Published : 12 Mar 2026, 03:00 PM
অবশেষে নেপালের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল জানা গেল। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে ব্যালট সংগ্রহ এবং সেসব গুণে ফলাফল ঘোষণা করতে যে কমপক্ষে পাঁচ দিন লেগে যেতে পারে, সেটি অবশ্য ৫ মার্চ ভোট গ্রহণের আগেই নির্বাচন কমিশন জানিয়ে রেখেছিল।
নেপালের সংসদে মোট আসন সংখ্যা ২৭৫। এর মধ্যে ১৬৫ আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়, বাকি ১১০ আসন প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বণ্টন হয়। ১০ তারিখ রাত পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সাবেক সংগীতশিল্পী ও কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বালেন্দ্র শাহর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি কমপক্ষে ১২৫ আসনে জিতে এককভাবে সরকার গঠন করতে চলেছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা গগন কুমার থাপার নেতৃত্বাধীন নেপালি কংগ্রেসের মাত্র ১৮ আসন পাওয়া বলে দিচ্ছে যে, গত সেপ্টেম্বরে জেনজিদের (Gen Z) আন্দোলনের মাধ্যমে আলোচনায় আসা মাত্র তিন বছর বয়সী রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি ভূমিধস বিজয় পেয়েছে।
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন হওয়া কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল পেয়েছে মাত্র নয়টি আসন এবং মাওবাদী গেরিলা সংগঠনের প্রধান পুষ্প কুমার দাহাল প্রচণ্ডর নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি পেয়েছে আরও কম, সাতটি আসন। শুধু আসনের দিক থেকেই এগিয়ে নেই, ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি আনুপাতিক হারে আরও অন্তত ৫৭টি আসন নিজেদের ঝুলিতে ভরতে চলেছে। সব মিলিয়ে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় যেতে থাকা এই অনভিজ্ঞ দলটির মোট আসন গিয়ে দাঁড়াবে ১৮২-তে, শেষপর্যন্ত সেটি আরও বাড়তেও পারে।
এই নির্বাচনের সম্ভবত সবচেয়ে বড় চমক ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর একই আসনে লড়াই। সেই লড়াইয়ে বালেন প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন অলিকে। এই পার্থক্যই বাকি নির্বাচনের চিত্র বোঝার জন্য যথেষ্ট।
মনে করা হয়, নেপালে জেন-জিদের আন্দোলন ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম কেন পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হলো, যেমনটা পেরেছে নেপালের তরুণরা। নেপালের জেন-জিরা বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা ভুল করেনি। নেপালি তরুণরা একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্ষমতা কাঠামো বদলে দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ‘নতুন বন্দোবস্তের’ স্বপ্ন পুরোনো ব্যবস্থার অংশীদার হওয়ার দৌড়ে খেই হারিয়েছে।
সেপ্টেম্বরে জেনজি মুভমেন্টের নেপথ্যে
গত বছরের অগাস্টের শেষ দিকে সরকার এক নোটিশ জারি করে বলে, এক সপ্তাহের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে সচল এমন সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিবন্ধন করতে হবে, নেপালে নিজেদের অফিস স্থাপন করতে হবে এবং একজন অভিযোগ নিষ্পত্তি ও কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ফেইসবুক থেকে ইনস্টাগ্রাম—কেউ নিবন্ধনের জন্য আবেদন জমা দেয়নি। ফলে সরকার নেপালের ভেতর সক্রিয় এমন ২৬টি প্ল্যাটফর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। মুহূর্তেই রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশের নানা প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়।
তিন কোটি মানুষের দেশ নেপালে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ এবং ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী প্রায় ৩৬ লাখ। বহু দশক ধরে বেকারত্বে হিমশিম খেতে থাকা নেপালের অসংখ্য তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে থাকে। চাকরির বাজার ক্রমশ সংকীর্ণ হতে থাকা দেশটির তরুণদের নিয়তি হলো, ভালো কিছু করতে হলে দেশ ছাড়তে হবে! ফলে দেশটির মোট জনসংখ্যার অন্তত ১০ ভাগ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পরিবারের সঙ্গে এসব প্রবাসীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে তারাও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

