Published : 19 Jul 2026, 12:35 PM
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে তের বছর আগে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে করা মামলার খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
ট্রাইবুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিবেদন পাইছি বলতে আমাদের কাছে একটা খসড়া দিছে। মানে আমরা ফাইনাল পাইনি। তবে আমরা এটা নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখছি।”
তবে খসড়া প্রতিবেদনে কী তথ্য এসেছে, সে বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, “রিপোর্ট নিয়ে আমরা এখনই বলতে পারব না। কারণ এটা হল একেবারেই খসড়া।”
এদিকে মামলার অগ্রগতি জানতে এদিন প্রসিকিউশনের আইনজীবী দলের সঙ্গে মতবিনিময় করতে আসেন হেফাজতের নেতারা।
হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমীর আব্দুল হামিদ (মধুপুর হুজুর), যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ শীর্ষ নেতারা এ সময় প্রসিকিউশনের আইনজীবী দল ও তদন্ত সংস্থার সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এ বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “হেফাজত নেতাদের সাথে মতবিনিময় করছি। কোনো দোষী যাতে বাদ না পড়ে যায়, সেজন্য আমরা সতর্কতা অবলম্বন করছি।”
খসড়া প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা, পুলিশ প্রধান ও বিজিবি প্রধানসহ বেশ কয়েকজনের নাম থাকার কথা বললেও ‘তদন্তের স্বার্থে’ পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন তিনি।
তবে আগামী ২১ জুলাই ট্রাইব্যুনাল খোলার দিন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে নিজেদের সন্তুষ্টির কথা বলেছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক।
তিনি বলেন, “খসড়া রিপোর্ট আমাদের অভিযোগ ও প্রত্যাশার কাছাকাছিই আছে। প্রাথমিকভাবে আমরা যেটুকু দেখেছি, কিছু টুকটাক কারেকশন আছে। আমরা পর্যালোচনা করে দুয়েকদিনের মধ্যেই তা জানাব।”
শাপলা চত্বরের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে এই হেফাজত নেতা বলেন, “প্রায় ৬১ জনের একটা তালিকা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা ৫৮ জনকে আইডেন্টিফাই করতে পেরেছি। আর বাকিদের আইডেন্টিফাই করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমাদের তালিকা হচ্ছে ৬১ জনের।
“আমরা আগাগোড়াই বলেছি, এখানে অনেক মিসিং আছে। ডেডবডি গুম করার অপচেষ্টা হয়েছে। তাছাড়া শহীদদের মধ্যে শুধু মাদ্রাসার ছাত্র নয়; শ্রমিক, ট্রাক ড্রাইভার, বুয়েটের ছাত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও রয়েছেন।”
শাপলা চত্বরের ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত ‘সবচেয়ে উপযুক্ত ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধান কৌঁসুলি।
তিনি বলেন, “এটি অবশ্যই একটি সিস্টেমেটিক অফেন্স, ওয়াইড স্প্রেড এবং টার্গেটেড কিলিং। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে হেফাজতে ইসলামের মত একটি সংগঠনকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার—সমস্ত জায়গায় আলেম-ওলামাদের ওপর নৃশংস আক্রমণ করা হয় এবং রাষ্ট্রের সকল অর্গানকে এটার বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়।”
পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্ত করা নিয়ে ওঠা এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশেরই। আমরা কে পুলিশ বা কে সাংবাদিক—সেটা দেখে তদন্ত করি না, আমরা অপরাধীকে দেখে তদন্ত করি। এই মামলায় অনেক পুলিশই আসামি হবেন। কাজেই পুলিশের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই।”
তদন্ত করতে গিয়ে কোনো ধরনের চাপের শিকার হয়েছেন কি না–এমন প্রশ্নে তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা শহিদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, "এখানে কাউকে বাদ দেওয়া বা কাউকে ঢোকানোর কোনো ধরনের চাপ আমাদের ওপর ছিল না।
“আমাদের এই মামলার তদন্তের সিস্টেমটাই অন্যরকম। শুরু থেকে প্রসিকিউশন টিম আমাদের সাথে থাকে এবং উনারাও সার্বক্ষণিকভাবে শুরু থেকে ছিলেন। প্রত্যেকটা বিষয়ে উনাদের গাইডেন্স ছিল।"

শাহবাগের আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। সেদিন সেই সমাবেশ ঘিরে পুরো মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা আর তাণ্ডব চলে। পরে সেই রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের মতিঝিল থেকে সরানো হয়।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ অগাস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। গত ৩ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ওই ঘটনায় ৩২ জনের প্রাণহানির তথ্য দেয়।
পরদিন প্রধান কৌঁসুলি জানান, এ মামলায় ২৮ থেকে ৩০ জন আসামি হতে পারেন।
আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ আরও অনেকের নাম এসেছে।
এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা এর আগে বলেছিলেন চিফ প্রসিকিউটর।
মামলাটিতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও আবদুল জলিল মণ্ডল এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
এ ছাড়া চলতি বছরের ১৪ মে এই মামলায় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপাকেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।