Published : 13 Nov 2025, 04:15 PM
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে জুলাই জাতীয় সনদ ‘লঙ্ঘিত’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ লঙ্ঘন করেছেন প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণের মাধ্যমে।
“কারণ জাতীয় সনদে তিনি স্বাক্ষর করেছেন এবং এই ভাষণের মাধ্যমে তা তিনি লঙ্ঘন করেছেন। আপাতত এটুকুই আমার প্রতিক্রিয়া।”
বেলা আড়াইটায় জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা ভাষণ দিয়ে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে এক সঙ্গে আয়োজনের ঘোষণা দেন।
এদিন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন, সেখানে গণভোট কী প্রশ্ন থাকবেন তা তুলে ধরা হয়েছে।
স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক সন্ধ্যায়
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। সন্ধ্যা ৭টায় এই বৈঠক হবে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে।
বৈঠকের বিষয়ে তথ্য দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেক বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা করা হবে। পরে দলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
পরে গুলশানে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সালাহউদ্দিন।
জুলাই সনদ লঙ্ঘন কীভাবে?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপির মুখ সালাহউদ্দিন আহমদ তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে জুলাই সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
কীভাবে সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই স্বাক্ষরিত হয়েছে, সারা জাতি দেখেছে এবং সেই স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ছাপানো কপি সবার কাছে আছে। সেই কপিগুলোতে প্রস্তাব এবং তার বিপরীতে দলগুলোর সম্মতি এবং নোট অব ডিসেন্ট, নোট অব ডিসেন্টের ভাষা সবকিছু সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।
“এটা কোন প্রথাগত নোট অব ডিসেন্ট নয়, ভিন্নমত নয়। সুনির্দিষ্টভাবে যে, এই ভিন্নমত যদি দলগুলো তাদের নির্বাচন ইশতেহারে উল্লেখ করে এবং জনগণের ম্যান্ডেট প্রাপ্ত হয় তাহলে তারা সেভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এখন সেই জায়গা থেকে কি সরে আসা হল না? এই জন্যই আমি বলছি যে, যিনি স্বাক্ষর করেছেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তিনি নিজের স্বাক্ষরিত দলিলের বাইরে গেলে সেটা লঙ্ঘনের শামিল।”
‘কোনো কোনো পক্ষ খুশি হতে পারে’
তিনি বলেন, “আমরা কয়েকদিন আগেও আমাদের দলের অবস্থান সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছি যে, স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের বাইরের কোনো বিষয় যদি আরোপ করা হয় তার সঙ্গে আমরা একমত হব না। সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতি সেটা কোনো বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করবে না।
“আজকেও বলতে চাই যে সমস্ত বিষয়গুলো এখানে জবরদস্তি করা হয়েছে এবং বলা হচ্ছে, এগুলোর উপর হয় আপনি ‘হ্যাঁ’ বলবেন বা ‘না’ বলবেন। যে প্রশ্নগুলো করা হচ্ছে, সেটা স্বাক্ষরিত সনদ বহির্ভূত। যে আদেশটা আজকে জারি করা হয়েছে, সেটার মধ্যে অনেকগুলো আছে নিত্য নতুন, তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেকগুলো প্রস্তাব করা হয়েছে।”
সালাহউদ্দিন বলেন, “হয়তো এখানে কোনো কোনো পক্ষ খুশি হতে পারে। কিন্তু কথা হচ্ছে যে, আমরা রাষ্ট্রের মধ্যে একটা ঐক্য সৃষ্টির পরিবর্তে কি অনৈক্য সৃষ্টি করতে যাচ্ছি? জাতীয়ভাবে কি আমরা কোনো বিভাজন সৃষ্টি করতে যাচ্ছি? এই বিভাজনের দায় দায়িত্ব কি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা নিবেন?”
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে প্রশ্ন
সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এটা একটা নতুন ধারণা যেটা জাতীয় ঐক্যমত কমিশনে কখনো আলোচিত হয়নি, সিদ্ধান্ত হয়নি, ঐক্যমত হয়নি।
“এই ধারণাগুলো কেন তিনি আদেশের মধ্যে এবং এই প্রস্তাবের মধ্যে নিয়ে আসলেন সেটা আমাদের জানা নাই। কারণ জাতীয় সংসদ গঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যেই নির্বাচন কমিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবিধানিকভাবে, রাষ্ট্রপতির নির্বাচনও সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব। এখন যে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন তার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হবে সংসদ সদস্যগণ…তারা শপথ নেবেন যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্য হিসেবে।”
তিনি বলেন, “আর এখানে (আদেশে) প্রস্তাব করা হচ্ছে, তারা একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। তারা কি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন যে শপথ নিবেন?