নেপালের রাজপথে আজ যে জেন-জিদের যে আন্দোলন হয়েছে, তার জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। বেকারত্বের অভিশাপ, আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য আর সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের সীমাহীন দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ তরুণদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেওয়ার আন্দোলন এভাবেই সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।
কাঠমান্ডুর মেয়র, যিনি এর আগে জনপ্রিয় র্যাপার ছিলেন, সেই বালেন্দ্র শাহ আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তরুণদের ভেতর আগে থেকেই বালেনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল, ফলে আন্দোলন একটি প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পায়। সে সময় ইউজান রাজভাণ্ডারি নামের ২৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছিল, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থেকে আন্দোলন শুরু হলেও এটি এখন আর সেখানে নেই। আমরা নেপালে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছি।’
সরকার বিক্ষোভ দমনের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছে। রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস এবং জলকামান নিক্ষেপ করেছে। এতে সংঘর্ষ রীতিমতো সহিংসতায় রূপ নেয়, নানা জায়গায় অন্তত ১৯ জনের প্রাণহানি হয়। আন্দোলনকারীরা, বিশেষ করে জেন-জিরা সরকারের নানা অফিসে ঢুকে পড়ে, রাজনৈতিক নেতাদের লাঞ্ছিত করার ভিডিও সামনে আসতে থাকে। বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন দখল করে নেয় তরুণেরা। হেলিকপ্টারে চড়ে রাজধানী ছেড়ে পালাতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে এবং অলি সরকারের পতন ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস কেমন ছিল?
অলি সরকার ক্ষমতা ছাড়ার তিন দিন পর অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। সব মহল বলছে, নেপালে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের বড় কৃতিত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান সুশীলা কার্কির।
পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই, দেশের নানা প্রান্ত থেকে একেবারে শুরুতেই তরুণেরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে, যেমনটা বাংলাদেশেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্ট মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার মন্ত্রিসভার অন্য উপদেষ্টারা পেয়েছিলেন। এর বাইরে রাজনীতির সঙ্গে কার্কির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা এবং পূর্বে কোনো ধরনের অ্যাক্টিভিজমে জড়িত না থাকা তাকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। কখনো ক্ষমতা দখলের মোহ দেখিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে এমন তথ্যও নেই; ফলে দুর্নীতি দমনে বিশেষভাবে দক্ষ এই নারী দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হাতে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তার সরকারের মেয়াদ হবে ছয় মাস। ফলে একদিকে রাজনৈতিক দলগুলো যেমন নির্বাচনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দল গোছানোতে মনোযোগ দিতে পেরেছে, অপরদিকে কার্কি ও তার ক্যাবিনেটও প্রথম দিন থেকেই কাজে মনোযোগ দিতে পেরেছে।
শুরুতেই সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর থেকে অলির দেওয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিলেন তিনি। অভ্যুত্থানের সময় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের শহীদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তাঁদের পরিবারকে দিয়েছেন সহায়তা এবং অভ্যুত্থানকালীন ঘটনা তদন্তে দুটো কমিটি করে দিয়েছেন। ভোটারের ন্যূনতম বয়স ১৬-তে নামিয়ে এনে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছেন, ফলে লাখ লাখ নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক রাখার জন্য আলাদা সমন্বয় সেল গঠন করেছেন।
তবে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতাও সামলেছেন তিনি। বিভিন্ন সময় জেন-জিদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে। সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও যোগ দিয়েছে। কোনো কিছু মনমতো না হলে তারা সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বসেছে, সঙ্গে মৌখিক আক্রমণ তো ছিলই।

