Published : 28 Jan 2026, 09:18 PM
স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যে ১২টি সংসদ নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র তিনটি বাদে সবগুলো নির্বাচনই কমবেশি বিতর্কিত। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
প্রয়াত পার্লামেন্টারিয়ান মওদুদ আহমদ লিখেছেন, “এটা সত্য যে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করতো। আওয়ামী লীগ বিঘ্ন সৃষ্টি না করলে যে ৯টিতে বিরোধী দল জয়লাভ করেছিলো তার সাথে আর বড়জোর ২০টি আসন যোগ হতে পারতো। সংসদের ৩১৫টি (সংরক্ষিত ১৫টিসহ) আসনের মধ্যে ৯টির পরিবর্তে ৩০টি আসনে বিরোধী দল জয়লাভ করলে সরকার ও আওয়ামী লীগের বিশেষ কোনো ক্ষতি হতো না। এরপরেও সবগুলো আসনে জয়লাভের জন্য তারা যেভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো, তার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। (মওদুদ আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল, ইউপিএল/১৯৮৩, পৃ. ১৮২)।
রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ ১৯৭৩ সালের ওই নির্বাচন নিয়ে লিখেছেন, “পার্লামেন্টারি পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন মানে বিরোধী দলের যথেষ্ট সংখ্যক ভালো মানুষ নির্বাচিত হবেন, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা। কাজেই নির্বাচনে (১৯৭৩) সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিরোধী দলের প্রতি উদার হওয়া উচিত ছিল। উদার হইতে তারা রাজিও ছিলেন। রেডিও টেলিভিশনে বিরোধী দলসমূহের নেতাদের বক্তৃতার ব্যবস্থা করিতেও তাদের আপত্তি ছিল না। আমি আওয়ামী নেতৃত্বকে পরামর্শ দিয়াছিলাম বিরোধী পক্ষের অন্তত জনপঞ্চাশেক নেতৃস্থানীয় প্রার্থীকে নির্বাচনে জয়লাভ করিতে দেওয়া উচিত। তাতে পার্লামেন্টে একটি সুবিবেচক গণতন্ত্রমনা গঠনমুখী অপজিশন দল গড়িয়া উঠিবে। আমার পরামর্শে কেউ কান দিলেন না।” (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল/১৯৯৫, পৃ. ৬২৬)।
বাংলাদেশে দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ নির্বাচন হয়েছে সামরিক শাসনের অধীনে। ওই নির্বাচনগুলোর ফলাফল নিরঙ্কুশভাবেই সামরিক শাসকদের সৃষ্ট দলের পক্ষে গেছে।
মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বিতর্কমুক্ত এবং তুলনামূলক ভালো নির্বাচন হয় ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যে নির্বাচনটি হয়েছিল একধরনের তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে। কিন্তু এরপরই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আবারও বিতর্কিত হয়। তবে ওই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ থাকলেও ভোটের ফলাফল ছিল বিশ্বাসযাগ্য। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই নির্বাচনটি হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ওই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক কম। কিন্তু এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনও বিতর্কমুক্ত থাকেনি। কেননা এই নির্বাচনের ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য। ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলেই সেটি অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোপরি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হয় বলে যে প্রতীতি জনমনে ছিল, ওই বিশ্বাসে বড় ধরনের চিড় ধরে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেড় বছর ধরে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করছে, আপাতদৃষ্টিতে তাদের কোনো দলীয় এজেন্ডা না থাকলেও বা বিশেষ কোনো দলের প্রতি পক্ষপাত নেই বলে মনে হলেও, এই সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন পক্ষপাতমুক্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।
এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান স্টেকহোল্ডার বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা নির্বাচনে প্রশাসনিক ক্যু-এর শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দুটি দলের প্রতি পক্ষপাত করছে এবং তাদের ক্ষমতায় আনতে চায়। নাম উল্লেখ না করলেও ওই দুটি দল যে জামায়াত ও এনসিপি—তা দেশবাসী বোঝে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি নির্দলীয় সরকারের প্রতিও কেন এই সন্দেহ? কেন সকল রাজনৈতিক দল শতভাগ আস্থা রাখতে পারছে না? আলোচনায় আছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবার জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। প্রশ্ন হলো, বাইরের একটি দেশ চাইলেই কি কোনো দল ক্ষমতায় চলে আসতে পারে? তাহলে জনগণের ভোটের কী প্রয়োজন? নির্বাচনে কোনো এক বা একাধিক দেশের চাওয়ার প্রতিফলন ঘটে নাকি জনরায়ের?
