Published : 13 Mar 2026, 01:08 PM
বৃহস্পতিবার সকালে সংসদ ভবনের সামনে মানুষের ভিড় জমেছিল। সবার চোখে ছিল একটাই প্রশ্ন। জুলাইয়ে রাস্তায় যারা বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল, যাদের রক্তে ভিজেছিল এই মাটি, তাদের আত্মত্যাগের মূল্য কি এই সংসদ দেবে? নাকি আবারও সেই পুরোনো নাটক দেখবে দেশ?
সকালটা মিথ্যে আশা দেয়নি। দিয়েছিল সত্যিকারের কিছু মুহূর্ত, যা এই দেশের সংসদীয় ইতিহাসে কমই এসেছে। সরকার আর বিরোধী দলের নেতারা পাশাপাশি বসলেন, একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন সম্মানের চোখে। আবরার ফাহাদের নাম উঠল, ফেলানীর নাম উঠল, জুলাইয়ের শহীদদের নাম উঠল, সবাই উঠে দাঁড়ালেন। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে মনে হলো, হয়তো এই সংসদ সত্যিই একটু আলাদা।
কিন্তু বিকেল হতেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট। রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণা হতেই বিরোধী বেঞ্চ জেগে উঠল তীব্র প্রতিবাদে। প্ল্যাকার্ড উঠল, স্লোগান উঠল, ওয়াক আউট হলো। অনেকে হয়তো অবাক হয়েছেন। আমি হইনি। কারণ এই বিরোধ শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে নয়, এটা একটা প্রতীকী অবস্থানের প্রতিবাদ। ফ্যাসিবাদের দুঃসময়ে যিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে বিরোধীরা মনে করে, তাকে এই জুলাইয়ের সংসদে অভিভাবকের আসনে দেখতে তারা রাজি নন। এই ক্ষোভের একটা ন্যায্যতা আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ঠিক এই মুহূর্তে স্পিকারের ভূমিকাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাজনীতিতে অভিজ্ঞ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু সংসদ পরিচালনা আলাদা বিদ্যা। আমরা এই দেশে শেখ রাজ্জাক আলীর মতো স্পিকার দেখেছি, যিনি টালমাটাল পরিবেশেও সংসদকে শক্ত হাতে ধরে রাখতেন। বৃহস্পতিবারের বিকেলে স্পিকারকে কিছুটা নড়বড়ে মনে হয়েছে আমার কাছে। হট্টগোলের মাঝে বারবার শান্ত থাকার অনুরোধ করেছেন, কিন্তু পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে তাকে। কারণ আগামী দিনগুলো আরও কঠিন হবে।
আর শোক প্রস্তাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়ে আমি সরাসরি বলতে চাই, এটা মেনে নেওয়া যায় না। রাজনৈতিক সমঝোতার নাম করে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। স্পিকারকে এটা মনে রাখতে হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাপ থাকবে, বিরোধী জোটের চাপ থাকবে, কিন্তু এই একটি জায়গায় নতি স্বীকার করলে এই সংসদের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো দলের সম্পত্তি নয়, এটা এই জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি।
আর ঠিক সেই কারণেই জাতীয় সংগীতের প্রশ্নটাও এখানে আসে। সংসদে মতভেদ থাকুক, বিরোধ থাকুক। কিন্তু ‘আমার সোনার বাংলা’ যখন বাজে, তখন সব দল, সব মত পেছনে চলে যায়। শুধু থাকে দেশ। এই একটি জায়গায় আমাদের ঐক্য যদি না থাকে, তাহলে বাকি সব ঐক্যের কথা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই প্রসঙ্গেই কৃতজ্ঞতার একটা কথা বলতে চাই। দীর্ঘ দেড় যুগ এই দেশের রাজনীতি ছিল রাজপথে, মাঠে, মামলায়, কারাগারে। সংসদ ছিল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সেই অন্ধকার থেকে রাজনীতিকে সংসদে ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এই স্বীকৃতি রাজনৈতিক নয়, এটা ঐতিহাসিক সত্য।
কিন্তু ধন্যবাদ দিয়ে থামলে চলবে না। এই সংসদের কাছে জনগণের প্রত্যাশার তালিকাটা দীর্ঘ এবং সুনির্দিষ্ট। আইন পাশের যন্ত্র হলে চলবে না, হতে হবে জবাবদিহির কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়মিত প্রশ্নোত্তর পর্বে আসতে হবে। স্থায়ী কমিটিগুলোকে সত্যিকারের ক্ষমতা দিতে হবে, কারণ অতীতে এই কমিটিগুলো ছিল কাগজের বাঘ। বাজেট আসবে, উন্নয়ন প্রকল্প আসবে, কিন্তু সেগুলোর ওপর সংসদীয় নজরদারি না থাকলে আবার সেই পুরনো লুটপাটের সংস্কৃতি ফিরে আসবে। গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের আগে খসড়া প্রকাশ হোক, বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হোক, নাগরিক সমাজকে যুক্ত করা হোক। এটা দুর্বলতা নয়, এটাই পরিণত গণতন্ত্রের চেহারা।
রোববার অধিবেশন বসবে আবার। রাষ্ট্রপতি ইস্যু কোন দিকে মোড় নেয়, বিরোধী দল ফিরে আসে কিনা, সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি। তবে একটা কথা এখনই বলতে পারি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে যে আর্থিক সংকট, যে আঞ্চলিক চাপ, যে সংস্কারের ডাক টেবিলে পড়ে আছে, সেগুলো মোকাবেলা করতে হলে সংসদকে অকার্যকর হওয়ার বিলাসিতা কারও নেই।
জুলাইয়ের রক্তের ঋণ শোধ হয় না বক্তৃতায়, শোধ হয় কাজে। এই সংসদের কাছে সেই কাজের প্রত্যাশা নিয়েই আছি।