Published : 09 Feb 2026, 03:22 PM
২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কাছে বিএনপির জন্য এক ধরনের কাঠামোগত সুযোগ (structural opening) হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল। দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে না থাকতে পারার ফলে অনেকে মনে করেছিলেন—বিএনপি যেন প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা কখনোই সরলরৈখিক নয়। ক্ষমতার শূন্যতা যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী, নতুন অক্ষ এবং নতুন রাজনৈতিক আচরণও জন্ম দেয়। ফলে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির সামনে যেমন ভূমিধস বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি পরাজয়ের বাস্তব ঝুঁকিও অস্বীকার করা যায় না।
এই সম্ভাব্য পরাজয়ের কারণগুলো বোঝার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, দলীয় কাঠামো, ভোটের মনস্তত্ত্ব এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির সমন্বিত বিশ্লেষণ। বিশেষ করে ছয়টি মাত্রা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—২০১৮ সালের সাজানো নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক ধাক্কা, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের উত্থান, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিস্তার, উন্নয়ন রোডম্যাপের দুর্বলতা, নেতৃত্ব সংকট এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে বিএনপির দুর্বল সম্পর্ক।
২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এক ধরনের ‘institutional shock’—একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধাক্কা—যেখানে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং নির্বাচনি অনিয়ম বিএনপির রাজনৈতিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বিএনপির সংগঠন, নেতৃত্ব এবং কৌশলগত আত্মবিশ্বাসে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক তত্ত্বে বলা হয়, repeated institutional shocks দলকে ‘strategic paralysis’-এ ঠেলে দিতে পারে—অর্থাৎ দল সিদ্ধান্তহীনতা, দ্বিধা এবং কৌশলগত অস্পষ্টতায় ভুগতে থাকে।
২০২৪–২৬ সময়ে বিএনপির আচরণে এই পক্ষাঘাতের লক্ষণ স্পষ্ট—আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিয়ে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে না পারা, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের পক্ষে ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়া, সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ উপস্থাপন করতে না পারা এবং মাঠ পর্যায়ে সংগঠনের কোন্দল ও বিভাজন। ফলে যে রাজনৈতিক স্পেসটি বিএনপির দখলে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি আংশিকভাবে খালি পড়ে থাকে।
এই শূন্যতা ব্যবহার করেছে জামায়াতে ইসলামীর মতো দল। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় জামায়াত একটি আদর্শিক-ক্যাডার দল—যেখানে সংগঠন, শৃঙ্খলা, মতাদর্শগত প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদ, মাদ্রাসা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা যে সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে, তা অনেক সময় ভোটের অঙ্কের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুই দলই ‘catch-all party’—যারা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করে। কিন্তু ক্যাচ-অল দলের সংগঠন সাধারণত ঢিলেঢালা; আদর্শিক শৃঙ্খলা দুর্বল এবং ক্ষমতার বাইরে থাকলে তাদের সংগঠন দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। বিএনপির ক্ষেত্রে এই ক্ষয় এখন দৃশ্যমান।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের বিজয় কেবল ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজে এক ধরনের ‘micro-level ideological consolidation’—ক্ষুদ্রস্তরে আদর্শিক পুনর্গঠনের—ইঙ্গিত। ছাত্রশিবিরের এই সাফল্য দেখায় যে জামায়াতের সংগঠন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো বিকশিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আদর্শিকভাবে দৃঢ়। রাজনৈতিক তত্ত্বে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হলো ‘political recruitment ground’—রাজনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্র। সেখানে যে দল শক্তিশালী, ভবিষ্যতের রাজনীতিতেও তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ছাত্রশিবিরের এই উত্থান বিএনপির জন্য একটি সতর্ক সংকেত—কারণ এটি দেখায় যে জামায়াত কেবল মাঠ পর্যায়ে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংগঠনিক স্তরেও পুনরুত্থান ঘটাতে সক্ষম হয়েছে এবং বিকল্প শক্তি হিসেবে জামায়াতের সম্ভাবনা বাড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিস্তার। ৭৯টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা যে কোনো দলের জন্যই একটি গুরুতর সংকেত। এর মধ্যে ৪৬টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির তীব্র লড়াই হবে—যা