Published : 14 Mar 2026, 11:57 AM
টাঙ্গাইলের মধুপুর বনের কালাপাহাড় এলাকায় একটি গারো পরিবারের বসতঘর ভেঙে ফেলা হয় গত ৯ মার্চ। সরকারের বনশিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই শিবলি মাংসাং ও রমেন কুবির দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার আর তিল তিল করে গড়ে তোলা ঘরদোর মুহূর্তেই তছনছ করে দেয়। প্রায় একই সময়ে সিলেটের খাদিমনগরের কল্লগ্রামেও বেশকিছু গারো পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালায় একটি বেসরকারি আবাসন কোম্পানি।
এই দুটি ঘটনার ধরন প্রায় একই। মধুপুরে উচ্ছেদ চালিয়েছে সরকারি রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ। সিলেটে প্রভাবশালী একটি বেসরকারি আবাস প্রতিষ্ঠান। উভয় ক্ষেত্রেই প্রচলিত আইনকানুন ও মানবিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। কোনো ধরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বা আগাম সতর্কবার্তার নিয়মকানুন অনুসরণ না করেই পরিবারগুলোকে ঘরছাড়া করার চেষ্টা হয়েছে। বসতভিটা থেকে এভাবে নাগরিকদের উপড়ে ফেলার চেষ্টা খোদ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মধুপুরের উচ্ছেদ অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সচেতন নাগরিকরা উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভুক্তভোগী রমেন কুবি জানিয়েছেন, তিনি অনেক বছর আগে প্রায় ৬০ হাজার টাকা দিয়ে এই জমি কিনেছেন। অথচ কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তার ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন পরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের আশ্বাস দিলেও এই যে মানসিক আতঙ্ক তৈরি হলো, তার দায় কে নেবে?
সিলেটের খাদিমনগরের কল্লগ্রামের ঘটনাটিও বেশ ভয়াবহ। সেখানে একটি বেসরকারি আবাসন কোম্পানি লোকলস্কর নিয়ে বহুকাল ধরে সেখানে বসবাস করা বেশকিছু গারো পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো নিয়ম মেনে নয়, ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের জমি ছেড়ে দিতে বলা হয়। এতে করে সেখানেও গারোদের মনে তৈরি হয়েছে নিজ বসতি থেকে উচ্ছেদের গভীর আতঙ্ক।
দেশের দুই প্রান্তে ঘটলেও এই দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত রাষ্ট্র, বাজার এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে যে চাপের মধ্যে আছে, তারই একটি প্রকাশ অংশ। গারো বা মান্দি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন আদিবাসী সম্প্রদায়। তাদের প্রধান বসতি মধুপুর গড় এবং ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলার গারো পাহাড়ের পাদদেশে। সিলেটের কিছু এলাকাতেও তাদের বসবাস আছে। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে, সমাজ কাঠামো মাতৃতান্ত্রিক। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তাদের যাপিত জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই বৈচিত্র্যকে রাষ্ট্র সহসা স্বীকৃতি দিতে নারাজ। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে একটি দুর্বল সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়। সংখ্যা কম, অর্থনৈতিক শক্তি কম এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত হওয়ার কারণে জমি ও সম্পদের বিরোধে তারা প্রায় সবসময়ই দুর্বল অবস্থানে থাকে।
আশির দশকে মধুপুরে গজারি বন কেটে প্রায় সাত হাজার একর জমিতে রাবার বাগান স্থাপন করা হয়। তখন বলা হয়েছিল এটি একটি উন্নয়ন প্রকল্প। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতার ঊনতা স্পষ্ট হতে থাকে। এখন সেই জমির বড় অংশে কলা ও আনারস চাষ হচ্ছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখেছি, সেই জমির অনেকটাই স্থানীয় প্রভাবশালী বাঙালিদের দখলে চলে গেছে। এ সত্ত্বেও সেই দখলদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ অজানা। অন্যদিকে, শত শত বছর ধরে বসবাস করা গারো পরিবারকে উচ্ছেদ করা তুলনামূলক সহজসাধ্য।
এখানেই তৈরি হয় একটি মৌলিক প্রশ্ন। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা কি অগুরুত্বপূর্ণ? নোটিশ, শুনানি এবং আদালতের সুযোগ কি নাগরিক হিসেবে গারোদের এখতিয়ার বহির্ভুত? রাষ্ট্র কেন প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে উদাসীন আর দরিদ্র গারোদের ক্ষেত্রে এমনকি বেআইনিভাবে সক্রিয়?
