Published : 02 Sep 2025, 10:57 PM
শুধু একক প্রার্থিতায় ‘না’ ভোট, অনিয়ম হলে পুরো আসনের ভোট বাতিল, জোটে থাকলেও নিজ দলের প্রতীকে ভোট করাসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব যোগ-বিয়োগ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
মঙ্গলবার রাতে কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আরপিও (সংশোধন) খসড়া অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য আরপিও ও আচরণবিধি সংশোধনের অনুমোদন দিয়ে রেখেছে কমিশন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি আইন সংস্কার নিয়ে মাসখানেক ধরে দফায় দফায় পর্যালোচনা করে ইসি। এরপর আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ইসি, যাতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং হলে সরকারের অনুমোদনের জন্য তা উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উত্থাপন হবে। সেই ধাপ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি সংশোধনীর অধ্যাদেশ জারি করবে।
অপরদিকে মন্ত্রণালয়ের সায় পাওয়ার পর আচরণবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ করবে ইসি।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মতামতের পর সার্বিক প্রস্তাব আমলে নিয়ে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ইসি আরপিও সংশোধনের কাজ করে।
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার মাছউদ বলেন, “আরপিও সংশোধন প্রস্তাব আমরা সাইন করে ফেলেছি। বেশ কিছু প্রস্তাবের মধ্যে সমভোট পেলে লটারি প্রথা বাদ দিয়ে আবার নির্বাচন, বিনা ভোটের বিধান বাদ দিয়ে ‘না’ ভোট যুক্ত করা, অনিয়ম হলে পুরো আসনে ভোট বাতিল, ঋণ খেলাপি হলে ভোটের পরে ব্যবস্থা নেওয়ার মত ইসির ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।”
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে অনেকগুলো বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, মোটামুটি সবগুলোই বহাল রয়েছে। ৪০-৪৪টার মতো সংশোধনী প্রস্তাব রয়েছে।
এবার প্রার্থীদের জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
এছাড়া আদালত ঘোষিত ফেরারি আসামিকে ভোটে অযোগ্য রাখার সুপারিশ করেছে ইসি। সংস্কার কমিশন এমন বিধান রাখার প্রস্তাব করেছিল। ইসি এর বিরোধিতা করে মার্চে ঐকমত্য কমিশনে চিঠি পাঠিয়ে বলেছিল, এমন বিধান করা হলে তা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এখন সেই প্রস্তাব আরপিওতে যুক্ত করার কথা বলেছে ইসি।
অন্য প্রস্তাবের মধ্যে প্রার্থী হতে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের সুপারিশ রাখা হয়নি বলে তুলে ধরেন কমিশনার মাছউদ।
শুধু একক প্রার্থিতার ক্ষেত্রে ‘না’ ভোটের বিধান রাখা হলে ‘ডামি’ প্রার্থী বাড়ার পাশাপাশি বৈষম্য হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছিলেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। সেক্ষেত্রে সব আসনে ‘না’ ভোট রাখার পরামর্শ ছিল অনেকের।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মাছউদ বলেন, “কোনো আসনে একক প্রার্থী থাকলে সেখানেই ‘না’ ভোট হবে। একক হলে হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়ে যেত আগে, আমরা বলছি এখন ‘না’ ভোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।”
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনে নির্বাচনের পর এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে বর্তমান ইসি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকারের বিষয়ে অনলাইনে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও আরপিও সংশোধনীতে যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে ইসি।

যত সংশোধনের প্রস্তাব ইসির
>> আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় বিদ্যমান বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্রবাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) যুক্ত করাসহ কোস্টগার্ডকে রাখা হয়েছে।
>> ইভিএম সংক্রান্ত যাবতীয় প্রভিশন বিলুপ্ত করা হয়েছে।
>> প্রার্থীদের জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা।
>> নির্বাচন কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের অবহেলাজনিত যে শাস্তিগুলো আছে সেগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এটা তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে ইসিকে জানাতে হবে।
>> ‘না’ ভোটের বিধান করা হয়েছে শুধু একক প্রার্থীর আসনে। ‘না’ ভোটের বিধানটা হবে যদি কোথাও একজন প্রার্থী হয়; বিনা ভোটে নির্বাচিত হবে না। সার্বিকভাবে ‘না’ ভোট নয়।
>> নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক এবং সংবাদকর্মীদের কেন্দ্রে প্রবেশের বিধান যুক্ত করা হয়েছে আরপিওতে।
>> ফলাফল স্থগিত ও বাতিল নিয়ে যে বিধানগুলো ছিল যেখানে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল বা ফলাফল বাতিল করার যে সক্ষমতা সেটাকে সীমিত করা হয়েছিল। সেটা আবার পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ (অনিয়ম হলে) নির্বাচন কমিশন অবস্থা বুঝে নির্বাচন স্থগিত করা এক বা একাধিক বা সমস্ত আসনের একইভাবে ফলাফল এক বা একাধিক বা সমস্ত আসনের ফলাফল বাতিল করতে পারবে।
>> আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি কার্যকরের বিধান সেটা সন্নিবেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আরপিওতে এটার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
>> সংবাদমাধ্যম কর্মীরা ভোট গণনার সময় উপস্থিত থাকতে পারবে। তবে শর্ত - গণনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যারা থাকতে চাইবেন তাদেরকে পুরাটা সময়ব্যাপী থাকতে হবে। মাঝপথে বের হয়ে যাওয়া যাবে না।
>> সমভোট প্রাপ্তদের জন্য আগে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ঘোষণার বিধান বাদ দিয়ে পুননির্বাচনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। যদি সমান হয়ে যায় তাহলে লটারির মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের যে বিধান ছিল কমিশন সেটা থেকে সরে এসে বলছে এক্ষেত্রে পুনঃনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
>> বিলবোর্ডে শুধু যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড সেগুলোতে আলোর ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া আলোকসজ্জার উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
>> প্রার্থীদের ব্যয়ের নিরীক্ষার (অডিট) ব্যাপারটাকে আরো সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং আরেকটু একনিষ্ঠভাবে দেখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যেগুলো ব্যত্যয় মনে করা হবে সেগুলোকেই অডিট করবে।
>> ইতোপূর্বে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি পর্যায় থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত এবং প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ৫০ লাখ পর্যন্ত অনুদান বা ডোনেশন নিতে পারত। এটাকে উভয়ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই লেনদেন হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর রিটার্নে এটা দেখাতে হবে।
>> নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত থাকেন বিশেষ করে পুলিশ এবং প্রশাসনের যাদের বদলি তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ১৫ দিন পর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে করতে হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জের ডিআইজিদের অন্তর্ভুক্তি ছিল না, সেটা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

>> কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআই ইত্যাদি ব্যবহার করে যেকোন ধরনের মিথ্যাচার বা অপবাদ ছড়ানো ইত্যাদি ব্যাপারে প্রার্থী, দল, সংস্থাসহ সবার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান করা হয়েছে।
>> কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দরখাস্ত যদি নাকচ হয় তাহলে ১৫ দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেই নির্বাচন কমিশন তাদেরকে পত্র দিবে। অতীতে শুধু নাকচ করে চিঠি দেওয়া হত এবং এই চিঠিটা আদালতে তারা উপস্থাপন করতে পারতেন এবং আদালতে এই কারণগুলো যথাযথভাবে প্রদর্শিত না হওয়ার কারণে অনেকে আবার নিবন্ধন ফেরত পেতেন। ইসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে-এতে প্রতিটি কারণ যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।
>> কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম স্থগিত হলে বা নিষিদ্ধ হলে, নিবন্ধন স্থগিত করার বিষয়টি অস্পষ্ট ছিল। এটা স্পষ্ট করে আরপিওতে যোগ করা হয়েছে।
>> হলফনামায় যদি মিথ্যা তথ্য দেয় তাহলে সেটার ব্যাপারে তদন্ত করে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আরো সুনির্দিষ্টভাবে আরপিওতে সন্নিবেশ করা হয়েছে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও (৫ বছর মেয়াদে) এই সময়কালে যদি হলফনামায় কোনো ধরনের অত্যুক্তি, বিচ্যুতি, মিথ্যা তথ্য যদি হয় তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনে তার প্রার্থীতা বাতিল করা হবে এবং নির্বাচিত এমপি হলেও আইনের আওতায় আসতে পারেন। এবং তার পদ চলে যেতে পারে। তবে এই পাঁচ বছরের পরে তা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে থাকবে না।
প্রিজাইডিং অফিসারদের ক্ষমতা বাড়ানো, ভোটে প্রভাব খাটালে শাস্তিসহ অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে একগুচ্ছ সুপারিশ রয়েছে।
তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুষ্ঠু ভোটে ‘সার্টিফিকেট’ দেওয়া, ইসির জবাবদিহিতা সংক্রান্ত কিছু সংস্কার সুপারিশ ইসির প্রস্তাবে থাকছে না।
গত ১১ অগাস্ট কমিশন বৈঠকের পর সার্বিক সংস্কার সুপারিশ তুলে ধরেছিলেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। এরইমধ্যে নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপও ঘোষণা করেছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আইনি সংস্কার চূড়ান্ত হবে বলে কর্মপরিকল্পনায় তুলে ধরা হয়েছে।
অনিয়ম: পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা চায় ইসি
'না' ভোট ফিরছে একক প্রার্থীর আসনে: ইসি
'না' ভোট বিধান সামনে আনছে যেসব প্রশ্ন
আরপিও সংস্কারে ইসির কর্তৃত্ব কতটা বাড়বে?
নির্বাচনি আচরণবিধি নিয়ে আরও যেসব প্রস্তাব পেল ইসি
নির্বাচনি আচরণবিধি চূড়ান্ত: পোস্টার বাদ, থাকছে টিভি সংলাপের সুযোগ
নির্বাচন কমিশন সংস্কার: ইসির আপত্তি তোলা সুপারিশের কী হবে?
আরপিও: আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করার প্রস্তাব ইসির