আবাসন কোম্পানির ‘হুমকি’, উচ্ছেদ আতঙ্কে ১৫ গারো পরিবার
বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘চেয়ারম্যান সিটি হাউজিং কোম্পানি’র লোকজন উচ্ছেদের জন্য নানাভাবে অত্যাচার করছে।
আবাসন কোম্পানির হুমকির মুখে ছয়-সাত দশক ধরে বসবাস করে আসা সিলেটের ১৫টি গারো পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগছে। কোম্পানির লোকজন খুঁটি গ্যাড়ে তাদের জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছে।
উচ্ছেদ ঠেকাতে সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের কল্লগ্রামের ফিসারি ছড়ারপাড়ের বাসিন্দারা এরই মধ্যে প্রশাসনের কাছে লিখিতও দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্বাস দিয়েছেন, পুনর্বাসন ছাড়া তাদের উচ্ছেদ করা হবে না।
তবু ভয় আর আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটছে কল্লগ্রামের প্রায় ৮০-৯০ জনের। সেখানে ১৫টি গারো পরিবারের পাশাপাশি একটি মুসলিম পরিবারও রয়েছে।
“মা-বাবা ও দাদা-দাদির সময় থেকেই আমরা এখানো বসবাস করে আসছি। বর্তমানে আমার বয়স ৭৫ হয়েছে। এই বয়সে এসে এখন হুট করে শুনতে হচ্ছে, আমাদেরকে উচ্ছেদের কথা। আমাদের বাচ্চা-কাচ্ছা নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে হবে। আমরা গরিব মানুষ, এখন আমরা কোথায় যাব?” টলমল চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে এভাবেই নিজের আতঙ্কের কথা বলছিলেন মেরি চিসাম; যিনি পল্লীটির জ্যেষ্ঠ সদস্যদের একজন।
তার অভিযোগ, ‘চেয়ারম্যান সিটি হাউজিং কোম্পানি’র লোকজন উচ্ছেদের জন্য নানাভাবে অত্যাচার করছে।
মেরি বলেন, “এই এলাকা এক সময় ‘জঙ্গল’ ছিল, জঙ্গল কেটে আমরা ঘরবাড়ি বানিয়েছি। এক সময় আমাদের ‘কুড়েঘর’ ছিল। আমাদের ফাদার (খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপসনালয় চার্চের প্রধান) সাহায্য করেছেন, আমরাও কিছু দিয়ে ঘরবাড়ি বানিয়েছি।
“এই প্রথম শুনতে হচ্ছে চলে যাওয়ার কথা। আগের মানুষ এ রকম কোনোদিন বলেনি; তাহলে আমরা এখানে ঘরবাড়ি করতাম না। এখন মাটি ভরাট করে আমাদের বলা হচ্ছে, চলে যাও। হুট করে এখন আমরা কোথায় যাব, আমাদের তো যাওয়ার ব্যবস্থা নাই।”
সোমবার কল্লগ্রামে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হলে, তারা জানান, এখানে ২৫ দশমিক ৭ ডেসিমেল জায়গায় কাঁচা-পাকা ঘর বানিয়ে ১৬টি পরিবার বসবাস করছেন। তারা ইউনিয়ন পরিষদকে হোল্ডিং ট্যাক্স দেন। এ ছাড়া প্রাপ্ত বয়স্কদের রয়েছে পাড়ার ঠিকানার জাতীয় পরিচয়পত্র-এনআইডি।
অজানা ভয় আর আতঙ্ক
পাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, ছাড়ার পূর্বদিকে নতুন করে মাটি ফেলা হয়েছে। ছড়াটি পার হয়ে পশ্চিম দিকে থাকা গারোপড়ায় প্রবেশ করে সুনসান নিরবতা লক্ষ্য করা গেছে। পাড়ায় নতুন লোক দেখে প্রথমে ছোট ছেলেমেয়ে ও কিশোর এগিয়ে আসে। পরে আসেন পাড়ার বাসিন্দা দয়া বেগম ও লিটন রেমাসহ আরও কয়েকজন। হঠাৎ করে অচেনা লোক দেখে তারাও কিছুটা ভীত হয়ে পড়েন। আর তাদের চোখে-মুখে অজানা ভয় আর আতঙ্ক।
পরিচয় পাওয়ার পর প্রথমেই দয়া বেগম দেখান তার ঘরের পাশে রেখে যাওয়া হাউজিং কোম্পানির খুঁটিটি। আর বলতে থাকেন, “আমাদের চলে যেতে বলা হয়েছে। তারা বলেছে, খুঁটি পর্যন্ত তাদের জয়গা, বাকিটা ছড়ার জায়গা।”
পাড়ার একাধিক স্থানে হাউজিং কোম্পানির পাকা খুঁটি দেখা যায়। হেঁটে পুরো গারোপাড়ার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি দেখার সময় নিরবতা লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় ঘরে-বাইরে থাকা স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে ও বয়স্কদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
একটির সঙ্গে আরেকটি ঘরের দেওয়াল লাগোয়া ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। কারো ঘর টিনের বেড়া আর টিনের ছালা; কেউবা আধাপাকা বাড়ি করেছেন। বোঝাই যায়, জায়গার স্বল্পতার কারণে বাড়িঘরগুলো ছোট ছোট।
গারোপাড়ার শেষ মাথায় গিয়ে চোখে পড়েছে নতুন করে ছড়াটির গতিপথ পবির্তনের চিহ্ন। বাসিন্দারা দেখিয়েছেন আগে কোনদিকে ছড়ার পানি প্রবাহ ছিল; বর্তমানে সেই স্থানে হাউজিং কোম্পানি মাটি ফেলে ভরাট করে বাঁশ দিয়ে বেড়া দিচ্ছে।
পাড়ায় দুর্গন্ধ বেশ প্রকট। এই ময়লা-আবর্জনা বিসিক শিল্পনগরী থেকে আসছে। দুর্গন্ধকে নিত্যদিনের সঙ্গী করেই বসবাস করছেন বাসিন্দারা। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও অপ্রতুল মনে হয়েছে।
‘রাত-বিরাতে হুমকি-ধামকি’
১৫টি গারো পরিবারের সঙ্গে ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে বসবাস করেন ৫০ বছরের দয়া বেগম। তার ভাষ্য, “আমাদের অনেকদিন ধরে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এখান থেকে তুলে দেওয়ার জন্য। মাটি ভরাট করা হচ্ছে, আমার ঘরের পাশে এসে পাকা খুঁটি দিয়ে বলে গেছে, এটা তাদের জায়গা। আমাদের চলে যেতে হবে। এসব করা হচ্ছে আমাদের সঙ্গে।”
চার মাস ধরেই এই অবস্থা চলছে। আবাসন কোম্পানি প্লট বিক্রি করছে এবং মাটি ফেলে জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাতের বেলায় মাটি ফেলা হয় বলে বাসিন্দারা জানান।
বাবুল কানু বলেন, “ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ মাটি ফেলা শুরু করে ছড়া ভারার জন্য। তারপর আমরা বাধা দিলে তারা পুলিশ আনে। তখন পুলিশ এসে বলে ছড়া সরকারি, এখানে মাটি ফেলা যাবে না। পরে আমরা গেলাম ইউএনওর কাছে। গিয়ে বিস্তারিত বলে লিখিত অভিযোগ দিলাম।
“তারপর কিছুদিন বন্ধ ছিল উৎপাত। এখন আবার কিছুদিন ধরে শুরু হয়েছে। রাত-বিরাতে এসে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। তা না হলে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেবে, মেরে ফেলবে বলা হচ্ছে। শরীরের রক্ত পানি করে এই ঘরগুলো করা হয়েছে। এখন এত বছর পর সবকিছু ভেঙে জায়গা দখল করা হবে বলেতেছে।”
একই ভাষ্য দিলেন দানিয়েল, লিটনসহ উপস্থিত থাকা পরিবারের সদস্য।
আদিবাসী গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, “কল্লগ্রামে গারো (মান্দি) নৃগোষ্ঠীর লোকজন পাঁচ-ছয় দশক ধরে মূলত ছড়ার পাড়ে পতিত ভূমিতে বসবাস করে আসছে। ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে তারা বসতি গড়ে তুলে। এখানে ৮০ বয়সের প্রবীণ রয়েছেন; আবার এক বছরের শিশুও আছে।
“এটা সত্য তাদের বসতির ভূমির মালিকানার স্বপক্ষে কোনো দলিলপত্র নেই। দেশের অনেক নৃগোষ্ঠীর মত তাদেরও এ ভূমির উপর আইনগত অধিকার নেই। তাই বিষয়টি আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিত। এদের এনআইডি কার্ড রয়েছে, তারা নির্বাচনে ভোট দেন। ইউনিয়ন পরিষদে হোল্ডিং ট্যাক্স দেন। সরকারি বিভিন্ন সহায়তাও পেয়ে থাকেন।”
অধ্যাপক জহিরুল বলেন, এখানকার ছড়া দিয়ে বিসিক শিল্পনগরীর তরল বর্জ্য প্রবাহিত হয়। যেকোনো সুস্থ মানুষ এখানে এক ঘণ্টা থাকলে শিল্পবর্জ্যের দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে এর সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে গেছে।
