Published : 28 Dec 2025, 01:30 AM
নির্বাসন কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়, তা আরেকবার প্রমাণ হলো তারেক রহমানের ফিরে আসায়। ১৭ বছর পর তার ফিরে আসা নিয়ে যে আবেগের ঢেউ এবং বাঁধভাঙ্গা মানুষের ভিড়—তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মানুষ রাজনীতির প্রত্যাবর্তন চায়। মনে হলো, একজন মানুষ এত বছর বিদেশে থাকার পর ফিরে আসতেই এমনভাবে আবেগের ঢেউ নামানোর পেছনে কষ্ট আর দুঃখের গভীরতা লুকিয়ে আছে। বিশেষত যখন মানুষ নিজেকে অসহায় বা বিপন্ন মনে করে, তখন তার পুঞ্জীভূত বেদনার প্রকাশ সম্ভবত এভাবেই হয়ে থাকে। এমনটা আমরা আগেও আমাদের জাতীয় নেতাদের প্রত্যাবর্তনের সময় দেখেছি।
সমস্যা হলো, আমরা বাঙালিরা বিশেষ করে বাংলাদেশীরা কোনোকিছুকে ধরে রাখতে পারি না। ধারাবাহিকতা মেনে চলতে পারি না, পালন করতেও পারি না। তাই তো উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার আড়ালে একনায়কতন্ত্র এত বড় হতে পারল। তিনি চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেলেন নানান জটিলতা আর অগম্য. দুরূহ অসংখ্য সমস্যা। ওই সমস্যার পাহাড়ের আড়ালে বেড়ে ওঠা এক প্রজন্মের তারুণ্যের একাংশ আজ ভিন্ন রূপ নিয়েছে, যাদের চেনা যায় না।
বাংলাদেশ চিরকালই গানপাগল এক দেশ। এ কারণেই আমাদের দেশের একেবারে গ্রামাঞ্চলে যে প্রতিভাসমূহ জন্ম নিয়েছেন, তা বিশ্বের অনেক সভ্য সমাজেও বিরল। লালন ফকির, হাছন রাজা, শাহ আবদুল করিম থেকে রাধারমণ—এমন অনেক নাম উল্লেখ করা যায়। সেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাউলদের ওপর হামলা হচ্ছে, গানের অনুষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে একের পর এক কনসার্ট। হামলা হচ্ছে ছায়ানট ও উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর। এই ঘটনাগুলোকে সাধারণ বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। এই তাণ্ডব, এই নিষেধ এখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার যেভাবে ইচ্ছে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, আর পড়লেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়!
এই জাতীয় ঘটনা মানুষকে বিচলিত করে তুলেছে। এমন হাজারো ঘটনা—মৃত্যু, অপমৃত্যু, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবনের সংকট, প্রগতিশীল বাঙালির অস্তিত্ব সবকিছু আজ কেমন যেন স্থবির ও আশঙ্কাগ্রস্ত। এসব কারণেই মানুষ চায় রাজনীতি ফিরে আসুক। অন্তত একজন এমন কেউ থাকুক, যাকে ভরসা করা যায়। সেজন্যই তারেক রহমানের জন্য মানুষের এই ভিড়। তিনি যে কাজটি করে আমাদের মন জয় করলেন, তা হলো কাউকে আক্রমণ না করে, কারও বিরুদ্ধে কিছু না বলে, কোনো দল বা মতের বিরুদ্ধে হুঙ্কার না দিয়ে সংযত ভাষায় তার ভাষণ দিলেন। এটাই মূলত সভ্য সমাজের শিক্ষা। ইউরোপের জীবনযাত্রা আর বিলেতের গণতন্ত্র যদি তাকে এটাই শিখিয়ে থাকে, তাহলে এর চেয়ে ভালো কিছু হতেই পারে না।
আমরা সকলেই জানি, সমস্যার সমাধান সহজ নয়। নানা কারণে সবকিছু বলতে না পারার যে সমস্যা, তার পর্দাটা একটু উল্টালেই চোখে পড়বে, কোথায় অনিশ্চয়তা আর তার উৎস কোথায়। কিছুদিন আগে দুটি সংবাদপত্রের অফিসে যে আগুন লাগল, তাতে সহায় সম্পত্তির যতটা ক্ষতি হলো, তারচেয়ে বেশি আঘাত লাগল বিশ্বাসের ওপর। মানুষ এতদিন জানত, মিডিয়ার প্রতি আক্রোশ থাকতে পারে, ভালো-মন্দ মিলিয়ে সমালোচনা-নিন্দা সব থাকতে পারে—কিন্তু আগুন লাগিয়ে দেওয়া? এটা মেনে নেওয়া কঠিন। যাদের ঘরে আগুন লেগেছে, তারা আমাদের মিডিয়া জগতের পাওয়ার হাউস। তারা ভালোভাবে জানেন, এর প্রতিকার কোথায়।
