Published : 22 Jan 2026, 02:51 AM
আপাতদৃষ্টিতে ইরানের আকাশ থেকে সংকটের কালো মেঘ কেটে গেছে; আবারও টিকে গেছে খামেনি জামানা। বাইরে থেকে ডনাল্ড ট্রাম্পের তর্জন-গর্জন আর ভেতর থেকে নাগরিক বিক্ষোভের যে উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কেবল শোরগোলেই শেষ হতে চলেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এই নিস্তরঙ্গতার গভীরে বয়ে চলেছে এক অবাধ্য স্রোত, যার অগ্রভাগে রয়েছেন ইরানের তেজস্বিনী নারীরা। পারস্যের এই অকুতোভয় কন্যারা বারবার খামেনি শাসনকে দাঁড় করিয়েছেন কাঠগড়ায়; কখনো রাজপথে কণ্ঠ ছেড়ে, কখনো বা বিশ্বমঞ্চে শান্তির নোবেল জয় করে। এবারও তারা শাসকের মসনদে কম্পন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতার এই সুকঠিন প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়েও ইরানের এই 'অবাধ্য কন্যারা' কেন বারবার একাট্টা হন? কোন সে দহন, যা তাদের শৃঙ্খল ভাঙার মিছিলে শামিল করে?
এই বিষয়টি বোঝার জন্য একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। খামেনি জামানার পূর্বে ছিল পাহলভি রাজবংশের শাসন। তার আগে ইরানে ১৭৮৯ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল তুর্কি বংশোদ্ভূত কাজার রাজবংশ। আগা মোহাম্মদ খান কাজার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। আধুনিকীকরণের চেষ্টা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং ব্রিটিশ ও রুশ প্রভাবের কারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ ছিল, যা ১৯২৫ সালে রেজা খানের অভ্যুত্থান ও পাহলভি রাজবংশের উত্থানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
কাজার শাসনামলে নারীরা মূলত গৃহবন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সীমিত সুযোগ পেতেন এবং পর্দা প্রথা ছিল কঠোর। তবে পাহলভি আমলে (১৯২৫-১৯৭৯) পাশ্চাত্য-প্রভাবিত আধুনিকীকরণ ও স্বাধীনতার ফলে নারীরা শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেন, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আবার পরিবর্তিত হয়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে বাম, ডান, নারী, পুরুষ—সকল পক্ষের সমর্থন ও অংশগ্রহণ থাকলেও পটপরিবর্তনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে বামপন্থী আর নারীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
ইরানের নারীদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার জন্য এ পর্যায়ে মাশা আমিনি নামের এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিক্ষোভের কথা সামনে নিয়ে আসতে চাই। মাশা আমিনি, যিনি জিনা আমিনি নামেও পরিচিত, তেহরানের একটি হাসপাতালে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার ‘অপরাধ’ ছিল—তিনি সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী হিজাব পরেননি। টহলকারী ‘মোরাল পুলিশ’ বা ধর্মীয় পুলিশ এই অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশি হেফাজতেই তার মৃত্যু ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী অন্যান্য নারী বন্দিদের বয়ান অনুযায়ী, পুলিশি নির্যাতনে মাশার মৃত্যু হয়েছিল। উল্লেখ্য, মাশা তার মা-বাবা এবং ভাইয়ের সঙ্গে তেহরানের বাইরের শহর সাক্কেজ থেকে বেড়াতে এসেছিলেন। পরিবারের মাঝ থেকেই পুলিশ তাকে কবজায় নিয়ে গিয়েছিল।
মাশা আমিনির মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রতিবাদ শুরু হয়। এই প্রতিবাদের সূচনা হাসপাতাল থেকেই। দ্রুত তা দেশের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে মাশার নিজ শহর সাক্কেজ ও কুর্দিস্তান প্রদেশের অন্যান্য শহর—যার মধ্যে সানন্দাজ, দিভান্দারেহ, বানেহ ও বিজার উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলন দমাতে খামেনি কর্তৃপক্ষ সরকারপন্থীদের রাস্তায় নামিয়েছিল এবং ইন্টারনেটের লাগাম টেনে ধরেছিল। শেষতক সরকার আন্দোলন দমাতে সক্ষম হয়।

সেই ঘটনার জের এখনো রয়ে গেছে ইরানের নারীদের মনে। গত বছর সেই রেশ কাটতে না কাটতেই খামেনির উপদেষ্টা আলি শামখানির মেয়ের বিয়েতে তার পরিবারের নারী সদস্যদের পশ্চিমা খোলামেলা পোশাকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শাসনযন্ত্রের শীর্ষে বসে থাকা একজন উপদেষ্টার পরিবারের এমন দ্বিচারী অবস্থান ইরানের নারীদের ক্ষেপিয়ে তোলে। অবাক হন ইরানের ভেতরের ও বাইরের সচেতন মহলও। এমন ফিসফিসানির মধ্যে নার্গিস মোহাম্মদীর বিষয়টি আবার সামনে চলে আসে।
শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদীকে গত মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার জন্য ২০২৩ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি ইরানের 'ডিফেন্ডার্স অব হিউম্যান রাইটস সেন্টার'-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট। একই প্রতিষ্ঠানে তার পূর্বসূরি শিরিন এবাদীও ২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
নার্গিস জীবনের ১০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। ২০২১ সাল থেকে তিনি 'রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা' ও 'রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের' অভিযোগে ১৩ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে চিকিৎসাজনিত কারণে তাকে তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগার থেকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয়। চিকিৎসা চলাকালেও তিনি তার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এসব নানা ঘটনা নিয়ে আমি কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলাম অস্ট্রেলিয়া বসবাসকারী ইরানের কিছু মানুষের কাছে। ধর্মীয় অনুশাসন বা পশ্চিমা অনুকরণ কিংবা সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাদ দিলে ইরানের নারীদের নিজস্ব পোশাক সংস্কৃতি ঠিক কী রকম এবং তা কোন দেশের সঙ্গে তুলনীয়?
