Published : 13 Apr 2026, 05:16 PM
নখ থেকে ভোট দেওয়ার অমোচনীয় কালির দাগ মুছে যাওয়ার আগেই নতুন সরকারকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনআকাঙ্ক্ষাগুলো গ্লানি হয়ে ফিরে আসতে শুরু করেছে। মানুষ কেন আবারও প্রতারিত বোধ করছে? অন্তত যে মানুষগুলো বিএনপি করেন না, কিন্তু বিএনপিকে ভোট দিয়েছিলেন মব আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিংবা সাম্প্রদায়িক শক্তির আধিপত্য রোধ করার জন্য, তারা এখন এমনটাই বলছেন।
মব সহিংসতা দমনে নিদারুণ ব্যর্থতা কিংবা দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজিকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে এক ধরনের বৈধতা দেওয়া—নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জনমানসের এই যে দ্রুত স্বপ্নভঙ্গ, এটি মূলত এ দেশের চিরন্তন রাজনৈতিক প্রবঞ্চনারই আরেক সংস্করণ মাত্র। এ দেশের মানুষ বারবার রক্ত ও প্রাণ দান করে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখে; কিন্তু দিনশেষে নতুন মুখের একদল কুশীলবের হাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ সঁপে দিয়ে খালি হাতে ঘরে ফেরে। প্রবঞ্চনার এই সকরুণ পুনরাবৃত্তিই আজ এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার শেকড় প্রোথিত ইতিহাসের গহীন অন্ধকারে।
এই সংকটের প্রেক্ষাপট খুঁজতে ফিরে যেতে হয় ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রারম্ভিক কালে। মীর জাফর ও রায় দুর্লভদের সেই ঐতিহাসিক চক্রান্তের উত্তরাধিকার আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন এক স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে, যার বিষক্রিয়া আজও জাতীয় সংকটকে ঘনীভূত করছে। শাসনের ছলে শোষণ আর প্রতিশ্রুতির ছলে প্রতারণা—এই দ্বৈত নীতিই এ দেশের রাজনীতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের কথা বলা যায়; যেখানে একাধিক রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাতুর্যের মাধ্যমে তাকে একটি রাষ্ট্রে রূপান্তর করা হয়। প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এই যে ঐতিহাসিক বেইমানি, তারই অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে পাকিস্তানকে বেশিদিন অখণ্ড রাখা যায়নি।
পরবর্তীকালে লাখো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরনো রাজনৈতিক চাতুর্য আমাদের পিছু ছাড়েনি। বিজয় অর্জনের পরপরই জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এক পরিকল্পিত প্রবঞ্চনার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। জীবন বাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ধরনের কার্যকর পুনর্বাসন ছাড়াই বিদায় দেওয়া ছিল একটি সুকৌশলী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যারা জীবন দিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায় থেকে তাদের এই বিচ্ছেদই মূলত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম রাজনৈতিক ফাটল তৈরি করে। এই ঐতিহাসিক অবহেলাই পরবর্তীকালে এ ভূখণ্ডের অনাকাঙ্ক্ষিত সব সংকটের শিকড় হিসেবে কাজ করেছে।
গণমানুষের এই স্বপ্নভঙ্গ ও রাজনৈতিক বিভাজনের সেই ধারাটি চূড়ান্ত রূপ পায় নবগঠিত রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়ায়। স্বাধীনতার পরপরই শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ক্ষমতার ভারসাম্যের বদলে প্রধানমন্ত্রীর একক হাতে যাবতীয় নির্বাহী ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করা হয়। বিস্ময়করভাবে, যে নিবর্তনমূলক আইনের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ যুগে যুগে লড়াই করেছে, সেই নিবর্তনকেই অদ্ভুত এক কৌশলে আত্মীকরণ করা হলো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশের সংবিধানে। এরপর দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে জনমানুষের মৌলিক অধিকার রুদ্ধ করে যে সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের পথ বেছে নেওয়া হয়, ইতিহাস তার প্রতিশোধ নেয় অত্যন্ত নির্মমভাবে। এ দেশের স্থপতি স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানকেই সেই ঐতিহাসিক ভুলের খেসারত দিতে হয় সপরিবারে প্রাণ হারিয়ে।
প্রতারণা ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার এই অন্তহীন খেলা থেকে রেহাই পাননি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও। যে সামরিক বাহিনীর একাংশের ওপর ভর করে তিনি ক্ষমতার শক্ত ভিত্তি গড়েছিলেন, সেই বাহিনীরই একদল উচ্চাকাঙ্ক্ষী সদস্যের গোপন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের শিকার হতে হয় তাকে। ইতিহাসের এই রক্তক্ষয়ী পাঠ পরবর্তী শাসকেরাও পাঠ করেননি। যে কারণে সেনাশাসক এরশাদও একই পথে হেঁটে ক্ষমতার একক নিয়ন্ত্রণ সংহত করতে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথেচ্ছ ব্যবহার করেন। দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলে গণদাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে গিয়ে শেষপর্যন্ত ১৯৯০ সালের প্রলয়ংকরী গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও কারাবন্দি হতে হয়। প্রতারণার যে বৃত্তটি তিনি ভাঙতে পারতেন, উল্টো সেই বৃত্তেই আটকা পড়ে তাকে এক অসম্মানজনক বিদায়ের সাক্ষী হতে হয়।
