Published : 26 Nov 2025, 09:54 AM
ভূমিকম্পের খবর পেয়ে দেশের কয়েকস্থানে ফোন করে স্বজনদের অবস্থা জানতে চেয়েছি। মিরপুর দুই নম্বরের একটি বহুতল ভবনে বসবাস করেন আমার এক মুরুব্বি; নাম ফরিদ উদ্দিন। তিনি উচ্চপদের সরকারি চাকরি হতে কয়েকবছর আগে অবসরে গেলেও পরম করুণাময়ের ইচ্ছায় পিঙ্কি নামের এক ফুটফুটে কন্যার গর্বিত পিতা হয়েছেন শেষ বয়সে। পিঙ্কির বয়স এখন আট।
৫.৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের পরদিন ফোন করে ফরিদ ভাইদের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আমরা ভালো আছি, তবে, পিঙ্কি ওর পাখি হারিয়ে দিশেহারা। খাওয়া-দাওয়া একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছে সে। তাকে নিয়ে খুব উৎকণ্ঠায় আছি। খাস দিলে দোয়া করো যেন ওর শখের পাখিটা খুঁজে পাওয়া যায়।”
ভূমিকম্প শুরু হলে সবাই যে যার মতো প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি করছিল। ফরিদ ভাইয়েরাও তাদের ছয়তলার ফ্ল্যাট ছেড়ে দ্রুত নিচে নেমে গিয়েছিলেন। বাসার দরজা ছিল খোলা। ওই ফাঁকে পাখিটি উড়াল দিল। এ ঘটনায় কেবল পিঙ্কির নয়, পরিবারের সবারই মনে কষ্ট। তবে, বোধগম্য কারণেই ছোট্টমনি পিঙ্কির কষ্টটা অনেক বেশি। সে টানা দু-বছর টাকা জমিয়ে পাখিটি কিনেছিল। ওর জন্য এ এক বিশাল মানসিক আঘাত বটে।
ওদিকে, শনির আখড়ায় সপরিবারে থাকে সুমাইয়া নামের আমার এক ছোটবোন। পেশায় পুলিশ কর্মকর্তা। সঙ্গত কারণেই, সাধারণ দশজনের চেয়ে তার শক্তি-সাহস খানিক বেশি হবারই কথা। তারপরও, ভূমিকম্পে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছে এভাবে, “ভীষণ আতঙ্কে আছি ভাইয়া। গতকালের ভূমিকম্পে তো ভেবেছিলাম এই বুঝি মৃত্যু হয়ে গেল। আল্লাহ বাঁচিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ!” আমি তাকে টেক্সট মেসেজ দিয়েছিলাম। পরে ফোনালাপে জেনেছি, ওদের ভবন থেকে দৌঁড়ে নিচে নামার সময় এক বয়স্ক মুরুব্বির নাকি পা মচকে গেছে সিঁড়িতে। তিনি আবার পক্ষাঘাতগ্রস্থও। আহ, সে কী কষ্ট!
আরও কয়েকজনের অভিজ্ঞতা শুনে মনে হয়েছে এবারের কম্পন সাম্প্রতিক সময়ের ভূমিকম্পগুলো হতে তীব্রতর, বিধ্বংসী, আর ভয় জাগানিয়া। এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে অনেকের দীর্ঘ সময় লেগে যাবে নিঃসন্দেহে। আমার কোনো স্বজন গুরুতর আহত বা নিহত না হলেও ভূমিকম্পটি দুঃখজনকভাবে কেড়ে নিয়েছে বেশকিছু সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ যা আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি। এমন মৃত্যু তাদের প্রাপ্য ছিল না। অন্যদের সীমাহীন লোভ-লালসা, বেহিসাবি কর্মকাণ্ড ও অসতর্কতার বলি হয়েছে এ নিরাপরাধ মানুষগুলো।
দুই.