সরাসরি ভোট বিভাজন ঘটাবে বলে সংবাদমাধ্যম অন্যান্য সূত্রের জরিপ বলছে। রাজনৈতিক তত্ত্বে অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে বলা হয় সংগঠনের বৈধতা-ক্ষয়—যেখানে দল ভোটারের কাছে অস্থির, অনিশ্চিত ও নেতৃত্বহীন হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই অভ্যন্তরীণ লড়াই বিএনপির সম্ভাব্য বিজয়ের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো উন্নয়ন রোডম্যাপের প্রশ্ন। বিএনপি জনগণকে আকৃষ্ট করার মতো কোনো সুস্পষ্ট উন্নয়ন রোডম্যাপ নির্বাচনি ইশতেহারে উপস্থাপন করতে পারেনি। বরং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণার শুরুতে বিএনপি নেতাদের নানাবিধ বক্তব্য জনমানসে হাস্যরস ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক তত্ত্বে উন্নয়ন রোডম্যাপকে ভবিষ্যৎ বৈধতার প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা হয়—যে দল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রূপকল্প স্পষ্টভাবে দিতে পারে, তার প্রতি ভোটারের আস্থা বৃদ্ধি পায়। বিএনপি সেই রূপকল্পকে আকর্ষণীয় ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য রূপে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এর বিপরীতে জামায়াতও কোনো গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন রোডম্যাপ দিতে পারেনি—তাদের শক্তি মূলত আদর্শিক ও সাংগঠনিক স্তরে, উন্নয়নভিত্তিক রূপকল্পে নয়। এই সীমাবদ্ধতা বিএনপির জন্য একটি ইতিবাচক উপাদান হিসেবে কাজ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি নতুন রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সেখানে জামায়াতের সমর্থকদের একচেটিয়া প্রভাব এখন স্পষ্ট। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হলো নতুন জনপরিসর—যেখানে মতাদর্শ, পরিচয় ও রাজনৈতিক আনুগত্য গঠিত হয়। এই পরিসরে বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি অনেকটাই নগণ্য। জামায়াতের সমর্থকদের এই একচেটিয়া প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমর্থনভিত্তির সামাজিক বুননে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কিনা—তা স্পষ্ট হবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে, যদি নির্বাচন সত্যিকার অর্থে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়।
এই বিশ্লেষণে আরও একটি মাত্রা যুক্ত হয়েছে—জামায়াতের জনসভা ও র্যালির প্রকৃতি। বিএনপির সমকক্ষ না হলেও দেখা গেছে, জামায়াতের জনসভাগুলোতে সারা দেশেই উল্লেখযোগ্য জনসমাগম হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি নিয়ে তারা র্যালি করেছে—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন সংযোজন। জামায়াতের জনসমাবেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এ দলটির কর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোতে এমন ধারাবাহিক অংশগ্রহণ সাধারণত দেখা যায় না। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই জনসমাগম কি কেবল সংগঠিত ক্যাডারদের উপস্থিতি, নাকি এর বাইরে জামায়াতের প্রকৃত জনসমর্থনও বৃদ্ধি পেয়েছে? অতীতের নির্বাচনি ফলাফল দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না, কারণ গত কয়েকটি নির্বাচনে জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে আবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তবে স্পষ্ট হবে—জামায়াতের দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বাইরেও কতটুকু জনসমর্থন রয়েছে।
এবার আসা যাক নেতৃত্ব সংকটের প্রশ্নে। রাজনৈতিক তত্ত্বে নেতৃত্বকে দলের দিকনির্দেশক শক্তি বলা হয়—যে শক্তি সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখে, কৌশল নির্ধারণ করে এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করে। বিএনপির ক্ষেত্রে এই নেতৃত্ব কাঠামো দুর্বল, অস্পষ্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল। মাঠ পর্যায়ে নেতৃত্বের ভাঙন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোদুল্যমানতা—সব মিলিয়ে দলটি একটি সুসংহত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারছে না। এই নেতৃত্ব সংকট নির্বাচনি ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে আসার পর প্রাথমিকভাবে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। নেতৃত্বের এই ওঠানামা এবং প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধানও নির্বাচনে বিএনপির ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সবশেষে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র—প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক—নির্বাচনি ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে বিএনপির এই নেটওয়ার্কে প্রভাব কমে গেছে। রাজনীতি বিজ্ঞানে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ককে বলা হয় ‘প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার’—যে প্রবেশাধিকার একটি দলকে নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় কাঠামোগত সুবিধা দেয়। বিএনপি সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এর বিপরীতে জামায়াতের সংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো এবং সামাজিক নেটওয়ার্ক তাদেরকে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে থেকেও একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