এরশাদের পতনের পর ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও এ দেশের রাজনীতির চিরচেনা চরিত্রের বিশেষ কোনো বদল ঘটেনি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানকালে তিন জোটের ঐতিহাসিক রূপরেখায় রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি তা রক্ষায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। মূলত প্রতিশ্রুতির এই বরখেলাপই এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক স্থায়ী প্রথা হিসেবে জেঁকে বসে। এই সংস্কৃতিরই চরম ও বিষাক্ত পরিণতি ছিল বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শাসনামল। এক ব্যক্তিতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সেই জগদ্দল পাথর সরাতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতাকে আবারও এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পথে হাঁটতে হয়। ইতিহাসের সেই ঝড়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠ থেকে একপ্রকার উধাও হয়ে গেলে, ক্ষমতার সেই শূন্যতায় প্রধান শক্তি হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হয় বিএনপি।
হাসিনা আমলে বিএনপির অজস্র নেতাকর্মীকে গুম, খুন ও আয়নাঘরের মতো অমানবিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। সংগত কারণেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল—যারা নিজেরা এমন ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তারা অন্তত রাষ্ট্র সংস্কার ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন থাকবেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের মাস না পেরোতেই জনতা সেই চেনা মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখতে শুরু করে। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান ঘুরে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ নাগরিক মনে নতুন করে প্রতারিত হওয়ার অন্তর্দহন শুরু হয়।
জনগণের এই আশঙ্কার প্রতিফলন ঘটে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। নবগঠিত সরকার তাদের প্রথম সংসদীয় অধিবেশনেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জনদাবির মুখে জারি করা ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশকে কার্যত আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক, তথ্য অধিকার, গণভোট এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো মৌলিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। ক্ষমতার বাইরে থাকার দীর্ঘ সময়ে যেসব নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে বিএনপি নেতৃবৃন্দ সোচ্চার ছিলেন, আজ রাষ্ট্রীয় গদিতে বসে বিচিত্র অজুহাতে সেগুলোই বাতিল করে তারা প্রকারান্তরে নিজেদেরই প্রতিশ্রুতির প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
এসবের পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের যে ধ্বংসাত্মক খেলা বিগত দেড় দশকে জনমানসে বিভীষিকা তৈরি করেছিল, নতুন সরকারকেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই একই পথে হাঁটতে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিতর্কিত নিয়োগের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলানুগত ব্যক্তিদের উপাচার্য ও মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। একই অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র দেখা গেছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়; যেখানে জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনগুলোতে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসিয়ে স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসনকে প্রকারান্তরে দলীয় শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান। অনুরূপ এক হঠকারী অবস্থান পরিলক্ষিত হয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নেও। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা এবং একটি আলাদা সচিবালয় গড়ার যে প্রস্তাব ছিল, তা বাতিল করে নিয়োগের পুরো নিয়ন্ত্রণ পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই ইতিহাসে টেকসই ভিত্তি পায়নি। মানুষের মনে প্রতারিত হওয়ার ক্ষোভ ঘনীভূত হলে, সময়ে-সুযোগে একদিন তা প্রলয়ের পরিণতি লাভ করে।