Published : 13 Apr 2026, 06:39 AM
যদি বলি তার কণ্ঠে জাদু আছে, মাদকতা আছে, অসীম সম্মোহনী শক্তি আছে, কোনো ঐশ্বরিক আবেদন আছে—তবে কোনো কিছু দিয়েই সম্ভবত আশা ভোঁসলের কণ্ঠের মাধুর্যকে ঠিকঠাকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না!
আমরা যারা গত শতকের আশির দশকে কৈশোর অতিক্রম করেছি, তাদের কাছে আশা ভোঁসলে কেবল একজন শিল্পী নন—যেন এক অনুভূতির নাম, এক অনিবার্য সুরের নদী। তার কণ্ঠে যে আবেশ, তা কেবল গান নয়; তা এক বিশাল সময়ের স্মৃতি, কয়েক প্রজন্মের ভালোবাসা। রেডিওত হঠাৎ পুরোনো গান, টেলিভিশনের সাদাকালো দিন, স্মৃতিময় সিনেমা হল থেকে মাইকে ভেসে আসা সুরের ছোঁয়া, ক্যাসেট প্লেয়ারের ঘূর্ণায়মান চমক—সবখানেই তার কণ্ঠ ছিল এক সঞ্জীবনী সুধা। অবশেষে যখন তিনি ৯২ বছর বয়সে চলে গেলেন, তখন যেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয় কোনো সম্পদ চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল!
যার কণ্ঠ এত সুললিত, তার জীবন চলার পথটা কিন্তু মোটেও ছন্দময় ছিল না। ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতে তার জন্ম। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন প্রখ্যাত মারাঠি নাট্যব্যক্তিত্ব এবং শাস্ত্রীয় কণ্ঠশিল্পী। তিনিই আশাকে শৈশবে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা দেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তার জীবন পাল্টে যায়। আর্থিক সংকট মেটাতে এবং পরিবারকে বাঁচাতে ১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি ছবি ‘মাজে বল’-এ প্রথম গান গেয়েছিলেন।
ছোটবেলায় বাবার কাছে প্রাথমিক তালিম নিলেও আশার সংগীত শিক্ষার প্রকৃত পাঠশালা ছিল তার জীবনের অভিজ্ঞতা। বড় বোন লতার সঙ্গে সবসময় একটি ‘সুস্থ প্রতিযোগিতা’ ছিল তার, যা নিজের কথায়, ‘গানকে আরও উন্নত করেছিল’। ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। পঞ্চাশের দশকের বলিউডে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে জায়গা করে নেওয়া কঠিন ছিল, যখন শামশাদ বেগম ও গীতা দত্তের মতো প্রতিভা এবং তার নিজের দিদি লতা জ্বলজ্বল করছিলেন। সংসার চালাতে গিয়ে আশাকে সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গান রেকর্ড করতে হতো, যার অধিকাংশই ছিল কম বাজেটের ছবির জন্য।
১৯৫২ সালে ‘সঙ্গদিল’ ছবিতে ওপি নাইয়ারের সুরে ‘ছম ছমাছম’ গানটিই ছিল তার ক্যারিয়ারের প্রথম সীমানা পেরোনো। এর পর শামশাদ, গীতা দত্ত বা লতা মঙ্গেশকরের পরেই তার নামটি উচ্চারিত হতে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রিতে।
আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবন সুখের ছিল না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি ৩১ বছর বয়সী গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গণপতরাও, যিনি লতা মঙ্গেশকরের সেক্রেটারি ছিলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বল্পমেজাজি। আশা তাকে ‘স্যাডিস্ট’ বলেছেন। চার মাসের গর্ভবতী অবস্থায় একবার তিনি এতটাই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন যে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৬০ সালে তিনি স্বামীকে ছেড়ে দেন। এই সম্পর্কে তার তিন সন্তান: হেমন্ত, বর্ষা ও আনন্দ।
