Published : 29 Mar 2026, 01:54 PM
‘উত্তরাঞ্চল থেকে কর্মস্থলে ফিরছে মানুষ, অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ’ শিরোনামে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি খবরে চোখ আটকে গেল। খবরে বলা হয়েছে, রাস্তায় ঈদের ছুটি শেষে সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের চাপ বেড়েছে। এই সুযোগে বাস মালিকরা সিরাজগঞ্জ থেকে যাত্রীপ্রতি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে, যা দ্বিগুণের বেশি। মরিয়ম খাতুন নামের এক যাত্রীর বক্তব্যে গোটা ঈদ যাত্রায় মানুষের ভোগান্তির চিত্র ফুটে ওঠেছে। তিনি বলেছেন, “ঢাকা থেকে বাড়ি আসার সময় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েছি। আবার ঢাকায় ফেরার পথেও অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে।”
বাংলাদেশের সড়কে ভোগান্তি নতুন কিছু নয়। শুধু মরিয়ম খাতুন নন; যাত্রীবাহী বাস থেকে মালামাল পরিবহন, সবক্ষেত্রে সড়কে অঘোষিত চাঁদা-বাণিজ্য চলে। সম্প্রতি বিবিসি বাংলাও একই বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, সাতক্ষীরা থেকে মালামাল পরিবহন করা একটা ট্রাককে ঢাকায় ঢোকা পর্যন্ত অন্তত ছয় জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। যেসব গাড়ি ফেরি পারাপার হয়ে ঢাকার দিকে আসে, তাদেরকে আরও বেশি জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। যেমন ফেরিতে ওঠার লাইনে টাকা দিতে হয়, লাইন আগে-পিছে করতে গেলেও টাকা লাগে। যারা টাকা দেয় না, তাদেরকে ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
এখানেই শেষ নয়; শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা ওঠানো হয়, কোথাও কোথাও মালিক সংগঠনের নামে বছরের পর বছর ধরে চাঁদাবাজি চলে, টোলের নামে বহু পুরনো কালভার্টে নামে-বেনামে চাঁদা বাণিজ্য চলে। এর বাইরে শ্রমিক উন্নয়নের নামে জেলা শ্রমিক ইউনিয়ন যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে চাঁদা তোলে। এটি ওপেন সিক্রেট যে, সড়কের নানা জায়গায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে চাঁদা না দিলে গাড়ির চাকা ঘোরে না।
নানামুখী চাঁদাবাজিতে সড়কে নামা মানুষের অবস্থা যখন বেহাল, এই বেহাল অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যখন দৃঢ় আইনের শাসন দরকার, তখন নতুন নির্বাচিত সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, “সড়কে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে যে অর্থ সংগ্রহ করে, সেটিকে তিনি চাঁদা হিসেবে দেখেন না। তবে কাউকে বাধ্য করে টাকা নেওয়া হলে সেটিই চাঁদা হিসেবে গণ্য হবে।”
সড়কে তীব্র যানজট, প্রয়োজনের তুলনায় পরিবহনের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের জীবন যখন জেরবার, ঈদের ঠিক আগে মন্ত্রীর এরকম বক্তব্য আগুনে ঘি ঢালা ছাড়া আর কিছু নয়। গত কয়েক বছরে হাজার হাজার কিলোমিটার পুরনো রাস্তা প্রসারণ, নতুন নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ, পদ্মাসেতু, কর্নফুলী টানেলের মত বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, আট লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা ময়মনসিংহ সড়ক থেকে শুরু করে ঈদের পূর্বে মানুষের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর সুবিধার্থে ছুটির সংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা উপায়ে যখন সড়কে খানিকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসছিল, তখন মন্ত্রীর এই মন্তব্য সড়কে চলা চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
একটি সবজি বোঝাই গাড়িকে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় ঢুকতে হলে যদি অন্তত ছয় জায়গায় চাঁদা দিতে হয়, তাহলে কোনটি চাঁদাবাজি আর কোনটি সমঝোতার মাধ্যমে ফি আদায়–সেটি কোন মানদণ্ডের মাধ্যমে নির্ধারণ হবে? কে ঠিক করে দেবে এই মানদণ্ড?
তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল, পণ্য পরিবহণের সময় জায়গায় জায়গায় দেওয়া এসব চাঁদা ট্রাকের মালিক, হেলপার বা পণ্য ব্যবসায়ীকে বহন করতে হয় না; বরং দিনশেষে অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য কেনার মাধ্যমে পুরো চাঁদার ভার ভোক্তাকে বহন করতে হয়। যাত্রীবাহী পরিবহনের ক্ষেত্রে যেটি বহন করতে হয় যাত্রীকেই। সমঝোতার মাধ্যমে টাকা আদায় হলে সে টাকা যাত্রীকে কেন বহন করতে হবে?
শুধু এটুকু বলেই ক্ষ্যান্ত হননি মন্ত্রী, ঈদের আগের দিন যখন ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রায় প্রতিটি পরিবহন যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছিল বলে খবর আসছিল, ঠিক তখনই মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে মন্ত্রী বলে বসলেন যে, “নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কোথাও বেশি ভাড়াতো নেওয়া হচ্ছেই না,বরং কোথাও কোথাও ২০ থেকে ৫০ টাকা ভাড়া কম নেওয়া হচ্ছে।” এরপর মন্ত্রী যা বলেছেন সেটি ঈদের ছুটিতে ঘর থেকে বের হওয়া যাত্রীর গালে চপেটাঘাত, “চলার পথে যাত্রীদের একটা প্রবণতা আছে, যেহেতু আসন কম বাস কম এবং যাত্রী অনেক। তখন কেউ কেউ ১০০ বা ২০০ টাকা বেশি অফার করে নিজের স্বেচ্ছায় যেতে চাচ্ছেন।”
ঈদের ছুটির মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন অহেতুক, বাস্তবতাবিবর্জিত মন্তব্য চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরকে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দেওয়া ছাড়া আর কি? স্বয়ং মন্ত্রীর পক্ষ থেকে এরকম মন্তব্যের পর সড়কে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আর কোনো ভিত্তি থাকে না।
ফলে এবারের ঈদের ছুটির পরেও সড়কে অবাধ দুর্বৃত্তায়ন বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভোগান্তির ঈদ যাত্রার সঙ্গে যোগ হয়েছে মৃত্যুর মিছিল। বাংলাদেশ রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে কমপক্ষে ২৭৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা খবরে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে কুমিল্লায় ট্রেনের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু, দৌলতদিয়ায় ফেরিতে ওঠার সময় নদীতে বাস ডুবে কমপক্ষে ২৭ জনের প্রাণহানি সড়কে চরম বিশৃঙ্খলার নজির ছাড়া আর কিছু নয়। এসব দুর্ঘটনায় কোনো কোনো পরিবারে একাধিক মৃত্যু, এক গ্রামে ৫ জনের মৃত্যুর মত ঘটনা মানুষকে শোকে বিহবল করেছে।
দৌলতদিয়ায় বাস ডুবে নিহতদের একজন আহনাফ রাইয়্যান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের এ শিক্ষার্থী গত ডিসেম্বরে তার বাবাকে হারিয়েছেন। রাজবাড়িতে ঈদ শেষে মা, বোন ও ভাগ্নেকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। নদীতে ডুবে যাওয়া বাস থেকে রাইয়্যানের মা ও ভাগ্নের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রাইয়্যানের বোন কোনোমতে জীবিত ফেরত আসতে পারলেও, প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর রাজবাড়ি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাইয়্যানের মৃতদেহের সন্ধান মেলে।
