Published : 23 Jul 2025, 08:14 PM
ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি আলোচনা শুরুর দিনেই অর্থাৎ, ১২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক উত্থাপিত শর্ত মেনে নেবার আল্টিমেটাম দেন। নতুন শর্ত অনুযায়ী ইরান তার ভূমিতে কোনো পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালাতে পারবে না। ইরানকে এ কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসতে হবে।
২০১৫ সালের ১৪ জুলাই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য এবং জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শুধু শান্তিপূর্ণ কাজে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে পারবে মর্মে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল—ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখতে হবে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসবার পর ২০১৮ সালে এ চুক্তি বাতিল করে দেন।
প্রথমদিকে সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির সক্ষমতা কমাবার পক্ষে থাকলেও পরবর্তীতে ইসরায়েলের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে ইরানকে পুরোপুরি এ সক্ষমতা ত্যাগ করবার দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। সঙ্গে আরও দুটি দাবি যোগ করা হয়। এর একটি হলো, ইরানকে তাদের ব্যালেস্টিক মিসাইল উৎপাদনের সক্ষমতা হ্রাস করতে হবে। অপরটি, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ঘনিষ্ঠ যে সব গোষ্ঠী রয়েছে যেমন হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি—তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানতে হবে।
এ বিষয়টি পরিষ্কার যে, পরমাণু চুক্তির কথা বলা হলেও এ চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমান্বয়ে ইরান যে একটি আঞ্চলিক শক্তি হয়ে উঠেছে, তাকে খর্ব করা। কেননা, শক্তিধর ইরানের উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের প্রভাবকে ক্ষুণ্ণ করবে। ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে যে শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠেছে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এটা বজায় রাখবার জন্য ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের সামরিকভাবে দুর্বল হওয়া ইসরায়েলের স্বার্থে জরুরি।
ট্রাম্প ঘোষিত ষাট দিনের আল্টিমেটাম শেষ হবার পরদিনই ইসরায়েল বিশ্বকে স্তম্ভিত করে ইরান আক্রমণ করে বসে। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে যে কোনো সময় জড়াতে হতে পারে, এ ধরনের একটা মানসিক প্রস্তুতি ইরানের থাকলেও, এটা যে এরকম আকস্মিকভাবে আসবে, তা খুব সম্ভবত সে দেশের নীতিনির্ধাকদের ধারণার বাইরে ছিল।
ষাট দিনের আল্টিমেটাম যখন ঘনিয়ে আসছিল তখন মধ্যপ্র্যাচের বিভিন্ন দূতাবাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার কূটনীতিক এবং জরুরি কাজের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করতে যাচ্ছে এরকম একটা ধারণা চাউর হয়ে যায়। কিন্তু তারপরও তাদের ওপর যে আক্রমণ অত্যাসন্ন—তাদের সামরিক বাহিনীর ওপর প্রাথমিক আঘাতের অভিঘাত দেখে, ইরান যে বিষয়টিকে সেভাবে দেখেনি, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ইরানের নীতিনির্ধাকদের ধারণা ছিল, যেহেতু আলোচনা চলছে, এ আল্টিমেটাম হয়ত চাপ সৃষ্টির একটা কৌশল। ফলে অতর্কিত হামলায় ইরান কিছুটা হকচকিয়ে যায়। দেশটির সেনাপ্রধানসহ সেনাবাহিনী এবং ইসলামিক রিপাবলিকান গার্ডের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হন। এছাড়া একজন উপাচার্য এবং সাবেক উপাচার্যসহ অন্তত সাতজন পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন। এরা সবাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
হামলার শুরুতে ইসরায়েল খুব আত্মপ্রত্যয়ী ছিল। তাদের আত্মপ্রত্যয়ের মূল কারণ হলো, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্ভেদ্য বলে নানা সময়ে তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরায়েলসহ প্রায় সবার একটা ধারণা ছিল, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম ভেদ করার ক্ষমতা কোনো মিসাইলের নেই। ফলে, এটিকে তারা বলত ‘ঈশ্বরের দেয়াল’। এর পাশাপাশি তাদের রয়েছে ডেভিড স্লিং, দ্য অ্যারো এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড। এছাড়া জর্ডান এবং লোহিত সাগরে মার্কিন বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদেরকে বাড়তি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
