Published : 10 Aug 2025, 03:38 PM
তথাকথিত উদারতাবাদীদের প্রশ্নবিদ্ধ করা ও সন্দেহের মধ্যে রাখা দরকার। কেন? শিক্ষা প্রসঙ্গে কয়েকটি উদাহরণ দিলেই উত্তরটি সম্ভবত পাওয়া যাবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার শ্রেণিকরণের ন্যাক্কারজনক চিত্রও তাতে ফুটে উঠবে।
প্রথম উদাহরণটি হলো: ‘লোকটি গরীব কিন্তু সৎ।’ এর অর্থ হলো, গরীব মাত্রই অসৎ, তবে, এই লোকটি ঘটনাচক্রে সৎ হয়ে গেছে! এমনই আরেকটি উদাহরণ হলো: ‘ছেলেটি গরীব কিন্তু মেধাবী।’ অর্থাৎ,গরীবরা সচরাচর মেধাবী হয় না, তবে সুনির্দিষ্ট একটি ছেলে মেধাবী হয়ে গেছে!
আমরা আরও শিখেছি ও শিখিয়েছি, ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে।’ এর দুই বা ততোধিক অর্থ হতে পারে। একটি হলো, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ার অধিকার কেবল শিক্ষিতের। আরেকটি হলো, লেখাপড়া করার উদ্দেশ্যটির সঙ্গেই বৈষয়িক লাভালাভ যুক্ত। আরও একটি অর্থ হতে পারে, শিক্ষিত মাত্রই ধনী আর ধনী মাত্রই সৎ ও মেধাবী (হওয়ার গ্যারান্টি)!
এবার ঈশপের বিখ্যাত খরগোশ ও কচ্ছপের গল্প। এই গল্পে আমরা ফেরি করেছি, সময়ের কাজ সময়ে না করলে আমরা দুর্বলের কাছেও হেরে যেতে পারি কিংবা হাল ছেড়ে না দিলে দুর্বলও জিততে পারে। বেশ! কিন্তু, আমাদের বলা হয়নি কচ্ছপ ওই একবার জিতলেও, এর আগে ও পরে ঠিক কত হাজারবার খরগোশ খেলাটা জিতেছে। এই সত্যটা বলা হয়নি, কারণ আমরা পরাজিতকে ভিলেন বানাতে পছন্দ করি। আর প্রথম তিনটি উদাহরণের সঙ্গে এই উদাহরণটির সম্পর্ক মূলত এই জায়গাতেই: পরাজিত মানেই খল, জয়ী মানেই বীর। গরীব বীর তখনই, যখন সে শিক্ষিত বা সৎ হয়, নইলে সে বরাবরই খল!
বছরের পর বছর শিশুতোষ মনে এমন শ্রেণিঘৃণা উৎপাদন করেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমরা সেসব মুখস্থ করে গেছি। এই বয়ান কে তৈরি করেছে? উদারতাবাদীরা। যেহেতু তারা একটি গরীব লোককে সৎ বা গরীবের সন্তানকে মেধাবী বলেছেন; যেহেতু তারা বলেছেন শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত বৈষয়িক লাভের জন্য, এবং যেহেতু তারা বলেছেন, দুর্বল হলেও তোমাকে আমি জেতার জন্য অনুপ্রেরণা দিব; সেহেতু তখন আমরা হু হু করে উঠেছি; আমরা ধরেই নিয়েছি, তাদের মন্দিরের মতো হৃদয়ে দুর্বলের প্রতি প্রেম খেলা করে এবং তারা অনেক সজ্জন।
কোনো ক্রিটিক্যাল ভাবনা ছাড়াই আমরা তাদের এই লিবারেল বয়ান ও অবস্থানকে স্ট্যাম্পে গেথে নিয়েছি। কিন্তু, অন্দরের শুভঙ্করের ফাঁকিটি আমরা এড়িয়ে গেছি। সেই আলাপই আমরা এই লেখায় করব।
২.