ঢাকা এবং তার আশপাশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পগুলো কেবল ঢাকাবাসীকেই আতঙ্কগ্রস্থ করেছে তা নয়, আমরা যারা প্রবাসে থাকি তাদের মনও একইভাবে আন্দোলিত, শংকিত। কেননা, আমাদের আপনজনেরা তো ঢাকা শহর তথা বাংলাদেশেই বসবাস করেন। জন্ম চট্টগ্রামে হলেও ঢাকার সাথে আমার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তিন দশক আগে বুয়েটে পড়ার সময়কার তারুণ্যের জোয়ারে ভাসা দিনগুলো কেটেছে প্রাণের ঢাকা শহরেই, যেখানে থাকেন আমার অনেক নিকটাত্মীয়সহ অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব-সুহৃদ-পাঠক। যারা জানেন না, গত ২৪ বছর ধরে কানাডায় বসবাস আমাদের।
একসময় ভাবা হতো, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের উৎসস্থল চট্টগ্রাম বা সিলেট অঞ্চলে। ঢাকার অদূরে নরসিংদীতে গত শুক্রবার ঘটে যাওয়া ৫.৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প ওই ধারণা বদলে দিয়েছে। কমপক্ষে দশটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়া ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদীতে। এর প্রভাবে পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে হয়েছে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি। ভূমিকম্প থেমে যায়নি, এখনো অপেক্ষাকৃত ছোট মাত্রার কম্পন বা আফটার-শক ঘটেই চলেছে। সঙ্গত কারণেই, দেশবাসীর সময় কাটছে চরম আতংক ও অস্বস্তিতে।
সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী আলোচ্য ভূমিকম্প সম্পর্কে অনেককিছুই ইতোমধ্যে জেনেছেন। বিশেষজ্ঞবৃন্দও এত ক্ষয়ক্ষতি কেন হয়েছে, কীভাবে তা এড়ানো যেত, ভবিষ্যতে কীভাবে কম্পন প্রতিরোধক স্থাপনা বা স্ট্রাকচার তৈরি করা যায়, ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা করেছেন। ওসব তথ্য ও আলোচনার বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশে অবস্থানকালীন মাঠপর্যায়ে প্রকৌশলী ও নগরপরিকল্পনার দায়িত্ব পালনের কিছু মূল্যবান অভিজ্ঞতা নির্মোহভাবে পাঠকের সাথে শেয়ার করার প্রচেষ্টা থাকবে এ লেখায়, যাতে সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কিছুটা হলেও দিকনির্দেশনা পেতে পারেন।
এ নিবন্ধের গোড়াতেই আমার পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে সামান্য আলোচনা লেখার মর্মার্থ বুঝতে সহায়ক হবে মনে করি। আমি বাংলাদেশের বুয়েট হতে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং (কাঠামো প্রকৌশল)-এ মেজর নিয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল) ডিগ্রি অর্জন করি। কিছুকাল পর দেশের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি 'অথোরাইজেশন কমিটি'-এর একজন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাই। যারা জানেন না তাদের জন্য একটু খোলাসা করে বলি, সরকার অনুমোদিত এই বিশেষ কমিটি ইমারত বা ভবনের নকশা অনুমোদন এবং বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট ও রেগুলেশন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য কর্তৃত্বপ্রাপ্ত।
দেশে চাকরিরত অবস্থায় নেদারল্যান্ড সরকারের বৃত্তি নিয়ে সেদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হতে নগর পরিকল্পনায় মাস্টার্স ডিগ্রিও অর্জন করেছিলাম। পাশাপাশি, আমি একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও কাজ করেছি। সে সুবাদে দেশে শতাধিক ভবনের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন আমি নিজে করেছি। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ)-তে দায়িত্বপালনরত একজন সম্মানিত বোর্ড সদস্যের দৃষ্টিনন্দন আবাসিক ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইনও আমি করেছিলাম। কয়েক বছর আগে ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট (আরসিআইসি-আইআরবি) হিসেবে কাজ শুরু করার আগে কানাডায়ও প্রায় দেড়দশককাল আমি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলাম। আজও আমি কানাডায় একজন লাইসেন্সড প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার। কানাডায় পাড়ি জমানোর পর আমি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রিও অর্জন করেছি।
তিন.
