Published : 19 Mar 2026, 10:42 AM
বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে তাকালেই ইরানকে বোঝার পুরো ছবিটা স্পষ্ট হয় না। দেশটির সামাজিক মনস্তত্ত্ব, জাতীয় চেতনা এবং রাষ্ট্রীয় আচরণ বুঝতে হলে তার দীর্ঘ ইতিহাস, বিদেশি শক্তির সঙ্গে সংঘাতের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আক্রমণকে কেন্দ্র করে যে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা আবারও এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং ড্রোন ইতিমধ্যে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং এই সংঘর্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলেছে।
যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায ২০ হাজার আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের ছয়টি হাসপাতাল সরিয়ে নিতে হয়েছে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ পড়েছে। তা সত্ত্বেও দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং ৭ হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি চিকিৎসা পেয়েছে।
এই সংঘাতের সামরিক মাত্রাও বিশাল। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে যুদ্ধের শুরুতেই পাঁচ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে ইরান পাল্টা আক্রমণ হিসেবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে তারা অন্তত ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নয়টি দেশের সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ করেছে। এই সংঘর্ষের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক করতে বাধ্য হয়েছে এবং অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
তবে এই ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে একটি বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। হামলার প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিজ কার্যালয়ে নিহত হওয়া এবং এত বড় বহিঃশক্তির আক্রমণের মুখে পড়ার পরও কেন ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ল না? বরং অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির ভেতরে জাতীয় ঐক্যের এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই রহস্যের জট খুলতে হলে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক বাস্তবতা এবং তাদের ইতিহাসের গভীরে তাকাতে হবে।
আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতাও এই প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। উচ্চশিক্ষার জন্য যখন আমি বেলজিয়াম এবং মালয়েশিয়ায় ছিলাম, তখন অনেক ইরানি শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার মেলামেশার সুযোগ হয়েছে। তাদের জীবনযাপন, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সামাজিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে বর্তমান শাসনব্যবস্থার কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। বিশেষ করে প্রবাসে থাকা ইরানি তরুণদের মধ্যে অনেকেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে তুলনামূলক স্বাধীনতার প্রত্যাশী। তারা প্রায়ই এমন পোশাক পরিধান করেন কিংবা এমনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ ও জীবনধারা অনুসরণ করেন, যা ইরানের ভেতরে প্রকাশ্যে সম্ভব হয়ে ওঠে না।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রথমে মনে হতে পারে যে ইরানের জনগণের বড় অংশ বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংহতি রেখে জীবনযাপন করতে চায় না। বাস্তবে গত দুই দশকের রাজনৈতিক ঘটনাবলিও এই ধারণাকে আংশিকভাবে সমর্থন করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলনের কথা বলা যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এরপর ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী যে আন্দোলন শুরু হয়, তা আধুনিক ইরানের অন্যতম বৃহত্তম সামাজিক প্রতিবাদে পরিণত হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, ওই আন্দোলনে অন্তত ৪৬৯ জন নিহত হয়েছে এবং ১৪ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে, অর্থাৎ ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের আন্দোলনগুলোতে সহিংস দমন-পীড়নের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে আরও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে; এছাড়া আটক করা হয়েছে অনেক মানুষকে। এই লাগাতার আন্দোলনগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরানি সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী।
তবুও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে বাহ্যিক সামরিক আক্রমণ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে সাময়িকভাবে মুছে দেয়। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে এলে অনেকে নিজেদের রাজনৈতিক মতভেদকে পেছনে রেখে জাতীয় প্রতিরোধের পক্ষে দাঁড়ায়। এই প্রবণতা শুধু ইরানে নয়, বিশ্বের অনেক দেশের ইতিহাসেই দেখা গেছে।
ইরানের ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী প্রবণতার ঐতিহাসিক ভিত্তি আরও সুগভীর। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ইরান অসংখ্যবার বিদেশি আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে। প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের যুগে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের অভিযান থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বিধ্বংসী মঙ্গোল আক্রমণ, কিংবা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আধুনিক যুগে আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সংঘাত—এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতাই ইরানি জাতীয় চেতনার গভীরে এক বিশেষ ‘প্রতিরোধ মনস্তত্ত্ব’ তৈরি করেছে।
আধুনিক ইতিহাসেও বিদেশি হস্তক্ষেপের স্মৃতি ইরানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ১৯৫৩ সালে বিদেশি শক্তির সহায়তায় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের ঘটনা এখনও ইরানের রাজনৈতিক আলোচনায় বড় বিষয়। অনেক ইরানি মনে করে যে তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বাহ্যিক শক্তি প্রভাব বিস্তার করেছে। ওই ঐতিহাসিক স্মৃতি বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক মনোভাবকেও প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক স্মৃতি আবার সক্রিয় হয়েছে হয়তো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, বাহ্যিক আক্রমণ ইরানের ভেতরে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্যমান অসন্তোষকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সরকার জাতীয় প্রতিরোধের ভাষা ব্যবহার করে জনগণের সমর্থন সংগঠিত করার সুযোগ পেয়েছে।
তবে এই সংঘাতের মানবিক মূল্য অপরিসীম। বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ হাজারই ছিল সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি। এছাড়া অন্তত ৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে এবং অনেক হাসপাতাল আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। এমনকি একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শতাধিক শিক্ষার্থীর প্রাণহানির খবরও বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির আঁচ লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়েই যাতায়াত করে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন।
সব মিলিয়ে বর্তমান সংকট ইরানের সমাজ ও রাজনীতির এক গভীর দ্বৈত বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। একদিকে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি এবং সামাজিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি সামরিক আক্রমণের মুখে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রবণতাও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
বিদেশে দেখা ইরানি শিক্ষার্থীদের আচরণ এবং বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যের মনোভাব; এই দ্বৈত বাস্তবতার দুটি ভিন্ন দিক। ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ইরানি তরুণ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু একইসঙ্গে তারা নিজ দেশের ওপর বাহ্যিক আক্রমণকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখে। এই কারণেই হয়তো তীব্র সংঘাতের মাঝেও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি এখনও।