“সুতরাং এই আইডিয়াগুলো নতুন এবং এভাবে একটা সময় নির্ধারণ করে দেওয়া এবং একটা পরিষদ নির্ধারণ করে দেওয়া তাদের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারের জন্য প্রস্তাব করা এবং সেটা ১৮০ দিনের ভেতরে হতে হবে সে সমস্ত প্রস্তাব করা…এগুলোর এখতিয়ার কি আসলে কারো আছে?
সালাহউদ্দিন বলেন, “আগামী জাতীয় সংসদকে এভাবে নিদের্শনা দিয়ে কোনো প্রস্তাব কি কোনো আইনি ভিত্তি পাবে? তাতে করে কি সংসদের এখতিয়ার, সার্বভৌম এখতিয়ারের উপরে কি হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না?”
‘গণ পরিষদের ধারণা সাংঘর্ষিক’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে জাতীয় নাগরিক পার্টির তরফে নতুন সংবিধান লিখতে গণ পরিষদের দাবি তোলে। গণসংহতি আন্দোলন ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন সংবিধান সংস্কার পরিষদের দাবি তোলে।
জাতীয় সনদে বিষয়টি না থাকার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “যদি কোনোরকমের একটা জাতীয় ঐকমত্য হত এই যে আমরা একটা গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করব। তখন সেই লক্ষ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান পরিবর্তন হতে হবে, নির্বাচন কমিশনকে এখতিয়ার দিতে হবে। তারপরে হতে হবে।”
“এখন কি আমরা স্বাধীনতার পূর্ব অবস্থায় আছি? যে একটা গণপরিষদ করতে হবে। বাংলাদেশকে নতুন করে একটা রাষ্ট্র হলো, এই রাষ্ট্র তো পুরাতন। এখানে আমাদের একটা সংবিধান আছে। সুতরাং যে সমস্ত আইডিয়াসগুলো এখানে আরোপ করা হচ্ছে। এগুলো সবগুলো সাংঘর্ষিক। তারপরেও আমরা যদি জাতীয় ভিত্তিতে ঐকমত্য হতে পারতাম কোন বিষয়ে তাহলে এই প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হতো না।”
‘সরকার ও ঐকমত্য কমিশন সংকট সৃষ্টি করেছে’
সালাহ উদ্দিন বলেন, “সংকট তো সৃষ্টি করেছেন জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং সরকার নিজেই। তারা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করলেন। তার আগে সংস্কার কমিশন গঠন করলেন।”
“আলাপ আলোচনা হলো। ঐকমত্য কমিশনের নয় মাস আলোচনা হলো এই বিষয়গুলো ক্ষমতায় আসার জন্য। তারপরে জাতীয় সনদ রচিত হল, প্রণীত হল, স্বাক্ষরিত হল। তার বাইরে কেন যাবে? আমাদের বক্তব্য তো এখানেই। সংকট তো শুরু করেছেন ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ প্রদানের মধ্য দিয়ে সরকারের কাছে। এবং সেই কমিশনের সভাপতি হিসেবে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা নিজেই স্বাক্ষর করেছেন। তিনি তার কাছেই নিজে নিজে সুপারিশ করেছেন। বিষয়টা অনেকটাই।”
তিনি বলেন, “এখানে দাবির কোনো বিষয় নেই। আমরা বলছি, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে, স্বাক্ষরিত হয়েছে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সেখানে তিনিও স্বাক্ষর করেছেন, সবাই স্বাক্ষর করেছে। আমরা বলছি সেই সনদটাই বাস্তবায়ন করি।
“আমাদের প্রস্তাব রাখল না, তাদের প্রস্তাব রাখল, সেটা বিষয় না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের শেষের দিকে যখন আইনি ভিত্তির কথা বলা হলো এই সনদের, তখন বললাম যে জনগণের সম্মতি নেওয়া যায় এবং একইভাবে একই দিনে সর্বময় জনগণের সম্মতি আছে কিনা সেটা আমরা নিতে পারি। সেখানে সবাই একমত হয়েছিল দুই-একটা দল বাদে। তখন তারা প্রশ্নটা উঠালেন, এই সম্মতির জন্য গণভোটটা কি আগে হবে, নাকি পরে হবে, নাকি ভোটের দিন হবে।
“সবাই কমফর্টেবল মনে করলেন, যৌক্তিক মনে করলেন, গ্রহণযোগ্য মনে করলেন, ব্যয়শ্রায়ী মনে করলেন এবং অন্যান্য সকল আয়োজনের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক মনে করলেন একই দিন হওয়া উচিত সময়ের বিবেচনায় ব্যয়ের বিবেচনায়, সুবিধার বিবেচনায়…সেটা তো আমাদের প্রস্তাব না। আমরা সেখানে সম্মত হয়েছি।”