এটাই যেন নিয়তি যে, জীবনের সঙ্গে তীব্র সংগ্রাম করে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে ওঠে আসা একটা ছেলের প্রবল সম্ভাবনার জীবন নিভে যাবে সড়কে। এই জীবনহানির জন্য কোথাও কাউকে জবাবদিহিতা করতে হবে না, বরং লাশ খুঁজে পাওয়ার আগেই ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সব দায় শোধ করা যাবে।
সড়কের অনিয়ম নিয়ে আমরা বহু বছর ধরে কথা বলছি, কিন্তু সমস্যার গায়ে হাত দেওয়ার মতো সুসংহত পদক্ষেপ খুব কমই দেখেছি। ‘সমঝোতা’র নামে অর্থ আদায়, নগদ টোলের অস্বচ্ছতা, ঈদের মৌসুমে অতিরিক্ত ভাড়া, ফেরিঘাটে লাইনের বাণিজ্য, নানা সংগঠনের নামে অর্থ সংগ্রহ—সব মিলিয়ে একটি ‘অদৃশ্য চক্র’ সড়কব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সংস্কার দরকার।
প্রথমেই প্রয়োজন চাঁদাবাজির আইনি সংজ্ঞা স্পষ্ট করা। ‘সমঝোতা’ শব্দের আড়ালে কোনো প্রকার অর্থ আদায় যাতে বৈধতা না পায়, সেটি তাহলে সরকার আইনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুক। কে কোথায় কিভাবে কোন খাতে অর্থ নেবে—সবকিছুর একটি লিখিত নীতিমালা থাকুক।
দ্বিতীয়ত, সড়কে নগদ লেনদেন কমানো ছাড়া অস্বচ্ছতা কমানো সম্ভব নয়। টোল, ফি, পারমিট সবকিছু ডিজিটাল পেমেন্টের আওতায় আনতে হবে। যানবাহনের গতিবিধি ট্র্যাকিং এবং টোল প্লাজায় ডিজিটাল রসিদ বাধ্যতামূলক করা হলে কোথায় কত টাকা আদায় হলো, তার হদিস পাওয়া সহজ।
তৃতীয়ত, ঈদ ও অন্যান্য বড় ছুটির সময় পরিবহন খাতকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, হটলাইন, তাৎক্ষণিক জরিমানাসহ নানা ব্যবস্থাকে সক্রিয় রেখে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা রোধ করা সম্ভব। অভিযোগ জানাতে যাত্রীকে থানায় দৌড়াতে হবে, এমন ব্যবস্থা থাকলে কোনো অভিযোগই বাস্তবে আসে না।
চতুর্থত, ফেরিঘাট ও বড় বাস টার্মিনালগুলোকে সিসিটিভির নজরদারিতে আনা ও সেসব তথ্য প্রকাশ করা হলেই অবৈধভাবে টাকা নেওয়ার প্রচলন বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু নিরাপত্তা নয়, প্রযুক্তি স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করবে।
পঞ্চমত, পরিবহন খাতে শ্রমিক ও মালিক সংগঠনগুলোর আর্থিক কার্যক্রমকে নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। তারা কী নামে অর্থ তোলে, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, এসব তথ্য প্রকাশযোগ্য হলে ‘সংগঠনের নামে’ অর্থ আদায় বন্ধ হয়ে যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্ঘটনায় দায় নির্ধারণ। কেবল ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। চালক, মালিক, তদারককারী যার অবহেলায় প্রাণহানি, তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আইনের ভয় বাস্তবে কাজ করবে। বাস পানিতে ফেলে ২৭ জনকে হত্যা করলেও কেনো একটা বাসের রুট পারমিট বাতিল হবে না, এটা হতে পারে না।
সড়ক কেবল এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার পথ নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেখানে ‘সমঝোতা’র নামে অনিয়ম চলতে থাকলে উন্নয়নের সব অর্জনই অর্থহীন হয়ে পড়ে। কেবল বক্তব্য নয়, কার্যকর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ সড়ককে মানুষের জন্য নিরাপদ করে তুলতে পারে।