অরূপের দেশে তৌফিকের অধরা বিমূর্ত ক্যানভাস
“আতিথেয়তায় রাজকীয়,সাংবাদিকতার সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় আপসহীন এবং গভীর শিল্পবোধে সিক্ত এক প্রাণবন্ত সত্তা”—বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম প্রধান শিল্পী মনিরুল ইসলামের চোখে তার প্রিয় অনুজ ও বন্ধু তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর এই আকস্মিক ও অকাল প্রয়াণকে সহজভাবে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। আমার মন যেন এই কঠিন সত্যকে গ্রহণ করতে বারবার অস্বীকার করছে। মৃত্যুর অমোঘ বার্তাটি যখন পেলাম, মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মাথায় কাজ করছিল না যে, জীবনের এত কাছে থাকা, এত প্রাণবন্ত এক পরম প্রিয় মানুষ এভাবে হুট করে আমাদের ফাঁকি দিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যেতে পারে! বেদনার সেই প্রচণ্ড ধাক্কায় আমি রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে আমি ‘তৌফিক’ বলে ডাকতাম। ওর সম্মতি ও অনুমতি নিয়েই শুরু হয়েছিল এই ‘তুমি’ সম্বোধন। আমার এই প্রস্তাবে তৌফিক যে কতটা আনন্দ ও আন্তরিকতা নিয়ে সায় দিয়েছিল, তা আজও মনে স্পষ্ট ভাসে। দীপ্ত হাসিতে ও বলেছিল, “হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনি তো আমার বড় ভাই।” ও আমাকে কতটা শ্রদ্ধার আসনে রাখত, তা অনুভবের বিষয়; আমাদের অন্তরের টানটি ছিল একেবারে সমানে-সমানে, খাঁটি বন্ধুর মতো। যত দিন গড়িয়েছে, যত বেশি সময় আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি, আমাদের এই হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বের শিকড় তত বেশি গভীরে প্রথিত হয়েছে। আড্ডায়-আলোচনায় নানা প্রসঙ্গ উঠে এলেও, আমাদের যৌথ অনুরাগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠত শিল্প ও সাহিত্যের মায়াবী জগৎ।
তৌফিকের সঙ্গে আমার সম্পর্কের প্রথম সোপানটি তৈরি হয়েছিল আমাদের অনুজপ্রতিম বন্ধু, লেখক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিনের হাত ধরে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কর্মী রাজুর সঙ্গে আমার সখ্য তো আজকালের নয়—প্রায় সিকি শতাব্দীর এক সুদীর্ঘ জানাশোনা। আমি তখন জিগাতলার বাসায় থাকি। রাজু বিভিন্ন সময়ে আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসত, আড্ডা জমাত। তেমনই এক অলস মুহূর্তে, কথাচ্ছলে ও প্রথম তৌফিকের কথা তুলল। রাজু অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে বলল—তৌফিক নাকি অসামান্য শিল্পানুরাগী, আমার চিত্রকলা ও সৃষ্টিশীল কাজ নাকি ওর ভীষণ পছন্দের। সেই কথাপ্রসঙ্গেই একদিন রাজু প্রস্তাব দিল আমাকে তৌফিকের বাসায় নিয়ে যাওয়ার; আঁকা হলো এক মেলবন্ধনের পরিকল্পনা।