দেশটির সেনা কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, এতগুলো ব্যুহ ভেদ করে ইরানের পক্ষে তাদের ভূমিতে আঘাত করা সম্ভব হবে না। ইরান অবশ্য নানা সময়ে জানিয়েছে তারা শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন হাইপারসনিক মিসাইল তৈরি করেছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, ইসরায়েল ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছে—যা তাদেরকে ইরান আক্রমণ করতে উৎসাহিত করে।
ইরান তার পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ইসরায়েলকে মাথায় রেখে। আজ হোক, কাল হোক ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘাত বাধবেই—এ ধরনের সামরিক-রাজনৈতিক বোঝাপড়া এই প্রতিরক্ষা ডকট্রিনের মূল প্রতিপাদ্য।

ইসরায়েলও দীর্ঘদিন থেকে ইরানকে আক্রমণ করবার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করছিল। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আমলে কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বাহিনী যৌথভাবে প্রতিরক্ষা মহড়া চালিয়েছে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাবার। ইরানে হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে সামরিকভাবে দুর্বল, সম্ভব হলে হামাসকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে ফেলবার উদ্যোগ নেয়— যুদ্ধ বন্ধের এক মাস পরেও এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সিরিয়ার রাশিয়া-ইরান ঘনিষ্ঠ সেক্যুলার বাশার আল আসাদের বাথ পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করে মার্কিন-ইসরায়েলের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রাখবে এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে আরব বসন্ত বা বসন্ত বিপ্লবের সময় থেকেই সামরিক এবং অন্যান্য সহায়তা দেবার নীতি নেয় ইসরায়েল।
এ লক্ষ্যে ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায়। নিজ দেশে সংগঠন আক্রান্ত হতে দেখে সিরিয়ায় অবস্থানরত হিজবুল্লাহ মিলিশিয়ারা, যারা আসাদের পক্ষ হয়ে লড়াই করবার জন্য সেখানে অবস্থান করছিল, তারা লেবাননে চলে আসা শুরু করে—নিজ সংগঠনকে রক্ষা করবার জন্য। ঠিক ওই সময়ে ইসরায়েল সিরিয়ায় অবস্থিত হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াদের অবস্থান, ইরানের সামরিক উপদেষ্টা, আসাদ সরকারের নানাবিধ বাহিনী এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর বোমা হামলা চালায়।
এসব হামলার লক্ষ্য ছিল আহমেদ আল শারার নেতৃত্বাধীন হায়াত তাহরিয়ার আল শামকে রণক্ষেত্রে সুবিধা করে দেয়া। লক্ষ্যণীয় যে, সিরিয়াতে রুশ বাহিনীর শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকবার পরও তারা কখনোই ইসরায়েলের হামলা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়নি। তাদেরকে হামলা করতে নিষেধও করেনি।
এ ধরনের ক্রমাগত হামলার শিকার হতে থাকলে আসাদ সরকারের পতন ঘটতে পারে এটা হয় রুশ সরকার বুঝতে পারেনি; অথবা বুঝতে পারলেও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কারণে তারা এ বিষয়ে কিছু না বলবার নীতি নিয়েছিল। এ সম্পর্কের অন্যতম কারণ হলো ইসরায়েলের জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ লক্ষ হচ্ছে রুশভাষী।
আসাদ সরকারের পতনের কারণে সিরিয়ায় রাশিয়া বেকায়দায় পড়ে যায়। ইরানকে সিরিয়া থেকে বের করে দেয়া হয়। আসাদ সরকারকে হটিয়ে মার্কিন-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ সরকার সিরিয়ায় প্রতিষ্ঠা করতে পারা ইসরায়েলের পররাষ্ট্র নীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্য।
এর ধারবাহিকতায় এখন মার্কিন মধ্যস্থতায় প্রথমবারের মতো ইসরায়েলেকে স্বীকৃতি দিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার ওপর আরোপিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। পাশাপাশি, হায়াত তাহরিয়ার আল শামকে দেয়া সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তকমা তুলে নিয়ে, সিরিয়ার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাবার পর প্রাথমিকভাবে খুব আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। তারা পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির পাশাপাশি আক্রমণ বন্ধের শর্ত হিসেবে ব্যালেস্টিক মিসাইল উৎপাদন কর্মসূচিও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করবার দাবি জানায়।