এক বছর হয়ে গেল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের। এক বছর আগে কী ঘটেছিল এবং এক বছর বাদে কী ঘটে চলেছে, তার খতিয়ান আমরা সকলেই কম-বেশি জানছি, দেখছি, বুঝছি। সংস্কার প্রশ্নে অভ্যুত্থানের সব অংশীজনই এখন ব্যস্ত, কেউ কেউ অবশ্য অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব লাভের টম-জেরি খেলা নিয়েও ব্যস্ত। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতেও কেউ কেউ মরিয়া। অথচ, মুষ্টিমেয়বাদে এই দাবিদার অংশীজনদের সিংহভাগের কেউই একটা ‘শিক্ষা কমিশন’ কিংবা বড়জোর একটা ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনের দাবি তুললেন না।
চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবি ছিল কোটাব্যবস্থার সংস্কার। মানে, কর্মসংস্থানের সুষম ব্যবস্থার অধিকার আদায় করে নেওয়াটাই ছিল মুখ্য ব্যাপার। সেই আন্দোলনের ওপর ফ্যাসিস্ট একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো তার স্বভাবগত চরিত্র অনুযায়ী আক্রমণই শুধু করল না, ছাত্রদের জীবন নিল, জীবন নিল সাধারণ মানুষের। শতশত লাশের উপর দাঁড়িয়ে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৭ বছরের জবরদস্তি শাসনের পতন হলো।
শাসকরা বুঝতে অক্ষম থাকেন যে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের একটা গভীর সম্পর্ক আছে (উপরে উদাহরণও আছে)। অথচ, শিক্ষাব্যবস্থার রাজনৈতিক এজেন্ডাটা তারাই ঠিক করেন এবং সেই এজেন্ডাতে শিক্ষা মানে বিদ্যার্জন নয়, বরং শিক্ষা মানে ঔপনিবেশিক মননজাত সেই সোনার হরিণ যা মূলত ‘শিক্ষিত চাকর’ হওয়ার ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ।
৩.
ভারতবর্ষে এই ‘চাকর-প্রার্থী’ মননের জন্ম দিয়েছিলেন থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকওলে, ১৮৩৫ সালে, তার কুখ্যাত মেমোরান্ডাম অব ইন্ডিয়ান এডুকেশনের মাধ্যমে, যেটির সূত্রে ইংরেজি হয়ে গেল মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন বা শিক্ষার বাহন। আর এর কয়েক বছরের মধ্যেই ব্রিটিশের বেনিয়া মন জানিয়ে দিল সাহেবের (মানে সরকারি) চাকরি পাওয়ার অধিকার তারই, যার ইংরেজি ভাষাজ্ঞান আছে। এই যে, শিক্ষাকে চাকরির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, এটা শাসক শ্রেণিরই কায়কারবার ছিল। সেই মনস্তত্ত্ব দিয়েই তারা টেক্সট পড়তে শিখেয়েছে আমাদের— ‘লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে।’
রাষ্ট্রের পর রাষ্ট্র বদল হয়েছে এ মাটিতে। শাসকের পর শাসকও। কিন্তু, মনোজগতের উপনিবেশটা স্থায়ীভাবে রয়ে গেছে, যেটা প্রভাব জমির ওপর ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র চেয়েও ভয়ানক হয়েছে। এই যে সমস্যাটা, সেই সমস্যার ছাঁচে আমরা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করব কি করব না, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে, বাস্তবতাটা মানতে হবে যে, একটা জনপদের বিপুল মানুষের শিক্ষা-সংক্রান্ত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার স্বপ্নসৌধ সাংস্কৃতিকভাবে গেথে গেছে।
এই সাংস্কৃতিক কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমস্ত ইউনিভার্সের বিদ্যা ও বীক্ষণ এক পাল্লায় রেখে ‘জীবনের ধ্রুবতারা’ বানিয়েছে ‘সরকারি চাকরির প্রস্তুতির তথ্য মুখস্থকে’। কাজটা সহজ নয়, কঠিনই। এই কষ্টসাধ্য কাজটা তারা করছেন শ্রেণিবোধে উঁচু হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। তা শিক্ষার কাজ তো শ্রেণি তৈরি করাই, চাকরি সেটার বড় ঘটক, এই যা!
এটাকে বিচ্যুতি বলা যেতে পারে, যেহেতু সময়ান্তরে এই প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। কিন্তু, উপায়ন্তরইবা কী? রাষ্ট্রের কর্মসংস্থান-ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা এমন যে, এখানে একটা চাকরি পাওয়া মানে হলো লটারি পাওয়ার মতো ব্যাপার। সেটাকে আপনি যখন অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোটা-ব্যবস্থা রেখে আরও জটিল করবেন, তখন সেই হাহাকার যে বিস্ফোরণে রূপ নিবে, এ আর আশ্চর্য কী!
৪.
