Published : 01 May 2019, 08:46 PM
চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে ২০০৮ সালে কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন শেফালী বেগম। কিছুদিনের মধ্যে এক আত্মীয় এর সহযোগিতায় একটি গার্মেন্টেসে নামমাত্র বেতনে হেলাপারের চাকুরিও পেয়ে যান। বিভিন্ন গার্মেন্টেসে চাকুরি বদল করে ৫ বছর শেষে মেশিন অপারেটর হয়ে উঠেন। মাস শেষে যে বেতন পাচ্ছিলেন তা খরচ করে নিজে ভাল থাকলেও ভবিষ্যত চিন্তা নিয়ে বরাবর উদ্বিগ্ন থাকতেন। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মা ও ছোট ভাইবোনদের ভরনপোষণ ও আনুষাঙ্গিক অন্যান্য পারিবারিক খরচ মেটাতে গিয়ে প্রায় মাসে ধারদেনায় পড়তেন। ফলে বেশি আয়ের লক্ষ্যে বিকল্প পেশা খুঁজতে থাকেন।
সরকার যখন বিনা খরচে বিদেশে নারী কর্মী পাঠাচ্ছেন- এই খবরটি শেফালীসহ তার কয়েকজন নারী সহকর্মীরা জেনে সবাই একজোট হয়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। তবে তারা সঠিক মাধ্যম না জানার কারণে পুরোপুরি বিনে খরচে বিদেশ যাওয়ার সুযোগটি পাননি। স্থানীয় দালালকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট, ট্রেনিং ও বিদেশ যাওয়ার খরচ দিয়ে ২০১৮ সালের শেষে গৃহকর্মীর ভিসায় সৌদি আরবে পাড়ি জমান। বিদেশে গিয়ে প্রথম তিন মাস মোটামুটি ভাল থাকলেও পরবর্তীতে বেতন না দেয়া, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানো, পর্যাপ্ত খাবার না দেয়া ও নিয়মিতভাবে শাররিক নির্যাতনের কারনে বাধ্য হয়ে দূতাবাসের সেইফ হোমে আশ্রয় নেন। পরর্তীতে নিয়োগকর্তা বদলি করলেও প্রায় একই সমস্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
শুধু চুয়াডাঙ্গার শেফালী কেন, তার মতো সারা দেশের অনেক শেফালী প্রতিদিন স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমালেও চিরচেনা এসব সমস্যার কারণে এভাবে মন খারাপ করে দেশে ফিরে আসছেন। এই করুণ দৃশ্যটি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে গেলে সরাসরি দেখা মিলবে। এছাড়াও বিদেশের দূতাবাসগুলোর সেইফ হোমে রয়েছে এই রকম হাজারও নারীকর্মী আছেন যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগটি নিতে গিয়ে নির্যাতন ও নানা অব্যস্থাপনার কারণে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
একবুক আশা নিয়ে এসব নারী কর্মীরা বিদেশে গেলেও তাদের একাংশ দেশে ফিরে আসছেন খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে। বিশেষকরে গৃহকর্মীর ভিসায় যারা যাচ্ছেন তাদের একটি অংশের উপর এই ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে নিয়মিতভাবে। চুক্তিভঙ্গ ছাড়াও শাররিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কেউ কেউ ফিরে আসেন। আবার কেউ আসেন অনাকাঙ্খিতভাবে গর্ভবতী হয়ে। কিন্ত কেউ তাদের পাশে সমবেদনা বা আশ্রয় দিয়ে দায়িত্বটুকু নিতেও চান না। তবে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় এনজিও তাদের বিমান বন্দরের জরুরি সহায়তা কেন্দ্রের সহায়তায় হতভাগ্য এই নারীদের উদ্ধার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিনে পুনর্বাসনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারের ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড ও দুতাবাসসমূহ যদি চাহিদা অনুযায়ী উদ্ধার ও পুনরেকত্রীকরণের উদ্যোগ নেয় তাহলে সমস্যা কিছুটা কমতে পারে। তবে সবার আগে চাই যারা বিদেশে পাঠানোর আগে কর্মীর মানবাধিকার ও সুযোগসুবিধা নিশ্চিতের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া।
তারা কেনই বা স্বল্প সময়ের মধ্যে ফিরে আসছেন নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন বা প্রতারিত খালি হাতে? বেশিরভাগের ফেরত কর্মীরা- এজেন্সি ও গন্তব্য দেশের নিয়োগকর্তার প্রতারণা ছাড়াও কখনো কখনো দূতাবাসের অবহেলাকে তারা দোষারোপ করেন। তবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, কাজ ও খাদ্যাভাস সম্পর্কে পূর্বে ধারনা না নেয়ার কারণেও তারা বিপদে পড়েন প্রায়ই। ভাষাগত দক্ষতা ও বিদেশের পরিবেশে নিজেকে খাঁপ খাওয়াতে না পারার কারণেও তারা নানাসময় বিপদে পড়েন। সুতরাং এইসকল বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা যেমন জরুরি; তেমনি সমাধানের রাস্তা খুঁজতে হবে।
