Published : 05 Feb 2026, 07:50 PM
সংখ্যা দিয়ে রাজনীতি নতুন নয়। তবে নির্বাচনের মুখে যখন অর্থনীতি হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্বাসের জায়গা, তখন সেই সংখ্যাগুলোর ওজন বাড়ে কয়েক গুণ। জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারও তার ব্যতিক্রম নয়। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা—সব মিলিয়ে ইশতেহারের অর্থনীতি অংশ পড়তে পড়তে মনে হয়, কাগজে-কলমে বাংলাদেশ যেন ইতিমধ্যেই উন্নয়নের আরেক ধাপে পা রেখেছে। কিন্তু এই অঙ্কগুলো কী বাস্তবতার সঙ্গে মেলে, নাকি আগের মতোই ভোটের আগের পরিচিত সংখ্যার রাজনীতি? বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জামায়াতের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো তাই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড়া করায় আমাদের।
মানুষ সংখ্যাকে পছন্দ করে, গুরুত্ব দেয়। একটি সংখ্যা অনেক কিছু বর্ণনা করে, সহজে বুঝিয়ে দেয়। সংখ্যা বড় বা ছোট হওয়ার মধ্য দিয়ে সফলতা কিংবা ব্যর্থতা বুঝানো হয়। যেমন-ক্লাসে রোল নং যত কম হবে, সেই শিক্ষার্থীকে তত সফল বলা যায়। আবার ফুটবল খেলায় গোল সংখ্যা যত বেশি হবে সেই দলই বিজয়ী হয়। এভাবেই সংখ্যা আমাদের জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
রাজনীতিতে তাই সংখ্যার গুরুত্ব অনেক বেশি। সহজেই ভোটারদের কানেক্ট (সংযোগ) করতে এই চর্চা হয়ে আসছে বছরের পর বছর। আবার সেই রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় যায় তখন নিজের সরকারের সফলতা দেখাতে কখনো সংখ্যাকে বড় করে আবার কখনো ছোট করে দেখায়। যেমন, মূল্যস্ফীতি বা জীবনযাত্রার ব্যয়কে কমিয়ে দেখানো। আবার জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু আয়কে বেশি দেখানো।
বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা ১৫ বছরের বেশি সময়ের শাসনামলে আমরা এমন চিত্র দেখেছি বারবার। তারা রাজনীতির ময়দানে সংখ্যাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যা নিয়ে টিভি টকশো কিংবা পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে নিয়মিত আলোচনা হয়েছে; সেই সব আলোচনাও যে সবসময় প্রকৃত সত্য বলেছে, এমন নয়। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, কিভাবে হাসিনা সরকার জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়ে দেখিয়েছিল।
সংখ্যার সেই একই ধারা জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারে দেখা গেল। সেখানে অর্থনীতি নিয়ে কিছু উচ্চাভিলাষী সংখ্যা ধরা হয়েছে। অর্থনীতি নিয়ে নিয়মিত কাজ করার সুবাদে যে সংখ্যাটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে তাহলো, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাময়িক হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বা জিডিপি ধরা হয়েছে ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হবে না এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি বেড়ে হবে কমবেশি ৪৮৫ বিলিয়ন ডলার। ইশতেহারে বলা হয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে ক্রমান্বয়ে ৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে। তার মানে হঠাৎ করে জিডিপি বাড়বে না।
তাহলে ধরে নিই আগামী ৫ বছর গড়ে ৭ শতাংশ করে জিডিপি বাড়বে। তার পরের ৫ বছর গড়ে ৮ শতাংশ এবং এর পরের ৫ বছর গড়ে ৯ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি হবে। ইশতেহারে কোন ক্যালকুলেশন দেখানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে দুই ট্রিলিয়ন ডলার হবে। যদি সাধারণ হিসাব করা হয়, তাহলে প্রথম ৫ বছরে জিডিপি বেড়ে হবে ৬৮০ বিলিয়ন ডলার।
পরের ৫ বছরে ৯৯৯ বিলিয়ন বা এক ট্রিলিয়ন ডলার ধরা যায়। শেষ ৫ বছরে হয় ১ হাজার ৫৩৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০৪০ সালে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি দুই ট্রিলিয়ন নয় বরং দেড় ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে। যদি আগামী ১৫ বছর ধারাবাহিকভাবে প্রতি ৫ বছর অন্তর গড়ে ৭, ৮ ও ৯ শতাংশ করে বাংলাদেশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে তাহলেই সেটা সম্ভব।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, একই সময়ে মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলার করা হবে। কিন্তু প্রতি বছর কী হারে বাড়বে সেটা বলা নেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসেবে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২০ ডলার। আগের মতই প্রবৃদ্ধি ধরে যদি হিসাব করা হয় তাহলে ২০৪০ সালে গিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৯ হাজার ডলারের মত।
