Published : 27 Nov 2025, 10:44 PM
বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য যে, ইতিহাসে আমরা কখনো একজন নিজস্ব ভালো শাসক পাইনি। মুঘল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসন পার হয়ে একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের পরও নিজেদেরকে ভালোভাবে শাসন করবার যোগ্যতা দেখাতে পারিনি। বর্তমানের প্রতি অসন্তোষের ফলেই আমরা অতীতের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি। আর তারই ফলে ক্ষণে ক্ষণে পুরনো কোনো না কোনো ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি টান অনুভব করে থাকি—যা বর্তমানকে সমালোচনার এক পশ্চাৎপদ রূপ।
ভালো কোনো শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যে জোটেনি। সামরিক শাসনের বিরতিগুলো বাদ দিলে স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল আমরা মূলত প্রধান দুই দলের একটি দ্বারা শাসিত হয়ে এসেছি। এক দলের প্রতি বিতৃষ্ণায় মানুষ আরেক দলকে ক্ষমতায় এনেছে। কিন্তু যে দলই ক্ষমতায় আসুক, নির্বাচনের পর জনগণ খুব বেশি আশাবাদী হতে পারেনি। যখনই সুযোগ এসেছে (সুযোগই বটে, কারণ বাংলাদেশে খুশি মনে ভোট দেবার মতো নির্বাচন পাওয়া এক ভাগ্যের ব্যাপার), মানুষের ক্ষোভ ঝরে পড়েছে সর্বশেষ ক্ষমতাসীন দলের ওপর।
মানুষ জানে, ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’ (লঙ্কার এ লোকজ বদনাম একপেশে)। এভাবে আমরা একবার বিএনপি, একবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে বাধ্য হয়েছি, কারণ অন্য কোনো দল কখনো বিশ্বাসযোগ্যভাবে জনগণের সামনে আসেনি। নির্বাচনে আমাদের সবসময় মন্দের ভালোকে বেছে নিতে হয়েছে। সত্যিকারের ভালো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৌভাগ্য আমাদের কোনো কালেই হয়নি। দু-একজন পেলেও তারা সংখ্যায় এত কম যে কোনো কাজে আসেন না, এটা আমরা বুঝে নিয়েছি। আমরা ভোট দিয়েছি মূলত এলাকায় ‘উন্নয়ন’ নামের কাজকর্ম চালিয়ে নেওয়ার জন্য, যা ভালো নেতার চেয়েও বেশি জরুরি মনে হয়েছে।
অতএব আমাদের সবসময়ই (অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচনের সুযোগ পেলে) একাধিক মন্দ প্রার্থীর মধ্য থেকে একজন কম মন্দ প্রার্থীকে বাছাই করতে হয়েছে। কিন্তু কাজটি যে কত কঠিন তা যারা ভোট দেন তারা সবাই জানেন। ভালো ও মন্দের মাঝে বা সাদা ও কালোর মাঝে পার্থক্য করা সহজ, কিন্তু কালো ও ধূসরের মাঝে পার্থক্য করা খানিকটা কঠিন। তাই মানুষ আসলে যা করে তা হলো, দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে দেয়। কম মন্দ দলটি ক্ষমতায় বসতে না বসতেই অতি মন্দে পরিণত হয়। আবার জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং এর আগেকার দলকে ক্ষমতায় বসাতে প্রস্তুতি নেয়।
জনগণের এ নির্বাচনি আচরণ আওয়ামী লীগ ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল বলেই ২০১৪ সাল থেকে তারা আর সত্যিকার নির্বাচন দেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি। নির্বাচনের খেলা খেলে একের পর এক ক্ষমতায় থেকেছে এবং শেষপর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের মতো এক বড় ঠেলা লেগেছে এ খেলা বন্ধ করতে। কিন্তু এত ত্যাগের বিনিময়ে যে দেশ পাওয়া গেল সেখানে মানুষের বাছাইয়ের ক্ষমতা বেড়েছে কি? ওই ক্ষমতা বাড়লেও অবশ্য লাভ নেই—বাছাই করার মতো জিনিস বা উপকরণ কই? নির্বাচনকালে মানুষ বাছাই করার স্বাধীনতা পাবে, কিন্তু মন্দ ও কম মন্দের বাইরে নতুন কিছু পাবে কি?