“সম্প্রতি ছড়ার ভূমি উদ্ধার এবং ছড়াটির প্রবাহ সোজা করতে গিয়ে এরা আজ উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগছে। আমি মনে করি, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কোনো খাস জমিতে তাদের পুনর্বাসন করা যেতে পারে।”
ছড়ার দুর্গন্ধের বিষয়ে বিসিক সিলেট জেলা কার্যালয়ের উপ মহা-ব্যবস্থাপক ম. সুহেল হাওলাদার বলেন, “ওই এলাকায় ময়লা-আবর্জনা দুর্গন্ধ কমাতে সরকারিভাবে কিছু প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেছি খালটি খননের বিষয়ে। খালটি খনন হলে গেলে দ্রুত পানি নেমে যাবে।”
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়
সম্প্রতি নাগরিক সমাজের একটি প্রতিনিধিদল কল্লগ্রামের গারোপাড়া পরিদর্শন করে সেখানকার বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারাও পুনর্বাসনের বিষয়টিকে প্রধান্য দিচ্ছেন।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা-ধরা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, “প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা ছড়ার পাশে ৭০ ধরে বসতি স্থাপন করা অপরাধ নয়। তবে ৫৬ ম্যাপ ধরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা ছড়ার গতিপথ পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। শান্তিপ্রিয়, সহজ-সরল গারো জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলো কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছে। তাই তাদের পুনর্বাসন না করে কোনোভাবেই উচ্ছেদ করা যাবে না।’’
গারোপাড়ার বাসিন্দারা জানান, সোমবার দুপুরের দিকে তারা সদরের ইউএনওর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। ইউএনও তাদের আশ্বাস দিয়েছেন, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হবে না। তবু তাদের ভেতরে ভয় কাজ করছে।
সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোশনূর রুবাইয়াৎ বলেন, “গারোপাড়ার বাসিন্দারা খাস জমিতে রয়েছেন। তাদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হবে না, পুনর্বাসনের জন্য তালিকা করা হয়েছে।
“একইসঙ্গে হাউজিং কোম্পানি কৃষি জমি ভরাট করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করার বিষয়ে কাগজপত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। বাসিন্দাদের হুমকি দিলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।”
যদিও কল্লগ্রামের গারোপাড়ার বাসিন্দাদের হুমকি-ধামকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ‘চেয়ারম্যান সিটি হাউজিং কোম্পানি’র পরিচালক আশরাফুল আলম আহাদ। তিনি বলেন, “ওই পরিবারগুলো ছড়ার জায়গায় বসবাস করছে আর ছড়াটি চলে এসেছে আমাদের হাউজিংয়ের জায়গাতে। আমি শুক্রবার গিয়ে বলেছি, আমরা আমাদের জায়গাতে মাটি ফেলতে চাই।
“আমি কাউকে হুমকি-ধামকি দেইনি। আমি আমার জায়গা পেতে লিখিত আবেদন করেছি। আমাকে ইউএনও ম্যাডাম বলেছেন, বিষয়টি তিনি দেখছেন। আমি কাউকে উচ্ছেদ করার কথা বলিনি। আমরা ছড়ার গতিপথ পরিবর্তন করিনি। ম্যাপ যেদিকে আছে ছড়ার গতিপথ ওইদিকে নিয়েছে উপজেলা পরিষদ। আমাদের কোনো কিছু এখানে নেই।”
গারোপাড়ার বাসিন্দাদের উচ্ছেদের বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, “এ রকম কোনো অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। তবে এই বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।”
