০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

আমার বন্ধু তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন কৌতূহলী, উদারমনা ও দূরদর্শী

বন্ধুত্ব, একটি কথোপকথন এবং ‘রেসিপি অ্যা উইক’-এর পেছনের গল্প লিখছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শেফ টমি মিয়া।

আমার বন্ধু তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন কৌতূহলী, উদারমনা ও দূরদর্শী

‘রেসিপি অ্যা উইক’ পাতার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শেফের পোশাকে টমি মিয়া। তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সঙ্গে অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা।

টমি মিয়া টমি মিয়া

Published : 09 Oct 2026, 09:05 AM

Updated : 09 Oct 2026, 09:05 AM

প্রিয় বন্ধু তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত।

তৌফিক ছিলেন একজন পথিকৃৎ সাংবাদিক ও সম্পাদক। বাংলাদেশে ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে পেশাগত সাফল্যের বাইরেও আমি তাকে মনে রাখব একজন বন্ধু হিসেবে—যার সঙ্গে নতুন ভাবনা বিনিময় করা যেত, খোলামেলা আড্ডা দেওয়া যেত এবং কখনো কখনো প্রচলিত চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করেও তর্ক-বিতর্ক করা যেত।

২০০৭ সালের দিকে তার সঙ্গে হওয়া একটি কথোপকথন আমার মনে গভীর দাগ কেটে আছে।

ওই সময় আমি তৌফিককে প্রস্তাব করেছিলাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে আমার রান্নার রেসিপি নিয়ে একটি আলাদা পাতা চালু করা যায় কি না।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু এটা তো একটি সংবাদভিত্তিক সাইট।”

আমি তার কথার যুক্তিটি ধরতে পেরেছিলাম। একটি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে রান্নার রেসিপির বিষয়টি তখন খুব একটা মানানসই বলে মনে করা হতো না।

তাই আমি তাকে আমার ভাবনাটা খুলে বললাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তখন শুধু দেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। আমি তাকে বুঝিয়েছিলাম, প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের কাছে খাবার কেবল পেট ভরানোর মাধ্যম নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। একটি রান্নার রেসিপি তাদেরকে দেশের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে, শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারে। খাবারের মধ্য দিয়ে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের, পরিবারের সঙ্গে তার ঐতিহ্যের এবং প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের ও সংস্কৃতির একটি যোগসূত্র তৈরি করতে পারে।

তৌফিক মন দিয়ে আমার কথা শুনলেন।

প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে না মিললেও তিনি চিন্তাটাকে এককথায় বাতিল করে দেননি।

বরং তিনি সেটিকে গ্রহণ করলেন।

শুরু হলো ‘রেসিপি অ্যা উইক’। আমার রান্নার রেসিপি নিয়ে তৈরি এই আয়োজনটি পরবর্তী কয়েক বছরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি জনপ্রিয় ও সফল ফিচার হয়ে ওঠে।

এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, ওই ছোট্ট কথোপকথনের মধ্যেই তৌফিকের একটি বিশেষ গুণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক। সংবাদ ও সাংবাদিকতার গুরুত্ব তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝতেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ছিলেন কৌতূহলী, উদারমনা এবং নতুন চিন্তা নিয়ে ভাবতে আগ্রহী মানুষ। কোনো নতুন ধারণা পাঠকদের সত্যিকার অর্থে কাজে আসতে পারে বলে মনে হলে তিনি সেটিকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না।

এই গুণটিই তাকে আলাদা করে তুলেছিল।

ভালো সাংবাদিকতা মানে কেবল ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দেওয়া নয়। মানুষের আগ্রহ, জীবন, স্মৃতি এবং যেসব বিষয় মানুষকে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে রাখে, সেগুলোকে উপলব্ধি করাও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

খাবার তেমনই একটি সংযোগের মাধ্যম।

আমার কাছে তাই ‘রেসিপি অ্যা উইক’ শুধু একটি রেসিপির পাতা ছিল না। এটি বাংলাদেশ এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে একটি ছোট্ট সেতু হয়ে উঠেছিল।

আর আমি সব সময় মনে রাখব, এর শুরুটা হয়েছিল দুই বন্ধুর মধ্যকার এক সহজ-সরল কথোপকথন থেকে।

তৌফিকের সঙ্গে ওই কথোপকথনটি হয়েছিল বলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আর তাকে বন্ধু বলে ডাকতে পেরেছিলাম, যা আমার জন্য ছিল আরও বড় সৌভাগ্যের বিষয়।

তার প্রয়াণ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পাশাপাশি তাকে যারা চিনতেন, সম্মান করতেন এবং তার সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের জন্যও এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ হারিয়েছে একজন পথিকৃৎ সাংবাদিককে। আমি হারিয়েছি একজন বন্ধুকে।

শান্তিতে থাকুন, তৌফিক।

আপনি চিরকাল আমাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও গভীর স্মরণে বেঁচে থাকবেন।

টমি মিয়া: এমবিই, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শেফ এবং রাজ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী।