০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: যিনি মানুষ ও প্রতিষ্ঠান গড়েছেন

বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতায় পেশাদারত্বের ভিত্তি ও দক্ষ কর্মী গড়ার অন্যতম কারিগর ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। প্রয়াত এই সাংবাদিক ও সম্পাদকের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি, তার কর্মোদ্যোগ ও উত্তরাধিকার নিয়ে লিখেছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: যিনি মানুষ ও প্রতিষ্ঠান গড়েছেন

১৪২৫ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বাসায় তার সঙ্গে আসিফ সালেহ্ ও তামারা হাসান আবেদ।

আসিফ সালেহ্ আসিফ সালেহ্

Published : 01 Nov 2026, 11:10 AM

Updated : 01 Nov 2026, 11:11 AM

আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, তৌফিক ইমরোজ খালিদী ভাই আমাদের মাঝে নেই।

লন্ডন থেকে তার মরদেহ দেশে আসার পর শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলাম। সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার মনে ভেসে আসছিল খালিদী ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্কের নানা স্মৃতি। মনে হচ্ছিল, তার সঙ্গে তো আরও কত কথা হওয়ার ছিল, আরও কত কিছু করার ছিল।

খালিদী ভাইকে ব্যক্তিগতভাবে চেনার অনেক আগে থেকেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন প্রবাসে থাকতাম। বাংলাদেশে কী ঘটছে, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, তা জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বিডিনিউজ। দেশের খবরের সর্বশেষ তথ্য পাওয়ার জন্য নিয়মিত বিডিনিউজে চোখ রাখতাম। বাংলাদেশ নিয়ে লিখতামও। প্রবাসে বসে দেশের সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা ছিল এই সংবাদমাধ্যম।

তখনো জানতাম না, এই প্রতিষ্ঠানের পেছনের মানুষটির সঙ্গে একদিন আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

২০১০ সালে দেশে ফিরে আসার পর তার সঙ্গে প্রথম দেখা। আমার উপস্থাপনায় একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। কথায় কথায় জানতে পারলেন, আমি গোল্ডম্যান স্যাকসের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। শুনে বেশ অবাক হয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তার আগ্রহও ছিল অনেক।

সেই প্রথম পরিচয়ের পর একটি বিষয় আমাকে প্রায়ই আনন্দ দিত। পরবর্তী সময়ে যতবার কারও সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, গোল্ডম্যান স্যাকসের চাকরি ছেড়ে দেশে ফেরার কথাটি উল্লেখ করতে ভোলেননি। এমনভাবে বলতেন, যেন নিজের ছোট ভাইয়ের কোনো অর্জনের কথা গর্ব করে অন্যদের জানাচ্ছেন।

পরিচয়ের কিছুদিন পরই একদিন আমাকে তার অফিসে ডাকলেন।

২০১১ সাল। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন তখন বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে যাত্রা শুরু করেছে। খালিদী ভাই সেখানে দায়িত্ব নিয়েছেন। তার মাথায় তখন অনেক নতুন পরিকল্পনা। আমাকে বললেন, প্রাইম টাইমে একটি দৈনিক অনুষ্ঠান করতে চান। এমন একটি অনুষ্ঠান, যেখানে উপস্থাপক শুধু সংবাদ উপস্থাপন করবেন না; বিষয় নির্বাচন, আলোচনা ও সম্পাদনার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত থাকবেন। অনেকটা নিউজ ম্যাগাজিনের আদলে।

তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশে এমন সংবাদ উপস্থাপক প্রয়োজন, যারা নিজেরা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান করবেন এবং সম্পাদনাতেও ভূমিকা রাখবেন।

আমাকে সেই অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিলেন।

তখনো আমাদের পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। ফলে প্রস্তাবটি পেয়ে অবাক হয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত কাজটি করা হয়নি। কিন্তু তার প্রস্তাবটি নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম।

পরে বুঝেছি, নতুন কিছু করার চিন্তা তার মাথায় সব সময়ই ঘুরত। প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইতেন না। নতুন ধারণা, নতুন ধরনের কাজ এবং নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতেন। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও তার এই বৈশিষ্ট্যটি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

আমাদের দেখা খুব ঘন ঘন হতো না। কখনো পহেলা বৈশাখে তার বাসায় দুপুরের আড্ডায়, কখনো কোনো অনুষ্ঠানে, কখনো হঠাৎ টেলিফোনে। দেখা হলে দেশ, সমাজ, গণমাধ্যম এবং নানা বিষয় নিয়ে কথা হতো।

একটি বিষয় সব সময় অনুভব করতাম, তিনি দেশকে নিয়ে ভাবতেন। দেশের জন্য কী করা যায়, নতুন কী করা সম্ভব, কীভাবে কাজের মান আরও ভালো করা যায়,এসব নিয়ে তার আগ্রহ ছিল।

আমাদের কাজের প্রতিও তিনি গুরুত্ব দিতেন। খোঁজখবর নিতেন, আগ্রহ দেখাতেন। তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না হলেও সব সময় পাশে থাকার একটি নিঃশব্দ আশ্বাস অনুভব করতাম।

কিছু সম্পর্ক ঘন ঘন দেখা-সাক্ষাতের ওপর নির্ভর করে না। খালিদী ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটি ছিল তেমনই।

তার নতুনত্বের প্রতি আগ্রহের একটি ঘটনা এখনো মনে আছে।

একবার বললেন, আমাদের দেশে সাধারণত মানুষ মারা যাওয়ার পর তাদের জীবনী প্রকাশ করা হয়। এই রীতিটি বদলানো দরকার। মানুষ বেঁচে থাকতেই তাদের জীবনের গল্প বলা উচিত।