প্রাসঙ্গিক বিধায় অথোরাইজেশন কমিটির মেম্বার থাকাকালীন একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। আমি যে কলেজ হতে এইচএসসি পাশ করেছিলাম ওই কলেজের সে সময়ের অধ্যক্ষ মহোদয় নীতির প্রশ্নে ছিলেন অবিচল। ভদ্রলোক এতটাই নীতিবান ছিলেন যে, পরীক্ষার হল পরিদর্শনের সময় তার নিজের কন্যাকে পাশের সীটের অন্য এক পরীক্ষার্থীর সাথে কথা বলতে দেখে এক বছরের জন্য বহিস্কার করেছিলেন। মেয়েটি হয়তোবা ভেবেছিল, “বাবা এসেছেন, কথা বললে আর সমস্যা কী?” এ ঘটনা কলেজের গন্ডির বাইরেও বেশ আলোচিত হয়েছিল ওই সময়ে। সে আমলে ফেইসবুক বা ইউটিউব থাকলে তা হয়তো ভাইরাল হয়ে কয়েক মিলিয়ন শেয়ারও হতো।
সেই অধ্যক্ষ মহোদয় একদিন আমার অফিসে হাজির। আমি ভক্তি-শ্রদ্ধায় তাকে দেখে দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। তিনি আমাকে জানালেন, তাকে কেউ একজন বলেছেন আমি তার কলেজেরই ছাত্র ছিলাম। একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় তিনি তার পাশের প্লটের এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। সমস্যাটি হলো, প্রতিবেশী তার (অধ্যক্ষ) ভবনের সাথে কোনো প্রকার গ্যাপ বা ফাঁক না রেখেই ব্যালকনি নির্মাণ করছিলেন। মৌখিক বাধা দিয়েও কাজ হয়নি। তিনি এর প্রতিকার চান। সাথে, তিনি তার নিজের ভবনের প্ল্যানের একটা কপিও এনেছিলেন, আর বলেছিলেন, তোমরা চাইলে লোক পাঠিয়ে মেপে দেখতে পারো আমি নির্মাণ কাজে কোনো ভায়োলেশন করেছি কিনা।
দুদিন পর তাকে আরেকবার কষ্ট করে আসতে বলে তাকে বিদায় জানাই সেদিন। তারপর দ্রুতই অথোরাজেশন কমিটির সদস্য সচিব সাহেবের কাছে বিষয়টি খুলে বলি। তিনি আমার সামনেই ওই এলাকার বিল্ডিং ইন্সপেক্টর (ইমারত পরিদর্শক) সাহেবকে ডেকে জানতে চাইলেন পাশের প্লটের মালিক কে?
খানিক পরই জানা গেল, ওই প্লটের মালিক তৎকালীন এক স্থানীয় এমপি সাহেবের নিকটাত্মীয়। পরিচয় পেয়ে সদস্য-সচিব মহোদয় আমাকে বললেন, “দেখো, ওই প্লটের মালিককে ইমারত নির্মাণ আইন ভায়োলেশনের নোটিশ পাঠালে আমাকে আর এ চেয়ারে থাকতে হবে না।” কথাটা অমূলক নয়, কারণ, তাকে এ পদে পদায়ন পেতে বিস্তর টাকা পয়সা খরচের পাশাপাশি এই বিশেষ এমপির আশীর্বাদও নিতে হয়েছিল। এ পরিবেশে সদস্য-সচিব ওই নীতিবান অধ্যক্ষ মহোদয়কে নীতিগত সুবিধা বা সহায়তা দেন কীভাবে?
