Published : 16 Jul 2025, 06:11 PM
আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গণিত বরাবরই একটি দুর্বোধ্য বিষয় হিসেবে পরিচিত। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছেই এটি কঠিন ও জটিল বলে মনে হয়। অবশ্য এই জটিল মনে হওয়ার দায় আমাদের বড়দের।
শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, অনেক শিক্ষকও গণিতকে দুর্বোধ্য মনে করেন। শৈশব থেকেই শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, গণিত একটি কঠিন বিষয় এবং এতে কোনো আনন্দ নেই। প্রথমে এই ধারণা জন্ম দেন মা-বাবা এবং অন্যান্য অভিভাবক, এরপর সেটি আরও গভীরভাবে প্রোথিত করেন শিক্ষক।
অভিভাবকের ভূমিকা একপাশে রাখলেও যখন স্কুলের শিক্ষক নিজেই বলেন—‘গণিত জটিল’, তখন সেটি শিক্ষার্থীর মনে স্থায়ীভাবে বসে যায় এবং এক ধরনের ভয় বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। পরে সেই শিক্ষার্থী গণিতে যতটুকু গুরুত্বই দিক না কেন, প্রকৃত অর্থে লাভ হয় না। কারণ শুরুতেই তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি তার বোধের বাইরে।
স্কুল পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় গণিতে। এ রপরেই গুরুত্ব পায় ইংরেজি। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও এই দুই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থার তেমন উন্নতি হয় না। বরং পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে, এমনকি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—গণিতে এই দুর্দশার কারণ কী?
অভিভাবকরা সন্তানকে গণিতে পাস করাতে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করছেন। এখানেই রয়েছে একটি বড় দুর্বলতা। কেবল পাস করানোর মানসিকতা থেকেই গণিত পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষকরা এখনও সেই পুরোনো, পরীক্ষামুখী পদ্ধতিতে ক্লাস করিয়েই দায় সেরে ফেলছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করেই পরীক্ষার ‘সেতু’ পার হচ্ছে।
এই প্রবণতা গণিতের শেখায় এক জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের চোখে এখন গণিত মানে শুধু ‘যেভাবে হোক ভালো নম্বর পাওয়া। নিদেনপক্ষে পাস করতে পারা।’ এমনকি যারা ভালো ফল করছেন, তাদেরও একটি বড় অংশ কেবল নম্বর তোলার জন্যই বিষয়টি পড়ছে—আসল আগ্রহ কিংবা আনন্দের জায়গাটা সেখানে নেই।
যুগের পর যুগ একই মানসিকতা, একই পদ্ধতি আর শিক্ষকদের একই ঘরানার কৌশল—এসব মিলে গণিত শিক্ষায় এক স্থবিরতা ও বিমুখতা তৈরি হয়েছে। ফলাফল রীতিমতন ধ্বংসযজ্ঞ।
এ বছর যখন উত্তরপত্র মূল্যায়নে কিছুটা গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তখনই তা পাসের হারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এবং এর মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—গণিতে শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফল।
গণিত শিক্ষাকে সহজতর করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, বাস্তবে সেই প্রশিক্ষণের প্রয়োগ খুব কমই চোখে পড়ে। পাঠদানে নানা উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যবহার হয় না। এখনও অনেক শিক্ষক চক আর ডাস্টারের মধ্যেই আটকে আছেন। অন্যদিকে, বিশ্বে মানুষ গণিত ব্যবহার করে মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছে, একের পর এক নতুন আবিষ্কার করছে। কারণ, গণিত ছাড়া বিজ্ঞান কল্পনাও করা যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতেই পারে—যখন গণিত শিক্ষার এই দুর্বল অবস্থা, তখন আমরা দেশে ভালো কোনো গণিতবিদ বা বিজ্ঞানী তৈরির আশা কীভাবে করতে পারি?
সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ৬ লাখ ৬৬০ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস না করায় স্বাভাবিকভাবেই কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সবাই। এই বিশ্লেষণেই উঠে এসেছে গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভরাডুবির চিত্র। পরীক্ষার্থীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গণিতে পাস করতে পারেনি।
পরিসংখ্যানের দিক থেকেও গণিতের অবস্থান উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে বর্তমানে গণিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭ জন। কিন্তু এর মধ্যে ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষকের গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই!
পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, মাধ্যমিকে গণিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী শিক্ষক আছেন মাত্র ৩ হাজার ৮৩৬ জন, যা মোট শিক্ষকের মাত্র ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৪৩ জন, যা মোটের মাত্র ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ।
অর্থাৎ, গণিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় একাডেমিক যোগ্যতা ছাড়াই মাধ্যমিকে এই বিষয় পড়াচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক।
এ চিত্র নিঃসন্দেহে ভয়াবহ এবং গণিত শিক্ষার মান নিয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) বলছে, মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিত শিক্ষকদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৭২ শতাংশ—অর্থাৎ ১২ হাজার ৯ জন শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত মিলিয়ে বিএসসি ডিগ্রি নিয়ে এ বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। আবার ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ—৭ হাজার ৭৪৩ জন শিক্ষক, অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে গণিত পড়ে বিএসসি করেছেন। অর্থাৎ গণিত শিক্ষকদের বড় একটি অংশ সরাসরি গণিতকে প্রধান বিষয় হিসেবে না পড়েই এই বিষয়ে পাঠদান করছেন।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ইংরেজিতে ৮৭ দশমিক ২১ শতাংশ হলেও গণিতে তা নেমে এসেছে ৭৭ দশমিক ৪৬ শতাংশে। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট—ইংরেজির তুলনায় গণিত শিক্ষার্থীদের কাছে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গণিত শিক্ষকের অভাব। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গণিত বিষয়ে দুর্বল ভিত্তি তৈরি হওয়ায় উচ্চ শ্রেণিতে এসে তারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারছে না।
গণিত শিক্ষক আমরা সংখ্যায় যথেষ্ট পাচ্ছি বটে, কিন্তু সেই শিক্ষক আদৌ গণিতে কতটা দক্ষ, তা মূল্যায়নের কোনো কার্যকর মানদণ্ড নেই। কারণ শিক্ষক নিয়োগ এখনও কেবল সার্টিফিকেট ও প্রথাগত পরীক্ষার ভিত্তিতে হয়। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে—একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কোন কৌশলে একটি জটিল বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করছেন, তা কীভাবে যাচাই হচ্ছে?
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যেসব শিক্ষককে দক্ষ করে তোলা হয়, তাদের সেই প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রয়োগ শ্রেণিকক্ষে আদৌ হচ্ছে কি না—সেটি নিয়েও কোনো নজরদারি নেই। এর পেছনে রয়েছে নানা কাঠামোগত সংকট, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো পর্যাপ্ত জনবল সংকট।
এই পরিস্থিতিতে যতক্ষণ না একজন শিক্ষক গণিতকে সহজ ও আনন্দময় বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘গণিতভীতি’ দূর করা সম্ভব নয়। আর এই ভীতি কাটাতে হবে একেবারে শৈশব থেকে, প্রাথমিক স্তর থেকেই।
নয়তো, যদি শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল পাঠ্যসূচি শেষ করাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সমস্যা আরও প্রকট হবে—আর পরবর্তী প্রজন্ম গণিতকে দেখে যাবে ভয়ের ছায়া হিসেবে, সম্ভাবনার আলো হিসেবে নয়। শুধু শিক্ষক নয়, এই দায়ভার নিতে হবে শিক্ষা প্রশাসন, সরকার এবং নীতিনির্ধারকদেরও—কারণ তাদের পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকলে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক যতই চেষ্টাশীল হন, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
প্রকৃত অর্থে, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতির বর্তমান চিত্রে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণিত শেখার ধারে-কাছে যেতে চায় না। পুরো শিখনপ্রক্রিয়া আটকে আছে কেবল ‘সাজেশন’ আর ‘প্র্যাকটিস’-এর সীমিত গণ্ডিতে। শিক্ষার্থীদের বলা হয়—বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, পরিমিতি আর জ্যামিতির অসংখ্য সূত্র মুখস্থ করো এবং সেগুলো দিয়েই সমস্যার সমাধান করো। এটাই যেন গণিত ক্লাসের সারাংশ—বইয়ে শুরু, খাতায় শেষ!