৯০ দশকের দিকে আমাদের শ্রমজীবী নারীকর্মীরা বিদেশে যাওয়ার সাহস সঞ্চয় করেন। এ জন্য নগরের দরিদ্রমানুষ ছাড়াও গ্রাম থেকে নারীরা বিদেশে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। এটি অবশ্যই নারীর কর্মসংস্থানের নতুন ধারা ও ক্ষমতায়নের জন্য ইতিবাচক দিক। সরকারের তথ্য অনুযায়ী প্রচুর পরিমানে পুরুষ কর্মী ছাড়াও গত ৪ বছর ধরে গড়ে এক লাখের বেশি নারীরা বিদেশে গেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখের বেশি নারীকর্মী বিভিন্ন পেশায় বিদেশে যান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, জর্ডান, আরব আমিরাত, লেবানন ও ওমানে তারা বেশি পরিমানে যাচ্ছেন। পেশা হিসেবে ক্যাটাগরি করলে বেশিরভাগ নারীকর্মীরা গৃহকর্মীর পেশায় বেশি যাচ্ছেন। তবে এই পেশাটি অন্যান্য পেশার চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন; যেমন তেমনি নামমাত্র বেতন ও আনুষাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা খুবই কম। এছাড়াও কর্মক্ষেত্রে শাররীক ও মানসিক নির্যাতন ছাড়াও যৌন নির্যাতনের পরিমান বেশি ঘটছে যা অন্যান্য পেশার চেয়ে তুলামূলকভাবে ঝুঁকি বেশি।
সম্প্রতি আরেকটি বিষয় বেশি আলোচিত হচ্ছে তা হচ্ছে বিদেশে কর্মীর মৃতদেহের সংখ্যাটি আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া। নারীকর্মীর লাশসহ ঢাকা বিমান বন্দরে প্রতিদিন গড়ে ১০টি করে লাশ দেশে আসছে। শুধু গত ৩ বছরে ২৯৪ জন নারীর কর্মীর লাশ দেশে আসে, যেখানে ৪৪ জন নারী কর্মী আত্মহত্যা করেছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। যা খুবই দু:খজনক। বিশ্লেষকদের মতে প্রতিশ্রুত কাজ ও বেতন না পাওয়া এবং নানারুপ নির্যাতনের কারণে অনেকে আশাহত বা অপমানিত হয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছেন।
বিদেশে নারী কর্মীরা যে গিয়ে সবাই ভাল নাই- এই কথা বলছি না। অনেক নারী কর্মী তাদের কষ্টার্জিত রেমিটেন্স দিয়ে পরিবারকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। গৃহকর্ম ছাড়া তুলনামূলকভাবে গার্মেন্টস বা অন্যান্য পেশায় যারা যাচ্ছেন তাদের আয় যেমন বেশি, তেমনি তাদের সমস্যা কম হচ্ছে। সুতরাং গৃহকর্মের ভিসার বাইরে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। নারী কর্মীর ক্ষেত্রে বিরাজমান বা বহুল আলোচিত যে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে তার সমাধানের উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
এই বছরের মে দিবসের ম্লোগান হল- 'শ্রমিক মালিক ঐক্য গড়ি, উন্নয়নের শপথ করি'।
আমাদের চাহিদার আলোকে এই স্লোগানটি খুবই সময়োপযোগী। তবে দিবস উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধতা না রেখে এর কার্যকরিতা সবাই দেখতে চাই। বিশেষত সকল সেক্টরের কর্মীর জন্য শ্রমঘন্টা নির্ধারন, ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। দেশে বিদেশে অন্যান্য সেক্টর ছাড়াও বিদেশে নারী কর্মীর ক্ষেত্রে অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি ভাবতে হবে। গত দুই তিন বছর যাবত প্রবাসী নারী কর্মীর সমস্যাগুলো নানাভাবে উঠে আসলেও সকল মহলে বরারই উপেক্ষিত ও অমিমাংসিত হয়ে যায়।
সুতরাং নারীদের কর্মী হিসেবে বিদেশে পাঠান্রে আগে সরকারিভাবে আরো বেশি তদারকি ও ব্যবস্থাপনায় শৃংখলা আনতে হবে। যাওয়ার আগে মানসম্মত উপায়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ যেন পায় তা নিশ্চিত করা। কিশোরীরা যেন ২৫ বছর বয়সীর পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যেতে না পারে পাসপোর্ট বিভাগ ও ইমিগ্রেশন দপ্তর থেকে তদারকি করা। এছাড়াও দুই দেশের মধ্যে চুক্তি করার সময় বেশি পরিমানে কর্মী পাঠানোর চেয়েও দরকার কর্মীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিতকরা যা সরকার ও আমাদের দেশের এজেন্সীগুলোকে পুনরায় বিবেচনায় আনতে হবে। তা না হলে এই ইস্যুতে বদনাম যেমন বাড়তে থাকবে; তেমনি নারী কর্মীর বিদেশে যাওয়ার আগ্রহে ভাটা পড়বে।