Published : 28 Aug 2025, 03:53 PM
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কারিগরি শিক্ষা। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে ষাটের দশকে এই শিক্ষার সূচনা হয়। ১৯৬০ সালে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ছয় দশক ধরে দেশজুড়ে এর বিস্তার ঘটেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে অধিদপ্তরের অধীনে ২১১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সার্টিফিকেট পর্যায়ে ১৫৫টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, একটি ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট; ডিপ্লোমা পর্যায়ে ৫০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট; এবং ডিগ্রি পর্যায়ে একটি টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও চারটি প্রকৌশল কলেজ রয়েছে। এছাড়া, বেসরকারি পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৯ম-১০ম শ্রেণিতে ভোকেশনাল এবং উচ্চমাধ্যমিকে বিএমটি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) কোর্স চালু রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে এর বিস্তার উল্লেখযোগ্য হলেও, মানের প্রশ্নে কারিগরি শিক্ষা এখনো নানা সংকটে জর্জরিত।
কারিগরি শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে প্রকৃত মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হলে শুধু সাধারণ শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর নতুন অর্থনীতিতে কারিগরি শিক্ষাই হতে পারে মূল চালিকাশক্তি। দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি হলে তা দেশীয় শিল্পে অবদান রাখার পাশাপাশি বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হবে। কিন্তু বাস্তবে, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
ভোকেশনাল ও বিএমটি শাখার পাঠ্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৯ম-১০ম শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে একদিকে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ধর্ম, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের মতো আবশ্যিক বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে ট্রেডভিত্তিক ব্যবহারিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। ভোকেশনাল শাখায় কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং, বাস্তব প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান, ব্যবসায়ে উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয় রয়েছে। বিএমটি শাখায় অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় গণিত, ব্যবসায় ইংরেজি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, উচ্চতর হিসাবরক্ষণ ইত্যাদি রয়েছে। কাগজে-কলমে এই পাঠ্যক্রম বৈচিত্র্যময় মনে হলেও, বাস্তবে শিক্ষার্থীরা এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না।
মূল সমস্যা রয়ে গেছে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে। ভোকেশনাল ও বিএমটি শাখায় প্রায় সব বিষয়েই ৪০ নম্বর ব্যবহারিক এবং ৬০ নম্বর তাত্ত্বিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। এখানে একটি অনৈতিক প্রথা চালু রয়েছে—অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে ব্যবহারিক বিষয়ে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়। ফলে, যে শিক্ষার্থী তাত্ত্বিক পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পায়, সে-ও এ গ্রেড অর্জন করে। এভাবে কৃত্রিমভাবে ফলাফল সুন্দর দেখানো হলেও, প্রকৃত জ্ঞান বা দক্ষতার বিচারে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থেকে যায়। এই পরীক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনীহা তৈরি করছে, কারণ তারা জানে, ব্যবহারিকে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যাবে, আর সামান্য পড়াশোনায় ভালো গ্রেড সম্ভব।
ফলে, চার বছর কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতা গড়ে ওঠে না। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিন থেকে ছয় মাসের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নেয়, বিশেষত কম্পিউটার বিষয়ে, তারাই বরং বেশি স্বাবলম্বী হচ্ছে। অথচ, যারা দীর্ঘ সময় ভোকেশনাল বা বিএমটি কোর্সে পড়ছে, তাদের অনেকেই কম্পিউটারের সুইচ অন-অফ করতে পর্যন্ত জানে না। এর কারণ প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম।
বাংলাদেশের অনেক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র ল্যাবরেটরি থাকলেও তা অকার্যকর। এমনকি, অনেক প্রতিষ্ঠানে একটিও সচল কম্পিউটার নেই। অথচ, সেসব প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার ট্রেড চালু করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায় করছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনে এলে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া হয়। ফলে, শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায় না।