ইরান এসব পদক্ষেপে সম্মত না হলে তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করবার ঘোষণা দেয়। ইরানের সরকার বা তাদের ভাষায় রেজিম পরিবর্তনের কথা বলা হয়। এ লক্ষ্যে শাহের পুত্র রেজা পাহলভী, যিনি ইরানের প্রবাসী অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান প্রধান, তাকে ক্ষমতায় বসাবার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ইসারেয়েলের আক্রমণের জবাব ইরান প্রথমে ড্রোন এবং পরে ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইরানে তৈরি নতুন নতুন অত্যাধুনিক মিসাইল ইসরায়েলের দিকে ছোড়া হতে থাকে। এর অনেকগুলো প্রতিরক্ষা বূহ্যের নানা স্তর ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এতে বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতির সম্মুখীন হয়—যে ধরনের ক্ষতির মুখে ইতিপূর্বে ইসারেয়েলকে পড়তে হয়নি। এসব কিছুর ফলে ইসারেয়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যূহর সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ইরানের হামলা ঠেকাতে জর্ডান ইসারেয়েলকে সহায়তা করে তার আকাশসীমা দিয়ে উড়ে যাওয়া ক্ষেপনাস্ত্র ভূপাতিত করে। সিরিয়ার আকাশসীমা ইসারেয়েল বিনা বাধায় ব্যবহার করে। ইরাক যেমন তার আকাশ ব্যবহার করে ইসারেয়েলের হামলার প্রতিবাদ করে; কিন্তু, আহমেদ আল শারার সরকার এ বিষয়ে নীরব থাকার ভূমিকা নেয়।
তবে মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরানের পার্শ্ববর্তী আজারবাইজান শিয়া প্রধান হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি ঘোষণা দিয়ে ইসারেয়েলকে সমর্থন করে। শুধু তাই নয়, তারা তাদের বিমানঘাঁটিগুলোও ইসারেয়েলকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
ইসারেয়েল দেশব্যাপী উন্নত ভুগর্ভস্থ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্মাণ এবং মিসাইল হামলার ১০ মিনিট পূর্বে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করবার ব্যবস্থা গ্রহণ করবার ফলে সাধারণ জনগণের ব্যাপক জীবনহানি এড়াতে সক্ষম হয়। অবশ্য এসব আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ফিলিস্তিনি-ইসারায়েলিদের আশ্রয় দেবার ক্ষেত্রে বৈষম্যের নানা অভিযোগ আসে।
যুদ্ধ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে ইসারেয়েল দেশী এবং বিদেশী সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যে কোনো সংবাদ প্রচার করবার আগে সামরিক বাহিনী থেকে অনুমোদন নিয়ে তা প্রকাশ করতে হতো। ফলে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইরান নানা সামরিক ঘাটি লক্ষ্য করে আক্রমণের দাবি করলেও, এসব হামলায় ইসারেয়েলের ঠিক কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, তা সঠিকভাবে কারও পক্ষে নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানায় ইরানের হামলায় ইসারেয়েলের পাঁচটি সামরিক ঘাটির ক্ষতি হয়েছে। তবে এতে কোনো সেনা সদস্য নিহত বা আহত হয়েছেন কিনা—এ ধরনের কোনো সংবাদ তারা প্রকাশ করতে পারেনি। ইসারেয়েল থেকেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
ইসারেয়েলের হামলায় ইরানের সামরিক-বেসামরিক স্থাপনাসমূহের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং নারী, পুরুষ, শিশু মিলিয়ে ৯৩৫ জন নিহত হয়। রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত বুশের পরমাণু স্থাপনা ব্যতীত ইসারেয়েল ইরানের বাকি সব পরমাণু স্থাপনা কেন্দ্রের ওপর আঘাত হানে।
এসব হামলার সময় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মারাত্মক দুর্বলতা ধরা পড়ে। অনেকটা বিনা বাধায় ইসারেয়েল ইরানের যে কোনো স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম হয়। ইরানের আকাশসীমায় ইসারেয়েলের বিমান বাহিনী অবাধে বিচরণ করতে পারে। ফলে তারা অনায়াসেই তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করতে সমর্থ হয়। এর পাশাপাশি, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তার নানাবিধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাত কার্যকলাপ খুব সহজে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়—যেটা ইরানকে বাড়তি ঝুঁকির মুখে ফেলে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হবার অন্যতম কারণ ইসরায়েলের কথা শুনে রাশিয়া ইরানকে তার চাহিদা অনুযায়ী অত্যাধুনিক এস ৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ না করা। ইসরায়েলের বক্তব্য হলো, ইরানের হাতে এ ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ভারসাম্য নষ্ট হবে; অর্থাৎ, ইরানে ইসরায়েলের হামলা করবার ক্ষমতা হ্রাস পাবে।
