Published : 01 May 2026, 09:08 AM
কোন এক চক্রবর্তী রাজার একমাত্র ছেলে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি রাজ্য-রাজত্ব সবকিছুই ত্যাগ করবেন। কারণ তিনি খুব কাছ থেকে জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর স্বরূপ দেখেছেন। এই দৃশ্যগুলো তাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়াত। এত সুন্দর মানুষ, রূপবান মানুষ কী করে এভাবে কুঁকড়ে যেতে পারে! কী করে একটা জীবন একটি লাঠির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে! একজন মানুষ, যার সঙ্গে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে হেঁটেছি, খেয়েছি, বসবাস করেছি, গল্প করেছি—একদিন সে নাই হয়ে যাবে! কেন? এমন কেন হয়? এ জীবন এতটা ক্ষণিক কেন? এতটা অনিশ্চিত কেন? এর কারণ কী? এর থেকে মুক্তির উপায় কী? এর সমাধান কোথায় পাওয়া যাবে? এমন হাজারো প্রশ্ন নিজেকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
অন্য একদিন এক সন্ন্যাসীর দেখা মিলল। তিনি কে? কী তার লক্ষ্য? এই জীবনের উদ্দেশ্যই বা কী? জানতে পারলেন তিনি সংসারত্যাগী। তিনি সবকিছু ত্যাগ করেছেন ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের আশায়। ঈশ্বর! ঈশ্বর কে? তিনি এই জগৎ-সংসারের সৃষ্টিকর্তা। সবকিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। এই যে মানুষ জরায় কষ্ট পাচ্ছে, ব্যাধিতে কষ্ট পাচ্ছে, যন্ত্রণা পাচ্ছে—ঈশ্বর কি এসব দেখছেন না? ঈশ্বর কি তাদের বেদনার আর্তনাদ শুনছেন না? তিনি কেমন ঈশ্বর! সবকিছুর মূলে রয়েছেন কোন এক অজানা, অচেনা, নিরাকার ঈশ্বর। তিনি এই কথা গ্রহণ করতে পারলেন না। হ্যাঁ, তবে ওই সন্ন্যাসীর ত্যাগের পথটা রাজপুত্রের মনে ধরল। এইটা বুঝি সমস্যার সমাধানের পথ হতে পারে। জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ও সন্ন্যাসী—এসব দৃশ্যের (নিমিত্ত) সঙ্গে জীবনে তার প্রথমবার দেখা হয়েছিল। নগর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে গিয়েই এমন অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছিলেন। কোনো রাজপিতা কি তার রাজ্য আর রাজত্বের একমাত্র উত্তরাধিকার পুত্রসন্তানকে সংসার পরিত্যাগের অনুমতি দেবেন? কোনো পিতাই দেবেন না। রাজা শুদ্ধোধনও তার একমাত্র পুত্রসন্তানকে সংসারত্যাগের অনুমতি দেননি। কিন্তু রাজনন্দন তো সংসার ত্যাগ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে নিয়েছেন। আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে তিনি নিজের পথ নিজে বেছে নিলেন। রাজমহলের বাইরে যে কোমল পা কোনোদিন পড়েনি, সেই পা চলল বনের ধুলোবালি কণা মাড়িয়ে। রাজসিংহাসনের পরিবর্তে তিনি বেছে নিলেন কুশের আসন।
দীর্ঘ ছয় বছর কৃচ্ছ্রসাধনা করলেন, কিন্তু সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারলেন না। তারপর তিনি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করলেন। তাতেই খুলে গেল দুঃখমুক্তির পথ। তিনি পেয়ে গেলেন সেই সত্যের সন্ধান, যার জন্য তিনি রাজ্য-রাজত্ব সবকিছু ছেড়েছিলেন। তিনি জগতে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ থেকে তথাগত গৌতম বুদ্ধ নামে খ্যাত হলেন। সেদিন ছিল শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। যেদিন রাজনন্দন সিদ্ধার্থের আবির্ভাব হয়, সেদিনও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি।