তারপর একদিন রাজুর সঙ্গে তৌফিকের ডেরায় পা রাখলাম। প্রথম দেখাতেই চোখে পড়ল এক দীপ্তিময়, সুদর্শন তরুণকে—যার চেহারায় ছড়িয়ে রয়েছে আভিজাত্য ও পরিশীলিত ভদ্রতার সহজাত আভা। রুচি, আভিজাত্য আর আপাদমস্তক সৌজন্যবোধের যে অনন্য সংমিশ্রণ একজন মানুষকে প্রকৃত ‘ভদ্রলোক’ করে তোলে, তৌফিক ছিল ঠিক তেমনই নিপাট এক ভদ্রলোকের প্রতিচ্ছবি। চমৎকার সদালাপী আর জীবনের আনন্দে ভরপুর।
শুধু তার ব্যক্তিত্বই নয়, ওর ঘরের চার দেয়ালজুড়েও যেন খেলা করত অনাবিল আনন্দের লহরি। ঘরের চারপাশজুড়ে ঝুলছিল খ্যাতনামা চিত্রশিল্পীদের শিল্পকর্ম—প্রতিটিই নিখুঁত ও নান্দনিক ফ্রেমে বাঁধা। সেই চিত্রকর্মগুলোর দিকে তাকালে যে কেউ অনায়াসে আঁচ করতে পারতেন, শিল্পকলার প্রতি ওর কী গভীর পক্ষপাত, সূক্ষ্ম পছন্দ আর সুমার্জিত রুচির নীরব উপস্থিতি। পুরো ঘরজুড়ে যেন ফিসফিস করে কথা বলছিল শিল্পের অনুচ্চারিত অনুভূতির নান্দনিক কলরব।
তবে তৌফিককে আমি আর দশজন সাধারণ ‘শিল্পসংগ্রাহক’ বা আর্ট কালেক্টরের খোপে বন্দি করতে রাজি নই। অনেকে কেবল কৌলীন্য জাহির করার তাড়নায় শিল্প সংগ্রহ করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখেন। কিন্তু তৌফিকের ভেতর বসবাস করত একজন খাঁটি শিল্পবোদ্ধা—এক দরদী, সূক্ষ্মদর্শী আর প্রকৃত শিল্পরসিক মন। শিল্পের স্পর্শকে ও যেভাবে যাপন করত, তা সত্যিই বিরল। কিছু ছবি শুধু ফ্রেমে বেঁধে দেওয়ালে টাঙানোতেই ওর তৃপ্তি ছিল না; দুয়েকটা অনবদ্য কাজ ও ঘরে ইজেলে যত্ন করে বসিয়ে রেখেছিল। দেখলে মনে হতো—চিত্রশিল্পী বুঝি এই মাত্র ক্যানভাস ছেড়ে পাশের ঘরে গেছেন, এখনই ফিরে আসবেন। দৃশ্যমান অনুপস্থিতির ভেতরেই যেন এক তীব্র উপস্থিতি রূপায়িত হতো ওর সেই শিল্প নির্বাচনে। এতেই স্পষ্ট বোঝা যেত—একটি শিল্পকর্মকে কোথায়, কীভাবে এবং কোন আলো-আঁধারিতে স্থাপন করলে তার আত্মাকে সম্মান জানানো যায়, সেই জাদুকরী নান্দনিকতাবোধ ওর খুব ভালোভাবেই জানা ছিল।
আড্ডার ছলে তৌফিক বহুবার ইউরোপের বিখ্যাত সব আর্ট গ্যালারি ও আন্তর্জাতিক শিল্পসংগ্রহগুলো দেখার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলেছে আমাদের। আমার বিশ্বাস, শিল্পের এই বিশ্বজনীন পরিভ্রমণ হয়তো ওকে চিত্রকলার গভীর অর্থ অনুধাবন ও উপভোগ করার দীক্ষা দিয়েছিল। সত্যি বলতে, এসব অভিজ্ঞতা ছাড়াও কেউ শিল্পরসিক হতে পারেন, তবে তৌফিকের ভেতর সেই চোখ আর বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা—দুটিরই অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল।
তৌফিকের ব্যক্তিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ওর অতুলনীয় আতিথেয়তা। মেজবান হিসেবে সে ছিল অনন্য ও আন্তরিক। ওর ডেরায় যতবার পহেলা বৈশাখের উৎসব জমেছে, ততবারই আমাকে পরম মমতায় নিমন্ত্রণ জানিয়েছে। বৈশাখের সেই নিমন্ত্রণে খাবারের আয়োজন দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত—যেন আবহমান বাংলার রসনাবিলাসের রাজকীয় ক্যানভাস। কত পদের ভর্তা, গুঁড়ো মাছ থেকে শুরু করে বড় নদীর নানা পদের মাছ, দেশি মাংস আর বুনো শাকসবজির এমন সমারোহ যে যেকোনো অতিথিই মুগ্ধ হতে বাধ্য।
প্রথমবার সেই খাবারের অঢেল বহর দেখে আমি তো অবাক হয়ে বলে ফেলেছিলাম, “এসব কী করছ, তৌফিক?”
