Published : 15 Apr 2026, 06:49 PM
পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার ন্যাশনাল হাইওয়েতে, এই সেদিন, গেল ২ এপ্রিল আগুন জ্বালিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে বিডিও (ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিস) অফিসের ভেতরে সাতজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে জিম্মি করেছে। পুরো ৯ ঘণ্টা ধরে জনতা বিচারকদের বাইরে বেরোতে দেয়নি। পুলিশের গাড়ি পৌঁছালে মানুষ তাদের ওপর পাথর ছোড়ে। কিন্তু জানেন কি? বিচারকদের জিম্মি করা এই মানুষগুলো কোনো পেশাদার অপরাধী নয়, বরং তারা সেই মানুষ যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে।
বাদপড়াদের কয়েকজন স্বেচ্ছামৃত্যুর ইচ্ছে প্রকাশ করে ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ জীবন বিসর্জন দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে ভোটার কার্ড কেবল পরিচয়পত্র নয়, বরং নিজ দেশে সসম্মানে টিকে থাকার প্রধান রক্ষাকবচ। এর করুণ উদাহরণ উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ার রিনারানি কুন্ডু, যিনি নিজের ও ছেলেদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। একইভাবে মালদহের কাবিল শেখের মৃত্যুও প্রমাণ করে যে, এই প্রশাসনিক জটিলতা সাধারণ মানুষের মনে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। হুগলির আরামবাগে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকাসহ ছয়জন বাসিন্দা রাষ্ট্রপতির কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, রাষ্ট্রহীন হয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে সসম্মানে মৃত্যুই শ্রেয়।
পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। আর এই নির্ণয় কে করেছে জানেন? কোনো বিচারক নন, কোনো কর্মকর্তা নন, একটি ‘সফটওয়্যার’। এখন হয়তো আপনি ভাবছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে অনেক বছর ধরে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) তো একটি প্রয়োজনীয় বিষয়, তাই না?
যখন এসআইআর শুরু হয়েছিল, তখন এটিই বলা হয়েছিল যে ভোটার তালিকায় অনেক অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর নাম রয়েছে যা সরানো দরকার। বিজেপি নেতারা তখন বারবার বলেছিলেন যে বাংলা থেকে ১ কোটির বেশি ভোটার বাদ পড়বে, যার একটি বড় অংশই অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “বাংলার সীমান্তবর্তী এলাকায় জনসংখ্যার গঠনে বিপজ্জনক পরিবর্তন এসেছে।” এটি কি ‘সংখ্যালঘু’ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ারই পূর্বাভাস ছিল?
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগের এই মুহূর্তে রাজ্যজুড়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর এটি নয় যে ‘কে জিতবে’, প্রশ্ন হলো ‘কাদের ভোটাধিকার শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে’।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে সাময়িকভাবে ছেঁটে ফেলা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। শতাংশের হিসেবে এটি পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটারের প্রায় ৮.৫৭ ভাগ। বাদ পড়া এই ভোটারদের অনেককেই বর্তমানে ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ছেঁটে ফেলা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই সংখ্যালঘু মুসলিম এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলোতে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার এখন আইনি মারপ্যাঁচে আটকে গিয়েছে। এরা ঐতিহাসিকভাবেই এই অঞ্চলের রাজনীতির নির্ধারক-শক্তি বলে ধারণা করা হয়।
এই প্রশাসনিক তৎপরতা কি শুধুই ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের ছায়া? নন্দীগ্রামের মতো আসনে বাদ পড়া ভোটারদের ৯৫ শতাংশই সংখ্যালঘু–গবেষণায় উঠে আসা এই তথ্যটি কি কেবলই একটি রাজনৈতিক পরিসংখ্যান, নাকি এটি পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহে একটি বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে? সাধারণ মানুষের মনে ইতিমধ্যেই দানা বেঁধেছে নাগরিকত্ব হারানোর ভয়, যা নির্বাচনের ফলাফলকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার। যাদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করে রাজ্যের ভবিষ্যৎ শাসনভার। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে অন্তত ১১৪টি আসনে এই সংখ্যালঘু ভোটের প্রভাব সরাসরি ফলাফল নির্ধারণ করে দেয়। বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা ৫০ শতাংশের ওপরে, যেখানে জয়ী হওয়া ছাড়া রাইটার্স বিল্ডিং দখল করা অসম্ভব।
২০২১ সালের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটাররা বিজেপিকে রুখতে একজোট হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিল। এর ফলে মুসলিম অধ্যুষিত আসনগুলোতে শাসক দলের স্ট্রাইক রেট ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া এবং ধর্মীয় মেরুকরণের নতুন বয়ান–এই দুটোই আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটকে সংজ্ঞায়িত করে। এখন এই ২৭ শতাংশ ভোটব্যাংকের একমুখী চরিত্রে পরিবর্তন আনতে পারে কি না, সেটিই বর্তমানে বড় প্রশ্ন।
সংখ্যালঘু এই বিশাল জনগোষ্ঠী আজ নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। তাদের এই অস্থিরতার প্রভাব কেবল পশ্চিমবঙ্গের ভেতরের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। এই আগুনের আঁচ কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশেও লাগতে শুরু করেছে। এটি এখন বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতেও প্রবল আলোড়ন তুলতে যাচ্ছে।