এই হলো, আমার দেখা মাঠ পর্যায়ে ইমারত নির্মাণ আইন প্রয়োগের বাস্তবতা। শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ওসব আইনকানুন আসলে দুর্বলের ওপরই প্রয়োগযোগ্য, সবলের ওপর নয়। দুই ভবনের মাঝখানে বা আশপাশে নিরাপদ গ্যাপ রাখা বা পার্শ্ববর্তী সড়ক হতে পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মাবলী ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ থাকলেও স্বার্থান্বেষীদের লোভলালসা বা অনৈতিক প্রভাবে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন আর হয়ে ওঠে না। এ যেন ‘কাজীর গরু কাগজে আছে, গোয়ালে নেই’ অবস্থা। সৌভাগ্যক্রমে, অধ্যক্ষ মহোদয় দুদিন পর আমার অফিসে আর আসেননি। কয়েকদিন পর জেনেছি, তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন। তারও কিছুদিন পর আমারও চাকরি ছাড়ার সুযোগ হয়ে যায়।
প্রশ্ন জাগে, দুই ভবনের মাঝে পর্যাপ্ত গ্যাপ বা ফাঁক রাখতে হয় কেন? একি কেবলই আলো-বাতাসের জন্য? সাধারণভাবে, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পেতে এ গ্যাপ থাকা জরুরি। তাছাড়া, অগ্নিকাণ্ড, বা ভূমিকম্পের মতো দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজ চালাতেও এমন স্পেস বা ফাঁক থাকা অত্যাবশ্যক। কিন্তু, প্রভাবশালীরা এসব শুনবেন কেন, তাদের তো দরকার প্রশস্ত শয়নকক্ষ, ড্রয়িংরুম, ব্যালকনি, ইত্যাদি? তাছাড়া, বাংলাদেশের কালচার বা সংস্কৃতি এমন যে, ক্ষমতা বা প্রভাব থাকলে তারা প্রচলিত নিয়মকানুন ভেঙে সাধারণকে জানান দিতে চান যে তারা আসলেই ক্ষমতাধর। তা কেবল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের অন্যসব ক্ষেত্রেও সত্য। যেমন, এই কিছুদিন আগেও আমরা ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের একমুখী (ওয়ানওয়ে) সড়কে জোরপূর্বক বিপরীত দিকে গাড়ি চালাতে দেখেছি। বাধা দিলে তারা পুলিশকেও পিটিয়েছে।
চার.
ভূমিকম্প নিয়ে যথেষ্ট আতংক ইতিমধ্যেই নানামহল থেকে ছড়ানো হয়েছে। তাই, আমি সে পথে হাঁটব না। তারপরও, কিছু বাস্তবতা এড়িয়ে গেলে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
কেউ কেউ বলছেন, ভবিষ্যতে ৮ বা ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের অর্ধেকেরও বেশি ভবন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। কিন্তু, একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমি মনে করি, ৮ বা ৯ মাত্রার ভূমিকম্প দরকার নেই, কেবল ৬ বা ৭ মাত্রার ভূমিকম্পই ঢাকা শহরে বর্ণিত মাপের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে যথেষ্ট। এর কারণ হলো, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ১ বেড়ে যাওয়া মানে ক্ষয়ক্ষতি ১০ গুণ বেড়ে যাওয়া; ২ বেড়ে যাওয়া মনে ক্ষয়ক্ষতি ১০০ গুণ বেড়ে যাওয়া। হিসাবটা তেমনই। এর অর্থ দাঁড়ায়, সম্প্রতি ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে আমরা যে মাপের ক্ষয়ক্ষতি প্রত্যক্ষ করছি, ৬.৭ মাপের ভূমিকম্পে এর ১০ গুণ ক্ষয়ক্ষতি দেখব; আর, ৭.৭ এ দেখব ১০০ গুন। এবার আপনিই ভেবে দেখুন, ঢাকা শহরকে মাটির সাথে গুড়িয়ে দিতে ৮ বা ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রয়োজন আদৌ আছে কি? এর সাথে সুনামি যোগ হলে কি হতে পারে ভেবেছেন? পরম করুণাময় যেন ওই প্রলয়করী দুর্যোগের মুখোমুখি দেশবাসীকে না করেন, সুদূর কানাডা হতে আমার প্রার্থনা সেটাই।
পাঁচ.
‘পৃথিবীতে মানুষের অসাধ্য বলে কিছু নেই।’ এটি একটি প্রচলিত প্রবাদ। এ কথা সত্য হয়ে থাকলে ভূমিকম্প পুরোপুরি ঠেকিয়ে দেবার ক্ষমতাও মানুষের থাকা উচিত। কিন্তু, বাস্তবে তা কি সম্ভব?
