Published : 23 Oct 2025, 02:13 PM
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের উপস্থিতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সংখ্যার বৃদ্ধি মানেই সমতা নয়। শৈশব থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে যে ধারণাগুলো তৈরি হয়, তা সমাজে জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্যকে আরও জোরদার করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে জরুরি। একজন সচেতন শিক্ষক ছোট ছোট কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে বড় প্রভাব ফেলতে পারেন, আর ওই প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের মানসিকতার ভিত গড়ে তোলে।
আমি মহিলা কলেজের একজন শিক্ষক হিসেবে দেখেছি যে, শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও আচরণে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব কতটা গভীরভাবে কাজ করে। আমাদের সমাজে মেয়েদের প্রতি কিছু প্রচলিত ধারণা এখনো বিদ্যমান যেমন, মেয়েরা নরম স্বভাবের হবে, তারা নেতৃত্বদানের চেয়ে বরং নেতার অনুসারী হতে পছন্দ করে। এই মানসিকতা ক্লাসরুমেও প্রবেশ করেছে। মেয়েরা হয়তো চুপচাপ থাকে বা নিজের মতামত দিতে দ্বিধা করে, আবার ছেলেরা ‘সাহসী’ সাজার জন্য অতিরিক্ত চাপ অনুভব করে।
আমি জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষণ কৌশল বিষয়ে তিনটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও পরিচালনা করেছি। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি যে, শিক্ষকরা অনেক সময় অজান্তেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে পক্ষপাত তৈরি করে দেন। যেমন: ক্লাসে কোনো মেয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মতামত প্রকাশ করলে আমরা হয়তো প্রশংসা করি, “বাহ্! তুমি তো খুব সাহসী।” কিন্তু এর ভেতরের একটি সূক্ষ্ম বার্তা হল—এমন আচরণ ছাত্রীদের কাছে প্রত্যাশিত নয়। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন এক আচরণগত প্রভাব তৈরি হয়, যা পরে সাংস্কৃতিক স্টেরিওটাইপকে আরও শক্তিশালী করে।
প্রশিক্ষণের পর আমি আমার ক্লাসে বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে শুরু করি। যেমন, শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া, যেন তারা নির্ভয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পারে; গ্রুপ বা প্রকল্পের কাজে শুধু ‘ভালো ছাত্রীদের’ না দিয়ে সবার মধ্যে সমানভাবে দায়িত্ব বণ্টন করা; ক্লাসে আলোচনা করা যে নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস বা দৃঢ়তা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের গুণ নয়, বরং তা সবার মধ্যেই থাকতে পারে।
এই ছোট পরিবর্তনগুলো খুবই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মত প্রকাশ করে, দলগত কাজে সক্রিয় অংশ নেয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরতে পারছে। আমি লক্ষ্য করেছি, শিক্ষকরা যখন ছোট ছোট বিষয়েও সচেতন হন—যেমন, সমানভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা, পুরস্কার দেওয়ার সময় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, তখন ক্লাসরুমের পরিবেশ অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ও সমানাধিকারপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শিক্ষকরা প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিস্তরেই সমতার বীজ বপন করতে পারেন। শিক্ষক নিজের মানসিকতা পরিবর্তন করলে শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই মূল্যবোধ শেখে। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত বিকাশে সাহায্য করে না, বরং সমাজের জন্য সমতাভিত্তিক সংস্কৃতিও গড়ে তোলে। একজন সচেতন শিক্ষক ক্লাসরুমে যে পরিবর্তন আনেন, তা পরবর্তী প্রজন্মকে শেখায় যে জেন্ডার কোনো বাধা নয়।
এ ছাড়া, স্কুল প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষকরা যদি জেন্ডার সংবেদনশীল পদ্ধতিগুলো শেখেন, তবে শুধু মেয়েরা নয়, ছেলে শিক্ষার্থীরাও তাদের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন হবে। এর ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই সমানভাবে শ্রেণিকক্ষের অংশ হতে পারবে।
গ্রামীণ অঞ্চলে জেন্ডার সংবেদনশীলতা বাড়াতে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, প্রশিক্ষণে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা অন্তর্ভুক্ত করা; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা; শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করা যে তারা নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে এবং পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষণ সামগ্রীতে সমতার বার্তা তুলে ধরা।
প্রাথমিক শিক্ষার স্তরেই যদি আমরা সমতার ধারণা মজবুত করতে পারি, তবে ভবিষ্যতের সমাজ এই সমতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। ছোট পরিবর্তনগুলো প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হলে তা শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা ও আচরণে এক বিশাল প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষকরা সচেতনভাবে এই পরিবর্তনগুলো আনা শুরু করলে, সমাজের প্রতি তাদের প্রভাবও সুদূরপ্রসারী হবে।
আসলে, প্রকৃত সমতা শুধু স্কুলের বাইরে নয়, ক্লাসরুমের ভেতর থেকেই শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা যখন শেখে যে প্রত্যেকের সমান অধিকার ও সুযোগ রয়েছে, ওই শিক্ষাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক আচরণ ও নৈতিক মানদণ্ড গড়ে তোলে। একজন সচেতন শিক্ষক শুধু পাঠ্যক্রম শেখান না, বরং সমতার বীজও বুনে দেন, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের চেতনায় পরিবর্তন আনে।
ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় প্রভাব আনে, আর ওই পরিবর্তন শুরু হতে পারে একজন সচেতন শিক্ষকের ক্লাসরুম থেকেই।