Published : 19 Sep 2025, 11:01 AM
অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পরে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ধারাবাহিক সংলাপ চললেও জাতীয় নির্বাচন, জুলাই সনদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে অন্য দলগুলোর, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে।
শুধু তাই নয়, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিবিরোধী যে জোটের কথা বলা হচ্ছিল, সেটি অনেকটা আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে। যার তৎপরতা শুরু হয়েছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনের যুগপৎ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। তাতে অনেকের মনে এই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে যে, বিএনপিবিরোধী এই জোট কি ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের অংশ?
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা প্রথম আলোচনায় আসে ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তখন ‘মাইনাস টু’ বলতে বোঝানো হতো আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই শীর্ষ নেত্রীকে। যদিও তখন সেটি সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে ‘মাইনাস টু’ সামনে আসছে। বলা হচ্ছে, এবারের ‘মাইনাস টু’ দুজন ব্যক্তির নয়, বরং দুটি দলের। অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এ মুহূর্তে দেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে কার্যত মাইনাস। কেননা এরই মধ্যে দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করে মাইনাস করে দেওয়া হয়েছে। আর মূল দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ। ফলে নির্বাচন কমিশনে তাদের প্রতীকও স্থগিত। এমতাবস্থায় এটি ধরে নেওয়াই সঙ্গত যে, যদি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়, তাহলে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে না। তার মানে মাইনাস ওয়ান কমপ্লিট। বাকি থাকে দেশের আরেক বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি।

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অতীতের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ জ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞান হিসাব করে এটা মনে করা হয় যে, একটি অবাধ-সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য, রাষ্ট্রীয় প্রভাবমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে; মব সন্ত্রাস দমন করা গেলে বিএনপিই সরকার গঠনের মতো আসন পাবে। সে কারণেই বিএনপিকে মাইনাস করা তথা তাকে সরকার গঠনের সুযোগ না দিতে বিএনপিবিরোধী বড় জোট গঠনের বিষয়টি আলোচনায় আসছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ও তার শরিক দলগুলোর বাইরে বাকি যারা সক্রিয় ছিল, তার মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত থাকলেও এই দুটি দলের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশই বেড়েছে। বিএনপির সঙ্গে থেকে জামায়াত ক্ষমতায়িত হয়েছে মনে করা হলেও এখন জামায়াত নিজেই ‘স্বনির্ভর’। অভ্যুত্থানের পরে জামায়াত এককভাবে শক্তিশালী এবং বিএনপিকে তাদের এখন আর ‘পাত্তা দেওয়ার’ প্রয়োজন নেই—এমন ন্যারেটিভও আছে। কিন্তু জামায়াত কি এককভাবে সরকার গঠনের মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে? এ কারণে জামায়াতের সঙ্গে অন্য ইসলামিক দলগুলো, বিশেষ করে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ আরও কিছু দলের জোট গঠনের গুঞ্জনও রয়েছে।

জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে সত্যি সত্যিই নির্বাচনি জোট হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও বিএনপিকে ঠেকাতে এ মুহূর্তে সক্রিয় অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো একাট্টা হতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন এবং তার কিছু লক্ষণও স্পষ্ট। বিশেষ করে জুলাই সনদ, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন, ভোটের আগেই বিচার ও উল্লেখযোগ্য সংস্কারের দাবিতে বিএনপিকে একঘরে করে ফেলার একটা পরিকল্পনা যে চলছে, তা সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলেই মনে হয়েছে।
কেন বিএনপিকে মাইনাস করার এই আলোচনা বা গুঞ্জন উঠল, তার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়।
১. একসময় বিএনপির সঙ্গে যেসব দলের সখ্য ছিল, তাদেরও কেউ কেউ এখন মনে করে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো ঝুলে যাবে বা মামলার গতি ধীর হয়ে যাবে। কেননা, নানাবিধ সংকটে জর্জরিত দেশের অর্থনীতি ঠিক করার বিষয়ে বিএনপি হয়তো অধিকতর মনোযোগী হবে।
২. কেউ কেউ মনে করে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের পথ পরিষ্কার হবে। অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ হয়তো ধীরে ধীরে দল গোছানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই আর ঘুরে দাঁড়াক, সেটি চায় না জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপি। এমনকি তারা দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নির্মূল করার পক্ষে।