বাংলাদেশের মতোই জেনজিদের ছোট ছোট গ্রুপ নানা দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের কাছে ধরনা দিয়েছে, কিন্তু কার্কি ছিলেন এখানে ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের মতো তরুণদের অন্যায্য দাবি মেনে নেননি; প্রয়োজন অনুযায়ী শক্ত হাতে দমন করেছেন। জানুয়ারির দিকে ক্ষুব্ধ হয়ে কার্কি এটাও বলেছিলেন যে, ‘যে যাই বলুক, আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নেপালকে বাংলাদেশে পরিণত হতে দেব না। আমরা বাংলাদেশ হতে চাই না।’
নেপালের তরুণদের ভূমিধস জয়ের নেপথ্যে
নেপালে যখন আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে, বালেন্দ্র শাহ তখন রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে র্যাপ সংগীত ছেড়ে রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন তিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জেতেন মেয়র ইলেকশন।
কিন্তু এই অল্প সময়ে শহরের রাস্তাঘাট, ফুটপাত ও নদী দখল করে বানানো অবৈধ স্থাপনা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে নতুন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করেছেন, সরকারি স্কুলগুলোর মান বাড়ানো ও সেখানে ডিজিটাল শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে সক্ষম হয়েছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার স্বচ্ছ অবস্থান, সরকারি কাজ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা ইতোমধ্যে তরুণদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে।
বালেন গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং অভ্যুত্থানের পরপরই রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে যোগ দেন। রবি লামিছানে নামের এক টিভি উপস্থাপক প্রথাগত রাজনীতিকদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ২০২২ সালে এই দল গঠন করেছিলেন। ফলে বালেনকে নতুন করে জেন-জিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে যেমন দরকার পড়েনি, তেমনি তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দলও খুলতে হয়নি। বরং অভ্যুত্থানের পর বালেনকে কেন্দ্র করে তরুণরা জড়ো হয়েছে।

তরুণ ভোটাররা নির্বাচনে জিততে সহায়কের ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশে ১৬ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা ৩০ ভাগ, কিন্তু নেপালে এ হার ৫৬ ভাগ। ভোট দেওয়ার বয়স ১৬-তে নামিয়ে আনার কারণে এসব ভোটের বড় একটা অংশ বালেন ও তার দলের প্রার্থীদের ব্যালটে গেছে।
যেকোনো গণঅভ্যুত্থানের পরের সময়টুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্ত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, নানা পক্ষ থেকে অভ্যুত্থানের শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়। সময় যত গড়ায়, সংকটও তত বেশি ঘনীভূত হয়। এক্ষেত্রে নেপাল খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার পতনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় নির্বাচন হয়ে যাওয়ায় অভ্যুত্থান থেকে সৃষ্ট আবেগ ব্যালটে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো নেপালেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি আকাশচুম্বী। অর্থনীতি ভঙ্গুর। দ্রুত হারে বেকারত্ব বাড়ছে। এসবের প্রভাব পড়ছে তরুণসহ সমাজের বাকি মানুষের জীবনে। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নিয়ে অসংখ্য রাজনৈতিক দল এসেছে বটে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের মধ্যে মিলের জায়গা ছিল এটি যে—প্রতিশ্রুতি না রাখা। ফলে মানুষ নতুন কাউকে বিশ্বাস করতে চেয়েছে।
নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করা সাড়ে ছয় হাজার প্রার্থীর মধ্যে এক হাজারের বেশি ছিল জেনজি, যারা বাঘা বাঘা নেতাদের বিরুদ্ধে লড়েছে। বালেন শাহর অঞ্চল মাধেশ প্রদেশেই অন্তত ৫৮ জন জেনজি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, যাদের অনেকেই জিতে এসেছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, আগামী সংসদে যাওয়া অন্তত ২৩ জন এমপির বয়স ৩০ বছরের কম।
বাংলাদেশের তরুণরা কেন পারল না?