কিন্তু মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে এত বেশি প্রবৃদ্ধি হওয়া সম্ভব নয়। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে মাথাপিছু আয় বেড়েছিল ৩ শতাংশের মত। তাই বলা যায় সংখ্যাটি হয়তো ৯ হাজার ডলার হওয়া সম্ভব নয়। একটি হাইপোথিসিসের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ গাণিতিক সূত্র দিয়ে সংখ্যাগুলোর কথা বলছি।
কিন্তু এর মাঝে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব কিছু তো নিশ্চয়ই থাকবে। যদি সেগুলো নাও থাকে তবুও এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ যে সম্ভব নয় তা সাধারণ হিসেবেই দেখা যায়। এই আলোচনা থেকে তাই এ উপসংহারে আসা যায় যে, আগের মতই কিছু সংখ্যা জনগণের সামনে আনা হচ্ছে যাতে বাস্তবতা কম।
ঠিক একই ধরনের কিছু লক্ষ্যমাত্রা দেখা গেছে বিগত সরকারের বাজেটে। প্রতি বছর সরকার রাজস্ব বোর্ডকে বড় একটি লক্ষ্যমাত্রা বেধে দিত, কিন্তু বছর শেষে তা পূরণ করতে পারত না সংস্থাটি। একই ধারা অব্যাহত আছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর এই ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা বা ২০ শতাংশ পিছিয়ে আছে রাজস্ব বোর্ড।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট রাজস্ব আয় ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা ধরেও পরে তা কমিয়ে ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এর বড় অংশই আদায়ের লক্ষ্য ছিল রাজস্ব বোর্ডের কিন্তু বাস্তবে তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করেছে সরকার। এর মধ্যেও বৃহৎ অংশ অর্জন করতে হবে রাজস্ব বোর্ডকে। চলতি অর্থবছরেও তা অর্জন করতে না পারার শঙ্কা প্রথম ছয়মাসেই দেখা দিয়েছে।
এসব পরিস্থিতির কারণে, অর্থ বছর শেষে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পড়তে হয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। আসছে নতুন সরকারের সামনেও চেয়ারম্যানকে আরো বিব্রত হতে হবে। কারণ, যে রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠন করুক না কেন তারা বলেছে, সরকারি চাকরিজীবিদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রয়োজন ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদিও বলেছে, এই অর্থের সংস্থান তারা করে যাবে। কিন্তু ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে থেকে কিভাবে এই টাকার সংস্থান করা হবে, তা এখনো আমাদের সামনে স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত তার ইশতেহারে ঘোষণা দিল, তারা যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েই যায়, তাহলে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।
এটি বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু জামায়াত তার ইশতেহারে বলছে, ব্যক্তি করমুক্ত আয় সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা (৯০ পাতার ইশতেহারে ৫ লাখ, তবে কোথাও কোথাও ৬ লাখ বলা হয়েছে) এখন যেটা সাড়ে ৩ লাখ আছে। আবার করপোরেট কর কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ জামায়াত মধ্যম-মধ্যমবিত্ত ও মধ্যবিত্ত করদাতা ও ব্যবসায়ীদের খুশি রাখতে চাইছে। এই ছাড়ের ফলে যে পরিমাণ কর কমবে নিশ্চয়ই সেটা অন্যখাত থেকে সংগ্রহ করে বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে কর আহরণে আটোমেশন ও কর ফাঁকি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে জামায়াত। সেটা কী এক দুই বছরে করা সম্ভব?
রাজস্ব বোর্ডকে আলাদা করার যে উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গিয়েছিল আমরা দেখছি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে গতিশীলতা আনতে বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বন্দরের অচলাবস্থাও দেখতে পাচ্ছি। আগামীতে কর ফাঁকি বন্ধে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার ফলাফল হিসেবে হয়তো বিভিন্ন পক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে বেঁকে বসবেন।
এখানেই জামায়াত দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসতে পারলেই কি রাতারাতি দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব? দুর্নীতির যেসব স্তরে হাত দিতে হবে—ফুটপাত থেকে শুরু করে ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিসসহ নানা দপ্তরে—সেখানে হঠাৎ কঠোর পদক্ষেপ নিলে বহু মানুষ এক লহমায় কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বে।
এসব মানুষের ওপর আবার নির্ভরশীল পরিবার আছে। সব মিলিয়ে এদের সংখ্যা হবে উপেক্ষা করার মতো নয়। এরা একত্র হয়ে সরকারের বিপক্ষে সড়কে নামলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? তাই বলে কী আমরা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাইব না? অবশ্যই। তবে সেটা পর্যায়ক্রমে আসতে হবে। হঠাৎ করেই কিছু করা সম্ভব হবে না। তথা রাতারাতি কোন পরিবর্তন আসবে না।