এই বাস্তবতায় সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল বা হিসাবরক্ষণ ট্রেডের শিক্ষার্থীরাও প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, পাবনার একটি স্বনামধন্য রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়া একজন প্রার্থী, সরকারি পলিটেকনিক থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণি অর্জন করলেও, তিন প্রকার ইটের মধ্যে কোনটি ভালো মানের তা বাছাই করতে পারেননি। একইভাবে, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমাধারী অনেকে সাধারণ ওয়্যারিংও জানে না।
অন্যদিকে, হিসাবরক্ষণ ট্রেডের শিক্ষার্থীদের জাবেদা, খতিয়ান, নগদান বা চূড়ান্ত হিসাবের মৌলিক ধারণা নেই। মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বছরে অন্তত একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরের বিধান থাকলেও, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা বাস্তবায়িত হয় না। ফলে, শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে না।
কারিগরি শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নয়, বরং হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন। কিন্তু বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার বর্তমান কাঠামোতে ওই সুযোগ অনুপস্থিত। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় অপচয় করছে, অথচ শেষপর্যন্ত তাদের কোনো কাজে লাগছে না। পরিবার ও সমাজ তাদের শিক্ষার পর যথেষ্ট প্রত্যাশা করলেও, বাস্তবে তারা শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার উপযুক্ত হয়ে উঠছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের কাছে তারা বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ পরিস্থিতির মূল কারণ কয়েকটি। প্রথমত, শিক্ষক সংকট এবং বিদ্যমান শিক্ষকদের মান। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ শিক্ষক নেই। যারা আছেন, তাদের অনেকেরই ব্যবহারিক দক্ষতা সীমিত। দ্বিতীয়ত, ল্যাবরেটরি ও ওয়ার্কশপের ঘাটতি। তৃতীয়ত, পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতির ত্রুটি। চতুর্থত, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। এই সবকিছুর কারণে কারিগরি শিক্ষা তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে না।
তবে সমাধান অসম্ভব নয়। কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কিছু মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃতপক্ষে ল্যাবরেটরি ও ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনা করছে কিনা তা তদারকি করা যায়। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে। ব্যবহারিক বিষয়ে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার প্রথা বন্ধ করতে হবে। ব্যবহারিক পরীক্ষা হাতে-কলমে জ্ঞান যাচাইয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশি মডেল অনুসরণ করে শিক্ষকদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ তৈরি করতে হবে। নিয়মিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর, ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের দেশে এখনো কারিগরি শিক্ষাকে অনেকটা দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা হিসেবে দেখা হয়। অভিভাবকরা সন্তানদের সাধারণ শিক্ষায় পাঠাতে বেশি আগ্রহী। অথচ উন্নত দেশগুলোতে কর্মমুখী শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। জার্মানি, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে তাদের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রমবাজারে কাজ করার মতো দক্ষ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বর্তমানে এর যে মানহীনতা রয়েছে, তা দূর না করতে পারলে জনশক্তি সৃষ্টি নয়, বরং অপচয়ই ঘটবে। কারিগরি শিক্ষার আধুনিকীকরণ ও মানোন্নয়নই এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে। যদি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রকৃত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, যদি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর ল্যাবরেটরি নিশ্চিত করা যায়, যদি পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার করে দক্ষতার প্রকৃত মূল্যায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
আজকের বিশ্ব প্রতিযোগিতামূলক। প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতিতে দক্ষ জনশক্তিই হলো মূল চালিকাশক্তি। আমাদের দেশ যদি ওই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চায়, তবে কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন ছাড়া বিকল্প নেই। সময় এসেছে বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, বরং ভেতরের কাঠামোকে শক্তিশালী করার। নয়তো কারিগরি শিক্ষার উদ্দেশ্য অপূর্ণই থেকে যাবে, আর শিক্ষার্থীরা পরিবার ও সমাজের কাছে বোঝা হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হতে পারে কারিগরি শিক্ষা। এই শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থে কার্যকর করতে হলে এখনই প্রয়োজন আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও বাস্তব পদক্ষেপ। তাহলেই দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে, আর বাংলাদেশ এক সমৃদ্ধিশালী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।