Published : 02 Feb 2026, 11:05 PM
ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য দুই শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী— মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বয়সের ব্যবধানের মতো ভোটের ব্যবধানও বড় হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় ভোটাররা।
তাদের যুক্তি, ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা আব্বাস ‘এলাকার সন্তান’; সবাই তাকে চেনেন; জানেন। কিন্তু জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীকে এলাকার মানুষ খুব একটা চেনেন না।
শাপলা কলির প্রার্থী নাসীরুদ্দীনও নির্বাচন ‘অসম’ হওয়ার কথা বলেছেন। কারণ হিসেবে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা’ এবং ‘অবৈধ অস্ত্র ও টাকার’ কথা সামনে আনছেন তিনি। এর মধ্যেই ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ঢাকা-৮ নানা কারণে আলোচিত। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অনেক এলাকা যেমন এই আসনে পড়েছে; আবার ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুও এ আসনকে আলোচনায় রেখেছে।
আব্বাস ও পাটওয়ারীর বাইরে এ আসনে প্রার্থীর তালিকায় আছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) এ এইচ এম রাফিকুজ্জামান আকন্দ, বাংলাদেশ জাসদের এ এফ এম ইসমাইল চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম সরওয়ার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেফায়েত উল্লাহ।
গণঅধিকার পরিষদের মেঘনা আলম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা, জনতার দলের মো. গোলাম সারোয়ার, জাতীয় পার্টির মো. জুবের আলম খান ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের ( মুক্তিজোট) মো. রাসেল কবিরও এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
তবে ভোটের হিসাবে মির্জা আব্বাসের পরের স্থানে পাটওয়ারীর থাকার সম্ভাবনাই বেশি দেখছেন তারা।

মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, শাহজাহানপুর ও রমনা থানাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসন। ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১ জন।
ভোটের প্রচার শুরুর আগেই আলোচনায় আসে এ আসন। এখানে ভোটে লড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি। কিন্তু ভোটের প্রচার শুরুর মাস খানেক আগেই আততায়ীর গুলিতে মারা যান তিনি।
হাদির মৃত্যুর পর এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান পাটওয়ারী, যিনি ঢাকা-১৮ আসনে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
ঢাকা-৮ আসনটির অনেক এলাকা একসময় ঢাকা-৬ আসনের অধীনে ছিল। ওই আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা আব্বাস। সেই সংসদে তিনি পান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব।
এরপর একই বছর অবিভক্ত ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য।

১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবের হোসেন চৌধুরীর কাছে হেরে যান আব্বাস, যেটি পুনরুদ্ধার করেন ২০০১ সালে। সেবার তাকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী বানায় বিএনপি।
এরপর ২০০৮ সালে সীমানা পরিবর্তিত হয়ে ঢাকা- ৮ আসনে চলে যায় খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, মতিঝিলসহ বেশিরভাগ এলাকা।
সীমানা পরিবর্তনের পর ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে পরের নির্বাচনগুলোতে এ আসনে এমপি হয়ে এসেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা।
ভোটারদের হিসাব কী বলছে
এই আসনে ৭৪ বছর বয়সী আব্বাসকে লড়তে হচ্ছে ৩০ বছর বয়সী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে।
জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া পাটওয়ারী কিংবা তার দল এনসিপির এটাই প্রথম ভোট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে লেখাপড়া সম্পন্ন করা পাটওয়ারীর বাড়ি চাঁদপুরে।
এই আসনের অনেকেই মনে করেন, ঢাকার বাইরের বাসিন্দা হওয়ায় ভোটারদের কাছে তার পরিচিতি কম। ফলে ভোটে খুব একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না তারা।
আসাদ মিয়া নামে এক ভোটার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাড্ডাহাড্ডি লড়াই যাকে বলে, সেই ধরনের সম্ভাবনা খুব কম।”
কেয়ারটেকারের কাজ করা কামরুল মিয়া মনে করেন, বেশির ভাগ ভোট মির্জা আব্বাসের ব্যালট বাক্সেই যাবে।
শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “অন্যরা দুই-চারটা ভোট পাইলে পাইতে পারে; না পাইলে নাই। কিন্তু আব্বাস সাহেবের আলোচনা আছে খুব বেশি; হেই পাইব।”
শান্তিনগর এলাকার এক দোকানি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পাটওয়ারী তো মনে করেন এই এলাকায় নতুন; অপরিচিত। আর মির্জা আব্বাস তো এলাকার সন্তান এবং পরিচিত; সবাই চিনে উনারে। এলাকার সবাই সুখ-দুঃখ শেয়ার করতে পারবে উনার সঙ্গে।”
‘উসকানিতে’ না জড়ানোর আহ্বান আব্বাসের
ধানের শীষের প্রার্থী বলছেন, সুষ্ঠু’ ভোট হলে তিনি নিজের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে ভোট বানচালের ষড়যন্ত্র হওয়ার শঙ্কাও দেখেছেন তিনি।
গেল শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “স্বাভাবিক ভোট যদি হয়, আমরা আশাবাদী জয়লাভ করার। কিন্তু আমরা ভয় পাচ্ছি, ওদের যে কার্যক্রম এবং ওদের পেছনে যাদের পৃষ্ঠপোষকতা, তাতে ভোটটা স্বাভাবিক হওয়ার কথা নয়।”
প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে এনসিপির ‘নিজেদের কোনো কথা নেই’ বলে মনে করেন মির্জা আব্বাস। দলটি নানাভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ তার।
গেল ২৮ জানুয়ারি ব্রাদার্স ক্লাব মাঠে এক নির্বাচনি সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কোনো উসকানিমূলক কথাবার্তা বা কাজে জড়াবেন না। বিজয় আমাদের, ইনশাআল্লাহ। কয়েক দিন ধৈর্য ধরুন।”