না, সম্ভব নয়। এর কারণ বহুবিধ। তবে, প্রধান কারণগুলোর একটি হলো, ভূ-স্তরের গভীর তলদেশে মাটির কোথায় কী গুণগতমান বা অবস্থা তা নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব নয়। অধিকন্তু, মাটির নিচে গভীরে বিশাল আকৃতির সব ফাটল রয়েছে যা কালের সাথে তাল মিলিয়ে কখনো প্রসারিত, কখনো সংকুচিত হচ্ছে, আবার কখনোবা স্থান পরিবর্তন করছে। মুভমেন্ট বা সঞ্চালন অতি ধীরে হয় বলে আমরা তা সাধারণভাবে আঁচ করতে পারি না, কিন্তু, কখনো তা অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিতে হলেই ভূমিকম্প হিসেবে তা আমরা অনুভব করি। মানুষের পক্ষে ভূ-পৃষ্ঠের গভীরে থাকা মাটির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে, যা সম্ভব তা হলো, স্ট্রাকচার বা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ভূমিকম্পে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা।
বাংলাদেশে কাজ করার সময় আমি দেখেছি, ভূমিকম্প মোকাবেলার স্বার্থে ভবন বা তার ভিত্তি কতটা শক্তিশালী হওয়া উচিত তাতে অনেক ভবন মালিকই তেমন গুরুত্ব দিতে চান না। এর একটি কারণ হলো যথাযথ জ্ঞানের অভাব, অন্যটি হলো, ভূমিকম্পের বিষয় বিবেচনায় নিলে নির্মাণ খরচ বেড়ে যায়।
উল্লেখ্য, জাপান বা ক্যালিফোর্নিয়ায় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষে বেস আইসোলেশন, সিসমিক ড্যাম্পার, রাবার বিয়ারিং, এনার্জি ডিসিপশন ডিভাইস ইত্যাদি সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে আজকাল। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, আমরা কেন বাংলাদেশে এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করছি না?
এ প্রশ্নের উত্তর সহজ। ওপরের পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করতে গেলে যে মানের নির্মাণসামগ্রী, নির্মাণশৈলী, প্রশিক্ষিত জনবল ও অর্থায়নের দরকার তা আমাদের নেই। একবার ভেবে দেখুন না, মূল প্রাক্কলনের চেয়ে খরচ বহুগুণে বাড়িয়েও মেট্রোরেলে বিয়ারিং প্যাড লাগানোর মতো সাধারণ কাজেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি; ভূমিকম্প ঠেকানো তো বহু দূরের কথা। বলা বাহুল্য, ভূমিকম্পের কারণে ভবনের ক্ষতি হলেও তা যাতে প্রাণঘাতী না হয় প্রকৌশলীবৃন্দ মূলত সেদিকেই মনোনিবেশ করেন, যা যথাযথ স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের মাধ্যমে অনেকাংশেই সম্ভব। তারা নিশ্চিত করতে চান, উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পে ভবনের প্যানকেক ধাঁচের প্রাণঘাতী কলাপ্স বা পতন না ঘটিয়ে যাতে কন্ট্রোল্ড বা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কলাপ্স ঘটানো যায়।
ছয়.
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার বিষয়টি কেবল প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে তাতে সাধারণ মানুষকেও অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত জরুরি। সেটি হতে পারে দুর্যোগ মোকাবেলায় মানুষকে যথাযথ জ্ঞান দিয়ে বা প্রশিক্ষিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ভূমিকম্পের সময় ভবন থেকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে কোন পথ দিয়ে এবং ভবনের বাইরে গিয়ে কোথায় নিরাপদ অবস্থান নিতে হবে, তা আগে থেকেই ব্যবহারকারীদের জানিয়ে দেয়া উচিত। সেসব বিষয়ে বছরে অন্তত দুবার ড্রিল করানো যেতে পারে। যাদের চলৎশক্তি সীমিত তাদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেয়া যায় তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ভবন ব্যবহারকারীরা যথাযথভাবে নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা পালন করছেন কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে তাদের নিজেদের উদ্যোগেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, ইমার্জেন্সি এক্সিট দ্রুত পলায়নের জন্য উন্মুক্ত না রেখে স্টোর রুম বা অন্যরূপ ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসা হয়। অনেক ক্ষেত্রে, দারোয়ান নিজেই আগেভাগে সরে যাওয়ায় ইমার্জেন্সি এক্সিট খুলে দেবার মতো কেউ আর থাকে না। এ শঙ্কা এড়াতে অফিস প্রধানের কক্ষে রাখতে হবে একটি বাটন যা চাপলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমার্জেন্সি এক্সিট খুলে যাবে।
ভূমিকম্পের সময় ভবনে আগুন ধরে যাবারও প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইমার্জেন্সি এক্সিটগুলো যেন অগ্নিপ্রতিরোধক (ফায়ারপ্রুফ) হয় তেমন ব্যবস্থাও নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে, বিশেষত গার্মেন্টস সেক্টরে, সেইফটি বা নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী/পরিদর্শক থাকলেও আর্থিক বা অন্যভাবে প্রভাবিত হয়ে তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। ফলে, প্রায়ই দুর্যোগে কর্মীদের প্রাণহানি ঘটতে শোনা যায়। তাই, এ ধরনের ইন্সপেকশনের দায়িত্বে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি ভবনের ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।
সাত.
