Published : 18 Jul 2025, 04:04 PM
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ১৬ জুলাই ঢাকায় এক সমাবেশে বলেছেন, ‘আমরা জুলাই ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত করেছিলাম ডেমোক্রেসির জন্য। আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, চেয়েছিলাম ডেমোক্রেসি, হয়ে যাচ্ছে মবোক্রেসি।’
বিএনপিকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেন সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে আমরা এই সরকারের সফলতা কামনা করেছি। আমরা এই সরকারকে সব সময় সব ধরনের সহযোগিতা করেছি। কিন্তু আজ গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে পরিকল্পিতভাবে ইস্যু সৃষ্টি করে ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে।’
সরকারের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা যেন আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়। জনগণের মনে যেন এ রকম প্রশ্নের উদ্রেক না হয় যে সরকার একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।’
বিএনপি নেতার বক্তব্য এটা স্পষ্ট যে গণতন্ত্রের জন্য হাপিত্যেশ করেও তা পাওয়া যাচ্ছে না। আচ্ছা, বাংলাদেশে যখন গণতন্ত্র অধরা, তখন দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্র কী অবস্থায় আছে তা একটু দেখে নেওয়া যেতেই পারে। যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতকে গণতন্ত্রের গুরু মানা হতো, তারাও নিজ নিজ ক্লাসে শূন্য পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত! যুক্তরাষ্ট্রে গলা ফুলিয়ে কথা বলার অধিকার থাকলেও, একে অন্যের গলা চেপে ধরার প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। আর ভারতে ভোটের উৎসব আছে, তবে বাকস্বাধীনতা যেন উৎসবের পরদিনই হারিয়ে যায়! বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের এই হাঁসফাঁস দেখে মনে হয়, আসলেই আজকাল গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা যেন পুরনো প্রেম টিকিয়ে রাখার মতোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
পৃথিবীজুড়ে কয়টি দেশে মানুষ প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনে আছে? স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও জনগণের কর্তৃত্বের যে মহৎ আদর্শ নিয়ে একসময় পৃথিবীর মানচিত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজ তা অনেকাংশেই ক্ষয়ে যাচ্ছে—অন্তসারশূন্য হয়ে পড়ছে। আমাদের সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ বৈপরীত্য হলো, আমরা এমন এক বিশ্বে বসবাস করছি যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব, বিশ্বায়নের সম্ভাবনা ও গণসচেতনতা সত্ত্বেও গণতন্ত্রের মানের ক্রমাবনতি রোধ করা যাচ্ছে না।
বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যা প্রায় ৮.০৯ বিলিয়ন বা ৮০৯ কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠী আজ ১৯৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করছে—যাদের শাসনব্যবস্থা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, কিন্তু চাহিদা একটাই: মর্যাদাপূর্ণ, স্বাধীন ও মানবিক জীবন। কিন্তু এই চাহিদার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব যেন বেড়েই চলেছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট থেকে প্রকাশিত ডেমোক্রেসি ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বে মাত্র ২৫টি দেশ পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত। দেশগুলো হচ্ছে নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, তাইওয়ান, লুক্সেমবার্গ, জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, মালটা, মরিশাস, উরুগুয়ে, কোস্টারিকা, জাপান, চিলি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, স্লোভেনিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। এসব দেশে বসবাস করে প্রায় ৪৯ কোটি মানুষ, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ পৃথিবীর ৯৪ শতাংশ মানুষ এমন কোনো না কোনোভাবে সীমিত, ত্রুটিপূর্ণ বা ছদ্মবেশী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে বাস করছে। এই পরিসংখ্যান হতাশাজনক নয় কি?
গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয়। এটি হলো একটি সামাজিক চুক্তি, যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক জবাবদিহিতা, সহনশীলতা ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানে যে ৪৬টি দেশ ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত, সেগুলোতে নির্বাচন থাকলেও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিরোধী রাজনীতির চর্চা নানা বাধায় জর্জরিত। এসব রাষ্ট্রে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মানুষ বাস করছে, যাদের কাছে গণতন্ত্র আছে, কিন্তু সেটি নিছকই নামমাত্র।
এর চেয়েও বিপজ্জনক হলো ৩৬টি দেশের ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা ছদ্মগণতন্ত্র। যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আংশিক চর্চা রয়েছে, কিন্তু সঙ্গে রয়েছে নিপীড়নমূলক আইন, নিরাপত্তা বাহিনীর দমননীতি, সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী কণ্ঠের দমন। হাইব্রিড শাসনের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১.৫ বিলিয়ন—যাদের গণতন্ত্রের স্বাদ কেবল কাগজে লেখা থাকে, বাস্তবে নয়।
অন্যদিকে পৃথিবীর ৬০টি দেশ পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান, সৌদি আরব, মিয়ানমার, রাশিয়া কিংবা আফ্রিকার অনেক দেশে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক বিরোধিতা কিংবা নির্বাচনের অধিকার একরকম বিলুপ্ত। এ ধরনের রাষ্ট্রে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২.৯৮ বিলিয়ন, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ শতাংশ। সোজা কথায়—বিশ্বের প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে একজন সরাসরি স্বৈরতন্ত্রের ছায়ায় বড় হচ্ছে।
