Published : 03 Mar 2026, 12:29 AM
প্রযুক্তিতে সবচেয়ে উন্নত দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুই রাষ্ট্রপ্রধান ডনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কর্তৃক ইরান আক্রমণ পৃথিবীকে জঙ্গলের যুগে ফিরিয়ে নিল। সেই যুগ যখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ছিল মানুষের একমাত্র নীতি। কিন্তু তারপর মানবসভ্যতা এগিয়ে চলেছে আর এই এগিয়ে চলার প্রমাণ হচ্ছে মানুষ তার এই বর্বর নীতি থেকে কতটা দূরে সরে আসতে পারে এবং এ ধরনের কূনীতিকে অচল, ঘৃণ্য ও অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে— এমনকি এ ধরনের নীতিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। জাতিসংঘের সৃষ্টি ও বিভিন্ন বৈশ্বিক নীতিমালা সেই যাত্রাপথে উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। কিন্তু ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যুদ্ধ ও গণহত্যা সভ্যতার সেই অর্জনকে এক মুহূর্তে মুছে ফেলতে উদ্যত। পৃথিবীতে আবার প্রতিষ্ঠিত হলো জোর যার মুল্লুক তার নীতি। অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চললেও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো।
এই আক্রমণে ধর্ম ব্যবহৃত হয়েছে যুৎসই আকারে। আক্রমণটি হয়েছে ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব পুরিম উদযাপন শুরুর আগমুহূর্তে। এটি উদযাপন করা হয় বাইবেলে উল্লিখিত একটি গল্প স্মরণ করে যেখানে অতীতের পারস্য রাজ্যে (বর্তমান ইরান) ইহুদিদের ধ্বংস করার হাত থেকে রক্ষা করার একটি কাহিনি বর্ণিত। নেতানিয়াহু এই সময়টি বেছে নিয়েছেন অতীত গহ্বর থেকে বিদ্বেষের ফসিল তুলে এনে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে। ইসরায়েল সম্প্রসারণের জায়নবাদী প্রকল্প সফল করতে ইরানকে ধ্বংস করা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নপূরণে তিনি বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রশাসনকে। তার মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে সেবা করতে নির্লজ্জভাবে এক পায়ে খাড়া।
কারণ ট্রাম্পের প্রধান সমর্থক গোষ্ঠি হচ্ছে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা যাদের বড় অংশই খ্রিস্টান জায়নবাদী। এরাই ইহুদি জায়নবাদের জন্মদাতা ও অন্যতম পৃষ্ঠাপোষক। জায়নবাদীদের বিশ্বাস চার হাজার বছর আগে ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইসরায়েলের শাসন স্থাপিত হবে। সেই পরিকল্পনারই অংশ ছিলো ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মদতে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই জায়নবাদী ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের একজন বিশ্বস্ত উগ্র প্রতিনিধি। সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, এটা ভালো হবে যদি ইসরায়েল ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকার হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ অংশ দখল করে নেয়— যা ইরাকের ইউফ্রেতিস নদী থেকে মিশরের নীলনদ পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০০৮ সালে তিনি ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বই অস্বীকার করেন এই বলে যে, আসলে ফিলিস্তিনি বলে কোনো কিছু নেই। গত বছর জুনে তিনি ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছিলেন স্বর্গের ডাকে কান পেতে ইরানে পারমাণবিক বোমা ফেলতে।
গত বছর জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানে হামলার পর ট্রাম্প দাবি করলেন দেশটির পারমাণবিক বোমা তৈরির ক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অথচ সাত মাস পরই তিনি আবার ইরানের পরমাণু অস্ত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে অজুহাত খাড়া করছেন। এবার ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে চুক্তি করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো। অথচ আলোচনা চলাকালেই নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প মিলে যে আক্রমণ করলেন তাতে প্রমাণিত হলো চুক্তি তাদের আগ্রহের বিষয় না। তাদের লক্ষ্য ইরানকে ধ্বংস করে ইসরায়েল সম্প্রসারণের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য নিশ্চিত করা—ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ও ইহুদি জায়নবাদীদের যা যৌথ স্বপ্ন। অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেতানিয়াহুর মধ্যযুগীয় মানসিকতা এই ইরান হামলাকে অনিবার্য করে তুলেছে। তার সহকারী হিসেবে কাজ করছেন ট্রাম্প গাজার ধ্বংসস্তূপে বিলাসবহুল সব হোটেল তৈরি করে ব্যবসা যার উদ্দেশ্যে।
