বিদায়, আমার বন্ধু: স্মৃতির পাতায় তৌফিক
দেশের একজন খ্যাতিমান সম্পাদক ও পথিকৃৎ সাংবাদিককে যখন সবাই স্মরণ করছেন, তখন আহমেদ আহসানুজ্জামান তুলে ধরেছেন তার বন্ধু তৌফিক ইমরোজ খালিদীর একান্ত ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি।
২ অক্টোবর লন্ডনের একটি হাসপাতালে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর খবর শুনে মনটা এমন এক বিষণ্নতায় ছেয়ে গিয়েছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বয়সের এই পর্যায়ে এসে মৃত্যু অবশ্য আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এত বছরে কত বন্ধু, শিক্ষক আর কাছের মানুষকে হারিয়েছি। কত জানাজায় গিয়েছি, কত শোকবার্তা লিখেছি। কতবার এমন সব মানুষের কথা বলেছি, যাদের জীবন আরও দীর্ঘ হতে পারত। তবু কিছু মৃত্যু অন্যভাবে নাড়া দেয়। মনে হয়, একজন মানুষই শুধু চলে গেলেন না, তার সঙ্গে হারিয়ে গেল জীবনের একটা গোটা অধ্যায়।
তৌফিকের মৃত্যু আমার কাছে ঠিক তেমনই। খবরটি শোনার পর থেকে বারবার মনে পড়ছে তাকে। খ্যাতিমান সম্পাদক, পথিকৃৎ সাংবাদিক, বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নয়। মনে পড়ছে সেই যুবকের কথা, যার সঙ্গে ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রথম পরিচয় হয়েছিল। মনে হচ্ছে, ওর চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে জীবনের একটি অধ্যায়ের দরজাও নীরবে বন্ধ হয়ে গেল। যার বিচরণ এখন কেবল স্মৃতিতেই।
আমরা ছিলাম ১৯৮৪ সালের ব্যাচ। কিন্তু জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সেশনজট তৈরি হয়েছিল। ফলে আমাদের ক্লাস শুরু হয় ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছিলাম একরাশ অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে। মনে হতো, এরই মধ্যে জীবন থেকে অনেকটা মূল্যবান সময় হারিয়ে গেছে।
আমরা পাঁচজন এসেছিলাম ঢাকা কলেজ থেকে। আগে থেকেই একে অপরকে ভালোভাবে চিনতাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওই বন্ধুত্বের পরিধি প্রসারিত হলো। তৌফিকও দ্রুত আমাদের একজন হয়ে উঠল। সঙ্গে ছিল রিপন, ইরা, ফারুক, ডিনা, হাসিব, পিয়া, শাহনাজ, মিজান, ইফতেখার, লাজ, একরাম, সুফিসহ আরও অনেকে।
এখন পেছনে ফিরে তাকালে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় এই ভেবে যে, ওই বন্ধুদের অনেকেই এখন আর আমাদের মধ্যে নেই। রিপন চলে গেছে। ইরা নেই। ডিনা নেই। হাসিব নেই। ফারুকও নেই। আমাদের প্রিয় শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, এস এম আই স্যার, যার ক্লাস আমাদের চিন্তাজগৎ গড়ে দিয়েছিল, তিনিও পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। এবার তাদের সঙ্গে যোগ দিল তৌফিক। এই বয়সে এসে বুঝতে পারি, স্মৃতি এমন এক জায়গা, যেখানে জীবিতদের পাশাপাশি চলে যাওয়া মানুষেরাও সমভাবে বিরাজমান।
শিক্ষকেরা প্রায়ই বলতেন, আমাদের ব্যাচ নাকি বিভাগটাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিল। কথাটায় হয়তো একটু বাড়াবাড়ি ছিল। আমরা যেন কেউই বাড়ি ফিরতে চাইতাম না। বেলা একটার দিকে ক্লাস শেষ হতো। কিন্তু আমাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রকৃত আনন্দ শুরু হতো তখনই।