জীবনের অন্ধকার পার করে আশা খুঁজে পান সুরের সাথী রাহুল দেব (আর ডি) বর্মনকে। বয়সে তার চেয়ে ৬ বছরের ছোট আর ডি বর্মনের সঙ্গে ১৯৮০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যদিও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে তারা আলাদা হয়ে যান। আর ডি বর্মনের সুরে ‘পিয়া তু আব তো আ জা’ বা ‘চুরা লিয়া হ্যায়’-এর মতো গানগুলো এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করে।
বাংলা গানের জগতেও তিনি অমর হয়ে থাকবেন। তার গাওয়া ‘চোখে চোখে কথা বলো, মুখে কিছু বলো না। মন নিয়ে খেলা করো, এ কি ছলনা’, ‘আমার স্বপ্ন তুমি, ওগো চিরদিনের সাথী। তুমি সূর্য ওঠা ভোর আমার, আর তারায় ভরা রাতি’, ‘আজ গুনগুন গুন কুঞ্জে আমার এ কি গুঞ্জরন। গানের সুরে পেলাম এ কার প্রাণের নিমন্ত্রণ’, ‘এমন মধুর সন্ধ্যায়, একা কি থাকা যায়? খুঁজে নাও, বেছে নাও, তুমি সাথী কে’, ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না, কবে কি আমি বলেছি, মনে রেখো না’, ‘বাঁশি শুনে কি ঘরে থাকা যায়? বলো গো সখী, কী করি উপায়’, ‘না না না, কাছে এসো না! মায়াবী এই রাতে, না না না কাছে এসো না’, ‘তুমি কত যে দূরে, কোথা যে হারিয়ে গেলে আমার জীবন হতে’—কেন যে এখনও পুরোনো হলো না, তা সম্ভবত সমাজবিদ্যার গবেষণার বিষয় হতে পারে।
রবীন্দ্রসংগীতও গেয়েছেন আশা। ‘তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে’ বা ‘সহে না যাতনা’ এখনও কানের মধ্যে ঘুরপাক খায় নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় কৈশোর পেরোনো বাঙালির। আশার কণ্ঠে ‘আমি আপন করিয়া চাহিনি তবু, তুমি তো আপন হয়েছো। জীবনের পথে ডাকিনি তোমায়, সাথে সাথে তুমি রয়েছো’ শুনলে এখনও যেকোনো সুরপ্রেমিক মানুষ আনমনা হয়।
তবে তার গাওয়া হিন্দি গানগুলো কিছুতেই ভোলার নয়: ‘ও মেরি সোনা রে’, ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি জানে জহাঁ’, ‘আ জা আ জা ম্যায় হুঁ প্যার তেরা’ গোটা ভারতবর্ষের মানুষের ঠোঁটে ঠোঁটে ফিরত। ‘দম মারো দম’ গানে তিনি কণ্ঠে তুলে এনেছিলেন হিপি সংস্কৃতির মূল তন্তুকে। ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’-এ খৈয়ামের সুরে ‘ইন আঁখো কি মস্তি’, ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ প্রভৃতি গানে প্রমাণ করলেন রাগপ্রধান গানেও তিনি সমান পারদর্শী। ঊর্মিলা মাতোন্ডকর অভিনীত ছবি ‘রঙ্গিলা’য় ‘তন্হা তন্হা’ গাইলেন ৬২ বছরের আশা। ২০০১-এ রহমানের সুরেই ‘লগান’ ছবিতে ‘রাধা ক্যায়সে না জ্বলে’ বা ‘প্যার তু নে কেয়া কিয়া’ (২০০৪)-এ ‘কমবখত ইশক’ গেয়ে মাতিয়ে রেখেছেন ভারতবর্ষের সংগীত জগতকে।
নক্ষত্ররাও এক সময় মরে যায়! গত ১১ এপ্রিল বুকে সংক্রমণ ও ক্লান্তির কারণে ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হন আশা ভোঁসলে। পরের দিনই কিংবদন্তি নীরব হয়ে যান। তার শেষের বছরগুলোতে তিনি পুরোনো গানের পুনর্নির্মাণ (মিক্স, রিমিক্স) এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করতেন। ৯০ বছর বয়সেও তার সৃজনশীলতা অটুট ছিল।
আশার ব্যক্তিগত জীবনে বারবার ট্র্যাজেডি নেমে এসেছে। তার মেয়ে বর্ষা ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেন। তিন বছর পর, ২০১৫ সালে তার ছেলে এবং সংগীত পরিচালক হেমন্ত ক্যানসারে মারা যান। এত সব আঘাত ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি কখনো থেমে যাননি, বরং কণ্ঠে সান্ত্বনা খুঁজেছেন।