সব কিছু মিলিয়ে চিত্রটা এমন যে, ভোটের আগের প্রচারণা যেন বিয়ে বাড়ির হৈ-হুল্লোড়। বিয়ে শেষে বর-কনে নিজ ঘরে ফিরে যায়। মধুচন্দ্রিমা শেষ করার পর শুরু হয় সংসারের বাস্তবতা। নির্বাচনের আগের অনেক প্রতিশ্রুতি, সংখ্যা মিষ্টি লাগবে ঠিক বিয়ে বাড়ির মতই। তবে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু হবে বাস্তবতা।
বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক চাপের মুখে আছে তা কাটিয়ে তুলতে একদিকে যেমন প্রয়োজন বাড়তি রাজস্ব আদায়, সেই জন্য দরকার হবে ব্যাপক সংস্কারের। কিন্তু এই সংস্কার করতে গেলেই সরকারের সামনে আসবে প্রচণ্ড বাধা।
রাজস্বের পাশাপাশি বাড়াতে হবে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স। প্রচণ্ড চাপ থাকবে ঋণ পরিশোধের। বন্ধ করতে হবে অর্থপাচার। এসব বাস্তবতা কিভাবে নতুন সরকার সামাল দিবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। নির্বাচনের আগের মিষ্টি কথা তখনকার বাস্তবতায় হয়তো থাকবে না।
এসব পরিস্থিতির কারণে, অর্থ বছর শেষে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পড়তে হয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। আসছে নতুন সরকারের সামনেও চেয়ারম্যানকে আরো বিব্রত হতে হবে। কারণ, যে রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠন করুক না কেন তারা বলেছে, সরকারি চাকরিজীবিদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রয়োজন ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদিও বলেছে, এই অর্থের সংস্থান তারা করে যাবে। কিন্তু ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে থেকে কিভাবে এই টাকার সংস্থান করা হবে, তা এখনো আমাদের সামনে স্পষ্ট নয়।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু জামায়াত তার ইশতেহারে বলছে, ব্যক্তি করমুক্ত আয় সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা (৯০ পাতার ইশতেহারে ৫ লাখ, তবে কোথাও কোথাও ৬ লাখ বলা হয়েছে) এখন যেটা সাড়ে ৩ লাখ আছে। আবার কর্পোরেট কর কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ জামায়াত মধ্যম-মধ্যমবিত্ত ও মধ্যবিত্ত করদাতা ও ব্যবসায়ীদের খুশি রাখতে চাইছে। এই ছাড়ের ফলে যে পরিমাণ কর কমবে নিশ্চয়ই সেটা অন্যখাত থেকে সংগ্রহ করে বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে কর আহরণে আটোমেশন ও কর ফাঁকি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে জামায়াত। সেটা কী এক দুই বছরে করা সম্ভব?
রাজস্ব বোর্ডকে আলাদা করার যে উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গিয়েছিল আমরা দেখছি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে গতিশীলতা আনতে বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বন্দরের অচলাবস্থাও দেখতে পাচ্ছি। আগামীতে কর ফাঁকি বন্ধে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার ফলাফল হিসেবে হয়তো বিভিন্ন পক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে বেঁকে বসবেন।
এখানেই জামায়াত দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসতে পারলেই কি রাতারাতি দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব? দুর্নীতি দমনে ফুটপাত থেকে শুরু করে ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিসসহ নানা দপ্তরে হাত দিতে হবে—সেখানে হঠাৎ কঠোর পদক্ষেপ নিলে বহু মানুষ এক লহমায় কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বে।
এসব মানুষের ওপর আবার নির্ভরশীল পরিবার আছে। সব মিলিয়ে এদের সংখ্যা উপেক্ষা করার মতো নয়। এরা একত্র হয়ে সরকারের বিপক্ষে সড়কে নামলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? তাই বলে কী আমরা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাইব না? অবশ্যই চাইব। তবে হঠাৎ করে কিছু করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ রাতারাতি কোন পরিবর্তন আসবে না।
সব কিছু মিলিয়ে চিত্রটা এমন যে, ভোটের আগের প্রচারণা যেন বিয়ে বাড়ির হৈ-হুল্লোড়। বিয়ে শেষে বর-কনে নিজ ঘরে ফিরে যায়। মধুচন্দ্রিমা শেষ করার পর শুরু হয় সংসারের বাস্তবতা। নির্বাচনের আগের অনেক প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সংখ্যা মিষ্টি লাগবে, ঠিক বিয়ে বাড়ির মতই। তবে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু হবে কঠিন বাস্তবতা।
বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক চাপের মুখে আছে তা কাটিয়ে তুলতে একদিকে যেমন প্রয়োজন বাড়তি রাজস্ব আদায়, অন্যদিকে দরকার হবে ব্যাপক সংস্কারের। কিন্তু এই সংস্কার করতে গেলেই সরকারের সামনে আসবে বাধার পাহাড়।
রাজস্বের পাশাপাশি বাড়াতে হবে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স। প্রচণ্ড চাপ থাকবে ঋণ পরিশোধের। বন্ধ করতে হবে অর্থপাচার। এসব বাস্তবতা কিভাবে নতুন সরকার সামাল দিবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। নির্বাচনের আগের মিষ্টি কথা তখনকার বাস্তবতায় হয়তো থাকবে না।