বিদ্যমান পদ্ধতিতে ভবনের নকশা অনুমোদন হতে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে নকশা বাস্তবায়নের সব দায়দায়িত্ব রাজউকের। এ দায়িত্ব দুভাগে বিভক্ত করে রাজউকের ওপর চাপ কমানো যেতে পারে। যেমন, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ভবনের নকশা বা ডিজাইন অনুমোদনের দায়িত্ব রাজউকের হাতে রেখে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী স্থাপনা বা ভবন নির্মিত হচ্ছে কিনা তা দেখভালের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে সিটি করপোরেশনকে। কেবল একটি সরকারি দপ্তরের চেয়ে দুটি দপ্তরকে দায়িত্বগুলো বন্টন করে দিলে উভয়ের ওপরেই কাজের চাপ কমে যাবে এবং তারা যার যার লোকবল দিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে।
ভবনের ব্যবহার শুরু করার আগে অবশ্যই সিটি করপোরেশনের সনদ গ্রহণ করতে হবে এ মর্মে যে, আলোচ্য ভবন রাজউক অনুমোদিত নকশা অনুসারে নির্মিত হয়েছে এবং ভবনের বিদ্যুৎ, পানি সংযোগ, ইত্যাদি মানসম্পন্ন ও ব্যবহার উপযোগী। কানাডাসহ উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সেখানে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইন্সপেকশন ও ক্লিয়ারেন্স ছাড়া ভবন ব্যবহার করা যায় না।
এ সনদের একটি কপি সিটি কর্পোরেশনে ইলেক্ট্রনিক্যালি সংরক্ষিত থাকবে যাতে পাসওয়ার্ড দিয়ে ব্যবহারকারী বা সংশ্লিষ্ট অফিস তা মুহূর্তেই যাচাই করে নিতে পারেন। ভবনের নকশাও ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকতে হবে যাতে নকশা হারিয়ে গেছে বা নকশা ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে, এ জাতীয় অজুহাত ভবনের মালিক বা ব্যবহারকারী দেখাতে না পারেন।
আট.
সাম্প্রতিক ভূমিকম্প বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) পুনঃপর্যালোচনার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়। মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে তেমন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও গবেষকবৃন্দের সমন্বয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করে কোড-এর বিভিন্ন ধারা উপধারা হালনাগাদ করা অতীব জরুরি। এক্ষেত্রে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের তথ্য-উপাত্তও ব্যবহার করা প্রয়োজন।
নয়.
রাজউক অনুমোদিত নকশা অনুসারে ভবন তৈরি করা হচ্ছে কিনা তা তদারকির জন্য জনবল বাড়াতে হবে। দেশে কর্মরত অবস্থায় আমি দেখেছি, কোনো এলাকায় যতসংখ্যক ইমারত পরিদর্শক দরকার অনেকক্ষেত্রে তার সিকিভাগও নিয়োগ দেয়া হয় না। এছাড়া, ইমারত পরিদর্শকগণকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে সার্ভেয়ারের দায়িত্বও দিতে দেখেছি। ইমারত পরিদর্শকদের সবাইকে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহনও দেয়া হয় না। এ পরিবেশে অনেকে ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন না। ফলে, তারা অনেকসময় নির্মাণস্থল পরিদর্শন না করেই ইন্সপেকশন রিপোর্ট দিয়ে থাকেন। ক্ষেত্রবিশেষে এমনও দেখেছি, দুই-তিন তলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এমন ভবনের ক্ষেত্রেও ‘নির্মাণকাজ শুরু হয়নি’, তেমন প্রত্যয়ন তারা দিয়েছেন। বলতে দ্বিধা নেই, আর্থিকভাবে প্রভাবিত হয়েও এমন ঘটনা নিয়মিতভাবেই ঘটে রাজউক, চউক, বা এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানে।
দশ.