তিনি কি কেবল নিজের কথা ভেবে এতটা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন? সম্যক সম্বুদ্ধগণের ধর্মতা অনুসারে, সম্যক সম্বুদ্ধত্ব লাভের পারমী যিনি পূরণ করেন, তিনি সকল সত্ত্বগণের দুঃখমুক্তির কথা ভেবেই পারমী পূরণ করেন। তাই বোধিজ্ঞান লাভের পর জীব ও জগতের কল্যাণে তথাগত বুদ্ধ ধর্ম প্রচার করবেন—এটাই অনিবার্য নীতি। গৌতম বুদ্ধও তার ধর্মযাত্রা শুরু করলেন। তিনি বললেন, সকল দুঃখের মূল কারণ হলো তৃষ্ণা—কাম তৃষ্ণা, ভব তৃষ্ণা ও বিভব তৃষ্ণা। মনের যাবতীয় ভোগবাসনাই হলো কাম তৃষ্ণা। এক লোকভূমি হতে আরেক লোকভূমিতে বারবার উৎপত্তির বাসনাই হলো ভব তৃষ্ণা। আর উচ্ছেদ দৃষ্টি হলো বিভব তৃষ্ণা। অর্থাৎ কর্মফলের প্রতি অবিশ্বাস, পাপ-পুণ্যের প্রতি অবিশ্বাস, জন্ম কিংবা মৃত্যু একবারই হয়ে থাকে—তাই খাও-দাও ফূর্তি করো—এমন ধারণা পোষণ করা। তৃষ্ণা সমূলে উৎপাটন করা না গেলে দুঃখকেও জয় করা সম্ভব নয়। কোন দুঃখ? জন্ম দুঃখ, জরা দুঃখ, ব্যাধি দুঃখ, মরণ দুঃখ, প্রিয় বিচ্ছেদজনিত দুঃখ, অপ্রিয় সংযোগজনিত দুঃখ, ঈপ্সিত বস্তু অলাভজনিত দুঃখ, পঞ্চ স্কন্ধ (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান) হতে উৎপন্ন দুঃখ।
সর্বদা লোভ, দ্বেষ এবং মোহে নিমজ্জিত আমাদের মতো মানুষদের দুঃখানুভূতি আর তৃষ্ণাক্ষয়কারী বুদ্ধের দুঃখানুভূতির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত আছে। আমাদের দুঃখ হলো—আমার ভোগবিলাসী জীবন নেই, ধন-সম্পদ নেই, ভালো-মন্দ খেতে পারি না, ভালো একটা বাড়ি নেই, জমিজমা নেই, অলংকারপাতি নেই, আমার প্রতিপক্ষ এত উন্নতি করছে কেন ইত্যাদি। কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থের তো এ জাতীয় কোনো দুঃখ ছিল না। তিনি গোটা মানবজাতির উদ্দেশ্যে বললেন, জগতে দুঃখ আছে, সেই দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের নিরোধ আছে এবং নিরোধের উপায়ও আছে। দুঃখ নিরোধ করতে হলে জীবনযাপনে আটটি পথ অনুসরণ করতে হবে। এই আটটি পথ হলো—সম্যক বা সৎ কর্ম, সৎ বাক্য, সৎ সংকল্প, সৎ জীবিকা, সৎ দৃষ্টি, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। অবিদ্যা (প্রজ্ঞাহীনতা) থেকে সংস্কার, সংস্কার থেকে বিজ্ঞান, বিজ্ঞান থেকে নামরূপ, নামরূপ থেকে ষড়ায়তন, ষড়ায়তন থেকে স্পর্শ, স্পর্শ থেকে বেদনা, বেদনা থেকে উপাদান, উপাদান থেকে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা থেকে ভব (উৎপত্তি), ভব থেকে জরা, ব্যাধি, মরণ, শোক, পরিদেবন সৃষ্টি হয়। অপরদিকে অবিদ্যা (প্রজ্ঞাহীনতা) নিরোধ হলে সংস্কার নিরোধ হয়, সংস্কার নিরোধ হলে বিজ্ঞান নিরোধ হয়, বিজ্ঞান নিরোধ হলে নামরূপ নিরোধ হয়, নামরূপ নিরোধ হলে ষড়ায়তন নিরোধ হয়, ষড়ায়তন নিরোধ হলে স্পর্শ নিরোধ হয়, স্পর্শ নিরোধ হলে বেদনা নিরোধ হয়, বেদনা নিরোধ হলে উপাদান নিরোধ হয়, উপাদান নিরোধ হলে তৃষ্ণা নিরোধ হয়, তৃষ্ণা নিরোধ হলে ভব (উৎপত্তি) নিরোধ হয়, ভব নিরোধ হলে জরা, ব্যাধি, মরণ, শোক, পরিদেবন নিরোধ হয়। এটাকে কার্যকারণ নীতি বা দ্বাদশ নিদান বলা হয়। বৌদ্ধ দর্শনে যে নির্বাণতত্ত্ব, সেই নির্বাণ তখনই সাক্ষাৎ হয় যখন এই দ্বাদশ প্রক্রিয়া নিরুদ্ধ হয়।
বুদ্ধের সাধনা কি পরিনির্বাণ লাভের জন্যই ছিল? আমি বলব, না। বুদ্ধের ত্যাগ আর সাধনা ছিল দুঃখ জয়ের জন্য। দুঃখ জয় করতে হলে তৃষ্ণাকে জয় করতে হবে। তৃষ্ণাকে জয় করতে পারলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নির্বাণ সাক্ষাৎ হবে। কেবল বুদ্ধ নন, যাঁরা তৃষ্ণাকে জয় করতে পারেন, তাঁরাই নির্বাণ সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধর্ম প্রচার করে অতীত সকল বুদ্ধগণের মতো অবশেষে ৮০ বছর বয়সে গৌতম বুদ্ধও নির্বাণ সাক্ষাৎ করেন। যেদিন বুদ্ধ নির্বাণ প্রাপ্ত হন, সেদিনও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি।
সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্তি—এই তিনটি অনন্য ঘটনা বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে ঘটেছিল বলেই বৈশাখী পূর্ণিমার অপর নাম বুদ্ধ পূর্ণিমা। এই তিনটি অনন্য অসাধারণ স্মৃতিবিজড়িত ও বুদ্ধের আলোয় আলোকিত বৈশাখী পূর্ণিমাকে বলা হয় ত্রিস্মৃতিবিজড়িত শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা।
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে জানাই শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।