এখন, প্রশ্ন তো সঙ্গতই যে, শিক্ষার্থীরা দুনিয়ার সব চাকরির মোহ ত্যাগ করে কেন সরকারি চাকরি তথা বিসিএসের প্রতি নজর তাক করেছেন? সহজ উত্তরে বলা যায় আর্থিক নিশ্চয়তা।
তবে, উনিশ শতকে দেখা গেছে, শুধু আর্থিক নিশ্চয়তার মোহে ভারতীয়রা, বিশেষত বাঙালিরা, সাহেবের কাচারিতে প্রবেশের জন্য মরিয়া হননি। ‘উল্টাপাল্টা’ ইংরেজি জেনেও তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্তত সাহেবের দাসানুদাসও যদি হওয়া যায়, তাহলে শ্রেণিগত উল্লম্ফন তো হবেই, সঙ্গে সবচেয়ে বড় ঘটনা যেটা ঘটবে সেটা হলো ব্যক্তির মধ্যবিত্তীয় সামাজিক স্ট্যাটাস বদলে যাবে, সমাজে তারা ক্ষমতাবর্গের অংশ হয়ে উঠবেন।
সাহেবের সরকারি নথিপত্র লিখে দিতে পারার 'রাইটার্স' তকমা তাদের সত্যই সামাজিক কাঠামোতে কুলীন করে তুলল। এমনকি সাহেবের চাপরাশি হওয়াও গৌরবের মনে করলেন অনেকেই। কেননা, এতে সমাজমানস তার বা তাদের বাড়তি কদর করে।
উপনিবেশকালের এই মনোজগৎ তো বদলায়নি, বরং মানুষ যত বেড়েছে, প্রতিযোগিতা যত বেড়েছে, সেই জগতটা আরও বেশি গভীরতর হয়েছে।
৫.
উপনিবেশ চলে গেছে প্রায় ৮০ বছর হতে চলল, কিন্তু আমরা যে বদলাতে পারলাম না এতদিনেও, এই আত্মসমালোচনাটা কিন্তু বেশ কম৷ কেন বদলাতে পারলাম না? এর কারণ অনেক হতে পারে। তার মধ্যে শিক্ষা একটা বিশিষ্ট কারণ। ঔপনিবেশিক শিক্ষার মনন দিয়ে আপনি বিঔপনিবেশিক কাঠামো বানাতে গেলে ভোগান্তিতে পড়বেনই পড়বেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ তো দূরের কথা, তাকে ঠিকঠাক মোকাবেলাই করেনি।
দৈবচয়ন পদ্ধতিতে আপনি যেকোনো রাজনীতিক ও আমলা, যারা নীতিনির্মাতা, তাদের জিজ্ঞেস করেন যে শিক্ষা তথা বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার সঙ্গে বাজারের চাকরিব্যবস্থাকে তারা সমন্বয় করার ক্ষেত্রে ঠিক কী কী যুগোপযোগী ভাবনা ভাবেন বা ভাবছেন? তাদের উত্তর হবে খুবই মুখস্থ এবং ক্লিশে। এত বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটের চাকুরির সংস্থান কী করে হবে, উত্তরে তারা উদ্যোক্তা হবার পরামর্শ দিলেও দিতে পারেন।
তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত বিভাগীয় শিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্রের টাকা জলে ফেলা হচ্ছে কেন? উত্তরগুলো এমন উদারনৈতিক হবে যে, আপনি আহ্লাদিত হবেন। আপনার চোখে ঠুলি পরানোর ব্যবস্থা তারা এমনভাবেই করেছেন।
৬.
চাকরির বাজার যে ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে না, সেটার দায়ও ঠিক চাকরির বাজারের নয়। নিশ্চয়ই এর দায় রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতির। তবে, প্রাথমিকভাবে এটা মূলত শিক্ষাব্যবস্থার সংকট থেকেই উদ্ভূত। একটি উদাহরণ দিলে হয়তো ব্যাপারটা সহজ হবে।
১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেলে পরীক্ষাকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘আধুনিক’ তিনটি (কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজ) বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়। ঠিক তখনই আমদানি করা হয় আজকের এসএসসি পরীক্ষার। তখন শিক্ষা বোর্ড ছিল না। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ই এই পরীক্ষার ব্যবস্থাপক ছিল। সেকালে এর নাম ছিল মেট্রিকুলেশন এক্সামিনেশন, মৌখিকভাবে মেট্রিক। দশম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার এ বন্দোবস্তকেই ধরা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের 'প্রবেশিকা' পরীক্ষা হিসেবে।
দুনিয়াব্যাপী টারশিয়ারি এডুকেশন প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে হয়। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে করল দশম শ্রেণি। কিন্তু, ১৮৫৯ সালেই এ প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়ে গেল। তখন ‘মধ্যবর্তী ব্যবস্থা’ হিসেবে আমদানি করা হলো আজকের এইচএসসি পরীক্ষার। এর পোশাকি নাম তখন ছিল ইন্টারমিডিয়েট এক্সামিনেশন ইন আর্টস বা ফার্স্ট আর্টস (এফএ), মৌখিকভাবে ইন্টারমিডিয়েট। এখন পর্যন্ত এই নিয়মেই চলছে সমগ্র ভারতবর্ষ তথা তার উত্তরসূরি দেশগুলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রকল্পটি ব্যর্থ হলেও, দশম শ্রেণি পাশের গুরুত্ব চাকরির বাজারে বেশ তৈরি হলো। দেখা গেল, মেট্রিকুলেশন পাশ করেও যারা আর ইন্টারমিডিয়েটে কিংবা টারশিয়ারিতে যেতে করতে পারছে না, তারা চাকরিতে প্রবেশ করছে। সে আমলে এবং গত আশির দশক পর্যন্ত এসএসসি পাশ বহু শিক্ষক বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পড়িয়েছেন। কিন্তু, আজকের তারিখে এসএসসি পাশ করে মোটামুটি ‘সম্ভ্রান্ত’ চাকরিতে আসার আর সুযোগ নেই। এইচএসসিও তাই, এর গুরুত্ব এখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনেই সীমাবদ্ধ।
তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, চাকরির বাজারে কারা প্রবেশ করবেন, কীভাবে প্রবেশ করবেন, কত দূর যেতে পারবেন, তা নির্ধারিত হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তরের মধ্য দিয়েই।
৭.