প্রথম গন্তব্য ছিল মল চত্বর। সেখানে ফুচকা আর ঝালমুড়ি খেয়ে অনেকেই চলে যেতাম ব্রিটিশ কাউন্সিলে। সত্যি বলতে কি, আমাদের বেশিরভাগই সেখানে পড়াশোনার জন্য যেতাম না। তখনকার ব্রিটিশ কাউন্সিল ছিল একেবারেই অন্য রকম। খোলামেলা, আন্তরিক, অনেকটা ঘরোয়া পরিবেশ। ইচ্ছেমতো বই ঘাঁটাঘাঁটি করতাম, বসে সময় কাটাতাম, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতো।
ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে আড্ডা গড়াত ফুলার রোডে, টিএসসিতে কিংবা শামসুন নাহার ও রোকেয়া হলের পাশের রাস্তায়। চার দশক পর আজ ওই আড্ডাগুলোর বেশিরভাগ কথাই আর মনে নেই। কিন্তু ওই অনুভূতিটা এখনো স্পষ্ট। কী অদ্ভুত এক বিশ্বাস ছিল আমাদের! মনে হতো, বন্ধুত্ব কখনো ফুরাবে না, আর সামনে পুরো জীবনটাই পড়ে আছে।
সেই দিনগুলোর কথা ভাবলেই তৌফিককে দেখতে পাই। কেউ কেউ স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়, আর কেউ কেউ ওই স্মৃতিকেই জীবন্ত করে রাখে। তৌফিক ছিল দ্বিতীয় দলের মানুষ।
আমরা ওকে ডাকতাম ‘ক্যারা’ বলে। নামটা কীভাবে ওর প্রাণচঞ্চল, অস্থির আর নির্ভার স্বভাবের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে গিয়েছিল। কোথাও আড্ডা হলে তৌফিক থাকবেই। তর্ক শুরু হলে সে যোগ দেবেই। কোনো অনুষ্ঠান বা আয়োজনের পরিকল্পনা হলে, সে জড়িয়ে পড়বে। আর কোথাও হাসির রোল উঠলে আশপাশেই শোনা যাবে ওর কণ্ঠ।
তবে শুধু প্রাণচাঞ্চল্য নয়, জীবন আর মানুষের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তৌফিকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। চারপাশের সবকিছু নিয়েই ওর কৌতূহল ছিল প্রবল। আমরা একসময় আড্ডা শেষ করে বাড়ি ফিরে যেতাম। কিন্তু তৌফিকের ফেরার তাড়া ছিল না। থাকত সোবহানবাগ অফিসার্স কোয়ার্টারে, ক্যাম্পাস থেকে বেশ খানিকটা দূরে। অথচ প্রায় প্রতিদিনই সে সবার শেষে আড্ডা থেকে উঠত। অনেক সময় ফুলার রোডের আড্ডা শেষ করে আবার চলে যেত এস এম হলে, নতুন করে আড্ডা জমাতে। তারপর গভীর রাতে বাড়ি ফিরত।
তৌফিককে নিয়ে কত কত কি মনে পড়ে। বিভাগে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় তার উৎসাহ, মানুষকে রাজি করানোর ক্ষমতা, কোনো কাজ কঠিন মনে হলেই হাল ছেড়ে না দেওয়ার স্বভাব—সবকিছু চোখের সামনে ভাসছে।
বিশেষ করে ১৯৮৭ সালের শুরুর দিকের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। আমরা তখন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি; পিকনিকে যাওয়ার জন্য খুব আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু বিভাগ থেকে অনুমতি মিলছিল না। একসময় আমরা হাল প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। তৌফিক ছাড়েনি। সে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছে, যুক্তি দিয়েছে, অনুরোধ করেছে, বোঝানোর চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত মনজুর স্যার আর আনিস আহমেদ স্যার আমাদের সঙ্গে যেতে রাজি হলেন।
আজ বুঝতে পারি, এই স্বভাবটাই তৌফিকের সারা জীবনের নানা কাজে ফিরে ফিরে এসেছে। প্রবল উৎসাহকে বাস্তব কাজে রূপ দেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল ওর। আমরা যেখানে বাধা দেখতাম, তৌফিক সেখানে দেখত আরও একবার যুক্তি দিয়ে কাউকে রাজি করানোর সুযোগ।
অন্যায় দেখলে ও একই রকম দৃঢ় হয়ে উঠত। এমনই একটি ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে। আমরা তখন দ্বিতীয় বর্ষের পুরোনো ছাত্র। বিভাগের এক বড় ভাই আমাদের অত্যন্ত ভদ্র ও মিষ্টি স্বভাবের এক আপাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে তৌফিক সরাসরি ওই বড় ভাইয়ের মুখোমুখি হলো।
