Published : 12 Oct 2025, 01:36 AM
জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া চূড়ান্ত করার পর এর বাস্তবায়ন নিয়ে যখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা চলছিল, তখন বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে নামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি দল।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংসদের উভয় কক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করাসহ অভিন্ন পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনে নামা দলগুলো বলছে, এটি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি জনমত গঠনে তাদের ‘কৌশল’।
কিন্তু ক্ষমতায় যখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রয়েছে এবং যে সরকার বলছে, রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে তারা রাজি, তখন প্রশ্ন ওঠেছে—এই আন্দোলন কী বর্তমানে দেশে ক্রিয়াশীল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে চাপে ফেলার একটি কৌশল?

এই কৌশল নির্বাচন ও আগামী দিনের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব তৈরি করবে, এমন আলোচনাও আছে জনপরিসরে।
নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে রাজনীতি বিশ্লেষক সাঈদ ইফতেখার আহমেদ বলছেন, ছয় দলের এই আন্দোলন ‘বড় লক্ষ্যে’ পরিচালিত হচ্ছে।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য মনে করছেন, এই ধরনের আন্দোলন বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে না। ফলে এ নিয়ে ‘চাপে থাকার কারণ নেই’ বিএনপির।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) অভিন্ন পাঁচ দফা দাবিতে মিছিল, সমাবেশ, প্রচারপত্র বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।
তাদের দাবিগুলো হল-
• জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন করা।
• সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু করা।
• অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিশ্চিত করা।
• ফ্যাসিস্ট সরকারের সব জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা।
• ‘স্বৈরাচারের দোসর’ জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।
পিআর পদ্ধতির নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর দাবিটি ছাড়া আন্দোলনকারীদের অন্য কোনো দাবির সঙ্গে বিএনপিকে দ্বিমত প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। এমনকি ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ বলে আখ্যা দেওয়া দলগুলোর বিচার এবং বিচারকালে তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিষয়েও বিএনপির প্রকাশ্য বিরোধিতা নেই।

সংলাপ শেষের পথে, আন্দোলনের শুরু
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানোর সংলাপ বুধবার রাতেই শেষ হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এই সংলাপে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একটি গণভোট আয়োজনের বিষয়ে দলগুলো একমত হয়েছে। সেই গণভোট ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগেই আয়োজনের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত এসেছে।
তবু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করা অভিন্ন দাবির যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচিতে অবিচল রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ছয়টি দল।
শুরুতে তারা পিআর পদ্ধতি চালুর যে দাবিটিকে সামনে এনেছিল, এখন সেটি আরও স্পষ্ট করে বলছে. আগামী জাতীয় নির্বাচনে উভয় কক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু করতে হবে, যদিও জুলাই সনদে তা রাখা হয়নি।
প্রথম দফায় ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায়, ১৯ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় শহরে এবং ২৬ সেপ্টেম্বর সারাদেশে জেলা-উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছয় দল।
দ্বিতীয় দফায় তারা ১ অক্টোবর থেকে ৯ অক্টোবর সারাদেশে গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করেছে। ১০ অক্টোবর রাজধানীসহ সব বিভাগীয় শহরে গণমিছিল করেছে তারা।
এর মধ্যে খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টি অবশ্য শুধু ঢাকাতেই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১২ অক্টোবর সারা দেশে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি পেশ করবে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জাগপা।
জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দলীয় কর্মসূচির পক্ষে জনমত গঠনের জন্যই আমরা আন্দোলন করছি। আমরা চাই, গণভোটের মধ্যে পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনের বিষয়টিও থাকুক। আমাদের কর্মসূচি কোনো দল বা পক্ষের বিরুদ্ধে নয়।”

আন্দোলন করে কী অর্জন করতে চায় ছয় দল?
সংলাপের পথ খোলা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে আন্দোলন ও সংলাপ একসাথে চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ব্রিটিশ আমলে হয়েছে, পাকিস্তান আমলে হয়েছে, ২০০৬ সালেও হয়েছে। এবারও আমরা ঐকমত্যের সংলাপে অংশ নিচ্ছি, আবার মাঠেও কর্মসূচি পালন করছি।”
আন্দোলন কতটা ফল বয়ে আনল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আন্দোলন ফলপ্রসূ হচ্ছে, আরও ফলপ্রসূ হবে। সামনে আরও কর্মসূচি রয়েছে। এরপরেও হয়তো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।”
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সংস্কারের পক্ষে জনমত তৈরি করেছি। এখন এই দাবিগুলোর বিষয়ে (আন্দোলন) কর্মসূচি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি জনমত তৈরি করছে।”
যেভাবে দেখছে অন্য দলগুলো
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাবগুলো সমন্বিত করে সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামাসহ জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মতভেদ ছিল।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। আর বিএনপিসহ কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করে আসছিল।
শেষ পর্যন্ত গণভোটের বিষয়ে ‘ঐকমত্য’ হয়েছে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তবে সেই গণভোট কবে, কীভাবে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি।
এর মধ্যেই ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হবে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তার আগে সেপ্টেম্বরে একটি সংবাদমাধ্যমে খবর আসে পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াত, এনসিপিসহ আটটি দল যুগপৎ আন্দোলনে নামছে।
পরে এনসিপির তরফে যুগপৎ আন্দোলনে যাচ্ছে না বলে জানিয়ে দেয়। দলটি বলেছে, তারা সংসদের উভয় কক্ষে পিআর চায় না, উচ্চকক্ষে চায়।

