Published : 24 Apr 2026, 04:52 PM
মুর্শিদাবাদের নওদার ধুলোবালি আর রোদে যখন বোমার ধোঁয়া মিশে যাচ্ছিল, তখন রাজভবনের ঘড়ির কাঁটা এক নতুন ইতিহাস লিখে ফেলল। ২৩ এপ্রিল ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা স্রেফ এক রাজনৈতিক লড়াই ছিল কি? নাকি তা ছিল বাঙালির এক অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক অভিব্যক্তি। একদিকে কোচবিহারের ৯৬ শতাংশ ভোটের হার, অন্যদিকে বীরভূমের তীব্র গরমে ভোট দিতে গিয়ে আসিম রায়ের মতো প্রবীণ নাগরিকের মৃত্যু। সব মিলিয়ে এক অস্থির ছবি।
বিশ্লেষকের চোখে যদি দেখা হয় তাহলে এই দিনটি শুধু ব্যালটের লড়াই নয়। প্রথম দফার ১৫২টি আসনে যে বিপুল ভোটার সমাগম দেখা গেল, তা কি কেবল সুস্থ গণতন্ত্রের লাখণ, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে ভিটেমাটি আর নাগরিকত্ব হারানোর এক তীব্র আতঙ্ক? বাস্তবে এবারের ভোট উদ্দীপনার চেয়েও বেশি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার আর্তনাদ।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া রাত ১২টার হিসাব অনুযায়ী, প্রথম দফায় ভোটের গড় হার প্রায় ৯৩ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে, যা ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। কোচবিহারে ৯৬.০৪ শতাংশ আর দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৫.৪৪ শতাংশ ভোট পড়ার এই পরিসংখ্যান কেবল গণতান্ত্রিক সচেতনতার ফল নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার কাহিনি।
বিহারের আদলে পশ্চিমবঙ্গেও এই প্রক্রিয়াটি যখন শুরু হয়, তখন থেকেই লাখ লাখ মানুষের মধ্যে এক অজানা ভয় দানা বেঁধেছিল। শিয়ালদহ বা হাওড়া স্টেশনে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপচে পড়া ভিড় কেবল ভোট দেওয়ার আগ্রহ নয়, বরং নাম কাটা যাওয়ার ভীতি থেকে তৈরি এক বাধ্যতামূলক জনস্রোত। মানুষের এই প্রবল উপস্থিতি তাই আনন্দের চেয়েও বেশি করে হয়ে দাঁড়িয়েছে নাগরিকত্ব টিকিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রাম।
এই নাগরিকত্বের লড়াই কতটা নির্মম হতে পারে, তার প্রমাণ বোলপুরের বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর নন্দলাল বসুর নাতি সুপ্রবুদ্ধ সেনের হয়রানি। সুপ্রিম কোর্ট আর ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ভোটার তালিকায় নাম ফিরে পেলেও তাকে বুথে গিয়ে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। অনেকের কাছে এই ঘটনাটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটির প্রতীক।
আবার পূর্ব বর্ধমানের গলেহারা বেগমের মতো ৮৫ বছর বয়সের বৃদ্ধা, যার সম্বল কেবল একটি ভোটার কার্ড, তাকে যখন ডিজিটাল অ্যালগরিদম ‘যৌক্তিক অসংগতি’র অজুহাতে সন্দেহভাজন করে তোলে, তখন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রথম দফার ভোটে এই অসংখ্য ‘গলেহারা বেগম’ বা ‘সুপ্রবুদ্ধ সেন’দের বুথমুখী হওয়া আসলে ডিজিটাল শাসনের বিরুদ্ধে সশরীরে প্রতিবাদ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল যখন নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে কেড়ে নিতে চায়, তখন মানুষ ব্যালট বক্সকেই তাদের আত্মপরিচয় রক্ষার শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়।
রাজনৈতিক সংঘাতের চিত্রটি প্রত্যাশিত হলেও ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংঘাত হয়েছে বেশ কিছু এবং এই সংঘাতগুলো স্রেফ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এবারের ভোটে নির্বাচন কমিশনের সক্রিয়তা বা অতি-সক্রিয়তা এক বিশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। হিঙ্গলগঞ্জের ওসির আচমকা অপসারণ কিংবা পুলিশের কর্মকর্তাদের গণবদলি রাজ্য সরকারের সঙ্গে কমিশনের এক স্নায়ুযুদ্ধের আবহ তৈরি করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের এই সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লিখেছেন। এমনকি কলকাতা হাইকোর্টও কমিশনের বাইক র্যালি সংক্রান্ত বিধিনিষেধকে ক্ষমতার অপব্যবহার বলে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে।