আলাপ থেকে যা বুঝতে পারলাম, তাদের নিজস্ব পোশাক সংস্কৃতি রয়েছে যা সে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু অনুযায়ী গড়ে উঠেছে। এটি অনেকটা তুরস্কের পোশাক সংস্কৃতির কাছাকাছি। তাদের বক্তব্য হলো—হিজাব বা খোলামেলা পোশাক যা-ই হোক না কেন, তা তারা পরতে চান নিজেদের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তে। তাদের মূল আপত্তিটা হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। এ প্রসঙ্গে খামেনি জামানার সঙ্গে পাহলভি জামানার তুলনা টেনে তারা জানালেন, পাহলভি আমলের শেষদিকে পশ্চিমা বেশভূষার অনুকরণ ও বাড়াবাড়িও অনেক বেশি ছিল। ওই অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন ও উদ্বেগ ছিল। তাদের ধারণা ছিল, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান তার নিজস্ব আত্মপরিচয়ে জাতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে দেশের মানুষের অনুকূলে গড়ে তুলবে। কিন্তু আদতে দেশটি ধর্মীয় বিধিনিষেধে ভরা এক নিয়ন্ত্রণমূলক শাসনামলের অধীনে রয়ে গেল।
এসব বাস্তবতায় নার্গিসের গ্রেপ্তারের সঙ্গে যোগ হয়েছিল জনজীবনে অর্থনৈতিক চাপ আর ব্যাপক মূল্যস্ফীতি। এর পাশাপাশি আন্দোলনের পেছনে পশ্চিমা বিনিয়োগ, আস্কারা আর উসকানিও ছিল চোখে পড়ার মতো। ইরানের খামেনি শাসনামলের বিরুদ্ধে দেশের ভেতরের মতো বাইরে অবস্থানরত ইরানি নারীরাও একাট্টা। তাদের লক্ষ্য খামেনি জামানার পতন ঘটানো এবং নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনা। বিদেশে অবস্থানরত ইরানি নারীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের মন্ত্রিসভা, সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। তাদের অনেকে সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। এদের একটি বড় অংশ পশ্চিমাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা বৈবাহিক সম্পর্কেও জড়িয়ে আছেন। এসব বাস্তব অবস্থাও খামেনি শাসনের বিরুদ্ধে ইরানের নারীদের একাট্টা হতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
তবে একাট্টা পশ্চিমাপন্থী এসব নারীর বাইরেও একটি অংশ রয়েছে যারা কার্যত নীরব; যারা ‘সাতেও নেই, পাঁচেও নেই’। আরেকটি অংশ রয়েছে যারা কার্যত নিরপেক্ষ। আর বাকি অংশটি সরকারপন্থী। এই বাস্তবতা যাচাই করার জন্য আমি কথা বলেছিলাম ইরানের আরও কিছু ব্যক্তি ও পর্যটকের সঙ্গে, যারা বিভিন্ন সময়ে ইরানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি হলো—আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইরানের সমাজজীবন ও সংস্কৃতির যে চিত্র তুলে ধরা হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতদুষ্ট। এমন অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ছকে কোনো কোনো ইরানি নারীর ভাগ্যে নোবেলসহ আরও পশ্চিমা স্বীকৃতি জুটতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে খামেনি জামানাও ছক কষতে থাকবে টিকে থাকার নতুন কৌশলের।
বাস্তবতা যা-ই হোক, খামেনি কর্তৃপক্ষ যদি আগেভাগেই নারীদের দাবিকৃত অধিকার এবং পোশাক বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা অবারিত করে দেয়, তবে তা উভয় পক্ষের জন্যই কল্যাণকর হতে পারে। তাতে করে ইরানি কর্তৃপক্ষ নারীদের ক্ষোভ প্রশমিত করে অন্য প্রতিকূল জাতীয় সমস্যায় বেশি মনোযোগী হতে পারবে। কারণ, গত বছর অক্টোবর মাসে আলি শামখানির মেয়ের বিয়ের পোশাক নিয়ে বিতর্কের পর অনেক জায়গায় পোশাকের ওপর নিয়ন্ত্রণ এমনিতেই ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে।
দেশের ভেতরে ও বাইরে ইরানি নারীদের এই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি অনেকে সহমর্মী। তবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এই আন্দোলন ততক্ষণই কার্যকর যতক্ষণ তা ইরানের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জাতিপরিচয়ের পক্ষে এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী খপ্পরমুক্ত। সম্ভবত এই কারণেই ইরানি নারীদের সরকারবিরোধী আন্দোলন খামেনিকে হঠাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সামনেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা আছে—এমনটা হলফ করে বলার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।