স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে বেশ উত্তেজনা আর হইচই শুরু হয়। তখনকার দিনে সিনিয়রদের মুখের ওপর কথা বলা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। কিন্তু অন্যায় আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া অলিখিত নিয়মকানুনের ধার তৌফিক কখনো ধারত না। ভাগ্য ভালো, অধ্যাপক আহসানুল হক স্যার এগিয়ে এসেছিলেন। কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ছিলেন অনেকটা অভিভাবকের মতো। তার হস্তক্ষেপে বিষয়টি আর বেশি গড়ায়নি।
ঘটনাটি আমার মনে রয়ে গেছে ওইদিনের উত্তেজনার জন্য নয়, বরং তৌফিকের চরিত্রের একটা মৌলিক দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে। কোনো কিছুকে অন্যায় মনে করলে সে চুপ করে থাকতে পারত না। সাংবাদিকতায় আসার অনেক আগেই ওর ভেতরে একজন সাংবাদিকের জন্ম হয়েছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই বৈশিষ্ট্য ওর মধ্যে ছিল। চিন্তাভাবনায় তৌফিক ছিল প্রগতিশীল। সংকীর্ণতা আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে ওর অবস্থান ছিল দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়াতে কখনো দ্বিধান্বিত হতো না।
তবে ওর যে গুণটি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করত, তা হলো, নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থেকেও সে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে পারত। তীব্র তর্ক করত, কিন্তু গোঁড়ামি করত না। ভিন্নমত শুনত, আলোচনা করত। প্রয়োজনে নিজের অবস্থান নিয়েও নতুন করে ভাবত। পরবর্তী সময়ে নানা বিতর্ক আর ক্রমবর্ধমান বিভক্তির মধ্যে যখন তাকে কাজ করতে দেখেছি, তখন প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই তৌফিককে প্রত্যক্ষ করেছি। নিজের বিবেচনায় চিন্তা করা, আর চিন্তার স্বাধীনতার সঙ্গে আপস না করার ওই একই দৃঢ়তা ওর মধ্যে ছিল।
খুব কম মানুষই জানেন, আমাদের কয়েকজনের সাংবাদিকতায় আসার পেছনেও তৌফিকের বড় ভূমিকা ছিল। মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার কিছুদিন পর ‘দ্য ডেইলি স্টার’ থেকে একসঙ্গে অনেক সাংবাদিক চলে যান। তৌফিক তখন পত্রিকাটিতে কাজ করছে। একদিন সে আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে গেল দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টাইমস ভবনের বিপরীতে অবস্থিত ডেইলি স্টার কার্যালয়ে। পত্রিকাটির তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক মাহফুজ আনাম ভাইয়ের সঙ্গে কিছু কথা হলো।
তারপর প্রায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের চাকরি হয়ে গেল। আমিসহ দুজন যোগ দিলাম শিক্ষানবিশ ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে। অন্যরা শিক্ষানবিশ সহসম্পাদক।
আজ ভাবলে অবাক লাগে, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাগুলো কত সাধারণভাবেই না ঘটে যায়! সেদিন মনে হয়েছিল, বন্ধুর সঙ্গে কাটানো আর দশটা দিনের মতোই আরেকটা দিন। অনেক পরে বুঝেছি, ওই সুযোগটি আমার ভবিষ্যৎকে কতটা বদলে দিয়েছিল।
সাংবাদিকতা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম ছিল একাডেমিক ইংরেজির বদলে সহজ, প্রাণবন্ত আর স্বাভাবিক ইংরেজিতে লেখার গুরুত্ব। ওই শিক্ষার পেছনেও পরোক্ষভাবে তৌফিকের অবদান ছিল।