নিজেদের দুর্গ ধরে রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এবারও অত্যন্ত কৌশলী পথে হাঁটছে। মুসলিম ভোটব্যাংকের ওপর নিজেদের একাধিপত্য বজায় রাখতে দলটি এবার ৪৭ জন (রেকর্ড সংখ্যক) মুসলিম প্রার্থীকে নির্বাচনি ময়দানে নামিয়েছে।
তৃণমূলের দীর্ঘদিনের রণকৌশল হলো সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং ‘বাঙালি পরিচয়বাদ’–এই দুইয়ের মিশেলে সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত রাখা। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী বা স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পগুলো গ্রামীণ মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়, যা ভোটের বাক্সে বড় প্রভাব ফেলে। দলটির নেতারা বারবার প্রচার করছেন যে, কেবল তৃণমূলই বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মুখে সংখ্যালঘুদের প্রধান ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে তৃণমূলের এই দুর্ভেদ্য দুর্গে এবার ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে আইএসএফ বা হুমায়ুন কবীরের মতো স্থানীয় শক্তিগুলো।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা মুসলিমদেরকে কেবল ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহার করে, কিন্তু প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে না। এই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ নিরসনে এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সংখ্যালঘুদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে তৃণমূল এখন সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই চালাচ্ছে। কেননা তারা জানে এই ভোটাররা হাতছাড়া হওয়া মানেই ক্ষমতার মসনদ হারানো।
অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তাদের প্রচারে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ এবং ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুটিকে সর্বাগ্রে নিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার থেকে শুরু করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী–সবার কণ্ঠেই শোনা যাচ্ছে দ্রুত ডেমোগ্রাফিক বা জনসংখ্যা পরিবর্তনের অভিযোগ।
বিজেপি দাবি করছে যে পশ্চিমবঙ্গ ধীরে ধীরে ‘পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে’ পরিণত হওয়ার পথে এবং হিন্দুরা নিজভূমে সংখ্যালঘু হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে শুভেন্দু অধিকারী ‘সাপ তাড়ানোর কার্বলিক অ্যাসিড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মূলত কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজেপির এই কট্টর অবস্থান হিন্দু ভোটকে সংহত করার লক্ষ্যেই সাজানো, যেখানে তারা দাবি করছে যে, ২০২৬ সালের নির্বাচনই হতে পারে হিন্দুদের ভাগ্য নির্ধারণের ‘শেষ লড়াই’। বিজেপি মনে করে, যদি হিন্দু ভোটাররা ১০০ শতাংশ সংহত হয়, তবে মুসলিম ভোটারদের সমর্থন ছাড়াই তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে। এই রাজনৈতিক বয়ান সরাসরি বাংলাদেশকে একটি ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা দুই দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও আত্মিক বন্ধনকে চরম চাপের মুখে ফেলে দেয়।
ভোটের মুখে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু গ্রামগুলোতে এখন গভীর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনাকে অনেকেই এনআরসির প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মানুষ এখন নাগরিকত্ব বাঁচাতে হন্যে হয়ে তাদের পূর্বপুরুষের দলিল খুঁজছে। তাদের বড় ভয়, ভোটাধিকার হারালে হয়তো শেষমেশ ডিটেনশন ক্যাম্পে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। এই গণ-আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের কট্টর ও বিভাজনমূলক বক্তব্য।
পশ্চিমবঙ্গের অনেক মুসলিম ভোটার এখন নিজেদেরকে রাজনীতির ‘দুধেল গাই’ ভাবছেন। মূলধারার দলগুলোর প্রতি এই অনাস্থা ও মোহভঙ্গ অনেককে হয় কট্টরপন্থার দিকে উসকে দিচ্ছে, নতুবা চরম উদাসীন করে তুলছে। সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য এই দুই প্রবণতাই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কেবল নির্বাচনের দিন নয়, বরং নাগরিকত্বের অধিকার রক্ষায় বছরজুড়ে পাশে থাকবে–এমন এক বিশ্বস্ত অভিভাবক খুঁজছে এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কলকাতার রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ অতি সহজেই ঢাকার কূটনীতি এবং জনমতকে স্পর্শ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যখন নতুন এক বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ককে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা চলছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ঢাকার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভয়, বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়, যদি পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ চরম রূপ নেয়, তবে সিএএ (Citizenship Amendment Act)-এনআরসি (National Register of Citizens) ইস্যু আবারও সামনে চলে আসতে পারে। বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীদের ধারণা, এর প্রভাব বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরও পড়তে পারে।
ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, সীমান্তের একপাশে ধর্মীয় অস্থিরতা তৈরি হলে অন্য পাশে তার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা যখন বাংলাদেশকে ‘সবক শেখানোর’ কথা বলেন বা ড্রোন হামলা চালিয়ে ধ্বংস করার হুমকি দেন, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ঢাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ কেবল প্রতিবেশী রাজ্য নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার, যার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন আদতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের এক বড় ‘লিটমাস টেস্ট’। কারণ ঠিক এই বছরই ফুরিয়ে যাচ্ছে গঙ্গা চুক্তির দীর্ঘ মেয়াদ। তিস্তার শুকনো চরে পানি আসবে কি না, তা-ও ঝুলে আছে পশ্চিমবঙ্গের আগামী রাজ্য সরকার সদিচ্ছার ওপর।
পররাষ্ট্রনীতি দিল্লির বিষয় হলেও পশ্চিমবঙ্গের বাগড়ায় ঢাকার সঙ্গে করা অনেক চুক্তিই অতীতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে গঙ্গার পানি বণ্টন কিংবা তিস্তার দাবি–সবকিছুর ভবিষ্যৎ এখন পশ্চিমবঙ্গের ব্যালট বাক্সে বন্দি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে এই পানি ইস্যুকে তার রাজনীতির তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসলে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া সীমান্ত হত্যা এবং বাণিজ্য সহজীকরণের মতো বিষয়গুলোতেও রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে যদি এমন কোনো শক্তি জয়ী হয় যারা বাংলাদেশকে কেবল ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘উৎপাদনের কারখানা’ হিসেবে দেখে, তবে ঢাকার জন্য কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়বে।
দুই বাংলার সংখ্যালঘু রাজনীতির মধ্যে এক অদ্ভুত মিল ও বৈপরীত্য বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিজেপি হিন্দু ভোটারদের সংহত করতে ‘সংখ্যালঘু পীড়ন’ এবং ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু ব্যবহার করে, বাংলাদেশেও অনেক সময় ভারতবিরোধী স্লোগান বা হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনীতিকে নির্বাচনি হাতিয়ার করা হয়। দুই দেশেই সংখ্যালঘুদের অনেক সময় কেবল ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে দেখা হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা যেমন অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও নাগরিকত্ব রক্ষায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুরাও মাঝেমধ্যে অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একই ধরনের উদ্বেগের সম্মুখীন হন। তবে পার্থক্য হলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুসলিম ভোট সরাসরি ক্ষমতার নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করে, যা বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে সবসময় সত্য নয়।
বাংলাদেশের রাজধানীর সাধারণ চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড–সবখানেই এখন পশ্চিমবঙ্গের ভোটের আলোচনা। শুভেন্দু অধিকারীর কট্টর বক্তব্যগুলো যখন ভাইরাল হয়, তখন বাংলাদেশের নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকে মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন আর কেবল মমতা বা মোদির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
ঢাকার মানুষের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তত সীমান্তে একটি ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করেন, যার ফলে বিজেপির কট্টর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আঁচ সরাসরি বাংলাদেশের ওপর পড়ে না। তিস্তা চুক্তিতে মমতার অনড় অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বড় চিন্তার ব্যাপার। আবার কট্টর বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে সীমান্ত সিল করে দেওয়া বা পুশব্যাকের মতো কঠোর পদক্ষেপের আশঙ্কা বাংলাদেশের মানুষকে আতঙ্কে রাখছে। এই মিশ্র অনুভূতির মধ্যেই বাংলাদেশের মানুষ এক ধরনের অদৃশ্য ভোটযুদ্ধে শামিল হয়ে পড়েছে।
জ্যোতি বসু বলেছিলেন “সরকার চাইলে দাঙ্গা হয়, না চাইলে হয় না”। তাহলে আমরা কি বলতে পারি, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চেয়েছে বলেই পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘুদেরকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে? এত বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম যেভাবে একসঙ্গে ঝুলে আছে, সেটার একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি নিয়ে আমরা এতদিন যা ভেবেছি, তা দুর্বল হয়ে পড়াই স্বাভাবিক।
এখানে বাংলাদেশেরও শেখার আছে যে, প্রতিবেশী দেশের ভেতরের ক্ষমতার সমীকরণ কত সহজে আমাদের নিজেদের সার্বভৌমত্ব আর জননিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে এসে জড়িয়ে যায়! গণতন্ত্র আসলে তখনই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ আর সংখ্যালঘু–দুই পক্ষই সমান মর্যাদায় নিজেদের অধিকার ভোগ করতে পারে, কোনো পক্ষই নিজেকে অনিরাপদ মনে না করে।
দুই বাংলার মানুষেরও তো স্বপ্নটা খুব ভিন্ন নয়। সীমান্তের এপারে-ওপারে এমন নেতৃত্ব আসুক, যারা প্রতিশোধের ভাষা নয়, মানবিকতার ভাষায় কথা বলবে; নতুন বিভাজন নয়, মিল আর সহাবস্থানের কথা বলবে। কারণ দিনের শেষে আমাদের নদী, আমাদের ভাষা, আমাদের ইতিহাস আর পারস্পরিক নির্ভরতা–এসবকে কোনো সীমানা, কোনো কাগুজে রাজনৈতিক সমীকরণ দিয়ে চিরদিন বন্দি করে রাখা যায় না।