Published : 08 Feb 2026, 06:44 PM
এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে যে ১৭৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, তার একটিতেও কোনো নারী প্রার্থী নেই। অথচ নির্বাচনি ইশতেহারে জামায়াত বলছে, ক্ষমতায় গেলে তারা নারীদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্যকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেবে।
যে দল জাতীয় নির্বাচনের একজনও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি বা দিতে পারেনি, তারা ক্ষমতায় গেলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেবে—এটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সেটি বলার চেয়ে বরং এটি যে একটি সাংঘর্ষিক ব্যাপার, সেটা বলাই শ্রেয়।
আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের একজন নারীকেও মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়টিকে ‘ন্যক্কারজনক’ বলে অভিহিত করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন টিআইবি। তবে নারীদের মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের এই অবস্থানকে ‘প্রত্যাশিত’ বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। এবারের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিও প্রত্যাশিত আসনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়নি। ন্যূনতম ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার যে অঙ্গীকার রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদেও করেছে, সেটিরও বাস্তবায়ন নেই। ৫ শতাংশ হিসেকে এবার অন্তত ১৫ জন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তারা হলেন, ফারজানা শারমিন পুতুল, সাবিরা সুলতানা, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টু, সানসিলা জেবরিন, আফরোজা খান রিতা, সানজিদা ইসলাম তুলি, শামা ওবায়েদ, তাহসিনা রুশদীর লুনা, নায়াব ইউসুফ কামাল ও নাদিরা মিঠু।
শুধু নারীদের মনোনয়নই নয়, বরং এবার নারীদের আরও একাধিক ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী বিতর্কিত হয়েছে। দলটির আমির শফিকুর রহমানের ‘এক্স’ (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে তার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন জানিয়েছেন নারী নেত্রীরা। ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ভবনে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাতে তারা এ সংক্রান্ত লিখিত আবেদন দেন। এ সময় গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু সাংবাদিকদের বলেন, সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে যে অবমাননাকর, কুরুচিপূর্ণ ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন, তা শুধু নারীদের প্রতি চরম অবমাননাই নয়, দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী, আত্মমর্যাদাশীল ও অবদানশীল নারীর শ্রম, সম্মান ও সামাজিক ভূমিকার সরাসরি অস্বীকৃতি। আমিরের ওই মন্তব্যকে ‘হ্যাকিং’-এর ফল বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে এই দাবি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে মনে করেন নারী নেত্রীরা। এছাড়া জামায়াতের আরও একাধিক নেতার নারীবিদ্বেষী মন্তব্য নিয়েও সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হয়েছে।
নারীদের নিয়ে যখন জামায়াতের এই অবমাননার অভিযোগ, ঠিক তখনই রাজনৈতিক পরিসরে এরকম গুঞ্জন রয়েছে যে, এবার বিপুল সংখ্যক নারীদের ভোট পাবে জামায়াত। মূলত দলটি এবার নারী ও তরুণদেরকেই টার্গেট করেছে। ফজরের নামাজের পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন জামায়াতের নারীকর্মীরা। এমনকি নারীদেরকে বেহেশতের লোভ দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। যা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে এই ধর্মভিত্তিক দলটি।
নির্বাচনি ইশতেহারে জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীদের মর্যাদা রক্ষা করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মাতৃত্বকালে মায়ের সম্মতিক্রমে দৈনিক কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হবে।
প্রসঙ্গত, নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়টি নিয়েও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল জামায়াত। কারণ প্রথমে তারা মাতৃত্বকালে যে কর্মঘণ্টা কমানো হবে, সেটি পরিষ্কার করেনি। যে কারণে তখন প্রশ্ন উঠেছিল যে, ৫ ঘণ্টা কাজ করিয়ে কি পূর্ণ সময় তথা ৮ ঘণ্টার বেতন দেওয়া হবে? এটি কি পুরুষের সঙ্গে তার বৈষম্য তৈরি করবে না? তাছাড়া সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, বিশেষ করে যেখানে দৈনিক কর্মঘণ্টা ঠিক রাখা সম্ভব হয় না—সেখানে নারীদের কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা কতটা বাস্তবসম্মত? উপরন্তু, যে নারীরা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন বা বা নিজের ক্যারিয়ারের প্রশ্নে এমনিতেই ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করেন, তাদের কর্মঘণ্টা কমানোর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত ও যুক্তিযুক্ত সেই প্রশ্নও উঠেছিল। মূলত এসব সমালোচনার কারণেই জামায়াত তাদের ইশতেহারে বিষয়টি পরিষ্কার করে মাতৃত্বকাল এবং সংশ্লিষ্ট নারীর সম্মতির বিষয়টি যুক্ত করেছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে জামায়াত জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠন করে সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নারী চলবে নির্ভয়ে—এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস, গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নারীর নিরাপত্তায় ইমার্জেন্সি পোল স্থাপন, জীবনব্যাপী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সুযোগ চালু করে নারীদের কর্মজীবনে ফিরে আসার পথ তৈরি করাসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কর্মজীবী নারীদের ব্যাপারে জামায়াতের যে দৃষ্টিভঙ্গি এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তারা ক্ষমতায় গেলেও এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করবে বা করতে পারবে—তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে।
গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে স্বাবলম্বী করতে হাঁস-মুরগীর খামার, গবাদি পশু পালন, মাছ চাষ ইত্যাদি প্রকল্প তৈরিতে সরকারি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছে জামায়াত। সেইসঙ্গে বলেছে নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা। যার সঙ্গে বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ মিল রয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে—যার বিপরীতে প্রত্যেক মাসে একজন নারী দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা পাবেন অথবা ওই টাকার সমপরিমাণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারবেন। বিএনপি মনে করে, এই উদ্যোগ নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
এটা ঠিক যে, কর্মজীবী নারী বা স্বচ্ছল নারীর জন্য এই ফ্যামিলি কার্ড খুব আকর্ষণীয় কিছু হবে না। কারণ মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা তার সংসারে খুব বেশি কিছু যোগ করবে না। কিন্তু যিনি কর্মজীবী নন, বিশেষ করে প্রান্তিক নারীদের জন্য মাসে আড়াই হাজার টাকা হয়তো কম নয়। বিএনপি যদিও এটা পরিষ্কার করেনি যে, কোন প্রক্রিয়ায় এই ফ্যামিলি কার্ড কাদেরকে দেওয়া হবে। একজন চাকরিজীবী বা স্বচ্ছল নারীকেও এই কার্ড দেওয়া প্রয়োজন কি না—সেটি বড় প্রশ্ন।
দ্বিতীয়ত, নারী বলতে কত বছর বয়স থেকে বোঝানো হবে। আবার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি প্রাথমিকভাবে যদি এক কোটি নারীকেও অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে এই বিপুল অঙ্কের টাকা রাষ্ট্র কোথা থেকে জোগাড় করবে, সেটিও প্রশ্ন।
সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, পরবর্তী সরকারকে দারুণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। মনে রাখতে হবে, অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে গত দেড় বছরে প্রচুর কল-কারখানা বন্ধের ফলে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর। এরকম পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের এবং কর্মহীন মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষাবলয় বিস্তৃত করা যেমন জরুরি, তেমনি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে খরচ বাড়লে সেই বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে বা এই টাকা সংগ্রহে রাষ্ট্রের কৌশল কী হবে—সেটি নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ নেই।
বাংলাদেশের বাস্তবতায়, রাজনৈতিক দলের ইশতেহার মূলত সুন্দর সুন্দর কথার ফুল দিয়ে গাঁথা একটা প্রতিশ্রুতির মালা—যে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা বাধ্যতামূলক নয় এবং যে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কোনো ধরনের জবাবদিহির মধ্যে পড়তে হয় না।
ইশতেহার দেখে মানুষ ভোট দেয় কি না—সেটি পুরোনো তর্ক। তবে ইশতেহারের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। তাছাড়া রাজনীতির ইতিহাস লেখা ও পর্যালোচনার জন্য ইশতেহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনি ইশতেহারে একটি দলের রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিজ দলের আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা এবং জনগণের প্রতি তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকে। যদিও শেষমেষ তারা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারে বা পারে না, তা নিয়েও বিতর্ক আছে।
উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ধরেই দলগুলোকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা যায়। বাংলাদেশে এখনও এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া ভোটের আগে দেওয়া ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো মানুষও ভুলে যায়। কেননা তখন তাদের সামনে জাগতিক অন্য অনেক বিষয় মুখ্য হয়ে দেখা দেয়। বাংলাদেশের মতো দেশে নাগরিকদের দৈনন্দিন চাহিদা ও প্রয়োজনগুলোই সামনে আসে। ফলে ইশতেহারে উল্লিখিত অনেক সুন্দর সুন্দর বাক্য দুই মলাটেই আটকে থাকে।
নির্বাচনি ইশতেহারের একটি বড় সমস্যা হলো, অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ইশতেহারে উল্লেখ করা হয় না। এটা অনেকটা ভিশন ও মিশনের মতো। নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রতিটি দলের ভিশন হিসেবে দেখা হলেও এগুলো বাস্তবায়নের মিশনসমূহ অনুপস্থিত থাকে বা অনুল্লিখিত থাকে। আবার অনেক প্রতিশ্রুতি থাকে দূরবর্তী বা উচ্চাভিলাষী—যা শুনতে ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য নয়। ইশতেহার প্রণয়নে দলগুলোরও টার্গেট থাকে জনতুষ্টি। অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে জনগণকে খুশি করা। কিন্তু দলের নেতারাও জানেন, ভোটের পরে এমন সব সমস্যা সামনে আসবে যে, মানুষও ওইসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই ভুলে যাবে।