Published : 26 Feb 2026, 12:12 PM
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর ও তার উপদেষ্টাকে ঘিরে কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঘটনায় ‘সরকার সমর্থিত মব-কালচারের’ আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তার ভাষায়, “গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে, তা বর্তমান সরকার সমর্থিত মব-কালচারের আনুষ্ঠানিক সূচনা বলে মনে হচ্ছে। এটি দুর্ভাগ্যজনক ও পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।
“বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও তার উপদেষ্টার মতো সম্মানিত ব্যক্তিদের এভাবে অপমান করার অধিকার কারো নেই।”
বৃহস্পতিবার সকালে ফেইসবুক পোস্টে এ মন্তব্য করেন সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা।
নতুন গভর্নর আসছেন এমন গুঞ্জনের মধ্যে বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়েন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। যাবার আগে দেখতে হয় বিক্ষোভ-প্রতিবাদ। পরে কর্মকর্তাদের তোপের মুখে অফিস ছাড়তে বাধ্য হন তার উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ।
বাংলাদেশ ব্যাংকে দিনভর নজিরবিহীন এমনসব ঘটনার মধ্যে বিকাল নতুন গভর্নরের প্রজ্ঞাপন আসে। পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নরের দায়িত্ব দেয় তারেক রহমানের বিএনপি সরকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও আমলার বাইরে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়ায় বিস্মিত এ খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
এ বিষয়ে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, “এমনিতেই ফ্যাসিবাদের নাগপাশে পড়ে দেশের অর্থনীতিতে চরম দুরবস্থা, সর্বস্তরে দুর্নীতির মহামারি, সাথে রয়েছে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট; তার পাশাপাশি যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে, তবে দেশের অর্থনীতির অবশিষ্টাংশও ধ্বংস হয়ে যাবে।
“আমি মনে করি, এই বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তর থেকে প্রতিবাদ হওয়া উচিত। ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মব সৃষ্টি করে দায়িত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন নানা উৎপাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে।”
জামায়াত আমির বলেন, “আমি সরকারকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, সত্যিকারভাবে একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে এসব অপতৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
“একইসাথে, দলীয় আনুগত্য নয়; যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক ও উপযুক্ত ব্যক্তিদেরকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”
ব্যবসায়ীকে গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও।
তিনি বৃহস্পতিবার সকালে ফেইসবুকে লিখেছেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদ কোনো আনুষ্ঠানিক বা অলংকারমূলক দায়িত্ব নয়। এটি একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর একটি, যার ওপর নির্ভর করে মুদ্রানীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সর্বোপরি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আস্থা গড়ে তোলা।
“জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর যখন মানুষ কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল, তখন যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল। কোটা আন্দোলন কেবলই কোটার প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল মূলত মেধাতন্ত্র ও দক্ষ প্রশাসনের দাবিতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।”
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “কিন্তু নতুন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের নিয়োগ সেই প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা দিচ্ছে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন শিল্পপতিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বে বসানো হলো, যাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৯ কোটি টাকা (সাত মিলিয়ন ডলারের বেশি) ঋণ বিশেষ নীতিমালার আওতায় পুনঃতফসিল করা হয়েছিল নিয়োগের অল্প সময় আগে।
“তিনি আবার বর্তমান শাসক দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যও ছিলেন। ইতোমধ্যে জ্যেষ্ঠ ব্যাংকাররা স্বার্থের সংঘাত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যে ব্যক্তি নিজেই ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধাভোগী, তাকে পুরো ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রকের আসনে বসানো হলে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।”
তিনি বলেন, “যখন দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্যতা, পেশাদারিত্ব এবং মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব, এমন এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার অবসানের সংকেত দিতে পারে এই সিদ্ধান্ত।”