দেখা যাচ্ছে যে, শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়, ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে রাশিয়ার, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে তা নিজেদের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে হলেও—যেমনটা সিরিয়াতে দেখা গেছে।
ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে হামলা চালাতে সক্ষম হলেও পরমাণু সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা এবং সমৃদ্ধ পরমাণু ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া ইরানের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হবার ফলে ক্রমাগত তাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আহবান করে এ যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়ে ফোর্ডোর পাহাড়ের ৩০০ ফুট গভীরে অবস্থিত পরমাণু স্থাপনা কেন্দ্র ধ্বংস করবার।
যুক্তরাষ্ট্রও ইরানকে একাধিকবার হুশিয়ারী দেয়, ইরান যদি পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে সরে না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে। উল্লেখ্য, বিশ্বে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমাই মাটির ২০০ ফুট গভীর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
ইসরায়েলের আহবানে সাড়া দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ২১ জুন ইরানের ফোর্ডো, নাতানজ এবং ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনাতে হামলা চালায়। হামলায় সর্বমোট ১২৫টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে এ হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধবংস করে দেবার দাবি করে। তবে হামলার ধরন এবং প্রকৃতি দেখে অনেক বিশ্লেষকের কাছে এটা সাজানো হামলা বলে মনে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরুর আগেই ইরানকে এ সম্পর্কে অবহিত করে। ইরান তার সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম পারমাণবিক স্থাপনা থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেবার ঘোষণা দেবার একদিন পর এ হামলা চালানো হয়।

এ হামলায় ফোরদো এবং অন্যান্য পারমাণবিক স্থাপনার আসলে খুব একটা ক্ষতি হয়নি বলে অনেকের মনে হয়েছে। যেটুকু ক্ষতি হয়েছে, ইরান চাইলে সেটা দ্রুত ঠিক করে কয়েক মাসের মধ্যেই আবার সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করতে পারবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে কেন সাজানো হামলা চালাল সেটা অনেকের কাছে পরিষ্কার না হলেও এর একটা মূল কারণ হলো, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
হামলার কারণ যাই হোক না কেন, এ হামলা ইরানের মিত্র রাষ্ট্রসমূহ বিশেষত রাশিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করে। এ তিনটি রাষ্ট্রের সঙ্গেই ইরানের নানাবিধ প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। ইরানের আধুনিক মিসাইল তৈরির পিছনে রয়েছে এ রাষ্ট্রগুলির কাছ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর জাতীয় সহায়তা।
যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সমর্থনে খুব শক্ত বিবৃতি দিয়ে পাশে দাঁড়ায় উত্তর কোরিয়া। তবে, ইরানের পাশে সেভাবে না দাঁড়ানোর জন্য রাশিয়ার ঘরে এবং বাইরে সমালোচনার মুখে ছিল পুতিন প্রশাসন। এ সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করে ইরানে মার্কিন হামলার পর।
রুশ দার্শনিক আলেক্সান্দার দুগিন—যার দ্বারা স্বয়ং প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রভাবিত বলে মনে করা হয় এবং বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের অন্যান্য নেতৃস্থানীয়রা দৃঢ়ভাবে পুতিনকে ইরানের পাশে দাঁড়াবার আহবান জানান। তাদের বক্তব্যের মূল কথা ছিল, সিরিয়ার পরে ইরানে যদি রাশিয়া ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী মিসাইলের টার্গেট হবে খোদ রাশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশ্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর রাশিয়া তার যতটুকু প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে এর ফলে তার পুরোটাই আবার ভেঙ্গে পড়বে। ফলে, কোনো অবস্থাতেই ইরানের যাতে পরাজয় না ঘটে, সে ব্যাপারে রাশিয়াকে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাশিয়ার পাশাপাশি চীনের মধ্যেও বাড়তি উদ্বেগ তৈরি হয়। কেননা, ইরান তার তেলের ৯০ শতাংশই রপ্তানি করে থাকে চীনে। এছাড়াও, পশ্চিমা শক্তি ইরানে জয়ী হলে চীন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দুর্বল হয়ে পড়বে—যা তাদেরকে শঙ্কিত করে তোলে।
