রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার ব্যর্থতা
বিশাল কর্মী বাহিনী আর বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কেন পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারছে না?
বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি হলো, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বিশাল সংগঠন হয়েও পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি। সদস্যসংখ্যা আছে, কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত কমিটি আছে, গঠনতন্ত্র আছে, কার্যালয় আছে, ছাত্র ও যুব সংগঠনও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার জন্য শুধু সাংগঠনিক বিস্তার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মের স্থায়িত্ব, নেতৃত্বের পরিবর্তনযোগ্যতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তি থেকে সংগঠনের স্বাতন্ত্র্য।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই অদ্ভুত মিল রয়েছে। দলগুলোর বয়স বাড়ছে, সাংগঠনিক বিস্তার বাড়ছে, নির্বাচনি অভিজ্ঞতা বাড়ছে, কিন্তু নেতৃত্বের কাঠামো একই জায়গায় আটকে আছে। দলগুলো কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, লাখ লাখ মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, অসংখ্য নেতা তৈরি করতে পারে—অথচ দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে না। ফলে রাজনৈতিক সংগঠন বড় হলেও দলগুলো আর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছে না।
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে, যেখানে সংগঠন ও তার কার্যপ্রণালি স্থায়িত্ব এবং নিজস্ব মূল্য অর্জন করে। ইতালীয় রাজনৈতিক তাত্ত্বিক অ্যাঞ্জেলো প্যানেবিয়াঙ্কোর ভাষায়, একটি রাজনৈতিক দল তখনই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যখন তার অস্তিত্ব কোনো নির্দিষ্ট নেতার উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল থাকে না। নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও সংগঠন টিকে থাকে, কারণ দলটি নিজেই সদস্য ও সমর্থকদের কাছে একটি মূল্যবান প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান নেতৃত্ব তৈরি করে না, বিপরীতে নেতাকে কেন্দ্র করে সংগঠন তৈরি হয়। বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে ৪৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আছেন। খালেদা জিয়া ২০২৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলটির নেতৃত্বে ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম ২১ বছর এবং পরে মতিউর রহমান নিজামী ১৬ বছর দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন।
ছোট দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ন্যাপের নেতৃত্বে মোজাফফর আহমদ ছিলেন ৫২ বছর। গণফোরামে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব প্রায় ৩০ বছরের। ওয়ার্কার্স পার্টিতে রাশেদ খান মেনন ২০ বছর ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাসদের একটি অংশে হাসানুল হক ইনু ২৪ বছর ধরে নেতৃত্বে আছেন। বাসদের নেতৃত্বে খালেকুজ্জামান ছিলেন ৪২ বছর। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃত্বে সৈয়দ রেজাউল করিম ২০০৬ সাল থেকে আছেন। জাকের পার্টির নেতৃত্বে মোস্তফা আমীর ফয়সাল ১৯৮৯ সাল থেকে আছেন।
এই সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ঠিক কতটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। একজন নেতা জনপ্রিয় হতে পারেন, দলের ঐতিহাসিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন, সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে পারেন—কিন্তু কোনো দলের নেতৃত্বে কয়েক দশক ধরে একই ব্যক্তি থাকলে সেই দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্ব তৈরি, প্রতিযোগিতা, মতের বৈচিত্র্য এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে কার্যকর থাকে না।
রওনক জাহানের গবেষণা এই বিষয়ে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা তুলে ধরেছে। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপকের গবেষণায় নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন, নীতি নির্ধারণ, নেতৃত্বে সামাজিক বৈচিত্র্য, দলীয় অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং সংঘাত ব্যবস্থাপনাকে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তার সাম্প্রতিক আলোচনাতেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বড় দলগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই এবং দলীয় সিদ্ধান্তে তৃণমূলের অংশগ্রহণ সীমিত।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গভীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও কাজ করে। রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আনুগত্য অনেক সময় নীতিগত আনুগত্যকে ছাড়িয়ে যায়। তরুণ কর্মী বুঝতে শেখেন যে সংগঠনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক চিন্তা, নীতিগত দক্ষতা বা জনসমর্থনের চেয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছাকাছি থাকাও প্রয়োজন। তখন দল হয়ে ওঠে পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুসারিত্বের কাঠামো। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
দলগুলোর দলীয় সংবিধানে নিয়মিত কাউন্সিল ও নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধান থাকলেও বাস্তবে সেগুলো অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পরিবর্তে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে দেখা গেছে। এর ফল পড়ে রাষ্ট্রীয় শাসনেও। যে নেতা দলের ভেতরে ভিন্নমতের সঙ্গে আলোচনা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি, রাষ্ট্র পরিচালনার সময়ও তার রাজনৈতিক আচরণে সেই অভিজ্ঞতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
দলগুলোর অভ্যন্তরীণ এই গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বছরের পর বছর এই বয়ান চালু আছে—নেতা দেশ নিয়ে ভাবেন, দলের নেতাকর্মীরা তাকে ভুল তথ্য দেন। নেতা সব জানেন না। নেতা পরিবর্তন চান কিন্তু দলের লোকজন পরিবর্তন হতে দেয় না।
রাজনৈতিক দলগুলোর কাউন্সিলকে সত্যিকারের নির্বাচনমুখী করতে হবে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালট ও প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকতে হবে। প্রার্থী মনোনয়নে লিখিত মানদণ্ড থাকতে হবে। দলীয় নীতি নির্ধারণে সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। নেতৃত্বের মেয়াদ, পুনর্নির্বাচনের সুযোগ এবং উত্তরাধিকার নির্ধারণের নিয়ম গঠনতন্ত্রে থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে এই চর্চা জরুরি।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসতে হবে রাজনৈতিক মানসিকতায়। কোনো নেতা দল তৈরি করলেই দলটি তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে যায় না। একজন নেতার অন্য অনেক সাফল্যের পাশাপাশি সাফল্যের অন্যতম বড় প্রমাণ হতে হবে—তিনি নিজের পরে কতজন যোগ্য নেতা তৈরি করে যেতে পেরেছেন।
গণতন্ত্রে সবসময় ক্ষমতায় থাকা সৌন্দর্য নয়, ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সক্ষমতাও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। রাজনৈতিক দলের পরিপক্বতা বোঝা যায় তখন, যখন প্রতিষ্ঠাতা বা দীর্ঘদিনের নেতা সরে গেলেও সংগঠন ভেঙে পড়ে না, কর্মীরা বিভক্ত হয়ে যায় না, নীতি হারিয়ে যায় না। সর্বোপরি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দল আবর্তিত হয় না।
রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে কীভাবে যাবে?—এই উত্তর যতদিন অনিশ্চিত থাকবে, ততদিন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সংগঠন হিসেবে বড় হতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না। এবং পূর্বের মতো প্রতিবার একই নিয়মে আমাদের গণতন্ত্র পথ হারাবে।
মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে; যেখানে শক্তিশালী নেতাকেও নিয়মের ভেতরে থাকতে হয়।
সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ই-মেইল: sajjadsabbir24@gmail.com