কথাটি আমাকে ভাবিয়েছিল। যে সমাজে মানুষ বেঁচে থাকতে তাদের সম্পর্কে সত্য কথা লিখতে অনেকে সংকোচ বোধ করেন, সেখানে জীবিত মানুষের জীবন নিয়ে বই প্রকাশের চিন্তা যথেষ্ট সাহসী।

খালিদী ভাই শুধু চিন্তা করেই থেমে থাকেননি। অভিনেত্রী কবরীর জীবনী প্রকাশ করে সেই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। বইটি আমাকে পাঠিয়েছিলেন।

তিনি আরও অনেক প্রকাশনা করেছেন। নতুন কোনো বই বা প্রকাশনা বের হলে আমাকে পাঠাতেন। তার এসব উদ্যোগে নতুনত্ব এবং উদ্ভাবনী চিন্তার পরিচয় পাওয়া যেত। একটি বিষয়কে প্রচলিতভাবে না দেখে ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করতেন।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন ভীষণ শৌখিন। নিজের সব পাঞ্জাবি নিজেই ডিজাইন করতেন। একবার দুষ্টুমিভরা চোখে তামারাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আড়ংয়ের জন্য কয়েকটি পাঞ্জাবি ডিজাইন করে দেবেন।

তার ব্যক্তিত্বের এমন অনেক দিক ছিল, যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যেত না।

তিনি ছিলেন কিছুটা অন্তর্মুখী, কখনো কখনো আড়ষ্ট। সে কারণে অনেকে তাকে ভুল বুঝতেন। দ্বিচারিতা সহ্য করতে পারতেন না। কিছু মানুষের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। কিন্তু যাদের বিশ্বাস করতেন, তাদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক। নিজের সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াতেন।

আমি মনে করি, তার সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় পেশাদারত্বের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে পেশাদারভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান খুব বেশি গড়ে ওঠেনি। সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও বেশি। প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর থেকে যায়। একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, তার কাজের মান ধরে রাখা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সেই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়া সহজ কাজ নয়।

খালিদী ভাই সেই কঠিন কাজটিই করেছেন।

বাংলাদেশের নানা প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যেভাবে কাজ করে গেছে, সেটিকে আমি তার নেতৃত্বের একটি বড় প্রতিফলন হিসেবে দেখি।

সাংবাদিকতায় তিনি যে কাজই করতেন, সেটি পেশাদারত্বের সঙ্গে করার চেষ্টা করতেন। সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা, কাজের মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার গুরুত্ব বুঝতেন। একটি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্ব শুধু তার প্রকাশিত সংবাদে নয়, বরং প্রতিদিনের কাজের ধরন এবং সেখানে গড়ে ওঠা মানুষদের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।

এখানেই খালিদী ভাইয়ের আরেকটি বড় অবদানের কথা বলতে চাই।

তিনি মানুষ তৈরি করেছেন।

বিডিনিউজে কাজ করার সময় অনেকেই তার কাছ থেকে শিখেছেন, প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, পেশাগতভাবে নিজেদের গড়ে তুলেছেন। পরবর্তী সময়ে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাদের অনেকেই ব্র্যাকে এসে কাজ করছেন।

লক্ষ করেছি, তারা প্রত্যেকেই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বিডিনিউজে কাজ করার অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন। খালিদী ভাইয়ের কথাও বলেন শ্রদ্ধা ও মমতার সঙ্গে।

একজন মানুষ তার প্রতিষ্ঠানে কেমন কাজের পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, অন্যদের কীভাবে গড়ে তুলেছিলেন, সেটি বোঝার জন্য এমন অভিজ্ঞতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আমার কাছে মনে হয়, একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দক্ষ মানুষ তৈরি করাও তার গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। বিডিনিউজ থেকে যারা অন্য প্রতিষ্ঠানে গেছেন, তারা নিজেদের সঙ্গে সেখানকার কাজের অভিজ্ঞতা ও পেশাদারত্বের চর্চাও নিয়ে গেছেন।

এভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তার নিজের গণ্ডির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

খালিদী ভাইয়ের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়ে বারবার মনে হয়েছে, দেশকে তার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। তার মাথায় সব সময় নতুন পরিকল্পনা থাকত। নতুন উদ্যোগ নিয়ে ভাবতেন। নতুন কিছু প্রকাশ করতে চাইতেন। সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার জগতে আরও অনেক কাজ করার সম্ভাবনা তার ছিল।

অথচ সেই মানুষটিকে এত তাড়াতাড়ি বিদায় জানাতে হবে, তা ভাবিনি।

বিডিনিউজ এ বছর ২০ বছরে পা রেখেছে। এই উপলক্ষ নিয়ে খালিদী ভাই নিজেও পরিকল্পনা করছিলেন। যে প্রতিষ্ঠানটি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তার দুই দশকের পথচলার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই।

তাকে হারিয়ে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ব্যক্তিগতভাবেও তার অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন।

তবে আমি মনে করি, একজন মানুষের রেখে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান, মানুষ এবং কাজের সংস্কৃতি। খালিদী ভাইয়ের ক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয়ই বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

আমি আশা করি, বিডিনিউজ তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার এগিয়ে নিয়ে যাবে। তিনি যে পেশাদারত্বের ভিত্তি তৈরি করেছেন, সেটিকে ধরে রাখবে এবং সামনের দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী করবে।

তার গড়ে তোলা মানুষগুলো দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাদের কাজের মধ্যেও তার অবদানের একটি অংশ বেঁচে থাকবে।

খালিদী ভাই, আপনাকে মনে পড়বে। আপনার সঙ্গে কাটানো সময়, আলাপ, নতুন নতুন পরিকল্পনার কথা এবং আপনার আন্তরিকতা মনে থাকবে।

ভালো থাকবেন, খালিদী ভাই।

আসিফ সালেহ্: নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক।