Published : 07 May 2026, 11:40 PM
মজুদে খেয়াল না রেখে ক্রয়পদ্ধতি পরিবর্তনের জটিলতায় বাংলাদেশের টিকা ব্যবস্থাপনা যে বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছে, সে বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে চিঠি পাঠিয়ে এই শঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল। চিঠি পাঠিয়েছিলেন ঢাকায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
‘টিকার মজুদ শেষ হওয়ার আসন্ন ঝুঁকি’ উপ-শিরোনামে তিনি লেখেন, হাম-রুবেলার এমআর৫ টিকার সময়সীমা ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে গেছে। পোলিওর ‘বিওপিভি’, টিটেনাস ও ডিপথেরিয়া (টিডি) এবং যক্ষ্মার বিসিজি টিকার সময়মীমা যথাক্রমে ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২২ ফেব্রুয়ারি এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হতে যাচ্ছে।
“সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে শিশুদের নির্দিষ্ট সময়ে টিকা নেওয়া ব্যাহত হয়। এছাড়া টিকায় প্রতিরোধ করা যায়, এমন রোগ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
ওই চারটির বাইরে অন্য টিকার প্রথম চালান ‘ভালোমত ব্যবহার হয়েছে’ তুলে ধরে তিনি লেখেন, “কিন্তু এমআর৫, বিওপিভি এবং বিসিজি টিকা কেনার জন্য ’এডিবি এপিভ্যাক্স’ চুক্তিটি জরুরিভিত্তিতে চূড়ান্ত করা এবং অর্থ হস্তান্তর প্রয়োজন।”
রানা ফ্লাওয়ার্স লেখেন, মজুদ যেন ফুরিয়ে না যায়, সেজন্য আগে দুই দফায় টিকার ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্থায়নের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ইউনিসেফের সরবরাহ বিভাগ। ওই আলোচনায় দর-কষাকষিতে ভূমিকা রাখে ইউনিসেফ বাংলাদেশ, যেন প্রাথমিক ৫০ শতাংশ রাজস্ব বাজেট পাওয়ার সময় কোনো শিশুর মৃত্যু না হয়।
তিনি লেখেন, “ইউনিসেফের নেটওয়ার্ক ও পদ্ধতির কারণে কেনাকাটার ক্ষেত্রে অর্থ হস্তান্তর থেকে শুরু করে শিপমেন্ট পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের সর্বনিম্ন একটা সময় লাগে। এক্ষেত্রে সরবরাহ বিভাগের সহকর্মীরা সতর্ক আছেন এবং সহায়তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, এর চেয়ে বেশি দেরি হলে, বিশেষ করে এপিভ্যাক্স চুক্তির ক্ষেত্রে, তাহলে মজুদ হারানোর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।”

চিঠির শুরুতে ইউনিসেফ প্রতিনিধি লেখেন, “বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়ে সরাসরি জানাতে আপনি আমাকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ফলে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ যে খুব বড় রকমের টিকা সংকটে পড়তে যাচ্ছে, সে বিষয়ে উদ্বেগ জানাতে আমি আপনাকে লিখছি।”
“এক্ষেত্রে নিয়মিত ইপিআই টিকার জন্য জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে ৮৪২ কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দের জন্য ইউনিসেফ আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাচ্ছে। ডব্লিউএইচও-ইউনিসেফের প্রি-কোয়ালিফাইড টিকা কেনার ক্ষেত্রে ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪২১ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করছে, ইউনিসেফ বিশ্বের টিকার সবচেয়ে বড় ক্রেতা, খুবই পুঙ্খানুপুঙ্খ মান যাচাইয়ের বিশেষ জ্ঞান এর রয়েছে। ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের নিয়মিত ও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকা সরবরাহকারী থেকে টিকা কেনা হয়।”
সাশ্রয়ী হওয়ায় ইউনিসেফের টিকায় আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায় দাবি করে চিঠিতে বলা হয়, “এই কেনাটাকার ক্ষেত্রে আপনার সিদ্ধান্ত নিরবচ্ছিন্ন টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রতিফলন। তবে, প্রশংসনীয় এই প্রাথমিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিশুদের জন্য যে পরিমাণ টিকার দরকার, তা মেটানো যাবে না।”
গ্যাভির সহায়তায় যৌথ অর্থায়নের হাম-রুবেলাসহ পাঁচ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার বাধ্যবাধকতা, সেটি চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দেন ইউনিসেফ প্রতিনিধি।
ওই পাঁচ টিকা হচ্ছে- ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টঙ্কার, হেপাটাইটিস-বিসহ পাঁচটি রোগের পেন্টাভ্যালেন্ট (পেন্টা), নিউমোনিয়ার পিসিভি, জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস(এইচপিভি), টাইফয়েডের টিসিভি টিকা এবং হাম-রুবেলার এমআর টিকা।
তিনি বলেন, ওই চুক্তির অধীনে এই কেনাকাটার ক্ষেত্রে ইউনিসেফের সরবরাহ বিভাগকে ‘একমাত্র এজেন্সি হিসেবে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ’ করে দেওয়া আছে এবং যৌথ অর্থায়নের টাকা সরাসরি ইউনিসেফের কাছে যাওয়া ‘বাধ্যতামূলক’।
“গ্যাভির চুক্তি ভঙ্গ করলে ভবিষ্যত সহায়তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। পাঁচ টিকার সবগুলোতেই ইউনিসেফের সরবরাহ বিভাগের মাধ্যমে কেনা বাধ্যকতামূলক। আর এসব ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়েই ইউনিসেফকে একমাত্র এজেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে গ্যাভি।”
উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করলে কীভাবে সময় বেশি লেগে যাবে, তাও চিঠিতে বিস্তারিত তুলে ধরেন ইউনিসেফের প্রতিনিধি।
তিনি লেখেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশ কেন ইউনিসেফের কেনাকাটার সেবা নেয়, তার অনেক কারণ রয়েছে।
ইউনিসেফের বড় আকারের ক্রয়াদেশকে সম্মান জানানো হয় এবং নিরাপদ টিকার ক্ষেত্রে দর তুলনামূলক কম।
“আমি বুঝতে পেরেছি, মন্ত্রণালয় এই বছর থেকে বাকি ৫০ শতাংশের রাজস্ব বাজেটের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির দিকে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।”

মাস ছয়েক আগে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার এক নির্দেশনার তুলে ধরে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “বিষয়টি আমাকে অবাক করেছে। কারণ আপনার ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বরের নির্দেশনার কথা আমার স্মরণে আসছে, যেখানে ইউনিসেফের কাছ থেকে সরাসরি কেনাকাটার কথা বলা হয়েছিল।
“আমি বিশ্বাস করি, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে গেলে কেনাকাটায় যে ৮ থেকে ১০ মাস লাগবে, তাতে টিকার অভাবে শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ‘প্রায় নিশ্চিত ঝুঁকি’ রয়েছে।”
তিনি বলেন, “ইউনিসেফের সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ২ থেকে ৪ মাস সময় লাগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশে যে পরিমাণ টিকা লাগবে, ইউনিসেফের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে তা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।”
রানা ফ্লাওয়ার্স লেখেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে ডব্লিউএইচও’র প্রি-কোয়ালিফাইড টিকা কেনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে ইউনিসেফ, যেখানে টিাকা আনা-নেওয়ার ফি সবচেয়ে কম; ৩ থেকে ৪ শতাংশ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে কিছু ‘অসাধু তথ্য’ দেওয়া এবং সংস্থার উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সেসব তথ্য পাঠানোর কথাও বলেন ইউনিসেফ প্রতিনিধি।
তিনি বলেন, টিকা দেওয়া নির্বিঘ্ন করতে শুধু ২০২৫ সালে প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ ডলার অগ্রিম অর্থায়ন করেছিল ইউনিসেফ। এরমধ্যে গ্যাভির সঙ্গে যৌথ-অর্থায়নের ৯৮ লাখ ডলারও ছিল
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে চারটি বিষয়কে জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে জানান রানা ফ্লাওয়ার্স।
তিনি লেখেন, “উন্মুক্ত দরপত্রের বিষয় পুনর্নিববেচনা করুন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাকি ৫০ শতাংশ রাজস্ব বাজেটের ক্ষেত্রেও ইউনিসেফের সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।
“ইউনিসেফের সরবরাহ বিভাগের মাধ্যমে যৌথ অর্থায়নের পাঁচ ধরনের টিকা কিনে গ্যাভির ‘ডিসিশন লেটার্স’ পুরোপুরি মেনে চলা নিশ্চিত করুন।
“সময়মত টিকা কেনাকাটার জন্য এডিবি এপিভ্যাক্স চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিন। সক্ষমতা জোরদার এবং জাতীয় ক্রয় পদ্ধতি রূপান্তর পরিকল্পনার পাশাপাশি টিকা কেনার ক্ষেত্রে ইউনিসেফের সঙ্গে ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদি কাঠামোগত চুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিন।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্য আলোচনায় টিকার সংকট নিয়ে সতর্ক করার বিষয়ে চিঠিতে লেখেননি রানা ফ্লাওয়ার্স।
চিঠির বিষয়ে আরও বাড়তি তথ্যের জন্য বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।