এই বাস্তবতা দেখে প্রশ্ন জাগে, কীভাবে এমন হলো? কেন গণতন্ত্রের ধারক-বাহক দেশগুলো নিজেরাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ? যুক্তরাষ্ট্র, যাকে বহুদিন গণতন্ত্রের বাতিঘর বলা হতো, সেখানেও আজ ভোটাধিকার নিয়ে সংকট, মিডিয়া ম্যানিপুলেশন ও মেরুকরণ গভীর হয়েছে। ফ্রান্স, ভারত কিংবা ব্রাজিলের মতো দেশগুলোতে ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ও বিভাজনের রাজনীতি গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই গণতন্ত্রকে আঘাত করছে।
এই বিশ্বপ্রবণতার পেছনে কাজ করছে কয়েকটি প্রবল ধারা। প্রথমত, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বৈশ্বিক করপোরেট শক্তির অভ্যুত্থান। করপোরেট স্বার্থের সঙ্গে মিশে গিয়ে রাষ্ট্র অনেক সময় নাগরিকের থেকে দূরে সরে যায়। দ্বিতীয়ত, তথ্যযুদ্ধ ও মিথ্যা প্রচারের দৌরাত্ম্য। ফেক নিউজ, ডিজিটাল নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ এখন নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তৃতীয়ত, গণমানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নামে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতি এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই আগ্রহ কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো পরিস্থিতির চাপে জন্ম নেয়, যার ফলাফল হয় গণতন্ত্রের আত্মসমর্পণ।
স্বৈরাচার এখন আর আগের মতো বন্দুক হাতে ক্ষমতা দখল করে না, বরং এখন সে গণতন্ত্রের পোশাক পরে আসে। নির্বাচন হয়, কিন্তু বিরোধীদের মাঠে নামতে দেওয়া হয় না। সংবাদমাধ্যম থাকে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। বিচারব্যবস্থা থাকে, কিন্তু শাসকের ছায়াতলে। এমনকি কিছু কিছু দেশে ‘নির্বাচনের মাধ্যমেই স্বৈরতন্ত্রকে বৈধতা দেওয়া হয়’, যা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল স্বৈরতান্ত্রিক দেশ চীন—যেখানে ১৪০ কোটির বেশি মানুষ কোনো নির্বাচন ছাড়া একটি একদলীয় ব্যবস্থার অধীনে চলছে। রাশিয়া ও ইরানেও একনায়কতন্ত্র গঠিত হয়েছে তথাকথিত গণতন্ত্রের মাধ্যমে। অন্যদিকে, ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রেও আজ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, সংবাদমাধ্যমের একমুখিনতা ও বিচার বিভাগের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা জনসচেতন নাগরিকদের গভীরভাবে চিন্তিত করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, গণতন্ত্র আজ নিজ দেশেই আঘাত পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাপিটল হিল হামলা, ব্রাজিলে নির্বাচনি সহিংসতা কিংবা ইউরোপে ডানপন্থী উত্থান গণতন্ত্রের ভিত নড়বড়ে করে তুলছে। বাংলাদেশের মতো দেশে যদিও নির্বাচন হয়, তবুও বিরোধী মতপ্রকাশের সুযোগ, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে একে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা চলে না—এটি নামমাত্র গণতন্ত্র।
এই বাস্তবতা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার সামনে দাঁড় করায়: গণতন্ত্র কাগজে লিখে তৈরি হয় না, এটি তৈরি হয় চর্চার মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র যদি জবাবদিহিমূলক না হয়, সংবাদমাধ্যম যদি ভয়মুক্ত না হয়, বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন না হয়—তাহলে তা গণতন্ত্র নয়, বরং ভদ্রতার মোড়কে পেশ করা স্বৈরতন্ত্র।
এই বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘ কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা প্রায় অদৃশ্য। তারা গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতেই বেশি ব্যস্ত। এ অবস্থায় নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তরুণ প্রজন্ম এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়ানো সব মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা ছাড়া গণতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব নয়।
তবে হতাশার মধ্যেও আশার আলো আছে। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, চিলি কিংবা কেনিয়ার মতো দেশগুলো তীব্র সংকট ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। এমনকি আফ্রিকার নানা দেশে আজ তরুণ সমাজ কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে।
বিশ্বের ৮০৯ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ যদি সত্যিকারের গণতন্ত্রের স্বাদ পায়, তাহলে সেটি কোনো সভ্য সমাজের গৌরব নয়। বরং এটি এক তীব্র লজ্জা, এক প্রচণ্ড দায়। এই দুনিয়াকে ভালোবাসলে, মানুষকে ভালোবাসলে, আমাদের গণতন্ত্রকে ভালোবাসতে হবে—শুধু নির্বাচনী উৎসব হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত জীবনদর্শন হিসেবে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, আমরা কোথায় যাচ্ছি? কীভাবে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এমন শাসনব্যবস্থায় বাস করছে, যা তাদের মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করে? কেন জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, যখন গণতন্ত্র আক্রান্ত হচ্ছে চীনের মতো পরাক্রমশালী দেশের ছায়াতলে কিংবা আফ্রিকার অভ্যুত্থানপ্রবণ এলাকায়?
উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকায়। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য কেবল সংবিধান নয়, দরকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। যতক্ষণ না ব্যক্তি পর্যায়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমালোচনার অধিকার এবং রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটছে, তত দিন গণতন্ত্র কেবল একটি প্রশাসনিক মোড়ক হয়ে থাকবে, যার ভেতর থাকবে নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও নীরবতা। তাই আজ জরুরি হয়ে উঠেছে—গণতন্ত্রকে কেবল রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরেও প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে, মতপ্রকাশে সাহসী হতে হবে, ক্ষমতার প্রশ্নে আপসহীন হতে হবে।
এই সময় আমাদের ঠিক করতে হবে—আমরা মানবতার পক্ষে থাকব, নাকি চুপচাপ অন্যায় মেনে নেব? গণতন্ত্র শুধু শাসনের নিয়ম নয়, এটা একটা লড়াই, যা প্রতিদিন চালিয়ে যেতে হয়।