অথচ ট্রাম্প হচ্ছেন ‘শান্তিবাদী’ নেতা। নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে তিনি এতটা উদগ্রীব ছিলেন যে তাকে শান্ত করতে পাকিস্তান সরকারও তার জন্য নোবেলের তদবির করেছে। তার পুরো নির্বাচনি অভিযান ছিল অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর পররাষ্ট্র নীতি পরিহারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। জর্জ বুশের ইরাক আক্রমণের সমালোচনা ছিল তার নিত্যদিনের বক্তব্য। কমলা হ্যারিস ও জো বাইডেনের সমালোচনা করেছেন তাদের ইরান নীতির জন্য–যা তার মতে বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছিল। অথচ ক্ষমতায় বসতে না বসতেই সবাই দেখতে পাচ্ছে তার ফ্যাসিবাদী রূপ। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মিলে এখন বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখে। নেতানিয়াহু আগেই গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত আর ট্রাম্প বর্তমান বিশ্বের সেরা যুদ্ধবাজ হিসেবে প্রমাণিত।
এ দুজন কেবলই যুদ্ধবাজ, তাদের ইরান আক্রমণের কোনো ন্যায়সঙ্গত কারণ নেই। বুশ তবু ইরাকের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ভোলাতে পেরেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলেছেন তা তার ভোটদাতারাও বিশ্বাস করছে না। ফলে ইরান আক্রমণকে যুক্তরাষ্ট্রে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই সমর্থন করছে না। ট্রাম্পের জনসমর্থন এখন তলানিতে। সবশেষে তিনি ‘রেজিম চেঞ্জে’র বাহানা করছেন। বুশের মিথ্যাচার দেশের ভেতরে খাওয়ানো গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন তা পারছে না। মনে হয়, তার প্রয়োজনও নেই। কারণ নগ্ন আগ্রাসনে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জুটি আগে থেকেই অভ্যস্ত। তারা বুঝে গেছে যে, বর্তমান এককেন্দ্রিক ভারসাম্যহীন দুনিয়ায় তাদেরকে ঠেকানোর কেউ নেই।
গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারাওফ্যাকিস এই হামলার চরিত্র তুলে ধরেছেন তার এক্স অ্যাকাউন্টে এভাবে: “বিশ্বের দুটি দুষ্ট রাষ্ট্র—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—যুদ্ধ শুরু করেছে কেবল ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যাকে ইচ্ছে তাকে বোমা মারতে পারবে আমরা এমন ধারণার বিরুদ্ধে। আমরা ইরানিদের পক্ষে। মানবতার পক্ষে।”
কিন্তু ইরানি অভিবাসীসহ বিশ্বের অনেকেই ইরানে মোল্লাতন্ত্রের পতনের সম্ভাবনা দেখে উল্লসিত হচ্ছেন। ভারাওফ্যাকিসের মত দ্বিধাহীন নৈতিক অবস্থান নিতে পারছেন না। তারা বুঝতে পারছেন না যে এই যুদ্ধে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নিরঙ্কুশ বিজয় ইরানের মানুষের এবং বিশ্বের অন্যান্য শান্তিকামী জনগণের জন্য কী ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ ডেকে আনবে। স্পষ্টতই ইরানের নির্যাতিত জনগণের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা নয়। এমন উদ্ভট বিশ্বাসের জন্য বহুজনকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে বহু দশক ধরে। ইরানের জনগণের মুক্তি হবে যেমন হয়েছে ইরাকে, আফগানিস্তানে, লিবিয়ায়, মিশরে ও অন্যত্র! দীর্ঘকালের জন্য দেশটিকে ধ্বংস করাই এই যৌথ হামলার উদ্দেশ্য–যা পরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও আধিপত্য নিশ্চিত করবে। আরও লক্ষণীয় ইরানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বোমা ফেলে হত্যা করা হচ্ছে সেখানকার বামপন্থি নেতাদের। জনগণকে ক্ষমতা গ্রহণের যে আহ্বান ট্রাম্প প্রচার করছেন তা এক বিরাট ধোঁকা। একদিকে মাথার ওপরে বোমা, অন্যদিকে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান! যেভাবে তারা আগেও ধোঁকা দিয়েছে ও এখনো দিচ্ছে বিশ্বের বহুজনকে।
এমন নয় যে ইরান জিতবে বা ক্ষতি থেকে রেহাই পাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তারা যতদিন আঘাত করে যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতে পারবে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর পায়ের তলা থেকে মাটি সরতে থাকবে তত দ্রুত। অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের সেটাই শেষ চেষ্টা। আর বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রমনা, মুক্তিকামী ও স্বাধীনচেতা সকলের নৈতিক সমর্থন তার জরুরি সম্বল। ইরানের জনগণের মুক্তির বিশ্বাসে তাদের পাশে থাকার ইচ্ছায় ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর চাপিয়ে দেওয়া এই হামলাকে নীরব সমর্থনও অন্যায় ও অনৈতিক।