তৌফিকের সঙ্গে রসিকতা করাটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এত পদের খাবার দেখে পরের বছরগুলোতেও বেশ কৌতুক করে বলতাম, “তুমি এত পদের আয়োজন করছ আসলে মানুষকে না-খাওয়ানোর জন্য। এত খাবার কি কোনো মানুষ খেতে পারে?”
আমার কথা শুনে তৌফিক মিটিমিটি হাসত। আমি ফের যোগ করতাম, “তিন পদের বেশি খাওয়ার পর তো জিভে আর কোনো স্বাদই থাকে না।”
তৌফিক তখন তার সেই স্মিত হাসিতে জবাব দিত, “হ্যাঁ, মনির ভাই, তা ঠিক। আপনারা তো ইউরোপে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, তিন পদের বেশি খেয়ে অভ্যাস নেই। কিন্তু আজকের দিনটি তো বিশেষ। আপনার পছন্দের পদগুলো চেখে দেখুন—এনজয় দ্য ফুড।”
দুপুরের ভোজ থেকে শুরু করে রাতের আহার—পুরো দিনটাই পহেলা বৈশাখের সেই আড্ডায় থমকে যেত। আর সেখানে কার না সমাগম হতো। রাজনীতিক, সমাজসেবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে শিল্পকলার সেরা মানুষেরা এসে তৌফিকের সেই ঘরটিকে এক আনন্দময় মিলনমেলায় রূপ দিতেন। জীবনের নানা ক্ষেত্রের মানুষের সঙ্গে ওর এই সখ্য আর প্রাণখোলা মেলামেশা ছিল সত্যি চোখে পড়ার মতো। প্রত্যেকটি মানুষকে ও সমান গুরুত্ব ও মনোযোগ দিয়ে আপ্যায়ন করত। সারাদিন এত এত অতিথি সামলাতে গিয়েও ওর মুখে ক্লান্তি বা বিরক্তির এক ফোঁটা ছাপ পর্যন্ত কখনও দেখিনি।
আমার ডায়াবেটিসের কথা মনে রেখে ও সবসময় আলাদা যত্ন নিত। কোন খাবারগুলো আমার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিত; এমনকি আমার জন্য আগে থেকেই তৈরি রাখত বিশেষ ধরনের স্বাস্থ্যকর জুস। তৌফিকের এই ভালোবাসাটুকু ভোলা অসম্ভব।
আড্ডা শেষে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে তৌফিক প্রায়ই বলে উঠত, “মনির ভাই, দাঁড়ান। আপনার জন্য একটা প্যাকেট আছে।”
আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, “কিসের প্যাকেট আবার?”
ও ইষৎ হেসে বলত, “আপনি তো একা থাকেন, ব্যাচেলর মানুষ। রাতে খাওয়ার জন্য কিছু খাবার দিচ্ছি।”
আমি অমত জানিয়ে বলতাম, “এত খাবার আমি কী করব, তৌফিক?”
কিন্তু সে কি আর ছাড়ার পাত্র। নাছোড়বান্দার মতো বলত, “না না, বেশি কিছু না। শুধু আপনার পছন্দের অল্প কিছু খাবার বেছে দিয়েছি।”
পরকে আপন করে নেওয়ার এই নিখাদ ভালোবাসা আর যত্ন আজকাল বড় বিরল। কিন্তু তৌফিকের হৃদয়ে এই মানবিক স্পন্দনটি সবসময় জীবন্ত ছিল। বিডিনিউজের প্রতিটা বর্ষপূর্তির আয়োজনেও ও আমাকে নিমন্ত্রণ জানাতে কোনোদিন ভুল করেনি। আমার প্রতি তৌফিকের যে প্রগাঢ় ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখেছি, তার কোনো তুলনা হয় না। বয়সে আমার ছোট হয়েও ও যেন এক অভিভাবকের মতো মমতার চাদর দিয়ে আমাকে আগলে রাখতে চাইত।
তৌফিক ছিল খুব বড় মাপের সাংবাদিক ও সম্পাদক। ওর মতো একজনের সঙ্গে পরিচিত হতে পারাটা আমার জন্য গভীর অনুভূতির এবং পরম গৌরবের। বিভিন্ন দূতাবাসের জমকালো সব আয়োজনে মাঝেমধ্যেই আমাদের দেখা হয়ে যেত। সেসব অনুষ্ঠানে তৌফিক যখন মার্জিত স্যুট-টাইয়ে হাজির হতো, ওর রুচিশীল পোশাক আর ব্যক্তিত্বের আভিজাত্যে চারপাশ যেন নিমেষে আলোকিত হয়ে উঠত।
ওর পোশাকের পছন্দ, বাচনভঙ্গি আর আচরণের প্রতিটি ছত্রে মিশে থাকত অপরূপ এক মার্জিত রূপ। ভিনদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে নিজের ও দেশের সম্মান-মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে সমান ছন্দে কথা বলতে হয়—সেই সূক্ষ্ম ও নান্দনিক শিল্পটা তৌফিকের চলাফেরায় অনায়াসে ফুটে উঠত। আসলে তৌফিক কেবল চিত্রকলার অনুরাগী ছিল না, ওর পুরো জীবনাচরণ ও সত্তাজুড়ে বিরাজ করত সেই শিল্পিত অভিব্যক্তি।
আমার বয়স তো অনেকটাই হলো; সম্প্রতি ধর্মীয় কিছু আচার-আচরণের প্রতি বেশ আগ্রহ জন্মেছে। তৌফিকের সঙ্গেও আধ্যাত্মিক ভাবনা নিয়ে কথা হতো প্রায়ই। একদিন ওকে বললাম, “তৌফিক, আমি হজ করার কথা ভাবছি।” শুনেই ওর মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, তক্ষণি বলে উঠল, “বেশ তো, মনির ভাই। তাহলে আপনি আমার সঙ্গেই যাবেন।” আসলে নানা মাত্রার আলাপে ও উপলব্ধিতে তৌফিকের সঙ্গে আমার এমন এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যাকে কেবল সাধারণ ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটা দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন।
মাস তিনেক আগের কথা, তৌফিকের সঙ্গে এক আড্ডায় কথাচ্ছলে ও হঠাৎ বলল, “মনির ভাই, ফিগারেটিভ ইমেজ আমার আর কেমন জানি ভালো লাগছে না।” আমি একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, “কেন বল তো?” ও একমুহূর্ত ভেবে বলল, “ঠিক জানি না, তবে মনে হয় নির্দিষ্ট আকৃতি যেন ভাবনাকে একটা গণ্ডির মধ্যে রুদ্ধ করে ফেলে। তার চেয়ে বরং বিমূর্ত ছবি দর্শকের কল্পনাকে মুক্তি দেয়।”
নিজের এই সূক্ষ্ম শিল্পবোধের কথা জানিয়ে সে তখন আমার কাছে আবদার করে বলল, “মনির ভাই, আপনি আমাকে ক্যানভাসজুড়ে বিশাল আকৃতির একটা বিমূর্ত ছবি এঁকে দিয়েন।”
ওর অনুরাগে সাড়া দিয়ে আমি বললাম, “ঠিক আছে তৌফিক, অবশ্যই দেব।”
এমনিতেও আমি অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবিই বেশি আঁকি। তবে তৌফিকের সেই কথার মাঝে আমি লক্ষ্য করেছিলাম—দৃশ্যমান রূপের আড়ালে থাকা এক অদৃশ্য, অধরা জগতের প্রতি ওর মনোজগতে গভীর আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। আফসোস, সেই বিশাল ক্যানভাসের বিমূর্ত ছবিটা ওকে আর দেওয়া হলো না; তার আগেই ও সব রূপ-অরূপের সীমা পেরিয়ে অন্য এক জগতে পাড়ি জমাল আমার অনুজ এই বন্ধুটি।
পেশাগত জীবনে তৌফিক আবার একেবারে অন্য এক মানুষ—অন্য ধাতুতে গড়া, ইস্পাতকঠিন ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অকুতোভয়। সাংবাদিকতার পথচলায় ও কখনো কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেছে, অন্যায় মেনে নিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। আদর্শ ও সত্যের প্রশ্নে ও ছিল অটল। ও ছিল গভীর বিশ্বাসযোগ্যতা, সত্যনিষ্ঠা ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রতীক—এক অনন্য সাংবাদিক ও সম্পাদক। এক সাক্ষাৎকারে তৌফিক নিজেই অবশ্য ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিল, ওর স্পষ্টবাদিতা আর সত্যভাষণের কারণে নাকি বহু শত্রু তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি ওর এই কথার সঙ্গে একমত নই; আমার দৃষ্টিতে শত্রুর চেয়ে ওর গুণগ্রাহী আর প্রকৃত মিত্রের সংখ্যাই ছিল অনেক বেশি। ওর নেতৃত্ব ও সম্পাদনায় কাজ করতে পেরে সহকর্মীরা যে কতটা উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত ছিল, তা আমি কাছ থেকে দেখেছি। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মতো এক দূরদর্শী ও নির্ভীক সম্পাদক পাওয়াকে সবাই নিজেদের পরম গৌরব বলে মনে করত ওর সহকর্মীরা। সত্যিকারের বস্তুনিষ্ঠ ও পেশাদার সাংবাদিকতা কাকে বলে—এই বিষয়টি তৌফিকের মতো এমন নিখুঁত ও প্রাঞ্জলভাবে আর কেউ হৃদয়ে ধারণ করেছে কি না, আমার সন্দেহ আছে। আজকের তরুণ প্রজন্মকে সৎ, নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে ওর অবদানকে যদি যুগান্তকারী বলা হয়, তবে বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হবে না।
এই তো সেদিন, তৌফিক আমার কাছে একজন ভালো ও ভরসাযোগ্য ড্রাইভারের খোঁজ চাইছিল। আমার এক বিশ্বস্ত ড্রাইভার ছিল, যে দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে কাজ করেছে। যেহেতু আমি এখন আর গাড়ি ব্যবহার করি না, তাই ওই ছেলেটিকেই তৌফিকের কাছে পাঠিয়েছিলাম। বিধি বাম। সেই ড্রাইভারের কণ্ঠ থেকেই আমাকে শুনতে হলো তৌফিকের চলে যাওয়ার মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক খবরটি। খবরটা শোনার পর বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল; বেদনার তীব্রতায় মনটা এতটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল যে বহুক্ষণ আমি কোনো চিন্তা করতে পারছিলাম না। ওর এই আকস্মিক ও অকাল প্রয়াণে আমি গভীরভাবে ব্যথিত ও শোকাচ্ছন্ন। আতিথেয়তায় রাজকীয়,সাংবাদিকতার সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় আপসহীন এবং গভীর শিল্পবোধে সিক্ত এক প্রাণবন্ত সত্তা আমাদের তৌফিক ইমরোজ খালিদী। আমার এই প্রিয় মানুষটিকে আল্লাহ যেন বেহেশত নসিব করেন—মনে মনে এই আকুল প্রার্থনা করছি।
মনিরুল ইসলাম: বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম প্রধান শিল্পী।
