Published : 03 Nov 2025, 08:14 AM
বাংলাদেশের ইতিহাসে তাজউদ্দীন আহমদের মতো সাধারণ অথচ অসাধারণ আদর্শবান নেতা বিরল। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি স্কুলের ছাত্র—অষ্টম শ্রেণিতে পড়তাম। বয়স কম হলেও সেই সময়ের অনেক দৃশ্য, অনেক অনুভূতি আজও স্মৃতিতে অম্লান।
‘এক টাকার প্রধানমন্ত্রী’ নামে পরিচিত তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস স্ত্রী–সন্তান থেকে দূরে থেকেছেন, থেকেছেন কঠোর ত্যাগের জীবনযাপনে। তিনি ঘুমাতেন মেঝেতে; আরাম–আয়েশের চিন্তা তার কাছে ছিল বিলাসিতা। যুদ্ধের সময়ে মুজিব বাহিনীর নামে আলাদা সংগঠন গঠনের প্রস্তাব তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন—কারণ তিনি জানতেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো গোষ্ঠীর নয়, এটি পুরো জাতির লড়াই। এই নীতিনিষ্ঠ অবস্থানেই তিনি শেখ মণিসহ অনেকের বিরাগভাজন হন। এমনকি তাকে হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত হয়েছিল—এই তথ্য পাওয়া যায় মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা ’৭১’ বইয়ে।
আমি তাজউদ্দীন আহমদের ভক্ত। তাজউদ্দীনসহ যে চার নেতা ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের কথা যদি বঙ্গবন্ধু জীবিত অবস্থায় মন দিয়ে শুনতেন, হয়তো ইতিহাসের এই ভয়াবহ পরিণতি আমাদের দেখতে হত না। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হল—গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কখনও জাতীয় চার নেতা হত্যা দিবসের কোনো অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত হননি।
তাজউদ্দীন আহমদের এক কন্যার সঙ্গে একবার আলাপ হয়েছিল আমার। তিনি গভীর কষ্ট নিয়ে বলেছিলেন—শেখ হাসিনা সেদিন সকালে ফোনে তার মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সমবেদনা জানালেও, নিজে কখনো উপস্থিত হননি। কেন এমন হয়—এর কোনো মানবিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ বলেন, এটি অন্ধ পিতৃভক্তির এক রূপ, আবার কারও মতে, হয়তো আশঙ্কা—তাজউদ্দীনের নাম বা মর্যাদা যেন বড় হয়ে না ওঠে। যা–ই হোক, এই নীরবতা কেবল রাজনীতির নয়; এটি এক জাতির ব্যর্থতার প্রতীক।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, সোমবার। মাত্র কয়েক মাস আগেই নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরিবারসহ তার হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে আছে দেশ। অথচ তখনকার সরকারি দল—বাকশাল—একটিও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। কিছু লুকোছাপা প্রতিবাদ, কিছু নিঃশব্দ ক্ষোভ—এই ছিল সেই সময়ের বাস্তবতা।
এদিকে একে একে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, এমনকি রক্ষীবাহিনীর প্রধানও খন্দকার মোশতাকের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে ‘দায়িত্ব পালন’ নামের ভদ্র বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হলেন।
শুধু কালের সাক্ষী হয়ে কারাগারে দিন গুনছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের প্রকৃত নেতারা। তাদের চোখে ঘুম নেই, হৃদয়ে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার ছায়া। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সামান্য আশাবাদী; মনসুর আলী নিস্তব্ধ; কামরুজ্জামান গভীর ভয়ে আচ্ছন্ন।
আর তাজউদ্দীন আহমদ? তার মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে যেন এক অদ্ভুত স্থিরতা—যেন জানেন, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা এবার তার দুয়ারে কড়া নাড়ছে। তিনি ছিলেন যেন পুরাণকথার অর্জুন—অদম্য, দৃঢ়, লক্ষ্যনিষ্ঠ। তিনি জানতেন, মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে কীভাবে, কতটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাকে। তিনিই জানতেন, খন্দকার মোশতাক নামের আওয়ামী লীগারটি কতটা হিংস্র, কতটা বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু এসব কথা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে বলতে পারেননি তাজউদ্দীন আহমদ। যদি বলতে পারতেন—তবুও কি দেশটার পরিণতি বদলাত? নাকি তখনও ইতিহাস একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিত এই দেশকে?
তাজউদ্দীনের চোখে ঘুম ছিল না সেই রাতে। মনের ভেতর যেন কোনো অজানা আশঙ্কা কুরে কুরে খাচ্ছিল। হঠাৎ গভীর রাতে কারাগারের নীরবতা ভেদ করে শোনা গেল গাড়ির গর্জন, পুলিশের পাগলা সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ। তবু তিনি স্থির, নীরব, নিশ্চুপ।
তার সঙ্গী কামরুজ্জামান সাহেব ভয় পেয়ে কাঁপা গলায় বললেন—‘ওরা কি আমাদের মেরে ফেলতে এসেছে?’
শান্ত তাজউদ্দীন তখন মৃদু স্বরে বললেন—‘যান, অজু করে নামাজ পড়ে নিন।’
এই ছিল তার শেষ কথা। ইতিহাসের পাতায় লেখা সেই নিঃশব্দ বিদায়ের বাণী—যা আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, বারবার মনে করিয়ে দেয়, এই দেশের মাটিতে সততার কোনো জায়গা থাকে না।
পাপ–পুণ্য যদি গণনা করা যায়, তবে ইতিহাসে এর চেয়ে বড় পাপ খুব কম। কারাগার, সাধারণ নিয়মে, মানুষকে নিরাপদ রাখার জায়গা। অপরাধীও যেন বেঘোরে নিহত না হয়, সেই কারণেই চার দেয়ালের মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু সেই রাতে, পৃথিবীর সব সভ্যতা, নিয়ম, আইন—সবকিছুকেই যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জেল ফটক খুলে দেওয়া হল। কার নির্দেশে? তখন এই দুর্ভাগা দেশের গদি দখল করেছিলেন আওয়ামী লীগের মীরজাফর—খন্দকার মোশতাক। সেই মানুষ, যিনি নিজে ছিলেন চার নেতার সহকর্মী, হয়তো বন্ধুও, কিন্তু ক্ষমতার লোভে ইতিহাসকে বিকিয়ে দিয়েছিলেন।
সেই একাত্তর থেকে খন্দকার মোশতাক গুটি চালছিলেন পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার পরিকল্পনায়। তখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এমন কূটচাল বাস্তবায়নের পথ বন্ধ করতে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বিদেশে যাওয়াও নিষিদ্ধ ছিল। অথচ পরবর্তীকালে, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মোশতাক হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধুর কাছের লোক। সেই সুযোগে তাজউদ্দীনের মত নেতাকে দূরে সরাতে তাকে খুব একটা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয়নি।
যাদের সঙ্গে তিনি সারাজীবন ওঠাবসা করেছেন, যাদের সঙ্গে পারিবারিক পরিচয় ও আদর্শিক মিত্রতা ছিল—তাদের হত্যা করার জন্য তিনি জেল ফটক খুলে দিতে পারলেন। বুক কাঁপল না, নৈতিকতার কোনো বাঁধন কাজ করল না। সেই রাতেই আমাদের নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধের মূলধারা যেন রক্তের ধারায় ভেসে গিয়েছিল।
এই চার নেতা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মূল স্তম্ভ। আজকের প্রজন্ম হয়তো বিশ্বাসও করতে পারবে না, কতটা সরল ও নিঃস্বার্থ ছিল তাদের জীবনযাপন। কালো ছাড়া কোনো বিলাসিতা ছিল না অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের; মনসুর আলী তো তখনও দেখতেই হেড টিচার; কামরুজ্জামানের সন্তানরা তখন কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র; আর তাজউদ্দীন আহমদ? মাত্র একটি সাদা হাফহাতা শার্ট। ১৯৭৫ সালে তিনি তখন না সরকারে, না আওয়ামী লীগে। তবু, তিনি ও তার সঙ্গীরা হলেন টার্গেট। কারণ তারা ফণী বাবু, মালেক উকিল বা তাহের ঠাকুরদের মতো ক্ষমতার নীল নকশায় অংশ নিতে রাজি ছিলেন না।
যা পাকিস্তানি সেনারা করতে পারেনি, তা করেছিল পথভ্রষ্ট একদল সেনা অফিসার। অবাক হবেন না—জেল হত্যার বিচারে দায়ী এগারো আসামির দশজন এখনও পলাতক। তবু ৩ নভেম্বর আসে, রক্ত ও শোকের সঙ্গে, আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে—নেতৃত্বহীনতা কী, আর কেন আজ এই দেশ ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর অবক্ষয়ের শিকার।
তখনকার সরকারি দল ৩ নভেম্বর পালন করত নামকাওয়াস্তে। কিন্তু এক ধরণের আফসোস থেকে যায়—এই চার নেতার একাত্তরের ভুমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। চার নেতাকে তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হলে কার ক্ষতি হত?
যদি তখনকার স্তাবকতা-সংস্কৃতির রাজনীতি একটু বাইরে এসে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামের মতো নেতাদের যথাযথভাবে তুলে ধরত, তাদের নয় মাসের সংগ্রামের চিত্র সামনে আনা হত, তবে তরুণ প্রজন্ম এতটা বিভ্রান্ত হত না। সত্যি কথা বলতে কি, এমনটা হয়নি, হচ্ছে না, ভবিষ্যতেও হবে—এমন আশা রাখা কঠিন। এভাবেই কি অন্তরালে থেকে যাবে তাদের অবদান? আর এসব কারণে নয় মাসের কাহিনিবিহীন মুক্তিযুদ্ধ আজ শুধুই চেতনার নামে মাথা তুলতে পারছে না।
৩ নভেম্বর আমাদের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়—এক এমন রাত, যার অভিশাপ আজও এই সমাজকে মুক্তি দেয়নি। দেয়নি বলেই হানাহানি, দাঙ্গা, সন্ত্রাস আর অগণতান্ত্রিকতার দানব এখনও আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, আরও শক্ত করে চেপে ধরে। যারা এই বিভাজন, এই সহিংসতার জন্য দায়ী—তারা ইতিহাস জানে না, চেনে না, অনুভবও করে না। আর সে দায়িত্ব আওয়ামী লীগও পালন করেনি। তাই আজ আমাদের শুধু চোখের জল ছাড়া কিছু নেই। অন্তহীন বেদনা, এক হারানো সম্ভাবনার শোকই করতে পারি আমরা। সেই রাতে অভিভাবকহীন রাজনীতি যেন পরবর্তীকালের চরম ব্যর্থতার সূচনা করে দিয়ে গেছে।