Published : 23 Jul 2026, 10:21 AM
মানুষের জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা যন্ত্র ভেন্টিলেটর দেশের বাইরে থেকে কিনে আনতে যেখানে লাখ লাখ টাকা লেগে যায়, সেখানে এক লাখ টাকায় দেশেই সেই যন্ত্র তৈরির কথা বলছেন তিন গবেষক।
সাত বছর ধরে কাজ করে ‘ভেন্টাস’ নামে একটি ভেন্টিলেটর তৈরি করেছেন তারা, যার প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা ‘সফলভাবে’ সম্পন্ন হয়েছে বলে তাদের ভাষ্য।
তারা বলছেন, এ ভেন্টিলেটর দিয়ে সহজেই যে কোনো মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস কার্যক্রম চালানো সম্ভব। খুব সহজে বহনযোগ্য ও কম খরচে তৈরি করা সম্ভব ভেন্টাস। গত মে মাসে এ ভেন্টিলেটরের প্রাথমিক পর্যায়ের সফল হিউম্যান ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে।
তিনজনের এই দলে রয়েছেন জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের আইসিইউ কনসালটেন্ট আসিফ উর রহমান, কার্ডিওলজির পোস্টগ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি সিফায়েত ইনাম স্বাক্ষর এবং প্রকৌশলী বায়েজিদ শুভ।
তাদের দাবি, ট্রায়াল চলাকালে রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন, রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাসের হার ও চেতনার মাত্রাসহ গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ট্রায়াল শেষে আর্টেরিয়াল ব্লাড গ্যাস (এবিজি) বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগীর অক্সিজেনেশন ও ভেন্টিলেশনের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। এই ভেন্টিলেটর প্রত্যাশিতভাবে রোগীকে শ্বাসপ্রশ্বাসে কার্যকর সহায়তা দিতে সক্ষম হয়েছে।
ভেন্টিলেটরের দামের প্রসঙ্গে আসিফ উর রহমান বলেন, “বিদেশ থেকে যে কোনো মডেলের ভেন্টিলেটর নিয়ে আসতে ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। আমদানি প্রক্রিয়ার জটিলতাও রয়েছে। তবে আমাদের তৈরি ভেন্টাস খুব সহজেই ব্যবহার উপযোগী এবং সহজ প্রক্রিয়ায় চালানো সম্ভব হবে।

“১ লাখ টাকায় এই ভ্যান্টিলেটর বানানো সম্ভব। তিনটি মোড যুক্ত করতে বড়জোর আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা লাগবে। আরো আপডেট ভার্সনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা লাগবে, যা বিদেশি ২০ লাখার টাকার ভেন্টিলেটরের মত সেবা দেবে।”
আসিফ উর রহমান বলেন, ২০২০ সালের প্রথমে স্বাক্ষর ও শুভ তার ভেন্টাসের ধারণা নিয়ে কথা বলেন। তারা চাইছিলেন মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস চালমান রাখার মত কোনো একটি যন্ত্র তৈরি করতে, যা মূলত ভেন্টিলেটরের মত কাজ করবে।
তারপর তারা প্রথম ‘স্পন্দন’ নামের একটি যন্ত্র তৈরি করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে সফলভাবে সেটির প্রাথমিক ব্যবহার উপযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেলেও পরে নানা কারণে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
“ওই যাত্রায় ব্যর্থ হলেও আমরা দমে যাইনি। বরং নীরবে আরো কাজ করতে থাকি, যার পরবর্তী ও আপডেট ভার্সন হল ‘ভেন্টাস’। এটি গ্রাম পর্যায়ের মানুষের প্রান্তিক শ্বাসকার্য চালানো থেকে শুরু করে জটিল রোগীদের পর্যন্ত কাজে আসবে, এভাবে কোডিং করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এই ভেন্টিলেটরের প্রথম ভার্সন ‘ভেন্টাস’, যা উপজেলা লেভেলের হাসপাতালেও ব্যবহার করা যাবে। এটা দিয়ে খুব সহজেই যে কোনো মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা যাবে। এই যন্ত্রের আরো আপডেট ও উন্নত ভার্সনগুলো জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালের ব্যবহার উপযোগী তিন মোডে কোডিং করা হয়েছে।”
প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য এই ভেন্টিলেটর তৈরির কথা তুলে ধরে এ চিকিৎসক বলেন, “বিভিন্ন যন্ত্র আমদানি করতে এবং অল্প পরিসরে কিনতে এক ধরনের অর্থ খরচ হয়েছে। তবে এটা ম্যাস প্রোডাকশনে গেলে খরচ আরো কমে আসবে।’’

গবেষকরা বলছেন, গত ১২ জুলাই তাদের ভেন্টিলেটরে দুই ঘণ্টা রোগী রেখে তার শরীরের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে শ্বাস-প্রশ্বাসসহ বিভিন্ন সূচক দেশের বাইরে থেকে আনা ভেন্টিলেটরের সঙ্গে কোনো পার্থক্য দেখায়নি। এর আগেও একটি মেডিকেল বোর্ড যন্ত্রটির প্রাথমিক ট্রায়াল সন্তোষ প্রকাশ করে বলে তারা জানিয়েছেন।
‘ভেন্টাসে’ তিনটি ভেন্টিলেশন মোড রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মোড ইতোমধ্যে সম্পূর্ণভাবে কাজ করছে। বাকি দুটি মোডের সফটওয়্যার কোডিং সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সেগুলোও ধাপে ধাপে চালু করা হবে।
আসিফ উর রহমান বলেন, “ভেন্টাস-১ প্রোটোটাইপটি আমরা এমনভাবে ডিজাইন করেছি, যাতে এটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট বা সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর না করে পরিবেশের বাতাস ব্যবহার করে রোগীকে প্রয়োজনীয় শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা করতে পারে। এটি পরিচালনার জন্য বিশেষ কোনো বিশেষজ্ঞেরও প্রয়োজন হবে না। রোগীর মুখে শ্বাসনালি (টিউব) সংযুক্ত করে একটি বোতাম চাপলেই যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করবে।”
সরকারের প্রতিনিধি দল এই কাজে যুক্ত হলে গবেষণা ও উন্নয়ন দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ চিকিৎসক।
তিনি বলেন, “যন্ত্রটি দেশের মানুষের কল্যাণের স্বার্থে তৈরি করা হয়েছে। তবে ম্যাস প্রডাকশনের জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধিসহ আমরা একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হতে চাই।
“ফলে উদ্ভাবনের এই স্বত্ব আজীবন আমাদের টিমের এবং দেশের থাকবে। পরে সব কিছুর ফলাফল আরো ভালো হলে আমরা বিদেশ রপ্তানির জন্য স্বীকৃতি এবং উৎপাদন করব।”