কালের বিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষাই এই বাজার বন্দোবস্তের প্রধানতম প্রভাবক হয়ে উঠেছে। কিন্তু, সেই আশির দশক থেকেই বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থাটির এতটাই লেজেগোবরে দশা সৃষ্টি হতে থাকল যে, চাকরির বাজারের বন্দোবস্তটিও ঠিকঠাক কাজ করতে পারল না। ক্রমান্বয়ে সেই সংকট বাড়তে থাকলেও, রাষ্ট্র ও সরকারগুলো সেদিকটায় মনোযোগ দেয়নি। ফলে, একদা তরুণরা স্লোগান দিয়েছিল, ‘শিক্ষা শেষে কাজ চাই, নইলে বেকারভাতা চাই।’ এটাও এদেশের বাস্তবতা ছিল, ভাবা যায়!
নব্বইয়ের দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করতে না করতেই রাষ্ট্র বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য দেশীয় চাকরির বাজারে প্রভাব তৈরির পথ উন্মুক্ত করে দিল। বেসরকারিকরণ বাড়ল; রাষ্ট্রীয় খাতগুলো ব্যক্তিমালিকানায় সোপর্দের ব্যবস্থা করা হলো; সমাজে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকল শ্রেণিব্যবধান।
মূলত, ঝাঁ-চকচকে এক কর্পোরেট দুনিয়ার অন্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল বাজার-অব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে, নব্য-ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে বহুজাতিকরা নিজেদের সাহেবের কাতারে বসিয়ে দেশের টাকা নিয়ে গেল বিদেশে। চাকরির বাজারও মাত্রাতিরিক্ত শোষণমূলক হয়ে উঠল। বেশি বেতন ও আভিজাত্যের খায়েশে যে তারুণ্য বহুজাতিক ও বেসরকারি চাকরির দুনিয়ায় প্রবেশ করতে চাইল, তাকে ধীরে ধীরে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা গ্রাস করতে থাকল।
এমন এক বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়াদের ‘বোধোদয়’ প্রত্যাবর্তন করেছে, এবং তারা অর্থনৈতিক (সাদা-কালোসমতে) নিরাপত্তাজনিত কারণেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য মরিয়া হয়ে গেছে। কিন্তু, বাজারকে পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের যে ভূমিকা এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল, মাঝখান দিয়ে সেটা তার অদক্ষতার কারণে হারিয়ে গেছে।
এখন বিশ্ববিদ্যালয় নয়, উল্টো বাজারই বলে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও বন্দোবস্ত কীভাবে চলবে। বিশ্ববিদ্যালয় সেটাতে প্রত্যাঘাত না করে বরং নিজেকে বাজারের কাছে সোপর্দ করেছে। আগেও করেছিল, কিন্তু এখন তা প্রাদুর্ভাবে পরিণত হয়েছে। চাকরির বাজার তাই অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। অথচ, রাষ্ট্র ও সরকার কত নির্বিকার!
অন্তর্বর্তী সরকারও সে নির্বিকারত্বের পথটাই বেছে নিল। একটা উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের কোনো প্রয়োজনই তারা বোধ করল না। যেটা এই গণ-অভ্যুত্থানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারত, সেটাই হয়ে গেল সবচেয়ে বড় অপ্রাপ্তি— উচ্চশিক্ষা কমিশন। এজন্যই বলেছি, তথাকথিত উদারতাবাদীদের সন্দেহ করুন!