Published : 04 Feb 2026, 10:17 AM
জেফরি এপস্টেইনের রহস্যময় দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’ আর স্ট্যানলি কুবরিকের চলচ্চিত্র ‘আইজ ওয়াইড শাট’ দেখতে দুটি ভিন্ন জগৎ কিন্তু অনুভবে যেন একই অস্বস্তিকর স্বপ্নের দুই স্তর। একটি বাস্তব, আরেকটি শিল্প; কিন্তু দুটিই ক্ষমতার অন্ধকার মনস্তত্ত্বের দিকে তাকিয়ে থাকা এক গভীর আয়না। এপস্টেইনের দ্বীপ আজ আমাদের হতবাক করে, ভীত করে, প্রশ্নে জর্জরিত করে। আর বিস্ময়ের বিষয় হলো এই প্রশ্নগুলোর ভাষা, কাঠামো ও আতঙ্ক কুবরিক যেন আগে থাকতেই রূপালি পর্দায় নির্মাণ করে রেখে গেছেন। যেন বাস্তব পরে এসেছে, আর তার ছায়া আগে থেকেই সিনেমায় ঘোরাফেরা করছিল।
‘আইজ ওয়াইড শাট’ চলচ্চিত্র কোনো প্রচলিত থ্রিলার নয়। চিৎকারসর্বস্ব ভয়ের ছবিও নয়, বরং নিঃশব্দ আতঙ্কের দীর্ঘ এক যাত্রা। এখানে ভয় আসে ধীরে, স্নায়ুর ভেতর দিয়ে। মুখোশধারী অভিজাতদের সেই গোপন আচার কেবল যৌনতার রূপক নয় এটি ক্ষমতার নিজস্ব ভাষা। কুবরিক দেখাতে চেয়েছিলেন, ক্ষমতাবানদের একটি সমান্তরাল জগৎ থাকে যেখানে সাধারণ মানুষের নৈতিকতা, আইন কিংবা মানবিক বোধ কার্যত অচল।
এই গোপন আস্তানার আবহ মোমবাতির আলো, মুখোশের আড়াল, ধীর অথচ শীতল সংগীত সব মিলিয়ে এক ধরনের ধর্মীয় আচার ও রাষ্ট্রহীন ক্ষমতার মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে। যেন এটি কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয় বরং ক্ষমতার নিজস্ব ভূগোল। ঠিক এখানেই ‘আইজ ওয়াইড শাট’ চলচ্চিত্রের সেই অতি গোপন আস্তানা অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যায় এপস্টেইনের ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপের সঙ্গে। বাস্তবেও ছিল নির্জন দ্বীপ, ব্যক্তিগত জেট, প্রভাবশালী অতিথিদের আনাগোনা আর এমন এক অদৃশ্য নিরাপত্তা বলয় যেখানে বছরের পর বছর আইন ঢুকতে পারেনি। চলচ্চিত্রের মতো এখানেও দরজা খোলা ছিল কিন্তু সেটা সবার জন্য না।
এপস্টেইনের দ্বীপ ঘিরে ওঠা অভিযোগ, সাক্ষ্য, তদন্ত ও ফাঁস হওয়া নথিপত্র কুবরিকের সেই কল্পনাকে বাস্তবে পরিণত করে। তখন প্রশ্ন জাগে কুবরিক কি এসব আগে থেকেই জানতেন? নাকি তিনি ইতিহাসের এমন এক চিরন্তন সত্য ধরতে পেরেছিলেন যা সময়ে সময়ে নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসে?
