Published : 04 Nov 2025, 03:34 PM
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টিকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “আজ তিনটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দলগুলো হচ্ছে—বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
“আগামীকাল পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে, ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির পর চূড়ান্তভাবে সনদ দেওয়া হবে।”
এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, “দলীয় প্রতীকের বিষয়ে এনসিপি চেয়েছে ‘শাপলা কলি’, আরেকটি দল চেয়েছে ‘কাঁচি’, আরেকটি দল প্রতীক পরিবর্তনের আবেদন করেছে।
“এ কারণে প্রতীকের বিষয়ে আমি কিছু বলিনি। যখন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে, তখন জানানো হবে।”
আখতার আহমেদ বলেন, ১২ নভেম্বর দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির সময় শেষ হবে।
“এরপর রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের চূড়ান্ত গেজেট ১৪-১৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা যায়।”
জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এরপর জুলাই সনদসহ বিভিন্ন বিষয়ে দলটি সরব রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীন কারাগার থেকে বেরিয়ে গত ১৭ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি’ নতুন দলের সূচনা করেন। কাছাকাছি নামের আরেকটি দল আপত্তি তোলায় দলটি নাম পাল্টিয়ে হয় ‘বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টি’।
২০১৩ সালে ১২ এপ্রিল বাসদের তৎকালীন সাধারণ খালেকুজ্জামানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে দলের আদর্শচ্যুতির অভিযোগ এনে বেরিয়ে আসেন ওই সময়কার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর ও শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী। ওই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে মুবিনুল হায়দারকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় বাসদ (মার্কসবাদী)।
নিবন্ধন নিয়ে যা যা হলো
আগামী বছর রোজার আগে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হবে; ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণা করবে ইসি। প্রস্তুতিমূলক সব ধরনের কাজ এগোলেও দল নিবন্ধনের কাজে পিছিয়ে পড়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। ইসির রোডম্যাপে নতুন দলের নিবন্ধন গেজেট প্রকাশ করার কথা ছিল সেপ্টেম্বরের মধ্যে।
এ বছরের ১০ মার্চ নিবন্ধন আগ্রহী নতুন দলের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বধীন ইসি। একদফা সময় বাড়ানোর পর ২২ জুনের মধ্যে ১৪৩টি দল আবেদন করে।
নিবন্ধন শর্ত পূরণে ব্যর্থতায় প্রাথমিক বাছাইয়ে ঝরে পড়ে ১২১টি দল। বাকি ২২টি দলের বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত চালায় ইসির এ সংক্রান্ত কমিটি। ৩০ সেপ্টেম্বর জানানো হয়, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ও বাংলাদেশ জাতীয় লীগকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এরপর শুরু হয় এনসিপির ‘প্রার্থিত’ প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে ‘জটিলতা’। শাপলা প্রতীক নিয়ে অনড় অবস্থানের মধ্যে নির্বাচন কমিশন প্রতীকের তালিকায় ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করে। শেষ পর্যন্ত এ প্রতীকেই রাজি হয়েছে এনসিপি।
আর জাতীয় লীগের নিবন্ধন নিয়ে এনসিপির অভিযোগের মধ্যে অক্টোবরের মাঝামাঝি ফের তদন্তে নামে ইসি। সেই সময় নিবন্ধনের পথে টিকে থাকা ১০টি দলের মাঠ পর্যায়ের তথ্য পুনরায় তদন্ত করার কথা জানিয়েছিল নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটি।
পুনঃতদন্তে নিবন্ধনের তালিকা থেকে জাতীয় লীগ বাদ পড়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, “পুনঃতদন্ত করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের, ভোটে অংশগ্রহণ ও অতীত নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রমে জাতীয় লীগের ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়নি।”
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিকে (বিএনআইপি) রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দিতে গত ২ সেপ্টেম্বর ইসিকে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আদালতের আদেশের অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা।
একনজরে নিবন্ধিত দল
>> এটিএম শামসুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি নবম সংসদ নির্বাচনের সময় ৩৯টি দলকে নিবন্ধন দেয়।
>> কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ নেতৃত্বাধীন ইসি দশম সংসদ নির্বাচনের আগে দুটি দল নিবন্ধন দেয়।
>> কে এম নূরুল হুদা কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় নিবন্ধনযোগ্য কোনো দল পায়নি। তবে আদালতের আদেশে কয়েকটি দল পরে যুক্ত হয়।
>> কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দুটি দলকে নিবন্ধন দেয়।
>> ২০০৮ সালে শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধন পেলেও স্থায়ী সংশোধিত গঠনতন্ত্র দিতে না পারায় ২০০৯ সালে ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল হয়।
>> দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন আদালত অবৈধ ঘোষণা করে।
>> একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ইসির প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়, আদালত জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করায় আরপিও অনুযায়ী দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হল।
>> ২০১৭ সালে নিবন্ধিত দলগুলোর কমিটি ও অফিসের খোঁজে মাঠে নামে ইসি। শর্ত পালনে ব্যর্থ দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়; এ ধারবাহিকতায় পিডিপি, ঐক্যবদ্ধ নাগকি আন্দোলন ও জাগপার নিবন্ধন বাদ যায়।
>> গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবি পার্টি, নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি), মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলনকে নিবন্ধন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
>> এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন ইসি দায়িত্ব নেওয়ার পর আদালতের আদেশে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বিএমজেপি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি-বিআরপি নিবন্ধন পেয়েছে।
>> ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এ বছর নিবন্ধন পুনর্বহাল হয় জামায়াতে ইসলামীর আর নিবন্ধন স্থগিত হয় আওয়ামী লীগের।
>> সবশেষ আদালতের আদেশে নিবন্ধন পুনর্বহাল হয়েছে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার।
বর্তমানে ৫৩টি দলের নিবন্ধন রয়েছে; স্থগিত রয়েছে আওয়ামী লীগের, বাতিল রয়েছে ফ্রিডম পার্টি, ঐকবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন ও পিডিপির নিবন্ধন।
নিবন্ধন: জাতীয় লীগের কার্যক্রম ফের যাচাইয়ে নামছে ইসি
নিবন্ধন পাচ্ছে এনসিপি ও বাংলাদেশ জাতীয় লীগ
দল নিবন্ধন: ২২ দলের মাঠের তথ্য আসতে শুরু করেছে ইসিতে