এদিকে ভোটের সমাজতত্ত্বও বিএনপির জন্য পুরোপুরি অনুকূল নয়। অমুসলিম ভোট—বিশেষ করে অধিকাংশ হিন্দু ভোট—ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ভোট বাক্সে গিয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই ভোট বিএনপির দিকে যাবে—এমন ধারণা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হিন্দু ভোটের একটি অংশ জামায়াতের দিকেও কিছুটা ঝুঁকছে। নারী ভোটের ক্ষেত্রেও চিত্রটি জটিল। জামায়াতের নারীবিষয়ক বক্তব্য কর্মজীবী ও শিক্ষিত নারীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে, ফলে নারী ভোটের বড় অংশ বিএনপির দিকে যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মীয় ভাষ্য ব্যবহার করে জামায়াত নারীদের একটি অংশকে প্রভাবিত করতেও সক্ষম হয়েছে। এবার আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটদানে বিরত থাকতে পারে। তবে যারা ভোট দেবেন—বিশেষত যাদের ‘ফ্লোটিং ভোটার’ বলা হয়—তাদের ভোটের বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এই ভাসমান ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জামায়াতকেও ভোট দিতে আগ্রহী। এসবের পাশাপাশি বিএনপির মাঠপর্যায়ের এক শ্রেণির নেতাকর্মীর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া—নির্বাচনে দলের প্রতি জনগণের একটি অংশকে বিমুখ করতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতি করার ফলে বিএনপির সমর্থকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামবাদী বয়ানের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে—যা শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে জামায়াতকে একটি অতিরিক্ত রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে।
এই সব মিলিয়ে পরিসংখ্যানগতভাবে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে—অমুসলিম ভোটের বড় অংশ, নারী ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ এবং নিজেদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক—সব মিলিয়ে একটি অনুকূল সমীকরণ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু তবু বিএনপি পরাজিত হতে পারে—যদি নির্বাচন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রভাবিত হয়, অথবা যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজবুনটে (Social fabric) কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটে থাকে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি ইঙ্গিত দেয়—দুই-মেরু রাজনীতি ভেঙে নতুন ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে, যেখানে জামায়াত একটি স্বতন্ত্র মেরু হিসেবে উঠে আসছে এবং বিএনপি প্রধান অক্ষ থেকে সরে যাবার একটা ঝুঁকির মুখোমুখি রয়েছে।
বাংলাদেশ এখন তার রাজনীতির এক ধরনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিএনপির সামনে যেমন ভূমিধস বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি পরাজয়ের ঝুঁকিও বাস্তব। এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে দলীয় সংগঠনের দুর্বলতা, কৌশলগত অস্পষ্টতা, নেতৃত্ব সংকট, রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক, ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক ধাক্কা, ভোটের সমাজতাত্ত্বিক পরিবর্তন, ছাত্রশিবিরের উত্থান, উন্নয়ন রোডম্যাপের দুর্বলতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতের একচেটিয়া প্রভাব, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিস্তার, এবং জামায়াতের জনসমাগমের প্রকৃতির সমন্বয়ে।
বিএনপি যদি এই নির্বাচনে এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল, সংগঠন ও নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়—বিশেষত আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনি প্রতিযোগিতাতেও জয় নিশ্চিত করতে না পারে—তবে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দুই-মেরু রাজনৈতিক কাঠামো থেকে তাদের ধীরে ধীরে অপসৃত হওয়ার একটি কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হবে। এই সম্ভাব্য শূন্যতা পূরণের ক্ষেত্রে জামায়াত, তার সীমিত হলেও গভীর সামাজিক শিকড়, আদর্শিক সংগঠন এবং ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে, একটি বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান সম্প্রসারণের চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তবে এই অগ্রযাত্রা কতদূর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে—তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরের সামাজিক রূপান্তর, রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার গতিপথের ওপর।