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচন হয়েছে ১৮ মাস পরে। যেকোনো অভ্যুত্থানের পর ১৮ মাস অনেক দীর্ঘ সময়। সময়ের এই পরিক্রমায় বাংলাদেশের তরুণরা নানা কিছুতে জড়িয়ে পড়েছে। অভ্যুত্থানের চেতনা ছাপিয়ে ততদিনে আবার সেই পুরনো বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কোটার মাধ্যমে নিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি জনপরিসরে জায়গা করে নিয়েছে। যে আশায় মানুষ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা সরকারকে সরাতে রাস্তায় নেমেছিল, তাদের সে আশা ভঙ্গ হয়েছে।

দেখা গেছে, ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ বা ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগান দেওয়া তরুণেরা উৎসব করে দেশের স্বাধীনতার মহানায়কের ৩২ নম্বরের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ভারতের আধিপত্যবাদবিরোধী স্লোগান ওঠানো তরুণদের যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার চিত্র সামনে এসেছে, সাধারণ মানুষ অভ্যুত্থানের পেছনের কারণ খুঁজতে বসেছে।
নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যতিক্রম হলো—এখানে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি শক্তি বহু বছর ধরে সক্রিয় আছে। একদিকে যখন এই শক্তির বিকাশ হচ্ছে, অপরদিকে আরেকটি শক্তি তাদের হঠাতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। অভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে অভ্যুত্থানকারীদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। ‘রিসেট বাটন’ চেপে ’৭১-কে বাদ দিয়ে ’৪৭-এ ফিরে যাওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে! যে তরুণরা মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে রাস্তায় মার খেয়েছে, অভ্যুত্থানের পর তাদের দেশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড মানুষকে দ্বন্দ্বে ফেলেছে। ফলে অভ্যুত্থানের কিছুদিন পরই সাধারণ মানুষ নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছে।
অভ্যুত্থানের পরই যখন নেপালের তরুণেরা একটি রাজনৈতিক দলের ছায়ায় থেকে নিজেদের একত্র করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করেছে, তখন বাংলাদেশের তরুণেরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশ হয়ে ক্ষমতায় ভাগ বসানোর কাজে ব্যস্ত থেকেছে। হুট করে পাওয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লুটপাটসহ নানাভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এসেছে অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে।
বিপুল সংখ্যক নারীকে সামনে রেখে তিন সপ্তাহের সেই জুলাই আন্দোলন চললেও, অভ্যুত্থানের পর নারীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে। অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের তরুণদের গড়া রাজনৈতিক এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রায় সকল নেত্রীকে টিকে থাকার জন্য ধর্মীয় লেবাস ধরতে হয়েছে—যেটি অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে লেখা ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ ধারণার পরিপন্থী। নারী উন্নয়ন কমিশনের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থীদের ‘মব’ হয়েছে, সেই মবের মঞ্চে অভ্যুত্থানের পক্ষের তরুণ নেতার উপস্থিতি মানুষকে বিস্মিত করেছে।
দিন যত গড়িয়েছে, অভ্যুত্থানে সক্রিয় তরুণদের বড় একটি অংশের সঙ্গে বিগত সরকারের ছাত্র সংগঠনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ সামনে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের নানা অভিযোগ রয়েছে। ফলে রাজনীতিতে ‘গুপ্ত ধারণা’ বা ‘ছাত্রলীগের লুঙ্গির তলায় থেকে সুবিধা নেওয়া’ হয়েছে বলে মানুষ মনে করেছে।
১৮ মাস ধরে ধর্মীয় উগ্রবাদে মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গেছে। মাজার ভাঙা, অন্য ধর্মের মানুষদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, ধর্মীয় উসকানি এবং ছায়ানট, উদীচী, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসের মতো জায়গাগুলোতে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছে; মানুষ সেসব দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছে। সেসব হামলার সময় অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া দল এনসিপি প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে নানাভাবে উসকানি দিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নিজেরা সেসব ভাঙচুরে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। ৩২ নম্বরে যখন ভাঙচুর চলছে, তখন সরকারের উপদেষ্টা, যিনি আবার অভ্যুত্থানের নেতা ফেইসবুকে ‘উৎসব হোক’ বলে পোস্ট দিয়েছেন। উৎসব ঘোষণা করে জাতির পিতার বাড়ি ভাঙচুরকে মানুষ ভালোভাবে নেয়নি।
‘মব’ হয়ে উঠেছিল জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষকে হয়রানি থেকে হত্যা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জীবন্ত মানুষকে ধরে এনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা মানুষকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে।
অথচ এসব বন্ধে তরুণদের সমর্থিত সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বরং কোথাও কোথাও ঘটনার পরম্পরা ও সরকারের নির্লিপ্ততা দেখে এ ধারণা করাটা অমূলক হবে না যে, ঘটনার পেছনে সরকারেরও সায় ছিল।

সবশেষে নির্বাচনের আগে তরুণদের গঠিত দল যুদ্ধাপরাধী ও ডানপন্থীদের দলের সঙ্গে ভিড়েছে। ফলে যে সকল মুক্তচিন্তার ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এনসিপি নামের নতুন দলটির সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, তারা সরে গেছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ভোটের জোট করার মধ্য দিয়ে দলটির ‘নতুন বন্দোবস্তের’ ডাক বিলীন হয়ে গেছে।
এসবের প্রতিফলন পড়েছে ব্যালটে। এনসিপি মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে। অপরদিকে ‘পুরনো বন্দোবস্তের’ রাজনৈতিক দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে।
নেপাল আমাদের কী শেখায়?
