Published : 04 Sep 2025, 01:35 AM
ফেরারি আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্য, জামানত আড়াইগুণ বাড়ানোসহ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনে আনা প্রস্তাবিত বড় পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে সংশ্লিষ্টদের তরফে।
একজন বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদ জামানতের টাকা বাড়ানোর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পদক্ষেপকে যোগ্য প্রার্থীদের ভোটে দাঁড়ানোকে নিরুৎসাহিত করবে বলে মন্তব্য করেছেন।
আর ফেরারি আসামিদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার উদ্যোগের পক্ষে একজন বিশ্লেষক মত দিলেও আরেকজন এ বিধানের অপব্যবহার হওয়ার শঙ্কা তুলে ধরেছেন।
একটি রাজনৈতিক দলের নেতা আরপিও সংশোধন প্রস্তাব চূড়ান্ত করার আগে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করার সমালোচনা করেন।
রোজার আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের লক্ষ্যে ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থা ইসি। এরইমধ্যে ভোটের কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচনি আইন সংস্কার নিয়ে মাসখানেক ধরে দফায় দফায় পর্যালোচনা করে ইসি। এরপর আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ইসি, যাতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। মঙ্গলবার তা সরকারের অনুমোদনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় ইসি।
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং হলে সরকারের অনুমোদনের জন্য তা উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উত্থাপন হবে। সেই ধাপ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি সংশোধনীর অধ্যাদেশ জারি করবে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী এ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপও শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
এমন পরিস্থিতিতে দলের সঙ্গে সংলাপের আগে আরপিও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চালালেও কোনো পরামর্শ পেলে তা বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ইসির তরফে।
কী বদলাচ্ছে
এবারের আরপিওতে বেশ কিছু বড় পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ইসি।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মতামতের পর সার্বিক প্রস্তাব আমলে নিয়ে আরপিও সংশোধনের কাজ করে তারা।
যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন শেষে বড় পরিবর্তন এনে তা সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। এতে ভোটার অনুপাতে নির্বাচনি ব্যয় আসনভিত্তিক ২৫ লাখেরও বেশি করার সুযোগ, অনলাইনে মনোনয়ন জমার সুযোগ না রাখা এবং একক প্রার্থীর আসনে ‘না’ ভোট চালুসহ একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব করা হয়।

আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনী যুক্ত করা, সমভোট পেলে পুননির্বাচন, জোটে ভোট করলেও প্রার্থীকে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করা, জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা, অনিয়ম করলে রিটার্নিং অফিসার প্রয়োজনে পুরো আসনে ভোট বাতিলের ক্ষমতা, অনলাইনের বদলে মনোনয়নপত্র সরাসরি রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা, লাভজনক পদ বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্য হলে প্রার্থী হতে পারবে না, হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রমাণ পেলে ভোটের পরেও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ইসির হাতে রাখা, প্রিজাইডিং অফিসারের ক্ষমতা বাড়ানোসহ ছোট-বড় ৪০-৪৪টি সংশোধন প্রস্তাব রয়েছে এবার।
এআই-অপব্যবহার রোধে আচরণবিধিতে শাস্তির বিধান যুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রবাসী ও দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তিদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটিংয়ের বিষয়েও আরপিও তে সংশোধন প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