যে কথা বলছিলাম, সব মিলিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরের বাঙালির মনে আশা জাগানোর মতো ঘটনা যখন অনুপস্থিত এবং দুর্লভ, ওই মুহূর্তে তারেক রহমানের ফিরে আসা প্রমাণ করে দিয়েছে মানুষ রাজনীতি চায়, রাজনীতিতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা রাখে। আমরা দলান্ধ বা দলকানাদের কথা বলছি না। এক ধরনের মানুষ সবকিছুতেই সন্দেহ প্রকাশ করে, খুঁত খুঁজে পেতে ভালোবাসে। তাদের কথা থাক। এখন সামান্যতম পজিটিভিটিও আমাদের কাছে কোয়ারামিনের মতো।
যখন ছায়ানট ও উদীচী পুড়ছে, তখন বাংলা-বাঙালির জন্য সুসংবাদ জরুরি। এই লেখার সূত্রপাত যে কথাটা নিয়ে এসেছে, তা হলো জাইমা রহমানের দেশে আগমন। পিতামাতার সঙ্গে আসা খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা নিঃসন্দেহে একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণী। এত বছর বিদেশে থাকার পরও তার পোশাক, চেহারা, লাবণ্য—সবই পুরোদস্তুর বাঙালি। সবচেয়ে যেটা ভালো লেগেছে, বিমানে পড়ার জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন দুই বাংলার সেরা গল্পসংকলন। বিগত একশ বছরের এই গল্পসংকলনের ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থটি পেঙ্গুইনের মহতী প্রকাশনা। জাইমা রহমান সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন এই চমৎকার বইটি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে হুমায়ূন আহমেদ—সবার গল্প রয়েছে। আমি এই পছন্দ বা রুচিকে সাধুবাদ জানাই। এতে অনেকগুলো বিষয় পরিষ্কার হয়। পারিবারিক ও চেনা-জানা পরিমণ্ডলে বাংলা-বাঙালির সঠিক আবহ না থাকলে জাইমা কি এই বই পড়তেন? যদি তার সঙ্গী-সাথী ও পরিচিত মহলে এমন আবহ না থাকত, তাহলে তিনি হয়তো এমন কোনো বই পড়তেন বা সঙ্গে রাখতেন যা ভিন্ন চিন্তা বা হালকা রসের। সেটাই হতো স্বাভাবিক। কিন্তু তার পছন্দ বলে দিচ্ছে, তিনি বাঙালির অন্তঃজগৎ, মনোজগতের খবর রাখেন। এই গ্রন্থে এমন কিছু সাড়া জাগানো গল্প আছে, যা বাঙালির জীবনবোধকে ধারণ করে। যা বহুকাল ধরে আমাদের শুদ্ধ ধারায় রাখতে সাহায্য করে আসছে।
এই বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার মতো নয়। জাইমা লন্ডনে বসবাস করেও বাংলা-বাঙালির শেকড়ের খবর রাখেন, যা আশাপ্রদ। একদিন যারা এই দেশের হাল ধরবেন, এই জাতিকে নতুন পথ দেখাবেন, তাদের মুখের ভাষা, আচরণ, ব্যবহার এবং মূল্যবোধ সঠিক হওয়া জরুরি। সেই সূতিকাগার তাদের পরিবার, সঙ্গী-সাথী এবং লেখাপড়া। ওই জায়গায় আজ যখন আমরা চিন্তা আর হতাশায় মুহ্যমান, তখন জাইমা রহমানের এই গ্রন্থ সঙ্গে আনার ঘটনা ভাইরাল হওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদও।
রাজনীতির কঠিন মারপ্যাঁচে বা দল-মতের কথায় যাব না। পীড়িত, মূর্ছিত, অপমানিত সমাজে কবি যেমন বলেছিলেন, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—তেমনভাবেই বাঁচুক মানুষ। তারেক রহমান রাজনীতিতে এমন অবদান রাখুন যাতে ভয়ার্ত মানুষের ভয় কেটে যায়। তার কন্যার মতো সবার হাতে-হাতে ঘুরুক বাংলা-বাঙালির গল্পকাহিনি।
মানুষের স্বপ্ন যা তার জীবনের চেয়েও অনেক বড়।