সিলেটের ঘটনাটিও একই প্রশ্ন সামনে আনে। আবাসন ব্যবসা এখন বাংলাদেশের একটি দ্রুত বিস্তৃত খাত। শহরের বিস্তার এবং জমির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণ প্রায়ই এমন জায়গায় হচ্ছে যেখানে জমির মালিকানা ঐতিহাসিকভাবে জটিল, বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। কারণ, তাদের ভূমি মালিকানার ধারণা রাষ্ট্রের বর্তমান আইনি কাঠামোর থেকে ভিন্ন। গারো সমাজ দীর্ঘদিন ধরে প্রথাগত বা সামষ্টিক মালিকানার কাঠামোর মধ্যে বসবাস করেছে। তাদের কাছে জমি মানে শুধু সম্পত্তি নয়; জমি মানে বসতি, কৃষিকাজ, বন এবং সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আধুনিক ভূমি আইন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই বাস্তবতাকে খুব কমই স্বীকৃতি দেয়। কাগজে নাম না থাকলে সেই জমি আইনের চোখে অন্য কারও হয়ে যায়। তখন বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী পরিবারও হঠাৎ করে ‘অবৈধ দখলদার’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই বাস্তবতার সুযোগ নেয় বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী। কখনো উন্নয়ন প্রকল্পের নামে, কখনো বন সংরক্ষণের যুক্তিতে, আবার কখনো আবাসন সম্প্রসারণে অজুহাতে তাদের উচ্ছেদ করা হয়।
মধুপুর গড়ের ইতিহাস মূলত এক ধরণের সংঘাতের ইতিহাস। বন বিভাগ, রাবার প্রকল্প এবং জাতীয় উদ্যান ঘোষণার মতো নানা উদ্যোগের ফলে গারোদের বসতি ও কৃষিজমি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে গেছে। এর ফলে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে। অনেক গারো পরিবার শহরে গিয়ে শ্রমিক হয়েছে, কেউ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে চলে গেছে। গারোদের এই দেশত্যাগকে নিছক অর্থনৈতিক অভিবাসন বললে বাস্তবতার সরলীকরণ হবে। মূলত এটি একটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাওয়া জাতিসত্তার লক্ষণ।
অথচ আপাত পরাজয় মেনে পিছু হটা এই গারোদের ইতিহাস কিন্তু অত্যন্ত সংগ্রাম-সমৃদ্ধ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মধুপুর গড় অঞ্চল ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। স্থানীয় গারো পরিবারগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়সহ সব ধরণের সহায়তা করেছে। অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন।
কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী বয়ানের ভেতরে তাদের এই অবদান খুব কমই জায়গা পেয়েছে। রাষ্ট্রের পরিচয়ে প্রধানত বাঙালি জাতীয়তাবাদই প্রাধান্য পেয়েছে, যার ভিড়ে ছোট ছোট জাতিসত্তার সমৃদ্ধ ইতিহাস আড়ালে থেকে গেছে। আর, এই অদৃশ্য অবস্থানই আজ তাদের অস্তিত্বের সংকটকে আরও গভীর করেছে।
আরেকটি বিতর্ক আছে আদিবাসীদের জনসংখ্যা নিয়ে। সরকারি জনশুমারিতে যে সংখ্যা দেখানো হয়, অধিকাংশ আদিবাসী সম্প্রদায় ও সংগঠনই সেই সংখ্যাকে বাস্তবে আরও অনেক বেশি মনে করে। তাদের অভিযোগ, সংখ্যা কম দেখানো হলে নীতিনির্ধারণে রাষ্ট্র তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দেখার সুযোগ পায়। সংখ্যা কম মানে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কম এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় বরাদ্দ কমানোর সুযোগ।
এই বাস্তবতায় সাম্প্রতিক উচ্ছেদ প্রচেষ্টা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এটি কয়েকটি গারো পরিবারের বাসস্থান ইস্যুকে পেরিয়ে নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধুপুরের ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এতে কি আদিবাসীদের ভূমি বিষয়ক বহাল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়েছে? স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদে আপাতত উচ্ছেদ থেমে থাকতে পারে, কিন্তু তাদের ভূমি ও বসতির অধিকার নিয়ে বিরোধ কি মিটেছে? অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরণের বিরোধ কিছুদিন শান্ত থাকে, তারপর সুযোগ বুঝে ফের শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে ভুক্তভোগীরা হাল ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যায়।
২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন যে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মতো আদিবাসী হিসেবে অভিহিত জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দেশের মানুষ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে একটি মধ্যপন্থি শক্তিকে বেছে নিয়েছে। অনেক আদিবাসী ভোটারও সেই আশায় ভোট দিয়েছেন যে, এতে করে তাদের জানমালের নিরাপত্তা বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা এখনও বেশ জটিল। সমাজের বিভিন্ন স্তরে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির প্রভাব রয়ে গেছে। সিলেটের আবাসন ব্যবসার সঙ্গে এরকম কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সংবিধানকে সর্বোচ্চ আইন মান্য করা হলে সবাইকে আইনের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো গোষ্ঠী যেন ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে দুর্বল জনগোষ্ঠীর জমি দখল করতে না পারে। বসতি উচ্ছেদের মতো কঠোর পদক্ষেপের ক্ষেত্রে অন্তত ন্যূনতম আইনি ও মানবিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। নোটিশ, শুনানি এবং পুনর্বাসন ছাড়া কোনো পরিবারকে উচ্ছেদ করা মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ একটি বিচিত্র সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যসম্বলিত রাষ্ট্র। এখানে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে। এই বৈচিত্র্যই দেশের শক্তি। কিন্তু বাস্তবে এই বৈচিত্র্যের প্রতি আমাদের আচরণ সবসময় সম্মানজনক হয় না। গারোদের মতো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আচরণই সেই বাস্তবতার একটি পরীক্ষা।
মধুপুর বা সিলেটের এই ঘটনাগুলো যদি বারবার ঘটে এবং আমরা যদি সেগুলোকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যাই, তবে ভবিষ্যতে একই দৃশ্য আরও বহুবার ফিরে আসবে। প্রতিবারই মানুষ বসতি হারাবে, একটি জাতি তাদের জমি হারাবে।
বাংলাদেশ নামক এই স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে গারোদের মতো জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ জায়গা কি থাকবে, নাকি তাদের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে সংকুচিতই হতে থাকবে? রাষ্ট্র যদি সত্যিই সমতা ও ন্যায়ের কথা বলে, তবে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ প্রান্তিক মানুষের জীবনে দেখাতে হবে।
আবাসন কোম্পানির 'হুমকি', উচ্ছেদ আতঙ্কে ১৫ গারো পরিবার
'অস্ত্রের মুখে' উচ্ছেদের পরদিন ঘর পুননির্মাণের আশ্বাস পেল গারো পরিবার