এমতাবস্থায়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মস্কোতে পুতিনের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে দেখা করবার পর রাশিয়া সব রকমভাবে ইরানের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ইরান কাতারে অবস্থিত আল উদেদ বিমানঘাঁটি, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড হিসেবে পরিচিত, সেখানে মিসাইল হামলা চালায়। তবে এটিও ছিল সাজানো হামলা। ইরান আগে থেকেই এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার ওই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি ইরানকে সাজানো হামলা চালাতে দিল কেন? কারণ, এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক-আফগানিস্থানের অভিজ্ঞতা, যে যুদ্ধ পরিচালনা করবার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয় করতে হয়েছে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার—এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেবার অন্যতম মূল কারণ। পাশাপাশি, মার্কিন অর্থনৈতিক দুর্বলতা, অন্য রাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধে জড়াবার জন্য জনসমর্থন না থাকা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা প্রথম নীতি ইত্যাদি সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আরেকটি যুদ্ধে জড়াবার অনুকূলে ছিল না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমকক্ষ কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটি তো বটেই, এমনকি ইউরোপের অনেক ঘাঁটিই ইরানের মিসাইলের রেঞ্জের আওতাধীন। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র এমনভাবে ইরানকে আক্রমণ করেনি, যা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
ইরানের হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষকেই যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দেয় এবং এর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়। দুই পক্ষই এ প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল এ প্রস্তাব মেনে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটল কেন?
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হলেও ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছিল। আয়তনের দিক থেকে ইরান ইসরায়েলের চেয়ে সত্তরগুণ বড় এবং পাহাড় পরিবেষ্টিত। অপরদিকে, ইসরায়েলের ঘনবসতিপূর্ণ সমতল ভূমি—যেটা ইরানকে একটা বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল।
যুদ্ধ ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছিল। ফলে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার পূর্ব মুহূর্তে ইরান বেশ কয়েকবার মিসাইল হামলা চালালেও ইসরায়েল পাল্টা হামলা চালায়নি, যা অতীতের ইসরায়েলের আচরণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অর্থাৎ, হামলা মেনে নেওয়া ছাড়া ইসরায়েলের আর কোনো গত্যন্তর ছিল না, যার ফলে ইসরায়েল এর পাল্টা জবাব দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়নি।
যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থায় ইরান তার সামরিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠবার উদ্যোগ নিয়েছে। ইরান মনে করছে যুদ্ধবিরতি চললেও যে কোনো সময় আবার ইসরায়েলের সঙ্গে তাকে যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে।
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে আর আক্রমণ করা হবে না, এ গ্যারান্টি না পেলে তারা আলোচনার টেবিলে ফিরে যাবে না। সঙ্গে তারা এটাও জানিয়েছে, ইরান তার পুরোনো অবস্থানেই অটল থাকবে; অর্থাৎ, সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে তারা সরে আসবে না। সমৃদ্ধকরণ কতটুকু করতে পারবে, শুধু ওই বিষয়েই ইরান আলোচনা করতে ইচ্ছুক।
যুদ্ধের পরে ইসরায়েল এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে ইরানকে তাদের দাবির প্রতি নতি স্বীকার করাবার আর কোনো সুযোগ খোলা নেই। কঠিন স্যাংশন মোকাবেলা করেই ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি এতদূর নিয়ে এসেছে। ফলে সেখানে নতুন করে তাদের আর কিছু করার নেই।
ইরান যদি এখন তাদের পরমাণু কর্মসূচি আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় তাহলে তা প্রতিরোধ করা পশ্চিমের জন্য দুরূহ। সব মিলিয়ে এ যুদ্ধ ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ইসরায়েল-কেন্দ্রিক যে ক্ষমতার ভারসাম্য, তার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে ইরান নিজেদেরকে আবির্ভূত সক্ষম হয়েছে।