ভবনের মালিক, ভবনের নকশায় যে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার স্বাক্ষর করে থাকেন তিনি এবং নির্মাণকাজ তদারকিতে যারা নিয়োজিত থাকেন তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
এটা হতে পারে এভাবে, ভূমিকম্প বা ভিন্ন কোনো কারণে ভবনে ফাটল দেখা দিলে বা ভবন হেলে গেলে, নকশায় স্বাক্ষরকারী প্রকৌশলী যথাযথভাবে ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছিলেন কিনা তা তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যালকুলেশনের ডকুমেন্ট দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার আইনি বিধান প্রণয়ন করতে হবে। মোটা অংকের অর্থদণ্ড ও গুরুতর ক্ষেত্রে জেলে দেবার প্রভিশন থাকতে হবে আইনে। ভবন নির্মাণে তাদের বিধিবিধান মানার অনীহা বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে অনুরূপ আইনি বিধানের আওতায় নিয়ে আসতে হবে ভবনের মালিক, নির্মাণকারী সংস্থা বা ঠিকাদারকেও। ত্রুটিপূর্ণ স্থাপনা বা ভবন ডিজাইন বা নির্মাণের জন্য উন্নতদেশগুলোতে বহু প্রকৌশলী তাদের প্রকৌশলবিদ্যা চর্চার লাইসেন্স হারিয়েছেন। আমাদের দেশেও তেমন নিয়ম চালু করা প্রয়োজন।
এগারো.
তুলনামূলকভাবে খরচ বেশি হলেও কিছু ভবন যেমন, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মসজিদ, ইত্যাদি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধক হিসেবে তৈরি করতে হবে যাতে ভূমিকম্পের কারণে বাসাবাড়ি হতে প্রতিস্থাপিত মানুষের সাময়িক অবস্থানের ব্যবস্থা এসব ভবনে করা যায়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকা শহরের বড় অংশই নরম, পানিসিক্ত পলিমাটির ওপর নির্মিত, যা ভূমিকম্পের সময় ভবনের কম্পন বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বড় ভূমিকম্পে ভবনের নিচের মাটি তরল হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়তে পারে। তাই, সময় এসেছে ঢাকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে ভাবার। কর্মসংস্থানের সুযোগ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষ যেন কেবল ঢাকামুখী না হন সে চিন্তাও মাথায় রাখতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে দেরি না করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদালত ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে হবে, যাতে বড় ধরনের ভূমিকম্পে ঢাকা অচল হলে পুরো দেশটাই অচল হয়ে না যায়।
পরিশেষে একটি তেতো সত্য বলে লেখাটি শেষ করি। জনশ্রুতি রয়েছে, ‘রাজউক-এর পিয়নেরও একাধিক দামি গাড়ি থাকে।’ কথাটি একেবারে অমূলক হলে দেশব্যাপী এমন প্রশংসা বা অপবাদ চালু থাকত না। সাম্প্রতিক ভূমিকম্প-দুর্যোগের ঘটনায়, যেখানে বাবা-ছেলে একসাথে প্রাণ হারিয়েছেন, আমার রাজউক-এর বন্ধুদের করজোড়ে অনুরোধ করব তাদের চিন্তা চেতনায় মৌলিক পরিবর্তন আনার জন্য। একবার ভেবে দেখুন, কাড়িকাড়ি অর্থ কামিয়ে মানুষ তো বাড়ি-গাড়িই করে; আর, ওই বাড়িটি যদি আপনার নিজের, আপনার প্রিয় প্রতিবেশী বা স্বজনের জীবনহানির কারণ হয় তাহলে সেই সুদৃশ্য ভবন বানিয়ে শেষ বিচারে কারও লাভ হলো কি?
শুভবুদ্ধির উদয় হউক সকলের।