সময় গড়িয়েছে। আমাদের জীবন স্বাভাবিক নিয়মেই ভিন্ন ভিন্ন পথে এগিয়েছে। পেশাগত ব্যস্ততা বেড়েছে, সংসার হয়েছে, পরিবারের দায়িত্ব এসেছে। প্রতিদিনের আড্ডার জায়গা নিয়েছে দৈনন্দিন ব্যস্ততা। তবু কিছু বন্ধুত্ব আছে দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকলেও যার টান কমে না। কারণ ওই সম্পর্কের শিকড় প্রোথিত থাকে এমন এক যৌথ অতীতে, যা সময় কিংবা দূরত্ব কোনো কিছুই মুছে দিতে পারে না।
আমাদের দেখা হতো কম। কথা হতো আরও কম। কখনো কখনো দীর্ঘ সময় যোগাযোগও থাকত না। অথচ আবার যখন দেখা হতো, মনে হতো মাঝখানের বছরগুলো যেন কোথায় মিলিয়ে গেছে। যৌবনে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের এটাই সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। ওই বন্ধুরা একসময় আমাদের সত্তারই অংশ হয়ে যায়।
হয়তো সে কারণেই গতকালের একটি কথোপকথন আমাকে এতটা তাড়া করে ফিরছে। রিপনের বোন লর্না এখন সাসেক্সে থাকে। একসময় তাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সবার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। ওই পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য এখন লর্না। তৌফিকের প্রিয় ব্রিকলেন মসজিদে ওর জানাজায় অংশ নেওয়ার পর লর্না আমাকে ফোন করেছিল। কথা বলতে বলতে জানাল, ও তৌফিকের কাছের মানুষদের বলতে শুনেছে, হোটেলে একা থাকতে তৌফিক পছন্দ করত না। একা থাকতে ভয় পেত।
কথাটা মন থেকে সরাতে পারছি না। কী নির্মম পরিহাস! শেষ পর্যন্ত ওর জীবনে সেটাই ঘটল, যেটাকে সে ভয় পেত। লন্ডনের একটি হোটেলকক্ষে একা থাকা অবস্থায় তৌফিকের মারাত্মক স্ট্রোক হয়। যখন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন আর তেমন কিছু করার ছিল না।
দৃশ্যটি কল্পনা করাও আমার জন্য অসহনীয়। যে মানুষটি চারপাশটা আড্ডা আর হাসিতে মাতিয়ে রাখত; যে মানুষটি বন্ধুদের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেত; যার পুরো জীবনটাই যেন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আর বন্ধুত্বে ভরা, জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে ওই মানুষটিকেই একা থাকতে হলো!
এই ভাবনাটা আমাকে এতটা কষ্ট দিচ্ছে, কারণ হয়তো আমার চেনা তৌফিকের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। তৌফিকের কথা ভাবলে তাকে কখনো একা দেখতে পাই না। দেখি বন্ধুদের ভিড়। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে টেবিলজুড়ে জমে ওঠা চায়ের কাপ। দেখি ফুলার রোডে সন্ধ্যা নামছে। কানে ভেসে আসে হাসি, তর্ক আর কত অসম্ভব স্বপ্নের কথা।
দেখি সেই যুবককে, যে সবার চেয়ে একটু বেশি সময় আড্ডায় থেকে যেত। আড্ডা এত ভালো জমেছিল যে, ছেড়ে উঠতে মন চাইত না। লন্ডনের ওই নিঃসঙ্গ হোটেলকক্ষ আমার স্মৃতিতে বেঁচে থাকা তৌফিকের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের খুব বেশি দেখা হয়নি। ওর সঙ্গে আমার শেষ যোগাযোগ হয়েছিল এ বছরের ১৪ জুন, ওর জন্মদিনে। হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। উত্তরে ও শুধু একটি ভালোবাসার ইমোজি পাঠিয়েছিল। আর কিছু নয়। তখন সেটিকে খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। অথচ আজ ওই ছোট্ট প্রতিক্রিয়াটুকুই কত মূল্যবান মনে হচ্ছে!
