Published : 16 May 2026, 02:13 PM
অতি সাধারণ রোগ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যাগুলো যখন প্রতিনিয়তই সরকারি পরিসংখ্যানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক কিছু খবর এই অঘোষিত মহামারী মোকাবিলায় রাষ্ট্রের দায় ও দায়িত্ব নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
‘হামের চিকিৎসা: কিনতে হয় সবই, খরচের চাপে অভিভাবকরা’—এটি গত ১০ মে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খবর। ভুক্তভোগীদের বরাতে এই খবরে বলা হয়, হামের চিকিৎসায় হাসপাতালে প্রতিদিন অনেক খরচ হয়। ডাক্তার, নার্স যখন যা নিয়ে আসতে বলেন, সব বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। বিভিন্ন সময় পরীক্ষা আর ওষুধ কিনতে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার ভাড়া দৈনিক এক হাজার, অক্সিজেন ৫০০ টাকা, নেবুলাইজার ১০০ টাকা। আর বিভিন্ন ওষুধ কিনে নিয়ে আসতে হয়। তারা বলেন, আইসিইউতে रखनेর সময় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ, বিভিন্ন ইনজেকশন কিনতে বেশি টাকা ব্যয় হয়। রাজধানীর শিশু হাসপাতালে ভর্তি আলিফ নামে এক শিশুর বাবার ভাষ্য, “টাহার চিন্তায় কি করবো বুঝতাছি না।”
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, মুমূর্ষু শিশুদের জন্য ঢাকার সরকারি হাসপাতালে কোনোমতে একটা সিটের ব্যবস্থা করা গেলেও মিলছে না ত্বরিৎ চিকিৎসা। সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকার কথা থাকলেও রোগীরা তা পাচ্ছে না। কাজেই প্রশ্ন উঠছে, হামের চিকিৎসা কেন বিনামূল্যে নয়?
১৩ মে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ানের একটি খবর: ‘হামের রোগী ভর্তি নিচ্ছে না ঢাকার নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালগুলো’। কারণ হিসেবে তারা বলছে, হামের রোগীর ব্যবস্থাপনার জন্য তাদের প্রস্তুতি নেই। আবার অনেক হাসপাতালে শিশুদের আইসিইউ থাকলেও সেখানে স্থান পাচ্ছে না হামে আক্রান্ত শিশুরা। রাজধানীর ৮টি বেসরকারি হাসপাতালের এমন চিত্র তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে।
খবরে বলা হয়, স্কয়ার হাসপাতাল হামের কোনো রোগীই ভর্তি নিচ্ছে না। বিআরবি হাসপাতালের ওয়ার্ডে হামের রোগী রাখা হয় না। কেবিনে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও তা করোনার মতো খুবই ব্যয়বহুল এবং সীমিত। কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে হামের রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না। এর বিপরীতেই স্পেশালাইজড হাসপাতাল—সেখানেও একই অবস্থা। কেন হামের রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না, তার কোনো সদুত্তর নেই।
শুক্রবার (১৫ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে চার শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ৮ জনের। এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ১৯২ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১১১ শিশুর শরীরে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৩৭৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭৪ শিশু। মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এত মৃত্যুর পরও এটি শিশুস্বাস্থ্যের জন্য একটা জরুরি অবস্থা বা মহামারী নয়? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন যে, এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে রাষ্ট্রের সমস্ত মনোযোগ এখানে দেওয়া দরকার। শিশুদের বাঁচাতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করা দরকার। কিন্তু সরকার সেটি করছে না। বরং এটা কবীর সুমনের গানের মতো: ‘কত হাজার মরলে পরে মানবে তুমি শেষে…’।
একটা সাধারণ অসুখে সাড়ে চারশো শিশু মরে গেল, অথচ মন্ত্রী-উপদেষ্টা-আমলাদের কথাবার্তার মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই, দুঃখবোধ নেই। বরং আছে অতীতের সরকারের ওপর দায় চাপানোর পুরোনো প্রবণতা। চেয়ারে বসলেই সকলের চেহারা এবং মুখের ভাষা অভিন্ন হয়ে যায়। যিনি সারা জীবন বিপ্লবী, প্রতিবাদী, ন্যায্য কথা বলেন—চেয়ারে বসার পরেই তার মুখের ভাষা বদলে যায়। তিনিও পূর্বসূরি মন্ত্রী-এমপি বা রাজনীতিবিদের ভাষায় কথা বলেন। অর্থাৎ তার বা তাদের কোনো দোষ নেই, গাফিলতি নেই; সব দোষ কেষ্টা বেটার!
তবে এরই মধ্যে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, হাম যে এখন মহামারী আকার ধারণ করল, সেখানে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতি ও উদাসীনতার দায় অনেকখানি। বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং death rate বা মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ আগাম অর্থায়নের ব্যবস্থা করে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করে, যাতে তীব্র সংকট মোকাবিলা করা যায়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু টিকার মজুত বালাই বা বজায় রাখা সম্ভব হয়। তবে কিছু টিকার ক্ষেত্রে এর আগেই মজুত শেষ হয়ে যায় এবং কিছু টিকার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থছাড়ে বিলম্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে টিকা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয় (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৭ মে ২০২৬)।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, টিকা কেনায় অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতি ছিল কি না, তার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হবে। হোক। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ শাস্তিও হোক। কিন্তু তার আগে আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে হবে। এই মুহূর্তে কয়েকটি কাজ করতে হবে:
১. সমস্ত সরকারি হাসপাতালে হামের চিকিৎসা শতভাগ ফ্রি করে দিতে হবে। হাসপাতালে ভর্তির পরে কোনো অভিভাবককে যাতে হাসপাতালে একটি টাকাও দিতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এমনকি আইসিইউ প্রয়োজন হলে, সেই খরচও রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। এখানে যে সমস্যাটা হবে তা হলো, সরকারি হাসপাতালের নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়রা বিনা পয়সায় কোনো কাজ করতে চায় না। এখানে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সন্তানের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেউ কোনো অভিভাবকের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিতে না পারে।
হামের চিকিৎসা বিনামূল্যে হতে হবে এই কারণে যে, এই মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা দায়ী। সময়মতো শিশুদের টিকা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে, অতএব হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত সকল শিশুর চিকিৎসার পুরো খরচ রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। চিকিৎসকরা বলছেন, হামে আক্রান্ত যেসব শিশু অপুষ্টির শিকার, তারা বেশি মারা যাচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে এখানেও রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না। কারণ সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক कर्तव्य বা কর্তব্য বলে গণ্য করবে। তার মানে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অতএব পুষ্টিহীনতার কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু হলে তার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
২. সমস্ত হাসপাতালে হামের পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং সেটা দ্রুত করতে হবে। অর্থাৎ হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
৩. সমস্ত বেসরকারি, এমনকি অভিজাত হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে যে, হামের রোগী ভর্তি নিতে হবে। না নিলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। বেসরকারি হাসপাতালেও হামের চিকিৎসা হতে হবে ন্যূনতম খরচে। যা খরচ হবে, তার একটি অংশ সরকার সেখানে ভর্তুকি দেবে।
৪. জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সকল হাসপাতালে হামের রোগীর সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা সদর হাসপাতাল, এমনকি মেডিকেল কলেজ থেকেও যদি কোনো হামের রোগীকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। ওই স্থাপনাগুলো ভেঙে সেখানে ধানের আবাদ করা উচিত।
বাস্তবতা হলো, জেলা-উপজেলা এমনকি বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান নিয়ে জনমনে অসন্তুষ্টির পরিমাণ এত বেশি যে, অসুস্থ হলে মোটামুটি সচ্ছল মানুষেরাও ঢাকায় চলে আসেন। অথচ প্রত্যেকে যদি তার বাড়ির কাছের হাসপাতালেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটা পেতেন, তাহলে হাজার হাজার টাকা খরচ করে তাকে ঢাকায় আসতে হতো না। ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপরেও অস্বাভাবিক চাপ পড়ত না। কিন্তু রাষ্ট্র কখনোই জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আধুনিক করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি। কারণ এটা হলে বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি হাসপাতালগুলোর চারপাশে যেসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে, সেগুলোর ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই সরকারি হাসপাতালগুলোকে পঙ্গু করে রাখা হয়। যে কারণে সরকারি হাসপাতালে গেলেই চিকিৎসক সোজা বাংলায় বলে দেন, “ঢাকায় নিয়ে যান।” দুর্নীতি-অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে না পারলে হামে সাড়ে চারশো শিশুর মৃত্যুর সংখ্যাটা সরকারি পরিসংখ্যান হয়েই থাকবে এবং মাসখানেক পরে এর প্রকোপ কমে এলেও কিছুদিন পরে অন্য আরেকটা অসুখের মহামারী তৈরি হবে।
টিকার সংকট 'আসন্ন': অন্তর্বর্তী সরকারকে যা বলেছিল ইউনিসেফ