একনজরে ১২টি নির্বাচন
বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। এর ঠিক দুই বছর আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের দিনটিকে স্মরণ করে স্বাধীনতার সোয়া এক বছরের মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৫২ লাখ ৫ হাজার ৬৪২ জন। অংশ নেয় ১৪টি দল। সরকারি হিসাবে এই নির্বাচনে ভোট দেন ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫১ হাজার ৮০৮ জন মানুষ। ভোটের প্রাপ্ত হার ৫৫.৬১ শতাংশ। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ (বিডিজেএল) ১টি এবং পাঁচটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন। বাকি ২৯৩টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। সংসদ নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরে মুনসুর আলী। কেউ বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন না।
পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার পরে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং নানারকম নাটকীয়তার পরে ক্ষমতায় আসীন হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তার অধীনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬৪ জন। নির্বাচনে ৪৯.৬৭ ভাগ ভোট পড়ে। ২৯টি দল ভোটে অংশগ্রহণ করে। বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ২০৭টি আসন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মিজান) ২, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৮, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ ২০, অন্যান্য দল ৮ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ১৬টি আসনে। স্বতন্ত্র বিজয়ীরা পরে বিএনপিতে যোগদান করেন। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন সংখ্যা ১৫টি থেকে ৩০টিতে উন্নীত করা হয়। এতে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩০ জনে। এই সংসদের সংসদ নেতা ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। বিরোধী দলীয় নেতা আসাদুজ্জামান খান।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এইচ এম এরশাদ। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি তিনি গঠন করেন জাতীয় পার্টি। ওই বছরের ৭ মে তার অধীনে হয় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মোট ভোটার ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৭৬ হাজার ৯৭৯। অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ২৮। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি বয়কট করে। বিজয়ী জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩টি আসন। এর বাইরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৭৬, জামায়াতে ইসলামী ১০, অন্যান্য দল ২৯, স্বতন্ত্র ৩২। সংসদ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা।
চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হয় এরশাদের অধীনে। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। মোট ভোটার ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৬৩ হাজার ৮২৯ জন। অংশগ্রহণ করে ৯টি দল। বিজয়ী জাতীয় পার্টি পায় ২৫১টি আসন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই নির্বাচন বয়কট করে। সম্মিলিত বিরোধী দল পায় ১৯টি। অন্যান্য দল ৫ এবং স্বতন্ত্র ২৫টি আসন। চতুর্থ সংসদের সংসদ নেতা ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, পরে কাজী জাফর আহমেদ। বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন জাসদের আ স ম আব্দুর রব।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই নির্বাচন বয়কট করলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (রব) উদ্যোগে ‘কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টিস (কপ)’ নামে সম্মিলিত বিরোধী দল গঠিত হয় এবং তারা নির্বাচনে অংশ নেয়। তারা মাত্র ১৯টি আসন পাওয়ায় প্রথমে সংসদীয় গ্রুপের মর্যাদা লাভ করলেও বিরোধী দলের মর্যাদা পায়নি। পরে অন্যান্য দলের আরও ১৪ জন সংসদ সদস্য আ স ম আবদুর রবকে নেতা মেনে নিয়ে স্পিকারের কাছে আবেদন করেন। স্পিকার তাকে বিরোধী দলের নেতার স্বীকৃতি দেন। তবে একে জনসাধারণ গৃহপালিত বিরোধী দল বলে বিদ্রুপ করত।
সংসদীয় রাজনীতিতে পুনঃপ্রবেশ
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি নতুন যুগে প্রবেশ করে মূলত ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৬ কোটি ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৩। অংশগ্রহণ করে ৭৫টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ১৪০টি আসন। আওয়ামী লীগ ৮৮টি। তখনও আওয়ামী লীগের একটি অংশ বাকশালে সক্রিয় ছিল। ফলে অনেকেরই ধারণা, আওয়ামী লীগের এই বিভক্তি না থাকলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তারা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করত। বাকশাল এই নির্বাচনে ৫টি আসনে জয়লাভ করে। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ ও বাকশাল একীভূত হয়ে যায়।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ দেশের সকল গণতান্ত্রিক দলের আন্দোলনের মুখে যে জাতীয় পার্টির প্রধান এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন, তার দলও এই নির্বাচনে ৩৫টি আসন পায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এরশাদই সম্ভবত একমাত্র সামরিক শাসক যিনি বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখল করে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পরে আবার মূলধারার রাজনীতিতে ‘ফ্যাক্টর’ হন। শুধু তাই নয়, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূতও হয়েছিলেন এবং সম্মনজনক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। যে কোনো সামরিক শাসকের জন্য এটি বিরাট ঘটনা।
১৯৯১ সালের নির্বাচনটি আরও যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীও ১৮টি আসনে জয় পায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদে গৃহীত সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র তথা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হয়। এই সংসদের নেতা ছিলেন খালেদা জিয়া। বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা।
১৯৯১ সালের নির্বাচন হয়েছিল একধরনের কেয়ারটেকার পদ্ধতিতে। কিন্তু এর সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ছিল না বলেই ১৯৯৪ সাল থেকেই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলের আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। ১৯৯৫ সালে আন্দোলনের গতি আরও বাড়ে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এটি ছিল ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যে নির্বাচনটি ছিল একতরফা। অর্থাৎ বিরোধী দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ক্ষমতাসীন বিএনপি পায় ২৭৮টি আসন। বিতর্কিত ফ্রিডম পার্টিও একটি আসনে জয় পায়। এই সংসদে কোনো বিরোধী দল ছিল না। মূলত এই সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করা হয়।