আগামী নির্বাচনে যারা প্রাধান্য বিস্তার করবেন বলে মনে করা হচ্ছে তাদের পার্থক্যও সাদা ও কালোর বা ভালো ও মন্দের মতো স্পষ্ট নয়। অতএব জনগণকে বেশ বিপাকে পড়তে হবে। স্বৈরাচারী আওয়ামী শক্তির পতনের পরে কোনো জনবান্ধব দলের উত্থান দেখা যায়নি। বোঝা যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতকে কেন্দ্র করে শক্তির বিন্যাস ঘটবে। নতুন ও পুরনো ছোট ছোট দলগুলোকে এদের কোনো একটির পাশে থেকে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখতে হচ্ছে। এই দুই দলই জনগণের কাছে পূর্বপরীক্ষিত—তাদেরও অতীত কর্মকাণ্ড মানুষের জানা, বিশেষত একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে আছে এক বিরাট প্রশ্ন। কিন্তু মানুষের কিছু করবার থাকবে না।
জনগণ আবারও চেষ্টা করবে কম মন্দ প্রার্থীদের ও কম মন্দ দলকে ভোট দিতে—যা সহজ নয়। আর তারপর তাদের আগের ইতিহাসের মতোই অপেক্ষা করতে হবে অতি মন্দের শাসনের অধীনে জীবনযাপনের। তবে বাছাই করবার সুযোগটাও কম বড় স্বাধীনতা নয়—যদিও বাছাই করবার স্বাধীনতা মন্দ ও কম মন্দের বাইনারিতেই সীমিত। যতক্ষণ না এ বাছাই ক্ষমতার সম্প্রসারণ হচ্ছে অর্থাৎ নতুন নেতৃত্বে কোনো গণবান্ধব শক্তির আবির্ভাব ঘটছে, ভাগ্যের এ চক্র থেকে মানুষের মুক্তি নেই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরিবর্তনের যে আলো জ্বালিয়েছিল তার শিখা প্রতিদিন একটু একটু করে নিভে যাচ্ছে। অথচ গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শক্তির এ ব্যাপারে তেমন সচেতনতা নেই। ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে ও স্বপ্নেই বিভোর সবাই!
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে এত ঢাকঢোল পেটানো হলেও, রাষ্ট্রে রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটল না। রাজনীতিতে গণবান্ধব ও গণতান্ত্রিক চরিত্রের কোনো উন্মেষ ঘটেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রে বিল ক্লিনটনের আমলে যেমন হয়েছিল তেমন করে রাষ্ট্রের ও সরকারের ভূমিকা যথাসাধ্য সংকুচিত হচ্ছে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে জার্মানিতে ও ইটালিতে যেমন হয়েছিল তেমন করে রাষ্ট্র বহির্ভূত কিছু শক্তির জন্ম হচ্ছে যারা রাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে সমাজে সবার ওপরে নিজেদের ইচ্ছে ও মতামত আরোপ করতে পারে। ধীরে ধীরে সমাজে সর্বব্যাপী ভয়ের বিস্তার ঘটছে আগের মতোই।
সম্প্রতি একজন জামায়াত নেতার দেওয়া বক্তব্যে চলমান রাজনীতির গতিপথের ছবি পাওয়া যায়— “প্রশাসনে যারা আছে, তাদেরকে অবশ্যই আমাদের আন্ডারে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের কথায় উঠবে, আমাদের কথায় বসবে, আমাদের কথায় গ্রেপ্তার করবে, আমাদের কথায় মামলা করবে।… পুলিশকে আপনার পিছনে পিছনে হাঁটতে হবে, থানার ওসি আপনার প্রোগ্রাম সকালে জেনে নিয়ে আপনাকে প্রটোকল দিবে।”
ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এই অধিপত্য চর্চার আকাঙ্ক্ষা আরও অনেকের আছে। এটি ইঙ্গিত দেয় ক্ষমতায় আরোহণের পর কী ঘটতে পারে তা। পুলিশের লোকজন রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ান না, যদিও তারা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের পেটোয়া বাহিনীর ভূমিকা পালন করে এসেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বেশি প্রমাণ তারা দেখাতে পারেননি। কিন্তু এবার পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন’ এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছে, “কারও দলদাস হয়ে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সেই দিন সুদূর পরাহত। বিধিবদ্ধ আইন ও জনকল্যাণকে সামনে রেখে পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব পালন করে শুধুমাত্র জনগণের কাছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে বিশ্বাস রাখে।”
দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক চেতনায় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা একজন সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতার চেয়ে অগ্রসর। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বক্তৃতায় বলেছেন, “আওয়ামী লীগ যা বলত তাই আইনে পরিণত হতো।” ওই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি অন্যদের মধ্যেও দেখা যায়। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার এই ভগ্নদশা কীভাবে সারবে যখন সর্ষের মাঝেই ভূত অর্থাৎ রাজনীতিতেই গলদ?
ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই অনেক পক্ষের আস্ফালন লক্ষ্য করা যাচ্ছে—দখলদারি, চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য, হুমকি-ধমকি কোনো কিছুর কমতি নেই। আর এরই মাঝে কে কার চেয়ে কম মন্দ তাই দেখানোর নানারূপ প্রতিযোগিতা চলছে। কম মন্দ থেকে অতি মন্দ হতে কেবল এক পা দূরের ক্ষমতায় আরোহণ করতে হয়।
এসব থেকে স্পষ্ট যে, আমাদের দেশের চলমান রাজনীতি এখনো ট্রাম্পিয়ান ফাঁদে আটকে আছে। প্রয়োজন মামদানি যুগের সূচনা— মন্দ ও কম মন্দ বনাম ভালো, অগণতান্ত্রিক ক্ষমতালোভী বনাম গণতান্ত্রিক জনস্বার্থমুখী, অনৈতিক বনাম নৈতিক রাজনীতি। প্রয়োজন ওই রাজনীতি যা বৈষম্যবিরোধী চেতনার চূড়ান্ত সম্প্রসারণ করে স্পষ্ট বলবে, মুক্তি লাভ প্রত্যেক মানুষের অধিকার—যা জন্মের লটারি ও সম্পদের মালিকানার ওপর নির্ভরশীল নয়। আমাদের রাজনীতির মূলধারায় এই গুণগত পরিবর্তন আশু প্রয়োজন।