Published : 17 Dec 2025, 12:49 AM
বাংলাদেশের বিজয় দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি টুইট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বইছে। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) এক্স পোস্টে তিনি লিখেছেন, “বিজয় দিবসে আমরা সেই সাহসী সেনাদের স্মরণ করছি যাদের আত্মত্যাগ ১৯৭১ সালে ভারতকে ঐতিহাসিক বিজয় এনে দিয়েছিল। তাদের দৃঢ় সংকল্প এবং নিঃস্বার্থ সেবা আমাদের জাতিকে রক্ষা করেছে এবং আমাদের ইতিহাসে গর্বের মুহূর্ত এনে দিয়েছে। এই দিনটি তাদের বীরত্বের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, তাদের অতুলনীয় চেতনাকে স্মরণ করার দিন। তাদের বীরত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।”
একই দিন ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও যে বার্তা দিয়েছেন, সেখানেও তিনি বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেননি। এক্সে দেওয়া হিন্দি ভাষার পোস্টে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী লিখেছেন, “বিজয় দিবসে আমি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর বীরদের শ্রদ্ধা জানাই, যারা ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের সীমান্ত রক্ষায় বীরত্ব, নিষ্ঠা ও অটল সংকল্পের মাধ্যমে ইতিহাস গড়েছিলেন। তাদের দুর্জয় সাহস, সংগ্রাম এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ প্রতিটি ভারতীয়র জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।” রাহুলের এই বক্তব্যে যুদ্ধটি কোথায় বা কার সঙ্গে হয়েছিল ওই ইতিহাসের কোনো উল্লেখ নেই।
১৬ ডিসেম্বর, অর্থাৎ বাংলাদেশের বিজয় দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার এই পোস্ট দুটি যে প্রশ্ন সামনে এনেছে তা হলো, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ওই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া এবং ১৬ ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিক বিজয়কে ভারত শুধু তাদের বিজয় হিসেবে দাবি করতে পারে কি না?
ইতিহাস বলছে, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই বাংলাদেশের সমর্থন দিয়েছে ভারত। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সে দেশে আশ্রয় নেয় এক কোটি শরণার্থী। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র জোগাড় ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়েও ভূমিকা ছিল ভারতের। কিন্তু ৯ মাস যুদ্ধের শেষের দিকে বাংলাদেশের বিজয় যখন অনেকটাই নিশ্চিত, তখন ভারতও সরাসরি পাকিস্তানের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ৩ ডিসেম্বর ভারতের আটটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় পাকিস্তান। তখন ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও। দুই দেশের এই সংঘাত তৃতীয় ইন্দো-পাকিস্তান যুদ্ধ নামেও পরিচিত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। নিজেদের যুদ্ধে জয়লাভ করে ভারতও।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের এই অর্জনকে ভারত নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করে এসেছে বহুবার। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ফল হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম এমন কথাও বলতে শোনা গেছে। তবে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম আর দেশের প্রতিটি কোণে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধাদের এই অর্জন ভারত চাইলেই তাদের করে নিতে পারে কি না—ওই প্রশ্ন উঠছে।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সহায়তা করেছে। কিন্তু মূল যুদ্ধটা করেছে বাংলাদেশ। এটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়লেও বাংলাদেশ ঠিকই স্বাধীন হতো। সেটি হয়তো বিলম্বিত হতো। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর না হলে হয়তো যুদ্ধটি আরও কয়েক মাস প্রলম্বিত হতো। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলেছিলেন, তাতে এই যুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় ছিল সময়ের ব্যাপার—যার স্পষ্ট ইঙ্গিত ১৯৭১ সালের অগাস্টে নৌপথে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা। তাছাড়া ধীরে ধীরে বিশ্ব জনমতও পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে যেত। এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রও। কিন্তু রাশিয়ার পাল্টা পদক্ষেপে সমীকরণ বদলে যায়। ফলে যুদ্ধটি আরও কিছুদিন বিলম্বিত হলেও বাংলাদেশের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত। অর্থাৎ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অস্তিত্ব আর মুক্তির লড়াইয়ের ক্ষুদ্র এক অংশ ছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। চিরবৈরি দুই প্রতিবেশীর এমন লড়াই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু তার বিপরীতে স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের লড়াই বিশ্বের ইতিহাসেই অনন্য। কোনোভাবেই এই বিজয় দিবস ভারত শুধু নিজেদের বলে দাবি করতে পারে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের বিজয় দিবসেও মোদীর পোস্টের ভাষা ছিল একইরকম। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিজয় দিবসে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। কিন্তু এবার বাংলাদেশের নামই উল্লেখ করা হয়নি মোদীর পোস্টে। তবে শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীই নন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হেনরি কিসিঞ্জারও তার ‘হোয়াইট হাউস ইয়ারস’ গ্রন্থে ‘ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ওয়ার’ বলে উল্লেখ করেছেন।
একাত্তরে ভারত কেবল যে এক কোটি বাঙালি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে তা-ই নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করেছে, নিজেরাও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের কয়েক হাজার সৈন্য নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের নিজস্ব শর্তে এই সমস্যা সমাধানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের ভেতরে ও বাইরে যে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, ভারত তারও মোকাবিলা করে। তার পক্ষে ওই সময় একমাত্র শক্তি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট ব্লকভুক্ত পূর্ব ইউরোপের গুটিকয় দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কাবু করার জন্যই ওই সময় সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট নিক্সন পরে স্বীকার করেছেন, প্রয়োজন হলে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় ছিল। বড় ধরনের যুদ্ধে সে জড়িয়ে পড়তে পারে, তা জানা সত্ত্বেও ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসরফায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেনি। (হাসান ফেরদৌস, ১৯৭১: বন্ধুর মুখ, শত্রুর ছায়া, প্রথমা/২০০৯, পৃ. ৮১)।
এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মাটিতে ঘটলেও তাকে ঘিরে যে রাজনীতি, তা কার্যত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল দিল্লি থেকে। উদ্বাস্ত প্রশ্নে ভারতীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এ ব্যাপারে একটি বড় ভূমিকা রাখে; কারণ ভারতের মাটিতে এক কোটি ভিনদেশির উপস্থিতি ভারতের অর্থনীতির ওপরই শুধু যে বড় ধরনের চাপ ফেলে তা নয়, তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে আবির্ভুত হয়।
গবেষকরা মনে করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বেশিদিন প্রলম্বিত হলে তাতে ভারতের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা উৎসাহিত হবে—এমন একটা ভয় ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মনে ছিল। ষাটের দশকের শেষদিকে পশ্চিম বাংলায় নকশালপন্থী আন্দোলন সহিংস আকার ধারণ করে। এমনকি দুই বাংলা ফের এক হওয়ার আন্দোলন নতুন করে চাঙা হয়ে উঠতে পারে, ওই সম্ভাবনাও ছিল বলে মনে করা হয়। ফলে ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ছিল, তা না মেনে উপায় নেই।
ভারতের তৎকালীন শাসকবর্গের এটিও একটি বিবেচনা ছিল যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠিত হলে সেখানে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ হ্রাস পাবে। সেখান থেকে ভারতে হিন্দুদের মাইগ্রেশন কমবে। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং শেষদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ছিল না। কিন্তু তারপরও বাঙালির এই স্বাধীনতা সংগ্রামকে কোনোভাবেই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সীমিত গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ করে রাখার সুযোগ নেই। বরং এই ধরনের ন্যারেটিভ বাংলাদেশের মুক্তিকামী সাত কোটি মানুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং এই যুদ্ধে শহীদদের প্রতি অবমাননার শামিল।
পরিশেষে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযু্দ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখা; এই যুদ্ধকে ‘ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই’ বলে অভিহিত করা এবং ১৯৭১ সালকে ‘গণ্ডগোলের বছর’ বলে উল্লেখ করার যে রাজনীতি, সে সংকীর্ণতা—সেটি একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি ও বিশালতা, এই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের আত্মদান এবং জীবন বাজি রেখে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও বীরত্বকে খাটো করে, তেমনি এই ধরনের বয়ানের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সম্পর্কও উন্নত হয় না। বরং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকেই শক্তিশালী করে। তাদের বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে।
ভারত ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের অংশীদার তাতে সন্দেহ নেই। তারা তাদের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফলে বাংলাদেশের বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছে—এই সত্য অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। বরং বাংলাদেশের মানুষও ভারতের এই অবদান, বিশেষ করে ১৯৭১ সালে এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দেয়ার ঘটনায় কৃতজ্ঞ।
একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের সাথে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের উত্থান-পতন, সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে ভারতের বৈষম্য এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ওপর তাদের ‘দাদাগিরি’ ফলানোর চেষ্টা নিয়ে যত সমালোচনাই থাকুক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্মোহভাবেই লেখা থাকবে। কিন্তু কোনো যুক্তিতেই ১৬ ডিসেম্বর এককভাবে ভারতের বিজয় দিবস নয়। ভারতীয় শাসকদের উচিত এই দিনে বাংলাদেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো এবং বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশীদার হতে পেরে তারা আনন্দিত। একটি দুটি শব্দই পুরো বয়ান পাল্টে দেয়। নরেন্দ্র মোদীর পোস্টে বাংলাদেশ শব্দটিই অনুপস্থিত। এইধরনের মানসিকতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের পথেও অন্তরায়।