তীব্র গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছে উপ-রাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমেদ পদত্যাগ করেন। তার স্থলে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপ-রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ করা হয়। উপ-রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করেন। এরশাদের পদত্যাগের পর উপ-রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র পরিচালনা ও নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য তিনি ১৭ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।
নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। অন্যান্য দলের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১৮, সিপিবি ৫, বাকশাল ৫, জাসদ (সিরাজ) ১, ইসলামী ঐক্যজোট ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ১, এনডিপি ১, গণতন্ত্রী পার্টি ১, ন্যাপ (মোজাফফর) ১ ও অন্যান্য দল ৩টি আসন পায়। মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল ৫৫.৪৫ শতাংশ।
সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৫ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৩৫ জন। অংশগ্রহণ করে ৮১টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় ১৪৬টি, বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন। সংসদ নেতা হন শেখ হাসিনা। বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন খালেদা জিয়া।
সপ্তমের ধারাবাহিকতায় হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০০১ সালের পয়লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মোট ভোটার ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪। অংশগ্রহণ করে ৫৪টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ১৯৩টি আসন। আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসন। সংসদ নেতা হন খালেদা জিয়া। বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আবার একটি ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান থাকলেও নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে বেশ কিছু কৌশল নেয় বিএনপি। বিরোধী দল আওয়ামী লীগ যার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সংঘাত-সংঘর্ষে দেশ ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হয়। আসে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্ববধায়ক সরকার—যেটি এক-এগারোর সরকার নামে পরিচিত। নতুন সরকার ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন, আরপিও ও নির্বাচনি আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনে এবং দুর্নীতি বিরোধী সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করে।
এক-এগারোর সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতা থাকে। ফলে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিছিয়ে যায়। ভোট হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। নির্বাচনে ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে এবং ভোট প্রদানের হার ছিল ৮৭.১৬ শতাংশ।
এই নির্বাচনের আগে আইন সংশোধন করে ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। দেশের ইতিহাসে প্রথম এই ‘না’ ভোটে সিল দেন ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯২৪ জন। যা প্রদত্ত ভোটের ০.৫৫ শতাংশ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় হয়। তারা পায় ২৩০টি আসন। বিএনপি মাত্র ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি আসন। সংসদের নেতা হন শেখ হাসিনা। বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া। তবে এই নির্বাচনেও ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
আওয়ামী লীগের অধীনে বিতর্কিত ৩ নির্বাচন
কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দেশের পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ ওঠেনি। অর্থাৎ মোটা দাগে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কিন্তু পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থাটি বড় ধরনের ধাক্কা খায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করে। অংশগ্রহণ করে মাত্র ১২টি দল। ১৫৩টি আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন—যা দেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ২৩৪টি আসন। জাতীয় পার্টি ৩৪টি। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। বিরোধী দলীয় নেতা হন রওশন এরশাদ।
মূলত দশম সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও তারা মাত্র ৬টি আসন পায়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এসেছে যে, এই নির্বাচনটি হয়েছে ‘আগের রাতে’।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। অংশগ্রহণ করে ৩৯টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় ২৫৮টি এবং জাতীয় পার্টি ২২টি আসন। বিএনপি সংসদে থাকলেও যেহেতু তাদের আসন ছিল খুবই কম এবং আসন প্রাপ্তির দিক দিয়ে জাতীয় পার্টি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ফলে তারা হয় বিরোধী দল। এই সংসদেও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ। বিএনপির সংসদ সদস্যরা পরবর্তীতে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও ছিল একতরফা। বিএনপি এই ভোট বর্জন করে। অনেক আসনে আওয়ামী লীগের নেতারাই নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। যে কারণে অনেকে এটিকে ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক দেখাতে আওয়ামী লীগ এই কৌশল নিয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।
ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু অভিযোগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভোটার উপস্থিতি কম থাকার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ভোটের দিন বেলা ১২টায় ১৮ শতাংশ এবং বিকাল ৩টায় ২৭ শতাংশ ভোট পড়ার কথা নির্বাচন কমিশন জানালেও এক ঘণ্টার ব্যবধানে বিকাল ৪টায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল জানান, সারাদেশে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ তথ্যটি ব্যপকভাবে সমালোচিত হয়, কারণ সেদিন সংবাদমাধ্যমে অনেক ভোটকেন্দ্রই ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ইসির হিসাবে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৮৯ জন। ভোট পড়েছে ৫ কোটি ৩০ হাজার ১২২টি। অর্থাৎ ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৬ মাসের মধ্যে দেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে—যা জুলাই মাসের মাঝামাঝি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অভ্যুত্থানের মুখে ওই বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার পতনের পরদিন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। সংবিধানে এই সরকারের কোনো বিধান না থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে এই সরকার গঠিত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: নেসার আমিন, বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও ফলাফল, ঐতিহ্য/২০২৩।