Published : 16 Nov 2025, 11:35 PM
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য যে আদালত গঠন করেছিল শেখ হাসিনার সরকার, সেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালই রায় দেবে, জুলাই অভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার শাস্তি হবে কি না।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণা করবে।
শেখ হাসিনা ছাড়াও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তখনকার আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এ মামলার আসামি।
তাদের মধ্যে মামুন দায় স্বীকার করে এ মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছেন। তিন আসামির মধ্যে একমাত্র তিনিই কারাগারে আটক আছেন, বাকি দুজনকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার কার্যক্রম চলছে।
আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট ৫ অভিযোগ আনা হয়েছে তিন আসামির বিরুদ্ধে।
জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুমসহ বিভিন্ন অভিযোগ বর্তমানে মোট ৪৫টি মামলা রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চে। তার মধ্যে ছয়টি মামলা অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে এবং একটি মামলা রায়ের পর্যায়ে এসেছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের জন্যও ইতোমধ্যে তদন্ত কাজ শুরু করেছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
শেখ হাসিনা ছাড়াও তার সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং সাবেক ও বর্তমান দুই ডজন সেনা কর্মকর্তা এসব মামলার আসামি।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ যাত্রা শুরুর পর সেখানে অর্ধশতাধিক মামলার রায় এসেছে; দণ্ডিত ১৮৯ আসামির মধ্যে ১৪০ জনকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আপিল শেষে এ পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা, একজন বিএনপির।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের আরো ৩০টি মামলা ট্রাইব্যুনালে রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই হত্যার বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করার পর আপাতত যুদ্ধাপরাধের কোনো মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে না।
ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিরোধী মতের লোকদের গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুই মামলা এবং শাপলা চত্বরে ‘গণহত্যা’ চালানোর অভিযোগে একটি মামলা রয়েছে।
আইনি ভিত্তি কী?
অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যান ভারতে। এরপর তার বিরুদ্ধে কয়েকশ মামলা হয় দেশের বিভিন্ন আদালত ও থানায়। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে সেসব মামলায় আসামি করা হয়।
এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আইসিটিতে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে, এটা ক্যাটাগরিকালি বলতে পারেন।”
বিষয়টি আরো ব্যাখ্যা করে আইন উপদেষ্টা বলেন, “সাবেক সরকারের সরকারপ্রধানসহ অন্য যারা জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, যাদের আদেশ নির্দেশ থাকার অভিযোগ রয়েছে, আমরা পত্রপত্রিকায় কিছু মন্ত্রীর নাম দেখেছি।
“আমরা এখানে কোনো ছাড় দেব না। আমরা বিদায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদেরও যদি কমান্ড রেসপনসিবিলিটি থাকে, আমরা সেটা পর্যন্ত খতিয়ে দেখব।”
সে সময় প্রশ্ন ওঠে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য করা এই আইনে শেখ হাসিনার বিচার করা সম্ভব কি-না। তবে, আইনের শিক্ষক থেকে মন্ত্রীর চেয়ারে বসা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, আইসিটি আইনের অধীনের বিচার করা সম্ভব।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ছিল। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিচারের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে তদন্ত এবং বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মূলত ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের বাংলাদেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্যই এ আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল।
এ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে বিচারের আওতায় আনা এবং স্বাধীনভাবে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ পরিচালনার বিধান যুক্ত করে ২০০৯ সালে আইনে কিছু সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমেই ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়।
১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনের ৩(১) ধারায় বলা আছে, আইনের দুই নং উপধারায় উল্লিখিত যে কোনো অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী [বা সংস্থা] বা কোনো সশস্ত্র, প্রতিরক্ষা বা সহায়ক বাহিনীর কোনো সদস্যের জাতীয়তা যাই হোক না কেন, তা যদি এই আইন প্রবর্তনের আগে বা পরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তার বিচারের এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।
অর্থাৎ যে কোনো সময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ, শান্তিবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনিভা কনভেনশন বিরোধী কাজসহ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যে কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা দল, সেনাবাহিনী কিংবা তাদের সহযোগী সশস্ত্রবাহিনীর বিচারের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনার আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটর হিসাবে কাজ করা রানা দাশগুপ্ত বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “এই আইনের একটা লম্বা প্রেক্ষাপট আছে। এটা করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। সেখানে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, তাদের বিচার করার জন্য এই আইনটি করা হয়।”
ফলে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপট এ আইনে বিচারের জন্য প্রযোজ্য হয় না বলে মত দিয়েছিলেন তিনি।
অন্যদিকে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “১৯৭৩’র যে আইনটা আছে, ওখানে ক্রাইম এগেইন্সট হিউম্যানিটির (মানবতাবিরোধী অপরাধ) সংজ্ঞা অনুসারে এটি অফেন্স (অপরাধ) হিসেবে আসে, অন্যগুলোর মধ্যে না।”
অর্থাৎ, আইনের তিন নম্বর ধারার ২(ক) উপধারায় উল্লিখিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা যেতে পারে।
এই ধারা অনুযায়ী, হত্যা, নির্মূল, দাসত্ব, নির্বাসন, কারাবরণ, অপহরণ, বন্দিকরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ বা কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত অন্যান্য অমানবিক কাজ বা রাজনৈতিক, জাতিগত বা ধর্মীয় ভিত্তিতে নিপীড়নের মত ক্ষেত্রগুলোতে এই ট্রাইব্যুনালে বিচার করা যাবে।
মামলা বৃত্তান্ত
>> শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার ৯ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ১৫ অগাস্ট তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা পড়ে।
>> প্রসিকিউশনের আবেদনে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।
>> শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের রেড নোটিস চেয়ে ১০ নভেম্বর পুলিশকে চিঠি দেয় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। পরে ডিসেম্বর প্রয়োজনীয় নথি পাঠানো হয়। বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ২০২৫ সালের এপ্রিল ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিস জারির আবেদন করে।
>> ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
>> ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় ২০২৫ সালের ১ জুন। সেদিন মামলার কার্যক্রম ট্রাইব্যুনাল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
>> ১ জুন অভিযোগ আমলে নিয়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের বিরুদ্ধে ফের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।
>> ২০২৫ সালের ১০ জুলাই ট্যাইব্যুনাল এ মামলার তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ হঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে রাজসাক্ষী হওয়ার অনুমতি দেয়।
>> রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামসহ প্রসিকিউশন টিম এ মামলা পরিচালনা করে। চৌধুরী আব্দুল্লাহ মামুনের পক্ষে আইনজীবী জায়েদ বিন আমজাদ। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।
>>মামলার সাক্ষী হিসাবে রাখা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা ও জাতীয় দৈনিকের এক সম্পাদকসহ ৮১ জনকে। শেষ পর্যন্ত মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানে নিহত আবু সাঈদের বাবা, নিহতদের পরিবারের সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান রয়েছেন সাক্ষীদের মধ্যে।
>> যুক্তিতর্ক শেষে ২৩ অক্টোবর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। ১৩ নভেম্বর আদালত জানায়, এ মামলার রায় হবে ১৭ নভ্ম্বের।