গত ২৭ জানুয়ারি হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে পিঠা উৎসবের মধ্যে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তাপ ছড়ায়। এনসিপি প্রার্থী ওই অনুষ্ঠানে গিয়ে ‘হেনস্তার শিকার’ হন। তার দিকে ডিম ছোড়া হয়।
পরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ তোলেন, বিএনপি প্রার্থীর ‘নির্দেশে’ তার সমর্থকরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অন্যদিকে মির্জা আব্বাস অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে ব্রাদার্স ক্লাব মাঠে আব্বাস বলেন, “নির্বাচন বানচাল করার কিছু চক্রান্ত চলছে। নির্বাচন থেকে জনগণকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা রয়েছে।”
এনসিপিকে ইঙ্গিত করে সেদিন তিনি বলেন, “যে দলটির কোনো নির্বাচনের অভিজ্ঞতা নেই, যারা জীবনে দেশের জনগণের জন্য কাজ করেনি, তারা বিএনপিকে অপদস্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের কাছে নিজেদের বলার কিছু নেই।
“তারা শুধু বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলাই তাদের কাজ মনে করে। তাদের উদ্দেশ্য হলো দেশের জনগণকে চিরতরে উপেক্ষিত রাখা।”
বিএনপি কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে ‘ঝগড়া বা ফ্যাসাদ করতে চায় না’ বলেও মন্তব্য করেন আব্বাস।
এনসিপি নেতাকর্মীরা বিএনপির সঙ্গে ‘ঝামেলা’ বাঁধাতে চায় বলেও অভিযোগ এ বিএনপি নেতার।
২৭ জানুয়ারি মালিবাগের গুলবাগে ভোটের প্রচারে নেমে তিনি বলেন, “যে যত কথাই বলুক, আমি তাদের ফাঁদে পা দেব না।”
পাটওয়ারীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমার ভোট আমি চাইব, তুমিও ভোট চাও। এলাকার জন্য কী করেছ আর কী করবে বলো। তোমরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করার চেষ্টা করছো।"

সমালোচনায় মুখর পাটওয়ারী
ঢাকা-৮ আসনের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও পড়েছে। এই আসনে পড়েছে মগবাজার, যেখানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
১১ দলীয় প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশে পাটওয়ারীর বাক্সে তুলনামূলক বেশি ভোট পড়তে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
আবার অন্যান্য এলাকার চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও শাহবাগ এলাকাতে পাটওয়ারী বেশি ভোট পেতে পারেন।
ভোটের প্রচারে কথার লড়াইয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিএনপি ও মির্জা আব্বাসের সমালোচনা করছেন পাটওয়ারী।
নির্বাচনে ‘লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’ বলেও নানা সময়ে, নানা জায়গায় বলে আসছেন তিনি। এ কারণে তার আসনে ‘অসম’ নির্বাচন হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন তিনি।
শুক্রবার ভোটের প্রচারের মধ্যে এক ব্রিফিংয়ে পাটওয়ারী বলেন, “একদিকে পিস্তল, আরেকদিকে মুখ, এটা কি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়?
“একদিকে আছে চাঁদাবাজির টাকা, আরেকদিকে আমার কাছে টাকা নেই। একদিকে হলো সন্ত্রাসী বাহিনী, আরেকদিকে আমরা নিরাপরাধ কয়েকজন।”
মির্জা আব্বাসকে উদ্দেশ করে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক পাটওয়ারী বলেন, “এখানে কোনো লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। এটা তো অসম খেলা। উনি তো সবকিছু কিনে ফেলতেছেন।”
২৭ জানুয়ারি ডিম নিক্ষেপের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মির্জা আব্বাসকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করার দাবি তোলেন পাটওয়ারী। ধানের শীষের প্রার্থীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবেও মূল্যায়ন করেন তিনি।
পাটওয়ারী বলেন, “হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে মির্জা আব্বাসের বাহিনী আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা করেছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তারেক রহমানের কাছে মির্জা আব্বাসের বহিষ্কারের দাবি জানাই।”
তিনি বলেন, “এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে, দলে সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেবেন, নাকি তাদের বহিষ্কার করবেন।”
আরও পড়ুন
ঢাকা-১২: সাইফুল-সাইফুল দ্বৈরথে নির্ভার সাইফুল
ঢাকা-১৫: নারীদের ভোটে নজর দুই শফিকের
ঢাকা-১১: প্রার্থী ও ভোটারের যত 'ভয়'
ঢাকা-৬: মেয়র হতে না পারা ইশরাকের সামনে সাবেক শিবির নেতা মান্নান
কোনো উসকানিমূলক কথাবার্তা বা কাজে জড়াবেন না: নেতাকর্মীদের আব্বাস