কী বলছেন বিশ্লেষক-রাজনীতিবিদ-অংশীজনরা
সার্বিক সংস্কার সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক, বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
বিশেষ করে ফেরারি আসামিদের ভোটে অযোগ্য ঘোষণার বিধান, জামানত বাড়ানো, নির্বাচনি ব্যয় বাড়ানো ও একক প্রার্থিতায় ‘না’ ভোট নিয়ে আরও আলোচনার পরামর্শ এসেছে।
এখন সরকারের তরফ থেকে কেমন সিদ্ধান্ত আসে সেটিও দেখার বিষয় মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালত ঘোষিত ফেরারি আসামিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব রেখেছিল সংস্কার কমিশন। গত মার্চে এমন সুপারিশে আপত্তি জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে চিঠি দেয় ইসি। তখন তাদের যুক্তি ছিল- ফেরারি আসামিকে প্রার্থী হতে বিরত রাখার বিধান করা হলে তা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে।
পরে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে একজন নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে আলোচনা করে ইসি। এরপর অবস্থান পরিবর্তন করে আরপিও সংশোধন প্রস্তাবে ফেরারি আসামির বিধানটি প্রার্থীর অযোগ্যতায় যুক্ত করা হয়।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, আগে বিরোধিতা করেছে ইসি, এখন হয়ত কমিশন বুঝতে পেরেছে ফেরারি আসামিদের ভোটে সুযোগ না দিলে বৈষম্য হবে না।
”আমার কাছে মনে হয় না এটা বৈষম্য হবে, যেহেতু আদালত কর্তৃক ঘোষিত ফেরারি। তিনি যদি আদালতে উপস্থিত না হন, ফেরারি মানে এক ধরনের বুঝিয়ে দিচ্ছে তিনি অপরাধী। এজন্য আদালতের সামনে আসছেন না, আইন ফেইস করছেন না, ভয় পাচ্ছে। তাহলে তার নির্বাচন করার অধিকার কেন থাকবে? আসুক, ধরা দিক। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে।”
এ বিশ্লেষকের ভাষ্য, আদালত যদি মনে করে সে (ফেরারি) নির্বাচন করতে পারবে, তাহলে তো বাধা নেই। যেহেতু পালিয়ে বেড়াচ্ছে, সেটা সত্য স্বীকার করে নিচ্ছে।
তবে জামানতের টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব যোগ্য প্রার্থীদের ভোটে দাঁড়াতে নিরুৎসাহিত করা হবে বলে মনে করেন তিনি।
আব্দুল আলীম বলেন, অনেক প্রার্থী রয়েছেন সৎ, যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। ইসির এ সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে যাবে।
‘না’ ভোট শুধু একক প্রার্থীর আসনে নয়, সব আসনে রাখার পক্ষে মত দেন তিনি।
এছাড়া অনলাইনে মনোনয়নের বিধান রাখার পক্ষেও যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “অনলাইন ফেরারি আসামির জন্য প্রযোজ্য হবে না, এমন সুপারিশ ছিল আমাদের। অন্যদের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সরাসরি মনোনয়নপত্র জমার পাশাপাশি যেন অনলাইনেও দেওয়ার সুযোগের পক্ষে ছিলাম আমরা। অনলাইন দরকারি জিনিস।
”অনেকে হয়ত আসতে পারছেন না অসুস্থতার কারণে। আবার কখনও বেশি লোকজন গেলে সংঘাতের শঙ্কা থাকে, মারামারি হতে পারে। তাদের জন্য অনলাইন রাখতে পারলে ভালো।”
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “আরপিও সংশোধনীর নামে ইসি কী করছে সেটা আমরা প্রকৃতভাবে জানি না। আমরা শুরু থেকে দাবি করে আসছি, আরপিও সংশোধন নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ নেওয়া উচিত। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন করা প্রয়োজন।”
প্রস্তাবিত আরপিও এর বেশ কয়েকটি বিষয়ে দ্বিমত তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘না’ ভোট সব আসনে থাকা জরুরি। শুধু একক প্রার্থীর আসনে নয়, সব আসনে তা থাকতে হবে। ভোটারের সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীকে পছন্দ নাও হতে পারে।
জামানত বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় মন্তব্য করে সিপিবির এই নেতা বলেন, এখন যে জামানত রয়েছে ২০ হাজার টাকা, তাও অনেক বেশি। বরং যার যত আয় সে প্রার্থীর জন্য একটা শতাংশ ধরে দেওয়া যেতে পারে। আয় অনুযায়ী জামানত নির্ধারণ হলে ন্যূনতম সমতা আসতে পারে।
“জামানত বাড়ালে টাকাওয়ালা ছাড়া নির্বাচন করতে পারবে না। নতুন প্রস্তাবে ঘোর বিরোধিতা করি।”
অনলাইনেও মনোনয়নপত্র জমার বিধান থাকা দরকার বলে মত দেন তিনি।
“নানা বিবেচনায় এটা থাকার দরকার। শোডাউন হলে বাধা বিপত্তি থেকে রেহাই পেতে অনলাইন দরকার,” যোগ করেন তিনি।
ফেরারি আসামি কে হবে, না হবে তা আইনগত বিষয় তুলে ধরে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, “এগুলো আইনের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। যদি আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হলে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবে না। এখন আইনে যা আছে তা রাখাই উচিত। মনে রাখতে হবে, আমরা টাইটফিট কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কারো গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব যাতে না করি সেটা বিবেচনা করে আরপিও সংশোধন করতে হবে “
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, রাজনৈতিক ও মিথ্যা মামলার সুযোগে ফেরারি আসামিরা ভোট করতে পারবে না এমন বিধান রাখা হবে কিনা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
“ফেরারি আসামির বেলায় মামলার বাস্তবতা বুঝে সেটা হতে হবে। বাস্তবতা নিরীক্ষণ করে এটা রিভিউ করার সুযোগ থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক মামলা দেখি ভুয়া হয়, রাজনৈতিক মামলা হয়। নানা ধরনের মামলা হয়। কাজেই সরাসির নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না-তার আগে দোষটা যদি প্রমাণিত হয় তখন হতে পারে; তিনি তো রিভিউ’র কথা বলতে পারেন।”

এই নারী নেত্রী বলেন, অনলাইনে মনোনয়ন নেওয়ার বিষয়ে ইসির সক্ষমতা না থাকলে তা বিশৃঙ্খলা বাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে কমিশনের সার্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় এসব প্রযুক্তিগত বিষয় আপডেট করা উচিত।
নির্বাচনি ব্যয় অনেক আসনে বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “ভোটের খরচ ভোটার প্রতি নির্ধারণের বিবেচনা ঠিক নয়। কী কী কাজ করতে হবে তা ধরেই নির্ধারণ করা উচিত। বিদ্যমান ভাবনাটা ভোট কেনাবেচার ধারণাকে সাহায্য করে, এটা সঠিক হয়নি।”
আরপিও সংস্কারের সার্বিক প্রস্তাবকে খুবই ভালো ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সহায়ক বলে মনে করেন সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার।
ফেরারি আসামিদের ভোটে অযোগ্য করার বিধান যুক্ত করাকে যৌক্তিক পদক্ষেণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, অনেক ধরনের অপরাধী রয়েছে যাদেরকে ভোট থেকে দূরে রাখতে এ প্রস্তাব সময়োপযোগী।”
তার মতে, সরকারের সহযোগিতা লাগবে ইসির। সার্বিক সংশোধন ইসির কর্তৃত্ব বাড়াবে। সরকার এখন এসব প্রস্তাবের কোনো কোনোটিতে সায় নাও দিতে পারে। কিন্তু ইসি প্রয়োজন মনে করেছে তাই সব প্রস্তাব দিয়েছে, বিবেচনা করা উচিত সরকারের।
“শুধু ক্ষমতায়িত করলে হবে না। আইন-বিধির যথাযথ প্রয়োগ, বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ।”