ঐকমত্য কমিশনে থাকা ৩০টি দলের মধ্যে ছয়টি দল আন্দোলনে থাকলেও বাকিরা সংলাপের মাধ্যমেই একটি নির্বাচনি উত্তরণ ঘটানোর পক্ষে।
এক্ষেত্রে এখন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া কার বিরুদ্ধে এবং কী উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক রাজনীতিকের।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “ইসলামপন্থি দলগুলোর এই আন্দোলন বিএনপিকে চাপে ফেলার আন্দোলন বলে মনে করছি না। আন্দোলন করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। বিএনপি মনে করে আলোচনার টেবিলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। তবুও যারা আন্দোলন করছেন সেটা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।”
অপরদিকে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি উনাদেরকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনারা বলেছেন, আমরা তো চাপ প্রয়োগ করার জন্য এই কর্মসূচি দিচ্ছি না। নিজেদের দাবির পক্ষে প্রচার চালানোর অংশ হিসেবে কর্মসূচি দিয়েছি। যুক্তিটা আমার কাছে বেশ দুর্বল লেগেছে।
“তবে আশার দিক হচ্ছে, উনারা আমাকে জানিয়েছেন যে এই আন্দোলনটা উনারা বেশি বড় করবেন না। উনারা যে পিআর পদ্ধতি নিয়ে আন্দোলন করছেন, সেটা কিন্তু এখন আর বিতর্কের বিষয় নাই। জুলাই সনদের মধ্যেও পিআর পদ্ধতির কথা নেই। তারা জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি বা বৈধতা চাচ্ছেন। সেটার জন্য আমরা সবাই গণভোট আয়োজনের বিষয়ে একমত হয়েছি।”
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন বলছিলেন, রাজপথে আন্দোলন কার বিরুদ্ধে হচ্ছে, সেটাই তাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, জনমত গঠনের জন্য কোনো আন্দোলন হলে সেটা ঠিক আছে। নিজের বক্তব্যের পক্ষে রাজপথে, গণমাধ্যমে কিংবা চার দেওয়ালের মধ্যে জনমত গঠন করতে পারেন।
“সে ক্ষেত্রে জনগণের সমর্থন নেওয়ার জন্য কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে কাছাকাছি আনার জন্য এই ধরনের কর্মসূচি দিলে, আমি মনে করি সেটা ফলপ্রসূ হবে। গতানুগতিক আন্দোলন বলতে যেটা বুঝি, সেটা যদি এখনই শুরু হয় তাহলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।”

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম ছাত্রনেতা মুশতাক বলেন, “আমরা ওই ধরনের কোনো আন্দোলনে নেই। হ্যাঁ, যদি দেখা যায় সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা থেকে সরে যাচ্ছে, কোনো বিশেষ দলের দিকে যাচ্ছে, তাহলে আমরা তার প্রতিবাদ করব।
“আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে পারলে একটা স্থিতিশীল সমাধানের দিকে পৌঁছাতে পারব।”
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন ইসলামপন্থি দলগুলোর কর্মসূচির সমালোচনা করে বলেন, “এক দিকে তারা ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে আলোচ্য বিষয়গুলো নিয়ে রাজপথে কর্মসূচি দিচ্ছেন। এটা নৈতিকভাবে কতটা গ্রহনীয় সেটা ভেবে দেখার বিষয়।”
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঐকমত্য কমিশনে আমাদেরও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে, অনেক বিষয় আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, আবার একমত হয়েছি। কিন্তু আমরা কোনো কর্মসূচি দিচ্ছি না। উনাদের এই তৎপরতা গ্রহণযোগ্য নয়।”
বামপন্থি দলগুলোও আগামীতে কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামবে জানিয়ে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক বলেন, “সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে আমাদের বক্তব্য আছে। আমরা বলেছি কোনো অবস্থাতেই এই মূল নীতি পরিবর্তন করা যাবে না। চাইলে নতুন কিছু যোগ হতে পারে। আমাদের অবস্থানের পক্ষে কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি দেব।”
রাজনীতি ও নির্বাচনে কী প্রভাব?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা আসার পর এবং জুলাই জাতীয় সনদে সই করার দিন ঠিক করার পর জামায়াতসহ ছয় দলের আন্দোলনের গতিমুখ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা আছে।
জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ তাহেরের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের আন্দোলন থামছে না। বরং সামনে আরও কর্মসূচি আসতে পারে।
রাজনীতির বিশ্লেষকরা এ পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইসলামবাদী দলগুলোর এই আন্দোলন কর্মসূচিকে দাবি আদায়ের নিরীহ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বলে মনে হলেও, এটি বড় লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি বলছেন, “আন্দোলনকারীরা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বলছেন। কার্যত, এই আন্দোলনে অন্তর্বর্তী সরকারের কারো কারো প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে–এরকম একটা ‘পাবলিক পারসেপশন’ তৈরি হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট দাবিতে আন্দোলন হলেও এরকম মনে হবার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে এটির আপাত লক্ষ্য নির্বাচনকে পিছিয়ে দেওয়া এবং বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা।”

যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের এই শিক্ষক বলছেন, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ইসলামভিত্তিক রাজনীতি যারা করেন, তাদের ‘ইসলামপন্থি’ নয়, ‘ইসলামবাদী’ বলতে চান তিনি।
সাঈদ ইফতেখার বলেন, “ইসলাম ধর্ম অনুসারী মাত্রই ইসলামন্থি, সে হোক জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস বা সাধারণ মুসলিম জনগণ। এই ইসলামপন্থিদের মধ্যে যারা ইসলামভিত্তিক রাজনীতি করেন, তারা ইসলামবাদী।”
বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর নজর রাখা এই বিশ্লেষক বলেন, “এই আন্দোলন ইসলামবাদী রাজনীতির পরস্পরবিরোধী মেরুকে একত্র করছে। যেমন মওদুদীর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে অভিন্ন কর্মসূচিতে মাঠে আছে কওমী ধারার ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস।
“অভিন্ন দাবির আন্দোলন থেকে নির্বাচনি সমঝোতা তৈরি হতে পারে। তবে নির্বাচন যদি পিছিয়ে যায়, বা তারা যদি তাদের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নির্বাচন পেছাতে পারে, সেটা তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দেবে। তাদের এই ঐক্য তাদের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টাকে গতি দেবে।”
সাঈদ ইফতেখার বলেন, “ছয় দল যে দাবিগুলো নিয়ে মাঠে নেমেছে, তার মধ্যে পিআর নিয়ে বিএনপির আপত্তি আছে। ঐকমত্য কমিশন পিআর পদ্ধতির কথা বলছে সংসদের উচ্চকক্ষের জন্য। আন্দোলনকারী কোনো কোনো দল নিম্নকক্ষেও পিআর চাচ্ছে। এটা বিএনপির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।”
তার মতে, বিএনপিকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ফেলবে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন না করবার দাবি যদি জোরেশোরে সামনে আনা হয়।
“এর বিপক্ষে কথা বলা কঠিন। এর সাথে জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোটসঙ্গীদের ভোটের মাঠে নিষিদ্ধ করে ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত সময় অনুযায়ী যদি নির্বাচনের তারিখ দেওয়া হয় এবং জামায়াত ও সমমনারা তাদের দাবি পূরণ হয়নি বলে ওই নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে এটি বিএনপির রাজনীতিকে একটি কঠিন সংকটের মুখে ফেলে দেবে।”
রাজনীতি বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দল দ্বিদলীয় জোটের বাইরে থাকতে পারবে না।
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বাংলাদেশে এতদিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- এই দুই ধারায় রাজনীতি বিন্যস্ত ছিল। এখন যেহেতু আওয়ামী লীগ নেই, সেখানে বিএনপি ধারার বিকল্প আরেকটি ধারা তৈরি হবে।
“একটা ধারায় তো রাজনীতি হবে না কখনোই। রাজনীতির নিয়মই হল কমপক্ষে বিকল্প একটা ধারা থাকবেই। সেই জায়গা থেকে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর বিকাশ হচ্ছে, তারা বিকল্প হওয়ার চেষ্টা করছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলছেন, “বিএনপির বিপরীতে আরেকটা ধারার বিকাশ হচ্ছে। সেটা অনেকটা ইসলামপন্থি, শরিয়াহ আইন যারা চায়, তাদের মধ্যে বোঝাপড়ার একটা বিষয় দৃশ্যমান হচ্ছে। …এই বোঝাপড়াটা যদি তারা নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে তাহলে, তারাও দেখা যাবে বিএনপির বাইরে আরেকটা ধারা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।”
এ বিশ্লেষকের ভাষ্য, তারাও (ইসলামপন্থি দল) আগামী নির্বাচন মাথায় রেখে তারা কাজ করছে। তারাও নির্বাচনে বিএনপির বাইরে ভোট দেওয়ার জন্য একটা জায়গা তৈরি করতে চাচ্ছে। এটাই তাদের লক্ষ্য।