বয়স আমাদের অনেক কিছু শেখায়। তবে সবচেয়ে নির্মম শিক্ষাটা সম্ভবত এই যে, কারও সঙ্গে যে শেষবারের মতো কথা হচ্ছে, তা আমরা আগে থেকে বুঝতে পারি না। আমরা ভাবি, আবার জন্মদিন আসবে। আবার শুভেচ্ছা জানানো হবে, আবার ফোনে কথা হবে। হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে যাবে, আবার কোনো একদিন সবাই মিলে আড্ডায় বসব।
একসময় এসে বুঝতে পারি, ওই সুযোগ আর নেই।
অনেক স্মৃতির ভিড়ে একটি ঘটনার কথা বারবার মনে পড়ছে। আশির দশকের শেষ দিকে ইংরেজি বিভাগে একটি বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। সেখানে তৌফিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুরু করল। মিলনায়তনজুড়ে শুনশান নীরবতা। ওর কণ্ঠের গভীরতা আর মাধুর্য সবাইকে মুগ্ধ করে রেখেছিল। কবিতার শেষের পঙ্ক্তিগুলোয় পৌঁছানোর পর মনে হয়েছিল, পুরো মিলনায়তন যেন জন্য থমকে গেছে:
হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান—
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
গত কয়েক দিন ধরে এই পঙ্ক্তিগুলোই আমার মনে অনবরত বেজে চলেছে। সাহিত্য হিসেবে নয়, এমনকি কবিতা হিসেবেও নয়। মনে হচ্ছে, এ যেন এক বন্ধুর প্রতি আরেক বন্ধুর শেষ বিদায়।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে দেশ মনে রাখবে তার কাজের জন্য, কৃতিত্বের জন্য। সেটাই স্বাভাবিক। সাংবাদিকতায় তার অবদান ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। সহকর্মীরা তাকে মনে রাখবেন একজন সম্পাদক হিসেবে, পাঠকেরা মনে রাখবেন একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে। কিন্তু আমার কাছে তৌফিকের স্মৃতি অনেক বেশি ব্যক্তিগত। আমি হারিয়েছি সেই প্রাণোচ্ছল বন্ধুটিকে, যার উপস্থিতি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় কিছু বছরকে রঙিন করে রেখেছিল। হারিয়েছি সেই বন্ধুকে, যে আড্ডায় এলেই চারপাশটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।
মনে পড়ে আমাদের অসংখ্য অসমাপ্ত কথোপকথনের কথা। আর কষ্ট হয় ওই বিভ্রমটার কথা ভেবে, যা আমরা পুরোনো বন্ধুরা সবাই মনে পুষে রাখি, আমাদের হাতে বুঝি এখনো অনেক সময় বাকি।
বন্ধু, আজ যখন তোমার কথা ভাবছি, তখন লন্ডনের কথা ভাবছি না। হাসপাতালের কথা ভাবছি না। এমনকি মৃত্যুর কথাও নয়। আমার মনে ভর করছে সন্ধ্যার ফুলার রোড। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডার শেষে সবাই ধীরে ধীরে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি। একজন একজন করে উঠে দাঁড়াচ্ছি। ভিড় পাতলা হয়ে আসছে। রাত গভীর হচ্ছে। কিন্তু একজন তখনো বসে আছে। কথা বলছে, হাসছে, আরেকটু থাকার অজুহাতে বাড়ি ফেরাটা পিছিয়ে দিচ্ছে।
আমার স্মৃতিতে তুমি সেখানেই রয়ে গেছ, বন্ধু। সবার শেষে আড্ডা ছেড়ে ওঠা ওই মানুষটি হয়ে। আর যত দিন তোমার বন্ধুদের মনে ওই সন্ধ্যাগুলো বেঁচে থাকবে, তত দিন প্রাণের সত্যে কখনোই তুমি সেই আড্ডা ছেড়ে চলে যাবে না।
আহমেদ আহসানুজ্জামান: ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এবং কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন আহমেদ রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি সেন্টারের পরিচালক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি), ঢাকা।
