Published : 21 May 2026, 02:19 AM
মানব সমাজে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন, ক্ষমতার পালাবদল কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে সীমিত নয়। গণতন্ত্রের মূলভিত্তি ন্যায়বিচার। নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের সমান সুযোগ এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র কাগজে লেখা মরা শব্দে পরিণত হয়। মানুষ ভোট দেয় শুধু সরকার গঠনের জন্য নয়, ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্যও। ওই বিচার যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তবে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষয়ে যায়।
তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের বিচারহীনতার ইতিহাসে এমনই এক বেদনার প্রতীক। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পরে শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খালের পাড়ে তার মরদেহ পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের সন্তান হারানোর কষ্টগাথা নয়; সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার নির্মম বার্তাও। ওই বার্তা হচ্ছে—ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে, মূল্য দিতে হবে।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। তিনি একজন সাংস্কৃতিক ও নাগরিক আন্দোলনের নেতা। নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে তিনি অন্যায়, সন্ত্রাস এবং ওসমান পরিবারের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সরব। তার কণ্ঠ থামাতে না পেরে সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে; এমন বিশ্বাস শুধু পরিবারের নয়, সাধারণ মানুষেরও।

ত্বকীর পরিবারের অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের নির্দেশে তার ভাতিজা আজমেরী ওসমান ও ছেলে অয়ন ওসমানের নেতৃত্বে টর্চার সেলে ত্বকীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। ফলে বর্তমান সংসদের এমপিদেরও দায় রয়েছে এই হত্যার সুষ্ঠু বিচারে ভূমিকা রাখার। না হলে খুনের দায়ে অভিযুক্ত একজন সদস্য জাতীয় সংসদে বসতেন, এমন কালিমা মোছার সুযোগ ব্যাহত হবে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে প্রতি মাসে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। মনে রাখা জরুরি, এটি কোনো দলীয় প্ল্যাটফর্ম নয়। আশির দশকের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই জোট দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক অধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম মঞ্চ। নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক চর্চার মূলধারার ২৭টি সংগঠন নিয়ে গড়ে ওঠা এই জোট ধারাবাহিকভাবে অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অংশ এবং বিশেষ করে ওসমান পরিবারের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট।

প্রশ্ন হচ্ছে, ১৩ বছর পরও কেন ত্বকী হত্যার বিচার হয়নি?
এটি কি শুধুই বিচারিক ব্যর্থতা? নাকি রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার সংকট? একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডে র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগপত্রের বিস্তারিত তুলে ধরেছিল। সেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে আসে। অথচ ওই অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়েনি। বছরের পর বছর ধরে মামলাটি ঝুলে আছে। এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু বিচারহীনতা নয়, এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসে আঘাত।
একটি রাষ্ট্র সন্তানহারা মা-বাবাকে কী বলবে? কীভাবে বোঝাবে যে বিচার হবে না? কত বছর অপেক্ষা করলে বিচার পাওয়া যায়? নাকি ক্ষমতাবানদের ছায়া থাকলে বিচার ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়?
বিচারহীনতার সংস্কৃতি কখনো একা আসে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভয়, হতাশা এবং রাজনৈতিক অনাস্থা। মানুষ তখন মনে করতে শুরু করে, রাষ্ট্র সবার জন্য সমান নয়। ক্ষমতার কাছে সাধারণ নাগরিক অনিরাপদ। এই অনুভূতি গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘মাস্তানি সংস্কৃতি’ একটি বাস্তবতা। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা আধিপত্য, ভয়ভীতি ও দখলদারির রাজনীতি বহু পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারকে ঘিরে এমন অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, যখন একটি রাজনৈতিক শক্তি নিজস্ব বলয়কে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের ১ মে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে এক শ্রমিক সমাবেশে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে ত্বকী হত্যার বিচার দাবি করেছিলেন। তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও অন্যায়ের প্রতীক হিসেবে মন্তব্য করেন। ওই সময় বিরোধী দলে থাকা বিএনপি, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের দায় নিয়ে সরব হয়েছিল।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই অবস্থান নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, খালেদা জিয়ার ওই বক্তব্য এখন রাজনৈতিকভাবে ফিরে এসেছে তার ছেলে তারেক রহমানের সামনে। তিনি এখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তারেক রহমান কী করবেন?
এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ক্ষমতায় থাকলে দায়ও নিতে হয়। বিরোধী দলে থেকে বিচার দাবি করা সহজ; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে ওই বিচার নিশ্চিত করা কঠিন। তবু কঠিন কাজটিই করতে হয় গণতান্ত্রিক নেতৃত্বকে। তারেক রহমান যদি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দিতে চান, তবে ত্বকী হত্যার বিচার নিশ্চিত করা তার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিচার চাইতে গিয়ে যেন বিচারিক জুলুম না হয়। রাষ্ট্রের কাজ আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। প্রকৃত অপরাধীর বিচার করা। কারণ ন্যায়বিচারের মানে শুধু শাস্তি নয়, ন্যায়সংগত বিচারও।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, সব ভোটার দলের নয়, দলের বাইরেও ভোটার আছেন। রাষ্ট্র শুধু দলীয় সমর্থকদের জন্য পরিচালিত হয় না। যারা কোনো দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, সেই সাধারণ নাগরিকদের আস্থা অর্জন করাও সরকারের দায়িত্ব। ত্বকী হত্যার বিচার ওই আস্থা পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ হতে পারে।
আজকের বাংলাদেশে মানুষ উন্নয়ন যেমন চায়, তেমনি চায় মর্যাদা ও নিরাপত্তা। তারা জানতে চায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে রাষ্ট্র তাদের পাশে থাকবে কি না। একজন বাবার কণ্ঠ বন্ধ করতে যদি তার সন্তানকে হত্যা করা হয়, আর ওই হত্যার বিচার ১৩ বছরেও না হয়, তবে সেটি শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা নয়; সেটি রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়।
ত্বকী হত্যার বিচার এখন শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। খালেদা জিয়া একসময় এই বিচার চেয়েছিলেন। এখন সময় এসেছে তারেক রহমানের অবস্থান স্পষ্ট করার।