প্রাথমিক পর্যায় থেকেই গণিত অলিম্পিয়াডের কৌশলগুলো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়েছে—উদ্দেশ্য একটাই, গণিত শেখাকে কার্যকর ও আনন্দময় করে তোলা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রয়োগ কোথায়?
উন্নত বিশ্বে শিশুদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে এনে, নানা আকর্ষণীয় উপকরণ ও বিকল্প পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে গণিত শেখানো হয়। ওদের কাছে গণিত মানেই গবেষণা, অন্বেষণ আর মজা। বাস্তব সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করে বিষয়টিকে সহজবোধ্য করে তোলা হয়। অথচ আমাদের এখানে গণিত মানেই—কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার মাধ্যম। শেখার আনন্দ, নতুন কিছু জানার আগ্রহ—এসব প্রায় অনুপস্থিত।
বেশিরভাগ শিক্ষক গণিত ক্লাস মানে সিলেবাস শেষ করাকেই দায়িত্ব মনে করেন। শিক্ষার্থীরা গণিত ক্লাসে ভয়ে চুপ থাকে—না বুঝেই কেবল বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে। ক্লাস শেষ হয়, সিলেবাস শেষ হয়, কিন্তু গণিত শেখা কতটা সফল হলো, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—বিষয়বস্তুকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যা শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হয়। বাস্তবে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা সমান নয়। তাই একজন দক্ষ শিক্ষককেই দায়িত্ব নিতে হবে গণিত শেখানোর পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনতে। যদি শিক্ষকের কলা-কৌশল বদলায়, শিক্ষার্থী বুঝতে পারে গণিত আসলে ভয়ঙ্কর নয়, বরং শিখনযোগ্য এবং যুক্তিনির্ভর একটি মজার বিষয়—তাহলে ‘গণিতভীতি’ অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
এখানে কর্তৃপক্ষেরও তদারকির প্রয়োজন আছে—শিক্ষকরা আদৌ প্রশিক্ষণ অনুযায়ী সৃজনশীল ও কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করছেন কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের কাছে গণিতকে সহজ করে তুলতে হলে, শিক্ষকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিক্ষককে বুঝতে হবে কোন শিক্ষার্থী মোটামুটি, কোনটি দুর্বল এবং কারা ভালো করছে। এর ভিত্তিতে অলিম্পিয়াডে ব্যবহৃত ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে প্রয়োজনে দলগতভাবে কাজ করাতে হবে। যারা পিছিয়ে, তাদের নিয়মিতভাবে উৎসাহ দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—শুরুতেই শিক্ষার্থীদের বোঝানো যে, গণিতও বাংলা বা অন্যান্য সহজ বিষয়ের মতোই শেখার যোগ্য। শুধু এর পদ্ধতি কিছুটা আলাদা। শেখার কৌশলটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।
শিক্ষককে নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে আলাদাভাবে সহায়তা দিতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে হাতে-কলমে শেখার নানা মাধ্যম ব্যবহার করে গণিতকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
এ ছাড়া গণিতে গল্পভিত্তিক পাঠক্রম, এক্সপ্লোরেটরি লার্নিং, পাজল ও গেম-ভিত্তিক অনুশীলনের মতো বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবতে হবে। এসব পদ্ধতি শিখনে আনন্দ আনবে এবং গণিতকে ভয় নয়, কৌতূহলের বিষয় করে তুলবে।
অভিভাবকরাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সন্তান গণিতে দুর্বল শুনেই যদি তারা চাপ প্রয়োগ শুরু করেন, তাহলে শিশু আরও ভীত হয়ে পড়ে। বরং উৎসাহ ও ইতিবাচক মনোভাব দিয়ে তাকে সহায়তা করলে গণিত শিক্ষায় সে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারবে।