Published : 20 Sep 2025, 01:00 AM
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল ফয়েজ মো. আলাউদ্দীন খানকে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা নতুন খবর নয়। এটা সংস্কৃতিজনের জানা হয়ে গেছে, অতিরিক্ত সচিব তার ওপর অর্পিত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ হিসেবে মহাপরিচালকের এই দায়িত্ব পালন করবেন বলে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি একটি স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যা সারাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে—সেটি পরিচালনা করবেন একজন সচিব তার মূল কাজের বাইরে অতিরিক্ত কাজ হিসেবে! অর্থাৎ বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা মূলধারার বাইরের অতিরিক্ত কোনো বিষয়? এর মাধ্যমে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আমাদের কী বার্তা প্রদান করল? রাষ্ট্রের চোখে শিল্প-সংস্কৃতি মূল ধারার কোনো বিষয় নয়, বরং ‘অতিরিক্ত’ বা ‘অবান্তর’ কোনো বিষয়?
এর আগে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ পদত্যাগ করেছিলেন মন্ত্রণালয় তথা সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনে। পদত্যাগ করে লিখিত বক্তব্যে সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, “উপদেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের অযাচিত হস্তক্ষেপ, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার জটিলতা, একাডেমির সচিবকে ‘ফোকাল পারসন’ হিসেবে মনোনীত করে মহাপরিচালকের বিধিসম্মত দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান, বাজেট কর্তন, শিল্পকলার ভেতর থেকে ফাইল গায়েব করে দেওয়া, একাডেমির অভ্যন্তরে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে প্ররোচিত করে কাজের পরিবেশ ব্যাহত করা এবং দুর্নীতিবাজ চক্রের নানা অপতৎপরতার কারণে আমি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি।”
সৈয়দ জামিল আহমেদের মতো একজন বিদগ্ধ মানুষ সরাসরি অভিযোগে এনে দায়িত্ব ছাড়ার পরও মন্ত্রণালয়ের কোনো বিকার চোখে পড়েনি। তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টা তো করা হয়ইনি, বরং মহাপরিচালক হিসেবে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা না করে তৎকালীন শিল্পকলা একাডেমির সচিবকে দিয়ে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে কার্যাবলি পরিচালনা করা হয়। সংস্কৃতিজনেরা মনে করেন, এটা করা হয়েছিল, যাতে করে সংস্কৃতি উপদেষ্টা তার খেয়ালখুশি মতো সব করতে পারেন।
ফল যা হবার তা-ই হলো। সৈয়দ জামিল আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর শিল্পকলা একাডেমি যে গতি পেয়েছিল তা মন্থর হয়ে গেল। তার চলে যাওয়ায় সংস্কৃতি উপদেষ্টা নিজেকে শিল্পকলা একাডেমির নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তার প্রেসক্রিপশনেই চলতে থাকল শিল্পকলা একাডেমি। এমনকি সৈয়দ জামিল আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিচালনা পরিষদের একটি সভা হওয়ার পর আর কোনো সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি। এসব অযাচিত নিয়ন্ত্রণ ও উদাসীনতার চূড়ান্ত রূপই হলো এই মহাপরিচালকের দায়িত্বকে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ হিসেবে বিবেচনা করা। এই সিদ্ধান্ত যেন এক ধরনের প্রতীকী ঘোষণা—শিল্পকলার মতো রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে মূল দায়িত্ব নয়, অবান্তর যোগ-বিয়োগের অঙ্গ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে আমরা দেখেছি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, আজাদ রহমান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মুস্তাফা মনোয়ার, মনজুরে মওলা, কামাল লোহানী, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মুস্তাফা জামান আব্বাসীর মত বিদগ্ধজনেরা। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন শিল্প ও সংস্কৃতির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী; তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন সৃষ্টিশীল শিল্পী, কেউ গবেষক, কেউবা নীতিনির্ধারণে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। অথচ সৈয়দ জামিল আহমেদ সরে যাওয়ার পর ছয় মাস শিল্পকলার সচিবকে দিয়ে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব চালানোর পর আরেকজন অতিরিক্ত সচিবকে নিয়োগ দেওয়া হলো অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে। ছয় মাসেও কেন একজন যোগ্য মহাপরিচালক বেছে নেওয়া গেল না? মন্ত্রণালয় ও উপদেষ্টার বিনা বাধায় ছড়ি ঘোরানোর জন্য? নাকি সংস্কৃতিকে একটি প্রশাসনিক শাখা-প্রশাখার অধীন করে রাখার জন্য?
অথচ শিল্পকলা একাডেমির মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাজেট বরাদ্দ ব্যতীত অন্যান্য কার্যক্রমে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ না করার বিধান রয়েছে। এটি কেবল আইন নয়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ন্যূনতম শর্ত। যখন আইনকে অগ্রাহ্য করে আমলাতন্ত্রকে শিল্পের নেতৃত্বে বসানো হয়, তখন তা কেবল ক্ষমতার খেলা নয়; এটি আসলে শিল্পের আত্মাকে খর্ব করার এক নিঃশব্দ প্রচেষ্টা।
আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যের একটি সনেট মনে করা যায়, “স্বাধীন মৃগের বর্ণ তোমারও যে শরীরে বিরাজে/ যখন আড়াল থেকে ছুটে আসে পাথরের ফলা,/ আমাদের কলাকেন্দ্রে, আমাদের সর্ব কারুকাজে/ অস্তিবাদী জিরাফেরা বাড়িয়েছে ব্যক্তিগত গলা।” আজ থেকে ৫২ বছর আগে উচ্চারিত এই শব্দগুলো এখন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ‘অস্তিবাদী জিরাফ’—এই রূপক আমাদের সময়ের অদৃশ্য কিন্তু দাপুটে ক্ষমতার প্রতীক। আজকের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা সেই লম্বা গলা দেখতে পাচ্ছি, যারা ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষের জন্য শিল্প ও সংস্কৃতির প্রাঙ্গণকে সংকুচিত করে ফেলছেন।
বাংলাদেশের কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান—বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি ও নজরুল ইনস্টিটিউট—আইন অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসিত। কিন্তু বাস্তবে আজ তারা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অযাচিত নিয়ন্ত্রণে জর্জরিত। এই নিয়ন্ত্রণ শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, জাতির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার ওপরও এক ধরনের আঘাত। গত এক বছরে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টার কর্মকাণ্ড নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সংস্কৃতির যে মৌলিক চেতনা—রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও নিজস্ব কণ্ঠে কথা বলার অধিকার—তা যেন ক্রমশ দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পকলা একাডেমির মতো বাংলা একাডেমিতেও অযাচিত হস্তক্ষেপ বিরাজমান। বাংলা একাডেমি আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির সর্বময় দায়িত্ব সাধারণ পরিষদের ওপর ন্যস্ত থাকার কথা। এই পরিষদ একাডেমির কার্যক্রম তদারকি ও পর্যালোচনা করে এবং নির্বাহী পরিষদকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু দেখা গেল যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় হুট করে বাংলা একাডেমির সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠন করল। একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, ফেলো এবং আজীবন সদস্যদের অনেককে না জানিয়েই সেই কমিটি গঠন করা হলো। এমনকি যাদের একাডেমির সাধারণ সদস্যপদও নেই, তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হলো কমিটিতে। এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবজ্ঞা নয়, এটি মূলত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশল।
বাংলা একাডেমির স্বায়ত্তশাসিত চরিত্র ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা অনেক দিন ধরেই চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই বিগত বছরগুলোতে মন্ত্রণালয়ের নানা উপায়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ার চেষ্টাও চোখে পড়েছে আমাদের। এই কমিটি গঠনের ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা। স্বায়ত্তশাসনের ওপর এই চাপ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, এটি আসলে জাতির বৌদ্ধিক স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিতবাহী।
শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলা একাডেমির মত আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো নজরুল ইন্সটিটিউট। সরকারের পট পরিবর্তনের পর এর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন লতিফুল ইসলাম শিবলী। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২০২৪-এর নভেম্বরে তাকে দেখা গেল ধানমন্ডি লেকে ‘বিদ্রোহী চত্বর’ করার ঘোষণা দিতে। কিন্তু গত এক বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। অথচ যে জায়গায় তিনি ‘বিদ্রোহী চত্বর’ করার ঘোষণা দেন, বিগত সরকারের আমলেই সে জায়গা উদ্ধার করে ‘নজরুল সরোবর’ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণের সিটি মেয়র।
আরো একটি কাজে নজরুল ইন্সটিটিউটকে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে দেখা গেল, সেটা হলো—নজরুলকে জাতীয় কবির স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা। ২০২৪ সালে ২৪ ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার সেই গেজেট প্রকাশ করে। গেজেট প্রকাশের পর সেটাকে এমনভাবে প্রচার করতে দেখা যায় যে, এতদিনে নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদাটা দেওয়া গেল। অথচ ২০২২ সালেই হাই কোর্টে এ বিষয়ক একটা রিট হয়েছিল। ২০২২ সালের ২২ জুন কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশনা চেয়ে আসাদ উদ্দিনসহ সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবী রিট আবেদন করেন। তাকে জাতীয় কবির ঘোষণা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে তখন রুল জারি করেছিল হাই কোর্ট। তখন তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, “জাতীয় কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের স্বীকৃতির জন্য নতুন করে কোনো গেজেটের প্রয়োজন নেই। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি, তা আমাদের আইনের মধ্যেই রয়েছে। তার জন্য আর আলাদা গেজেটের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। গেজেটের চেয়ে আইনই বড়।”
সেই ২০২২ সালের রিট ও রুলের ধারাবাহিকতাতেই ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশিত হয়। এই গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর নজরুল ইন্সটিটিউটের নামের সঙ্গে ‘জাতীয় কবি’ অভিধা যুক্ত করে বাহবা নেওয়ার চেষ্টাও দেখেছি আমরা।
এখানে কেবল তিনটি প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে দেশের সংস্কৃতির পরিসরে ছড়িয়ে আছে আরও বহু প্রতিষ্ঠান, যেখানে একই রকম অস্তিবাদী জিরাফেরা তাদের দীর্ঘ গলা বাড়িয়ে আসন গেড়েছে। তারা একদিকে ক্ষমতার ছায়া ব্যবহার করে সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের নামটাকে আলোকিত করে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে ব্যস্ত। এই প্রবণতা সংস্কৃতিকে মানুষের জীবনের অঙ্গ নয়, বরং সমাজের এক ধরনের বাড়তি সাজসজ্জা বানিয়ে ফেলতে চায়। সংস্কৃতি যে জাতির আত্মার স্পন্দন—তাকে যদি প্রশাসনিক অতিরিক্ত দায়িত্বের খাঁচায় আবদ্ধ করা হয়, তবে সেটি শুধু প্রতিষ্ঠানগত সংকট নয়, আমাদের স্বাধীন চেতনা ও সৃজনশীলতার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে ধরে নিতে হবে। সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে তাই কেবল সংস্কৃতিকর্মীদের নয়, নাগরিক সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষকেই প্রশ্ন তুলতে হবে—আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের ভবিষ্যৎ কি কয়েকজন জিরাফের মতো লম্বা গলাওয়ালার খেয়ালখুশির হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে, নাকি আমরা নিজেরাই তার রক্ষক হব?