বিচারপতি রাওয়ের সেই কড়া মন্তব্য যে, ‘কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা ঢাকতে নাগরিকদের হেনস্থা করা হচ্ছে’, তা আসলে গণতান্ত্রিক কাঠামোতে কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রাজনৈতিক বয়ান বা 'ন্যারেটিভ' তৈরির লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর 'ঝালমুড়ি' আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'এসআইআর বিরোধী' তত্ত্ব সমান্তরালে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী যখন কৃষ্ণনগরের সভা থেকে দাবি করেন যে তিনি ঝালমুড়ি খেয়েছেন কিন্তু ঝাল লেগেছে তৃণমূলের, তখন তা কেবল এক রসিকতা ছিল না, তা ছিল প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক রাজনৈতিক কৌশল।
মোদী ৪ মে বিজয়োৎসবের আগাম বার্তাও দিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এসআইআর বিরোধী লড়াই তাকে বাঙালির মান-সম্মান রক্ষার নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। তৃণমূলের দাবি, বিপুল ভোট পড়ার অর্থ হলো মানুষ চক্রান্তের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, এবং তারা প্রথম দফাতেই ১২৫ থেকে ১৩৫টি আসন পেতে চলেছে। পাল্টা হিসেবে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীও ১২৫টি আসনের দাবি তুলে লড়াইকে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক স্তরে নিয়ে গেছেন। এরই মধ্যে অমিত শাহ আজ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, মে মাসের ৫ তারিখের পর অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গে বিজেপির শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তার কথায়, ‘‘গভীর রাত পর্যন্ত আমরা বিশ্লেষণ করেছি। ১৫২টির মধ্যে ১১০টির বেশি আসনে বিজেপি জিততে চলেছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আমরা সরকার গড়ব। প্রথম দফায় ভোট দিয়েছেন যারা, তাদের অনেক অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ। ভয় থেকে ভরসার দিকে যাত্রা খুব ভাল ভাবে আপনারা শুরু করেছেন। দ্বিতীয় দফার ভোটারেরা এই যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যাবেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান, নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য পুলিশকে অভিনন্দন। কারণ, বহু যুগ পরে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে কোনও মৃত্যু হয়নি।’’
বিরোধীরা যখন কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রশংসা করছে আর শাসক দল কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনছে, তখন বোঝা যায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা মেরুকরণের শিকার। প্রথম দফার ভোট শেষ হলেও তাই সব প্রশ্নের সমাধান হয়নি। ২৩ এপ্রিলের এই দীর্ঘ দিনের শেষে ১৫২টি আসনের ভাগ্য যখন ইভিএম যন্ত্রে বন্দি হলো, তখন বাংলার মানুষ আসলে এক নতুন দিশার অপেক্ষায় রইল। এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত আমাদের শেখাল যে, শুষ্ক সংখ্যাতত্ত্বের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার আর সম্মানই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের আসল প্রাণভোমরা।
এই নির্বাচন সমাজমানসের এক অদ্ভুত চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছে যা গবেষণার বিষয় হতে পারে। পপ তারকা ঊষা উত্থুপের মতো ব্যক্তিত্ব যখন বলেন যে তিনিও বর্তমান পরিস্থিতিতে কথা বলতে ভয় পান, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রকৃত অবস্থা ধরা পড়ে। ভাতার রাজনীতি বা অনুদানের রাজনীতির বিরুদ্ধে যখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তোলেন, আবার এসআইআর-এর ফলে নাম কাটার ভয়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা যখন নিজের জমানো টাকায় ভিন রাজ্য থেকে ফিরে আসেন, তখন বোঝা যায় উন্নয়ন আর আতঙ্কের এক অদ্ভুত মিশেলে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সমাজ দাঁড়িয়ে আছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার এবারের ভোট কেবল উন্নয়ন বা দুর্নীতির ইস্যু নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঙালি সত্তা আর নাগরিক অধিকার রক্ষার এক মরণপণ লড়াই। এই লড়াইয়ে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আসলে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ফল, যা যে কোনো প্রতিষ্ঠানের শক্তির চেয়েও বড়।