৩. বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো দল নিষিদ্ধের পক্ষে নয়—এমন মন্তব্য করে সম্প্রতি দলের সিনিয়র নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘যারা জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা চাচ্ছে, তাদের বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে তারা সেই অভিযোগটা আদালতে উত্থাপন করতে পারেন।’ বিএনপির এই বক্তব্য বা অবস্থানকে অনেকে আওয়ামী লীগ ও তার শরিক দলগুলোর প্রতি নীরব সমর্থন বলে মনে করেন। ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে এ মুহূর্তে সক্রিয় অন্য দলগুলো পার্থক্য বেশ স্পষ্ট।
৪. বিএনপিবিরোধী দলগুলো মনে করে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হবে না। তারা বিএনপির অতীতের সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার আলোকে এবং গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে খুনোখুনির কারণে মনে করছে, দেশ আগের মতোই চলবে। অর্থাৎ অভ্যুত্থানের পরে জনমনে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটি পূরণ হবে না। ফলে যেভাবেই হোক তারা বিএনপির ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে চায়।
৫. বিএনপি ক্ষমতায় এলে যে সংস্কার হবে না—সেই শঙ্কার কথা ১৮ সেপ্টেম্বরও বলেছেন জামায়াতের নেতারা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ পাঁচ দফা দাবিতে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে অনুষ্ঠিত সমাবেশে দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার করে দেশের ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও দিনদিন একটি দলের প্রভাবের কাছে তারা মাথা নত করছে। তারা বলেন, নির্বাচিত সরকার সংস্কার বাস্তবায়ন করবে বলে যেসব দল প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নেই। একই দিন ইসলামী আন্দোলনের মিছিল-পূর্ব বিক্ষোভ সমাবেশে দলের নেতারাও বিএনপিকে চাঁদাবাজ, দখলবাজ, খুনি দুর্নীতিবাজ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাদের হাতে দেশকে তুলে দেওয়া হবে না। নেতারা বলেন, ‘আগে যারা দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে, যারা হাওয়া ভবন তৈরি করেছে, তাদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান হয়নি।’
৬. গত এক বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিতর্কিত করতে যেসব নতুন বয়ান হাজির করা হয়েছে, বিএনপি সেইসব বয়ান বিশ্বাস করে না বা এসব বয়ানের প্রতি তাদের যে সমর্থন নেই—সেটি এরইমধ্যে দলের একাধিক সিনিয়র নেতা স্পষ্ট করেছেন। উপরন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী তথা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে জামায়াত যে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি, তারও সমালোচনা করেছেন। কিন্তু জামায়াত হয়তো মনে করছে যে, অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের নতুন বয়ান হাজির করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং বঙ্গব্ন্ধুকে হেয় করার এটাই উপযুক্ত সময়। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে জামায়াতের এই নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
৭. অভ্যুত্থানের পরে গত এক বছর ধরে দেশে ‘ইসলামাইজেশনের’ যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিশেষ করে বিভিন্ন উগ্রবাদী দল ও গোষ্ঠীর নেতৃত্বে যেভাবে অনৈসলামিক কার্যক্রমের অভিযোগ তুলে একটির পর একটি মাজারে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে; নারীদের খেলা বন্ধ করে দেওয়া; রাস্তায় নারীদের অবাধ চলাফেরায় নানাভাবে বাধা দেওয়া; বাউল মতাদর্শের মানুষদের চুল কেটে দেওয়া বা তাদের নানাভাবে নাজেহাল করার যেসব ঘটনা ঘটছে—তার মূলে রয়েছে দেশে একটা নতুন ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক আবহ তৈরি করা। দেশে শরিয়া আইন চালু, বাংলাদেশকে আফগানিস্তান মডেলে পরিচালনা করার খায়েসও অনেকের আছে। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলোর এই স্বপ্ন পূরণ হবে না। ফলে তারাও চাইবে বিএনপি কোনোভাবেই ক্ষমতায় না আসুক। যে কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপিকে এক করে দেখা এবং ‘দুই সাপের এক বিষ, নৌকা আর ধানের শীষ’—এমন স্লোগানও দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সংস্কার ও বিচার ঝুলে যাবে; দেশে অনিয়ম দুর্নীতি আগের মতোই চলবে এবং আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের পথ তৈরি হবে—এমন সব শঙ্কার কারণে বিএনপিবিরোধী জোট হচ্ছে নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো কারণ রয়েছে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে ক্ষমতায় বিএনপি আসবে নাকি অন্য কোনো দল, সেই সিদ্ধান্ত জনগণের। প্রায় দেড় যুগ ধরে দেশের মানুষ কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নানা কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এবারের নির্বাচনটি যাতে কোনোভাবেই বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ না হয় এবং কোনো অজুহাতেই যাতে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া বা বানচাল করা না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। জনগণই ঠিক করুক তারা কাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়।