সংগীতের পাশাপাশি ২০১৩ সালে তিনি মারাঠি ছবি ‘মাই’-এ অভিনয় করেছিলেন, যা তার বহুমুখী প্রতিভার আরেক পরিচায়ক।
আশা ভোঁসলের কাজের পরিধি ভাষা ও সময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ স্থান পেয়েছেন ২০টিরও বেশি ভাষায় সর্বোচ্চ সংখ্যক স্টুডিও ট্র্যাক (১২,০০০-এর বেশি) রেকর্ড করার জন্য। বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, পাঞ্জাবি, এমনকি রুশ ও মালয় ভাষাতেও তিনি গেয়েছেন। তার মোট অ্যালবামের সংখ্যা শতাধিক।
তার সঙ্গে জুটি বেঁধে যারা বিখ্যাত হয়েছিলেন—সেই মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, আর ডি বর্মন, বাপ্পী লাহিড়ীরা একে একে মৃত্যুর অন্ধকারে হারিয়ে গেছেন। আশা কিন্তু রয়ে গিয়েছিলেন আশা-তেই। ২০০৫-এও ‘পেজ থ্রি’ সিনেমার ‘হুজুরেঁ আলা’ শুনে একবারও মনে হয়নি, এই গায়িকা সত্তরের কোঠায় দাঁড়িয়ে মোহ বিতরণ করেছেন অকৃপণ কণ্ঠে। কত মানুষ যে আশার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়েছেন— ‘ম্যায় থোড়ি দের জী তো লু/ নশে কে ঘুঁট পী তো লু’—সেই সংখ্যা হিসাব করে বোঝানো যাবে না।
এ এক বিস্ময়কর জীবন! প্রায় এক শতাব্দী তিনি বেঁচেছেন। এই বাঁচা কণ্ঠের ইন্দ্রজালে সবাইকে মোহিত করে বাঁচা। সেই একাকী চাঁদনি রাতে ‘রাত বাকি, বাত বাকি/ হোনা হ্যায় জো, হো জানে দো’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো’, ‘ইয়ে মেরা দিল প্যার কা দিওয়ানা’।
গানের পাশাপাশি আশা রান্না করতেও খুব পছন্দ করতেন। তিনি ২০০২ সালে দুবাইয়ে চেইন রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেন। দুবাইতেই প্রথম রেস্তোরাঁ চালু করেন, নাম দেন ‘আশা’স’। পরে এই রেস্তোরাঁর চেইনের আউটলেট ছড়িয়ে যায় বিশ্বের বহু প্রান্তে।
যে মানুষটি এক সময় কেবল টাকার জন্য গেয়েছেন, জীবনের শেষ ভাগে এসে তিনি গান গেয়ে আর হোটেল ব্যবসা করে মিলিওনারও হয়েছিলেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর মতে, তার মৃত্যুর সময় মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০-২৫০ কোটি ভারতীয় রুপি (২৫-৩০ মিলিয়ন ডলার)।
তিনি জাতীয় স্তরের বহু পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু আশির দশকের আমাদের মতো শ্রোতাদের কাছে তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো—আমাদের হৃদয়ে তার অমর আসন।
আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শক্তির প্রতীক। যে নারী ব্যক্তিগত জীবনে এত ঘাত-প্রতিঘাত সয়েছেন, অথচ তার কণ্ঠে এত প্রাণশক্তি ও প্রেম ছিল, তিনি চিরকাল অমর। তার যাত্রা শেষ হলো, কিন্তু যে স্বরলিপি তিনি রেখে গেলেন, তা শুধু রেকর্ড নয়; তা যন্ত্রণাকে জয় করে সৃষ্টি করার মহাকাব্য। আজ যখন আমরা ফিরে তাকাই, দেখি—একটি কণ্ঠ কীভাবে একটি সময়কে ধারণ করে, কয়েকটি প্রজন্মকে একত্র করে। আশা ভোঁসলে সেই বিরল শিল্পী, যিনি কেবল গানই গাননি—তিনি সময়কে সুরে বেঁধেছেন।
তার গান শুনলেই মনে হয়—জীবন যতই জটিল হোক, কোথাও না কোথাও একটি সুর বেজে চলে, যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আর সেই সুরের নাম—আশা।