সম্ভবত উত্তর দ্বিতীয়টাই। ক্ষমতার অপব্যবহার কোনো নতুন গল্প নয়। রাজদরবার থেকে সাম্রাজ্য, চার্চ থেকে কর্পোরেট বোর্ডরুম সব ইতিহাস জুড়েই ক্ষমতা নিজের নিয়ম নিজেই বানিয়েছে। পুরোনো এক রাজনৈতিক প্রবাদ আছে– ক্ষমতা নিজেকে আড়াল করতে ভালোবাসে। কুবরিক ছিলেন সেই ইতিহাস, দর্শন ও মনস্তত্ত্বের গভীর পাঠক। তিনি জানতেন, ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হয়, ততই তা গোপন হয়। তাই ‘আইজ ওয়াইড শাট’ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত পাঠ যা আমরা বারবার দেখতে পাই, আবার বারবার ভুলে যেতেও চাই।

এই চলচ্চিত্রের আরেকটি গভীর ও অবহেলিত স্তরের দেখা মেলে নিকোল কিডম্যান অভিনীত অ্যালিস হারফোর্ড চরিত্রে। প্রথম দর্শনে অনেকেই ‘আইজ ওয়াইড শাট’–এর গল্পে টম ক্রুজ অভিনীত ডাক্তার বিল হারফোর্ডের একক যাত্রা হিসেবেই দেখেন। একজন পুরুষের নৈতিক বিভ্রান্তি, ঈর্ষা ও আত্মঅন্বেষণের গল্প হিসেবে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ভেতরে একটু গভীরে প্রবেশ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে গল্পের নৈতিক ও মানসিক কেন্দ্রবিন্দু আসলে অ্যালিস। নিকোল কিডম্যানের অভিনয় এখানে সংলাপের চেয়ে অনুভূতিতে বেশি শক্তিশালী। তার সেই স্বীকারোক্তিমূলক দৃশ্য যেখানে তিনি তার স্বামী বিল হারফোর্ডের সামনে নিজের অবদমিত কামনা ও কল্পনার কথা যখন বলেন তখন পুরো চলচ্চিত্রের ভারসাম্য এক মুহূর্তে পাল্টে যায়।
অ্যালিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার মুখোশ শুধু অভিজাত গোপন সমাজেই নয়, দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরেও থাকে। পুরুষের তথাকথিত নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কুবরিক ভেঙে দেন এক নারীর কণ্ঠে। নিকোল কিডম্যানের চোখের ভেতরের দ্বিধা, হাসির আড়ালে চাপা ক্ষোভ আর স্বপ্ন ও বাস্তবের সীমা মুছে যাওয়ার অনুভূতি সব মিলিয়ে অ্যালিস হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্যের বাহক। এখানে দাম্পত্য সম্পর্ক নিজেই এক রাজনৈতিক ক্ষেত্র; যেখানে কে কী জানে, কে কতটা বলে, আর কে কতটা চেপে যায়, সেটাই ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মার্কিন রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত দম্পতি বিল ক্লিনটন ও হিলারি যেন বাস্তব জীবনের আরেকটি ‘হারফোর্ড দম্পতি’। বিল ক্লিনটনের ব্যক্তিগত জীবন বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে। মনিকা লিউইনস্কি অধ্যায় তার সবচেয়ে প্রকাশ্য উদাহরণ। কিন্তু সেই সংকটের মধ্যেও হিলারি ক্লিনটন ভেঙে পড়েননি বরং রাজনৈতিকভাবে আরও দৃঢ় আরও কৌশলী হয়ে উঠেছিলেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই দাম্পত্য সম্পর্ক টিকে ছিল ভালোবাসার চেয়ে বেশি পারস্পরিক স্বার্থ, ক্ষমতার বোঝাপড়া ও নীরব চুক্তির ওপর।
ঠিক যেমন ‘আইজ ওয়াইড শাট’-এ অ্যালিস জানেন, সত্য সব সময় উচ্চারণ করতে নেই। কিছু সত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য চেপে যেতে হয়। তেমনি হিলারি ক্লিনটনের রাজনৈতিক যাত্রাতেও আমরা দেখি এক ধরনের সচেতন নীরবতা। তিনি জানতেন, কোন মুহূর্তে প্রতিবাদ করতে হয় আর কোন মুহূর্তে নীরব থাকাই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।
এখানেই কুবরিকের চলচ্চিত্রের সঙ্গে বাস্তবের ভয়ংকর মিল। ‘আইজ ওয়াইড শাট’-এ টম ক্রুজের চরিত্রকে হত্যা করা হয় না। তাকে কেবল দেখিয়ে দেওয়া হয় সে কোথায় ঢুকে পড়েছে। বাস্তব জীবনেও এপস্টেইন নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত বহু ক্ষমতাবান ব্যক্তির ক্ষেত্রে আমরা দেখি আইনি শাস্তির চেয়ে নৈতিক ধোঁয়াশা ও রাজনৈতিক বিতর্কেই বিষয়গুলো আটকে থাকে। আর এই ধোঁয়াশার ভেতরেই দাম্পত্য সম্পর্কগুলো এক ধরনের ঢাল হয়ে ওঠে।
এই তুলনায় টম ক্রুজ-নিকোল কিডম্যান ও বিল ক্লিনটন-হিলারি আসলে ব্যক্তি নন তারা প্রতীক মাত্র। একদিকে চলচ্চিত্রের গল্পের ভেতর দিয়ে কুবরিক দেখিয়েছেন দাম্পত্যের গোপন রাজনীতি, অন্যদিকে বাস্তব জীবন আমাদের দেখাচ্ছে ক্ষমতার দাম্পত্য রূপক। এপস্টেইনের দ্বীপ তাই শুধু অপরাধের স্থান নয়। এটি সেই মুখোশের পরীক্ষাগার, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান ও নৈতিকতা একসঙ্গে মিশে যায়।
আজ মুক্তির এত বছর পরেও ‘আইজ ওয়াইড শাট’ আমাদের এত প্রাসঙ্গিক মনে হয় কারণ বাস্তব বিশ্ব ধীরে ধীরে এই চলচ্চিত্রের গল্পের কাছাকাছি চলে এসেছে। কারণ, এপস্টেইনের দ্বীপ কেবল একটি অপরাধস্থল নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতাব্যবস্থার বিকৃত প্রতিচ্ছবি।
হয়তো অচিরেই হলিউডে এপস্টেইনের দ্বীপ নিয়ে বড় বাজেটের কোনো চলচ্চিত্র তৈরি হবে। যেখানে নামী পরিচালক, তারকাখচিত অভিনয় শিল্পী, সবই থাকবে। কিন্তু কুবরিককে অতিক্রম করা সহজ হবে না। কারণ তিনি ঘটনাকে নয়, কাঠামোকে ধরেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন সেই অন্ধকার, যা কোনো নির্দিষ্ট দ্বীপে সীমাবদ্ধ নয় বরং সমাজের কেন্দ্রেই বসবাস করে।
এপস্টেইনের ফাইল পড়তে পড়তে বারবার মনে পড়ে স্ট্যানলি কুবরিকের ‘আইজ ওয়াইড শাট’ কোনো কাকতাল নয়। কারণ এই চলচ্চিত্র আগেই দেখিয়েছিল, ক্ষমতার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ চিৎকার করে আসে না; সে আসে নিঃশব্দে, পরিচিত মুখে, দাম্পত্যের মতোই নীরব এক সমঝোতা নিয়ে। মুখোশ পরে সে আমাদের এত কাছে চলে আসে যে আমরা তাকে আলাদা করে চিনতেই পারি না।
এপস্টেইনের দ্বীপ আজ আমাদের শিউরে ওঠায়, কারণ সেখানে ক্ষমতার সেই গোপন অবয়বকে আমরা প্রায় নগ্ন অবস্থায় দেখতে পাই। কিন্তু এই আতঙ্ক আমাদের একেবারে নতুন নয়। কুবরিক যেন আগেই সতর্ক করেছিলেন—এই অস্বস্তি আমরা বহু আগেই জেনে গেছি, অনুভব করেছি, এমনকি পর্দায় দেখেও ফেলেছি। বাস্তব যখন চলচ্চিত্রের সঙ্গে ভয়ংকরভাবে মিলে যায়, তখন ভয় জন্মায় ঘটনায় নয়; জন্মায় এই উপলব্ধিতে যে সত্যটি সব সময়ই আমাদের সামনে ছিল। শুধু আমরা চোখ খুলে দেখার সাহস করিনি।