শুধু ঢাকা ও কাঠমান্ডু নয়, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও আরব বসন্তের দেশগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, মানুষকে সংগঠিত করার অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে জেন-জিদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক নেটওয়ার্ক ও আধুনিক সব কনটেন্ট দিয়ে মানুষের কাছে খুব দ্রুত পৌঁছানোর কৌশল রপ্ত করেছে তারা। ফলে যেকোনো প্রতিবাদ দ্রুত বড় হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে চলমান শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের ভেতরে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও কর্মহীন বিশাল জনগোষ্ঠী তো রয়েছেই। কিছু একটা বলে ডাক দিলেই কিছু মানুষ জমায়েত করা কঠিন কিছু নয়। এসব সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতাসীনদের গদিও তছনছ করা সম্ভব।
কিন্তু ক্ষমতাসীনদের গদি থেকে হঠানোই যে যথেষ্ট নয়; পরিবর্তনের জন্য যে রাজনৈতিক আদর্শের প্রয়োজন হয়, সাংগঠনিক কাঠামো, দক্ষ নেতৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রয়োজন পড়ে, নেপালি তরুণেরা সেই শিক্ষাটি সামনে এনেছে। ফলে বাংলাদেশে যখন পুরনো রাজনৈতিক ধ্যানধারণা নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নেপালের তরুণেরা বরং গোটা গল্পটাই পাল্টে দিয়েছে।
মূল পার্থক্যটা হলো এই যে—নেপালের জেন-জিরা যখন সরকার পতনের মাধ্যমে একটা পরিবর্তনের সূচনা করতে চেয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের তরুণদের স্বপ্ন ছিল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেরাই সেই পুরনো বন্দোবস্তের অংশীদার হওয়া।
নেপালের তরুণেরা কি আস্থার প্রতিদান দিতে পারবে?
রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির ভূমিধস বিজয় দেখে এটি অনুমান করা যায় যে, অন্তত প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ তাদেরকে ভোট দিয়েছে। এমন সব প্রার্থীকে মানুষ ভোট দিয়ে জিতিয়ে এনেছে, রাজনীতিতে যাদের কোনো পরিচিতি নেই। একেবারে আনকোরা, নতুন! এমনকি স্থানীয় মানুষও তাদেরকে ঠিকমতো চেনে না। এসবের অর্থ এই দাঁড়ায় যে, মানুষ পরিবর্তনের জন্য আকুল হয়ে অপেক্ষা করেছে।
কাঠমান্ডুর এক তথ্য ও প্রযুক্তি কোম্পানির ব্যবস্থাপক বিকি শ্রেষ্ঠা যেমন নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলছিলেন, ‘আমার চার বছর বয়সী সন্তান ভবিষ্যতে এই দেশে থাকতে পারবে কি না, এই নির্বাচন সেটি ঠিক করে দেবে। ফলে পরিবর্তন ছাড়া আর কিছু চাই না আমি।’
২০০৮ সালে রাজতন্ত্র শেষ হওয়ার পর অন্তত ১৪ বার নেপালের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে পরিবর্তন এসেছে। গত তিন দশক ধরে নেপালের মানুষ ২৭ বার শুধু সেই পরিবর্তনের জন্য নতুন নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ভোট দিয়েছেন। চেয়ারে বসা মানুষটার পরিবর্তন হয়েছে বটে, কিন্তু দুর্নীতি কমেনি, বেকারত্ব বেড়েছে, কাজের সন্ধানে মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়েছে এবং মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ফলে নেপালের মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তরুণদের ওপর ভরসা রেখেছে। সেই ভরসার মূল্য তরুণরা কি দিতে পারবে, নাকি নেপালও আরব বসন্তের গল্পের মতো ঠাকুরমার ঝুলি হয়ে কল্পনার রাজ্যে ভেসে যাবে—সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।